পশ্চিমের আকাশে অস্তগত সূর্যের রক্তিম আভাকে ম্লান করে দিয়ে আচমকাই নেমে এল অন্ধকার। সরহিন্দের ধু ধু প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকজন আহত সৈনিক। তাদের কাতর ধ্বনি, এরা সবাই তার একান্ত আস্থাভাজন ছিলেন। ওই একটু দূরে পড়ে আছে প্রিয় ইয়াকুতের নিথর দেহ। আর সুলতানা, এখন বন্দিনী।
অন্য তাঁবুতে আলতুনিয়া অস্থির পায়ে পায়চারী করছেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। এ বন্দিনী সুলতানাকে নিয়ে তিনি এখন কী করবেন?
আহত সিংহীর মতোই হিংস্র হয়ে উঠেছেন বন্দিনী সুলতানা। শত্রু শিবিরের তাঁবুতে বসে তার প্রতি পিতার বিশ্বাসের কথা ভেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে আরেকবার উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন। তার স্মৃতিতে আজ শুধু জ্বল জ্বল করছে সেই দিনটার কথা। যুদ্ধে যুদ্ধে ভগ্নস্বাস্থ্য পিতা যখন মৃত্যুশয্যায়, তার চারপাশ ঘিরে থাকা ওমর-ওমরাহদের জন্য সেই দিনটা ছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার দিন। সেই ক্ষণে সবাই যখন ভবিষ্যৎ সুলতানের নাম শোনার অপেক্ষায় উদ্গ্রীব, এমন সময় তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর কোনো পুত্র নয়, এক কন্যা হবেন এই মসনদের উত্তরসূরি। তাকে আমি সেইভাবে তৈরি করেছি।’
এপ্রিলের উষ্ণতা যেন চরম হয়ে উঠেছিল সেদিন। এমন একটা সিদ্ধান্তের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না একেবারেই। সবাইকে চমকে দিয়ে ঘোষিত হলো তখেতর অধীশ্বরীর নাম। হ্যাঁ, তিনি মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণী। মধ্যযুগের সেই আলো-আঁধারির দিনগুলোয় চরাচর যখন অস্থির, মানুষ যখন রক্তাক্ত তলোয়ার আর শিকল ছাড়া কিছু জানে না, ন্যায়-অন্যায় বোধ যখন অস্পষ্ট, মাত্স্যন্যায় যখন একমাত্র ন্যায় শাস্ত্র, উদ্ধত পুরুষতন্ত্র যখন একমাত্র গৌরব হিসেবে চিহ্নিত; সেই পৃথিবীর এক নারী তিনি। ১৯ জন পুত্রের যোগ্যতাকে অস্বীকার করে যে পিতা তার কন্যাকে সালতানাতের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করেছেন, তিনি দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ। আর দিল্লির সিংহাসনের প্রথম এবং একমাত্র নারী অধীশ্বরীর নাম রাজিয়া।
মৃত্যুর পর পুত্ররা কেউ নয়, কন্যা রাজিয়া বসবে তার সিংহাসনে। ১৯ জন পুত্র যেখানে প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে বসে আছে, সেখানে নিজের নাম শুনে চমকে উঠেছিল রাজিয়া স্বয়ং। তবে বিচলিত হয়নি একবারও।
কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে রাজিয়ার জন্য মসনদে আরোহণ খুব সহজসাধ্য ছিল না। যেখানে তার পিতার ছিল একাধিক স্ত্রী ও পুত্রসন্তান। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র তো সেখানে স্বাভাবিক ঘটনা। শুরু হলো দরবার কক্ষজুড়ে ষড়যন্ত্র। এপ্রিলের তপ্ত রাত্রি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সুলতানের এমন অদ্ভুত শেষ ইচ্ছা রক্ষার কোনো প্রয়োজনই বোধ করলেন না অমাত্যরা।
সুলতান যখন শেষ শয্যায়, তখনই অতিশয় তত্পর হয়ে উঠছিলেন তার এক স্ত্রী শাহ তুর্কান। একসময় কৃতদাসী, উচ্চবিলাসী এ নারী শুধু সুলতানের স্ত্রী হয়েই নয়, দিল্লির অধীশ্বরী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন দীর্ঘদিন। তার পক্ষে সরাসরি এটা হওয়া সম্ভব নয়, তাও বুঝতেন ধূর্ত এ নারী। তাই পুত্র ফিরোজকে সামনে রেখে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জয়ী হলেন তিনি।
পিতার ঘোষিত উত্তরাধিকার নয়, বরং শাহ তুর্কান পুত্র রুকনুদ্দীন ফিরোজ, যাকে নিয়ে তিনি দিনের পর দিন স্বপ্নের জাল বুনে চলেছেন, তাকেই রাতারাতি মসনদে প্রতিষ্ঠিত করলেন। পরদিন সকালে দেখা গেল, ইলতুতমিশের সিংহাসনে মাথা উঁচু করে বসে আছে তার দ্বিতীয় পুত্র ফিরোজ।
রাজিয়াকে এ নিয়ে খুব বেশি বিচলিত দেখা গেল না। তার আক্ষেপ একটাই, শেষ পর্যন্ত এই অপদার্থকে সিংহাসনে বসালেন তারা!
মূলত ফিরোজের আড়ালে শাহ তুর্কানই শাসনক্ষমতা পরিচালনা করতেন। পুরো রাজত্বটাই তিনি নিজের হাতের মুঠোয় নিতে যাচ্ছিলেন। তুর্কানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে ইলতুতমিশের আরো কয়েকজন স্ত্রী নিহত হন এবং তার কনিষ্ঠ পুত্রকে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়।
এরই মধ্যে তিনি ওমর-ওমরাহদের প্রতি বিরূপ আচরণে লিপ্ত হতে থাকেন। তাদের পায়ের তলায় রাখতে চান তিনি। কিন্তু অপদার্থ, ব্যভিচারী, অত্যাচারী, ন্যায়নীতিহীন, অথর্ব পুত্রের আড়ালে তিনি একজন শাহ্ তুর্কান। আর ওমর-ওমরাহ তো অনেক জন। তাদের সঙ্গে কীভাবে পেরে উঠবেন এ ধূর্ত নারী!
সুতরাং নভেম্বরের শীতে আবারো একবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল দিল্লি। রাজধানী যদি ধূমায়িত, বাইরে তখন দাউ দাউ আগুন। অবশেষে তারা ফিরোজকে সিংহাসন থেকে টেনে নামালেন। মাতা-পুত্রকে করা হলো বন্দি।
যারা একসময় নারীর সিংহাসনে আরোহণকে ভালো চোখে দেখেনি, তারাও এবার রাজিয়াকে তখেত বসাতে রাজি হয়ে গেলেন।
পিতা কন্যাকে যোগ্য ভেবেছিলেন ঠিকই, তবে তার অমাত্যরা মনে মনে এটা মেনে নিতে পারেননি শুরুতে। তারা এক অপদার্থ পুরুষের আড়ালে এক উচ্চবিলাসী কৃতদাসীর পরোক্ষ হস্তক্ষেপ থেকে মসনদ রক্ষা করতে আরেক নারীকে মসনদে আহ্বান করেছিল শুধুমাত্র, যে ছিল সুলতানের দ্বারা মনোনীত উত্তরসূরি।
২.
রাজিয়া যেন এতদিন এ অপেক্ষায়ই ছিলেন। সিংহাসনে আরোহণ করতে তার তরফ থেকে কোনো জড়তার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ সে জানে, সালতানাত পরিচালনায় সে কতটা যোগ্য। তার নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে তার কোনো সন্দেহ নেই। তার আত্মবিশ্বাস কুতুব মিনারের মতোই মজবুত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পিতা শুধু তাকে রাজ্য শাসনে দীক্ষিত করেননি, শিক্ষিতও করে তুলেছিলেন। অস্ত্র ও যুদ্ধবিদ্যায়ও তার দীক্ষা ছিল। অভিষেকের দিনে রাজিয়া যখন অন্দরের পর্দা সরিয়ে এক দৃঢ় পদক্ষেপে দরবারে প্রবেশ করলেন, তাকে দেখে যেন ক্ষণকালের জন্য চমকে গেল সবাই। তার মাথায় মুখে ওড়নার আড়াল নেই। অঙ্গে পুরুষের সাজ। মাথায় সুলতানি তাজ। কোমরে বাহারি নকশাদার মণি-মাণিক্যখচিত খাপে ধারালো তলোয়ার। ওমরাহরা বিস্ময় চেপে রাখতে পারলেন না। তারা একে অন্যের দিকে তাকালেন। তাদের চোখে নির্ভরতার ছাপ স্পষ্ট। হ্যাঁ, পিতা উত্তরাধিকার নির্বাচনে ভুল করেননি। এ কন্যাকে নির্বাচন করে তিনি ঠিকই করেছেন। তাদের সামনে বসা কন্যাটি প্রতিপদে একজন যোগ্য সুলতান।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজিয়ার নাম হলো সুলতান রাজিয়াত-উদ-দিন। তার নারী নাম আড়াল করার এক প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা। রাজিয়ার এটা খুব ভালো না লাগলেও মেনে নিয়েছিলেন। সঙ্গে উপাধি যুক্ত হলো জালাল-উদ-দিন।
কিন্তু সিংহাসন রক্ষা করা তার জন্য যে খুব সহজসাধ্য হবে না, এটা তিনি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন।
মূলত সুলতানি আমলে তখন একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছিল। অনেকদিন থেকেই দাস সাম্রাজ্যের পত্তন হয়েছে দিল্লিতে।
রাজিয়ার নানা সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবাক ছিলেন মুহম্মদ ঘুরীর একজন কৃতদাস। তরাইয়ের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়ের পর মুহম্মদ ঘুরী খোরাসনে ফিরে যান। হিন্দুস্তানে অভিযানের পর অভিযান চালিয়ে দিল্লিতে দাস বংশের বুনিয়াদ গড়েন কুতুবুদ্দীন আইবাক।
কুতুবুদ্দীনের সবচেয়ে প্রিয় ভৃত্য ছিলেন ইলতুতমিশ ওরফে আলতামাস। এই আলতামাস তার স্বভাব ও বীরত্বের কারণে কুতুবুদ্দীনের এতটা প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন যে, তিনি তার এক কন্যার বিয়ে দেন তার এই প্রিয় ভৃত্যের সঙ্গে।
কুতুবুদ্দীনের মৃত্যুর পর ইলতুতমিশ তার স্থলাভিষিক্ত হন। তবে মসনদ রক্ষায় তাকে ক্রমাগত লড়াই করতে হয়েছে কুতুবুদ্দীনের অন্যান্য বিদ্রোহী দাসের সঙ্গে।
সুতরাং সেসব বিদ্রোহী রাজিয়াকেও ত্বরাতে দেবে না এটাই স্বাভাবিক। রাজিয়ার মধ্যে মেধা, দক্ষতা, রাজকীয় শিষ্টাচার ও সহবতের সঙ্গে ছিল এক ধরনের ঔদ্ধত্য ও বেপরোয়াভাব। তবে সেটা শুধু ইয়াকুতকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে।
প্রেম এমন এক মোহ, যা মানুষকে অন্ধ ও বিচার-বুদ্ধিহীন করে দেয়। ব্যক্তির মেধা, ব্যক্তিত্ব এখানে ম্লান হয়ে যায়। কোনো শিক্ষা, কোনো সংস্কার এখানে বাদ সাধতে পারে না। রাজিয়া তখন মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণী। প্রেমের মতো এক মস্তিষ্ক নিঃসরিত বৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াকে প্রতিহত করার মতো মানসিক জোর তার ছিল না। তাই তো ইয়াকুতের প্রতি তার গভীর প্রেমকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। হাবসি ক্রীতদাস ইয়াকুত ছিল দক্ষ ঘোড়সওয়ার, যার ওপর রাজিয়াকে ঘোড়ায় চড়া শেখানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। বয়সে সে রাজিয়ার সমবয়সী। পাকা আবলুস কাঠে গড়া যেন তার শরীর। দীর্ঘ দেহ, চওড়া বুক, চওড়া কাঁধ, খাঁড়া নাক, পুরু ঠোট, মাথায় কালো আঙ্গুরের থোকার মতো কোঁকড়ানো চুল, টলটলে আয়ত চোখ, তার চলার ভঙ্গিতে দাসদের মতো কোনো জড়তা ছিল না। সে যখন হাঁটে, তখন মনে হয় যেন হাবসি রাজপুত্র হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু অন্য সময় বিশেষ করে সে যখন রাজিয়ার সামনে দাঁড়ায়, তখন তার আনত মূর্তিটি যেন এক অনুগতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইয়াকুত রাজিয়াকে দক্ষ ঘোড়সওয়ার তো করে তুলেছিল, সঙ্গে সঙ্গে হরণ করে নিয়েছিল তার হূদয়।
সেই সময় প্রাসাদের অন্দরমহলে দাস মনিবের প্রেম অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখনই, যখন সে প্রেম সত্যিকারের প্রেমে পর্যবসিত হয়। রাজিয়ারও হয়েছিল তাই, আর যা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাজিয়ার গতিবিধি সম্পর্কে এরই মধ্যে গুপ্তচরদের মাধ্যমে অবগত হচ্ছিলেন অমাত্যরা।
প্রাসাদের বাগানে রাজিয়া ও ইয়াকুতের আলিঙ্গনাবদ্ধ মূর্তি এক গবাক্ষ থেকে দেখছিল এক চর। ভয়ে ইয়াকুতের হাত শিথিল হয়ে আসছিল। রাজিয়া তাকে আরো জোরে আঁকড়ে ধরে বলেছিল, ভয় কি ইয়াকুত, মৃত্যু তো একবারই হয়। দরকার হয় আমরা একসঙ্গে মরব।
তবে হত্যা নয়, তার জন্য এ কারণে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল।
তুর্কি ওমরাহরা একদিন সরাসরি বললেন, সুলতান বলে যা খুশি করার অধিকার নেই রাজিয়ার। প্রথমত. ইয়াকুত বান্দা, তবে বান্দা কোনো সমস্যা না হলেও সে ভিন্ন জাত। সে তুর্কি নয়, অবিসিনিয়ান। জাতটাই তার প্রধান সমস্যা। কেন, তুর্কিদের মধ্যে কি কেউ তার প্রিয়তম হতে পারত না?
রাজিয়া এর কোনো জবাব দিলেন না। তার এ মৌনতা ঔদ্ধত্য হিসেবে ধরে নিলেন অমাত্যরা। ক্ষোভ ও ঈর্ষা থেকে প্রতিহিংসার ষড়যন্ত্র শুরু হলো। দিল্লির ওপরতলার ঘরে ঘরে তখন ষড়যন্ত্র। আকাশের চাঁদ আর গবাক্ষের ঈর্ষাকাতর চোখগুলোকে সাক্ষী রেখে হিন্দুস্তানের সুলতান যখন একজন দাসের হাতে নিজেকে সমর্পণ করছেন, তখন হিন্দুস্তানের ভূতপূর্ব ক্রীতদাসরা ঘরে দরজা এঁটে সুলতানকে রক্ষার নামে এক নতুন ষড়যন্ত্র আঁটছেন।
কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল রাজধানীতে আচমকা এক ধর্মীয় বিদ্রোহ। হাজারখানেক মানুষ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একদিন হানা দিল দিল্লির বড় মসজিদে। ওরা নাকি কিয়ামিত নামে এক ইসলামী গোষ্ঠী। ওদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মুলাহিদ নামে আরেক গোষ্ঠী। তাদের নায়ক নূরউদ্দীন নামের এক ব্যক্তি। আর তাদের উত্সাহ জোগাচ্ছে রাজ্যের উজির মোহাম্মদ জুনাদি ও তার অনুচররা।
এ ধরনের বিদ্রোহের জন্য রাজিয়া সবসময়ই প্রস্তুত ছিলেন ভেতরে ভেতরে। তাই এতে বিচলিত হলেন না মোটেই। রাজকর্তব্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রাজিয়া কোনো সামান্য নারী নন। তার হুকুমে বাদশাহী ফৌজ যাত্রা করল মসজিদের উদ্দেশে। নূরউদ্দীন পরাজিত হলেন। অন্য নায়করা কেউ কেউ মারা গেলেন, কেউ কেউ বন্দি হলেন। যথারীতি দরবার বসিয়ে রাজিয়া সুলতান বিচার করলেন বিদ্রোহীদের। কেউ কেউ ক্ষমা ভিক্ষা করে মুক্তি পেল। প্রকৃত অপরাধীরা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলো। কেউ কেউ নির্বাসনে গেল। কাউকে কোনো রকম করুণা করা হলো না। তিনি রাজিয়া, তিনি রাজধর্মে অবিচল।
৩.
কিছুদিন চারদিক নিস্তব্ধ রইল। সবাই চুপচাপ। উজির-নাজিররা স্বীকার করলেন, ইলতুতমিশের রাজত্বেও বিদ্রোহ ছিল। কিন্তু রাজিয়ার রাজত্বে সবাই বশ। কিন্তু রাজিয়ার মনে সন্দেহ, তার রাজত্বে এই যে শান্তি বিরাজমান, তা আসলে কতখানি স্থায়ী! আপাতশান্ত দিল্লিতে কোনো সুপ্ত অসন্তোষ আছে কিনা! তাই একবার পরখ করে দেখার জন্য তিনি একদিন জরুরি বার্তা পাঠালেন ইয়াকুতকে।’ আগামীকাল সকালে দরবারে হাজির দেখতে চাই।’
প্রেম মূলত একটা ব্যাধির মতো, যা ওই ব্যাধিগ্রস্তকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। নয়তো ইয়াকুতের প্রতি রাজিয়ার এ অতি আগ্রহের কোনো প্রয়োজনই ছিল না, যা তার শান্ত সালতানাতকে আবারো অশান্ত করে তুলল। কিন্তু প্রেম এমন এক বল্গাহীন আবেগের নাম, যা সিংহাসন বা রাজসম্মানের ধার ধারেনি কোনো কালেও।
ইয়াকুত রাজিয়ার কাছে ভালোবাসা ছাড়া আর চায়নি কোনো কিছুই। তবে সেই চাওয়াটাও কি সে মুখে কখনো প্রকাশ করেছে সেভাবে! কিন্তু রাজিয়া তাকে দিতে চেয়েছে সর্বস্ব। তাকে ধীরে ধীরে করে তুলতে চেয়েছে সুলতানার সওহরের উপযোগী।
যে মুহূর্তে রাজিয়া ইয়াকুতকে দরবারে ডেকে অশ্বশালার প্রধান হিসেবে ঘোষণা করলেন, সেই মুহূর্ত থেকে আবারো অসন্তোষ জেগে উঠতে লাগল। রাজিয়া ওয়াজির সাহেবের চোখে প্রচ্ছন্ন বিক্ষোভ দেখতে পেলেন।
দরবার ভাঙতে না ভাঙতেই গোটা সভাকক্ষ ক্রোধে ফেটে পড়ল। একদল তলোয়ার কোষমুক্ত করে রাজিয়ার সমর্থকদের দিকে এগিয়ে গেল, ‘এভাবে অপমানিত করার মানে কি আমাদের? রাজিয়ার রূপ তোমাদের বশ করতে পারে, আমাদের নয়।’
অন্য পক্ষ তা প্রতিহত করল। আবারো শুরু হলো ছোটখাটো বিদ্রোহ।
রাজিয়া এবারো কঠোর হস্তে দমন করলেন সেই বিদ্রোহ। রাজিয়ার মনে সাহস, মাথায় বুদ্ধি, আর দেহে তারুণ্যের শক্তি তাকে প্রায় দিগ্বিজয়ী আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী করে তুলেছিল, যা একসময় তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল; যা ক্রমশ ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল তার সালতানাতজুড়ে।
আবারো রাজ্যজুড়ে বিদ্রোহের দামামা বেজে উঠেছে। রাজিয়াকে এবার বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সরহিন্দে ইখতিয়ার উদ্দীন আলতুনিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।
রাজিয়া উজিরকে ডেকে বললেন, সেনাবাহিনীর ভার তিনি নিজেই নিতে চান। রাজিয়ার সেনাবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন তার ভগ্নিপতি জালালুদ্দিন। তিনি রাজিয়াকে বাধা দিলেন। বললেন, ‘এমন হলে বেহেস্তবাসী সুলতান ইলতুতমিশের কাছে কী জবাব দেবে এই বান্দা?’
তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আপনি রণসজ্জার আয়োজন করুন। জবাব দেয়ার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। আমরা হারব না ইনশাআল্লাহ।
সেদিন ছিল ১২৪০ সালের অক্টোবর মাস। বিশাল বাহিনী নিয়ে জালালুদ্দিন এগিয়ে গেলেন সরহিন্দের দিকে। সৈন্যবাহিনীর পুরোভাগে হাতির পিঠে রাজিয়া। হাতির গাঘেঁষে তার পাশাপাশি চলেছে একটি সাদা তুর্কি ঘোড়া। সে ঘোড়ায় উপবিষ্ট হাবসি জওয়ান ইয়াকুত। সে যেন আজ ঘোড়ার চেয়েও বেশি টগবগে। রাজিয়ার মুগ্ধ দৃষ্টি বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছে।
সুলতানা রাজিয়া তখন ঘুণাক্ষরেও জানতে পারছেন না, কী গভীর ষড়যন্ত্রের জাল তার বিরুদ্ধে বিছানো হয়েছে যুদ্ধের ময়দানে। তার মুগ্ধতায় ছেদ পড়ে যুদ্ধের দামামা শুনে। যেন আচমকাই সে এসে পড়ল লড়াইয়ের ময়দানে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিকে উন্মত্ত সৈন্যের উন্মত্ততায় সে দিশেহারা হয়ে পড়ল। যুদ্ধের কোনো নিয়মই এখানে প্রয়োগ করা হয়নি। কে তার সৈন্য আর কে বিরোধী শিবিরের, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পলকে হারিয়ে যায় সাদা ঘোড়া। রাজিয়া উন্মাদিনীর মতো চিত্কার করে হাঁক দিলেন সৈন্যদের বিরোধী শিবিরের দিকে এগিয়ে যেতে। কিন্তু হায়! সহসা শত্রু-মিত্র যেন একাকার হয়ে যায়। তার পক্ষ হয়ে ঢাল ধরার যেন কেউ নেই। ইয়াকুত একা। সে কীভাবে দুই শিবিরের একাকার হয়ে যাওয়া সৈন্যদের সামাল দেবে? শত শত ঘোড়ার খুরে পিষ্ট হতে লাগল মাটিতে লুটিয়ে পড়া ইয়াকুতের ঘোড়া।
রাজিয়া হাতির মাথায় অঙ্কুশে ঘা বসালেন। তার গলায় যেন রণধ্বনি।
নিমেষে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে ইয়াকুতকে কেউ পেছন থেকে আঘাত করেছে।
হাতির পিঠ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমে এলেন রাজিয়া। ইয়াকুতের মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে তার বুকে কান রাখলেন। কোনো সাড় নেই। উন্মাদিনীর মতো ওর মুখে মুখ গুঁজে শ্বাস দেয়ার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলো না। সব শেষ হয়ে গেছে, ইয়াকুত আর নেই। রাজিয়ার তখন বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে, ইয়াকুতকে যেকোনো প্রকারে আঘাত করা ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য ছিল।
তার পরও তিনি দমলেন না। হাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে রণহুঙ্কার দিলেন। দু’চোখ দিয়ে তার যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। কোনো বিদ্রোহীর যেন সাধ্য নেই তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
—এগিয়ে চলো! কিন্তু কোথায় সুলতানি ফৌজ! চারদিকে শত্রু সৈন্য। তার বিশ্বাসঘাতক সৈন্য দল কখন তাকে ফেলে রাজধানী অভিমুখে ফিরে গেছে।
এরই মধ্যে একজন সম্ভ্রান্ত চেহারার সৈনিক এগিয়ে এসে বললেন, ‘সেলাম সুলতানা। আপনার সৈন্যরা আপনাকে ত্যাগ করে দিল্লির পথ ধরেছে। আপনি কি এবার এই মহাশ্মশান ত্যাগ করবেন না?
না। জবাব দিলেন রাজিয়া। আমি এখনো দিল্লির সুলতান।
তবে বেয়াদবি মাফ করবেন। পরাজিত আপনি, এখন আমাদের হাতে বন্দি হলেন।
তার পর রীতিমতো তাকে সম্মান দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বন্দি শিবিরে। আলতুনিয়ার দুর্গে।
দুর্গে বন্দিনী সুলতানা।
অন্যদিকে দুর্গের নিজ কক্ষে অস্থির পায়চারি করছেন আলতুনিয়া। দিল্লির অমাত্যরা তাকে দিল্লির মসনদের অধীশ্বর হওয়ার প্ররোচনায় সুলতান রাজিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করার মন্ত্রণা দিয়েছিলেন। তিনি যথারীতি অভিযান পরিচালনা করেন। এক ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় কেউ কারো ওপর আক্রমণ করেনি। শুধু রাজিয়ার বিশ্বস্ত সৈন্যরাই যুদ্ধে হতাহত হয়েছেন এবং রাজিয়াকে ফেলে মূল ফৌজ দিল্লি ফিরে গেছে। সুলতান বন্দি, আলতুনিয়া এ যুদ্ধে জয়ী, কিন্তু তিনি এখন বুঝতে পারছেন, দিল্লির মসনদ তার জন্য নয়। তিনি বুঝতে পারলেন, দিল্লির অমাত্যরা তাকে ব্যবহার করেছে শুধুমাত্র। তারা সবাই সেখানে ফিরে গিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ খেলায় এখন তাদের আলতুনিয়াকে আর কোনো প্রয়োজন নেই। অচিরেই এ সংবাদ ভেসে আসে আলতুনিয়ার কানে।
এভাবে তাকে ধোঁকা দিল ওই সব কুচক্রী ওমরাহ! তবে কি তারা ভেবেছে, রাজিয়াই তার এ সফল অভিযানের একমাত্র পুরস্কার? কিন্তু যে সিংহাসনের জন্য এ যুদ্ধ, সেই সিংহাসনই যদি তার না হলো, তাহলে তিনি কী করবেন এই রাজত্বহীন, মসনদহীন ইলতুতমিশ কন্যাকে নিয়ে? কতদিন বন্দি করে রাখবেন তাকে? ইলতুতমিসের মতো সেও তো একজন দাস। সামান্য ক্রীতদাস থেকে প্রতিভা ও যোগ্যতাবলে এ অবস্থানে পৌঁছেছে সে। কোনো নারীকে অপমান করা বা হত্যা করা তার কাম্য হতে পারে না। তার চেয়ে বরং রাজিয়াকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করাই তার জন্য সমীচীন হবে।
রাত গভীর। নিঃশব্দ গারাগারের উঁচু দেয়ালঘেঁষে দাউ দাউ করে জ্বলছে মশাল। সেখানে ধীর পায়ে পায়চারি করছেন রাজিয়া। তারা শরীরজুড়ে অবসাদ, অন্তরজুড়ে বেদনার ভার, তবুও তিনি দু’দণ্ড স্থির হয়ে বসতে পারছেন না। যতবার তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিশ্বাসঘাতকতার দৃশ্যটা কল্পনা করেন, ততবার রাগে তার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই তাবৎ অবিশ্বাসের প্রতিশোধ একদিন তাকে নিতেই হবে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন তিনি। কিন্তু এ বন্দি অবস্থায় কীভাবে সেটা সম্ভব! সেই মধ্যযুগে বন্দিনীদের প্রতি বিরূপ আচরণের কাহিনী রাজিয়ার অজানা নয়। তিনি কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
৪.
এরই মধ্যে একদিন রাজিয়ার বন্দি শিবির উপঢৌকনে উপঢৌকনে ভরে উঠতে লাগল। রাজিয়া বুঝতে পারেন, কোনো এক নতুন মেরুকরণের আভাস এটা। তবে সেটা ভালো, নাকি মন্দ! না না, সংশয়ের দোলাচল সারা দিনজুড়ে। সন্ধ্যায় তিনি একখানা বই খুলে বসে ছিলেন, মশালের আলোয় তার মুখটা নির্মল দেখাচ্ছিল। এমন সময় কারারক্ষী এসে জানান দিলেন, তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন স্বয়ং আলতুনিয়া। রাজিয়া জানেন, সৌম্য দর্শন এ ব্যক্তির আচরণ যথেষ্ট সৌজন্যপূর্ণ। কিন্তু এসব কিসের আলামত!
এরই মধ্যে তসরিফ রাখলেন আলতুনিয়া। প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়ের পর আলতুনিয়াকে কেমন একটু ইতস্তত লাগছিল। রাজিয়া বুঝলেন, নিশ্চয়ই তিনি কোনো প্রস্তাব করতে এসেছেন, কিন্তু সহবতের ক্ষুণ্নের আশঙ্কায় বলতে পারছেন না। এ প্রস্তাব খুব সহজ হবে না জেনেও রাজিয়া তাকে অভয় দিলেন বলার জন্য।
আলতুনিয়ার দৃষ্টি এতক্ষণ ছিল নিম্নমুখী। এতক্ষণে তিনি সুলতানার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। মশালের আলোয় ওই দ্যুতিময় কোমল মুখচ্ছবির নারীর দিকে তাকিয়ে তার হূদয় তোলপাড় করে উঠল। তিনি যেন তার হূত্স্পন্দন শুনতে পাচ্ছিলেন। কণ্ঠের কম্পন কোনোভাবে সংবরণ করে তিনি বললেন, সুলতানা আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং বিদুষী। আমি না বলতেই আপনি আন্দাজ করতে পারছেন, আজ এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি আপনার কাছে। মহীয়সী, আপনি এই বান্দার অপরাধ নেবেন না। আপনিও একজন বান্দার কন্যা এবং এখনো অবিবাহিতা। আসুন, আমারা শত্রুতা ভুলে গিয়ে দুজনের মধ্যে স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তুলি। আপনার যদি সম্মতি থাকে, তাহলে আমি আপনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি। আপনি একে কোনো জোরজবরদস্তি ভাববেন না অনুগ্রহ করে। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমরা আবার দিল্লি দখল করব এবং দিল্লির তখেত বসাব আপনাকেই। সুলতানা রাজিয়াকে।
বন্দি হওয়ার পর এই প্রথম রাজিয়ার চোখে জল এল। তিনি প্রতিক্ষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন তার বন্দিদশার ভবিষ্যৎ নিয়ে। তীব্র অপমানিত হওয়ার বা মৃত্যুর প্রহর যেমন গুনতেন, আবার সালতানাত ফিরে পাওয়ার স্বপ্নও দেখতেন একই সঙ্গে। আজ এই ক্ষণে যেন সব উদ্বেগের অবসান ঘটল। তবে এই অভাবনীয় ঘটনার জন্য নয়, তার চোখে জল এল শুধু ইয়াকুতের জন্য। এ তার অন্য কোনো দুর্বলতা নয়। রাজিয়া আলতুনিয়ার অলক্ষে নিঃশব্দে চোখ মুছলেন। তার পর নীরব রইলেন দীর্ঘক্ষণ। একটি দীর্ঘশ্বাসে বক্ষ পূর্ণ করে নিলেন। আবার ঋজু হলো দেহভঙ্গিমা। কণ্ঠস্বর স্থির ও গাঢ় হলো ধীরে ধীরে এবং বললেন, আপনার প্রস্তাবে আমি রাজি।
বিদুষী রাজিয়া দিল্লি পুনরুদ্ধারের কথা ভেবেই এ বিবাহ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন, এ সময়ে ইয়াকুতের বিরহে বিরহী হয়ে থাকা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বিয়েটাকে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তার কাছে আর কিছুই নয়।
সরহিন্দের সেই দুর্গে আলতুনিয়ার সঙ্গে বিয়ে হলো রাজিয়ার। এবং এর পরদিন থেকেই তারা দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য কাজে লেগে পড়লেন।
আলতুনিয়ার একটাই কথা— সিংহাসন উদ্ধার করে আপনাকে ফিরিয়ে দেয়াই হবে আমার পাপের প্রয়শ্চিত্য বিবি। সুলতানা রাজিয়াই আমার কাছে দিল্লীশ্বরী, আমি তার দাসমাত্র।
৫.
সুলতানার নতুন বাহিনী সাজিয়ে আলতুনিয়া একদিন দিল্লির পথ ধরলেন। পাশে তার যোদ্ধাবেশে রাজিয়া। এই কদিনের মধ্যে কি অবিশ্বাস্য দৃশ্যান্তর! রাজিয়া দেখছিলেন ইয়াকুতের স্থলে এখন অন্য সওয়ার। সাদা ঘোড়ায় চড়া আলতুনিয়া ইয়াকুত নয়। অনেক বেশি তেজস্বী। পরম বিক্রমের সঙ্গে লড়াই করছে দুর্ধর্ষ আলতুনিয়া।
ইয়াকুত নত চোখে সত্যিকার অর্থে জানাতে চাইত তার দাসত্ব। আর আলতুনিয়া মুখে বারবার ‘আপনার বান্দা’ বলে যেন অস্বীকার করে নেয় তার দাস অস্তিত্বকে। প্রকাশ করে তার সত্যিকার পৌরুষ ও কষ্টে অর্জিত আভিজাত্যকে।
কিন্তু আলতুনিয়াও এ যুদ্ধে সফল হতে পারল না। সৈন্যদের একাংশ এবারো বিশ্বসঘাতকতা করল। দিল্লি হাতের মুঠোয় পেয়েও মুঠো শিথিল করতে হলো তাদের।
তারা দুজন বন্দি হলেন। রণাঙ্গন এখন নিস্তব্ধ। অস্ত্রের ঝনঝনানি, যোদ্ধার হুঙ্কার, মুমূর্ষের আর্তনাদ, কামানের গর্জন, হাতি-ঘোড়ার বৃংহিত-হ্রেষা সব বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাদের ঘিরে উল্লাস করছে মধ্যযুগের বিকৃতমনস্ক যোদ্ধারূপী কয়েকজন মানুষ। এক ত্রূদ্ধর অপমানের জ্বালা তীরের মতো বিঁধছে তাদের অহমে। শরীরের আঘাত শরীরের লাঞ্ছনা কিছুই নয় যেন। তারা দুজনই এখন অপেক্ষা করছে মৃত্যুর। ক্ষণকালের মধ্যেই খ্রিস্টের পরিণতি বরণ করে নেবে তাদের। আলতুনিয়া মনে মনে বললেন, এ ঘটনা ভারতবর্ষের সালতানাতের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায় হয়ে রইল, সেটা বুঝতে পারল না ত্রূদ্ধর বিশ্বসঘাতক ক্ষমতালোভীরা। তারা বুঝতেও পারল না, একজন নারীকে তারা পরাজিত করেছে তাদের পৌরুষ দিয়ে নয়, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নয়, ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে।






