কুতুব মিনার ও এক ছুটন্ত ঘোড়া...

ইতিহাসের কেতাব খুলে বসলে একটি বিষয় অনায়াসেই উপলব্ধি করা যায়; সেটি হলো এর পাতায় পাতায় সন্তর্পণে বিচরণশীল, প্রাক্তন প্রতাপশালী চরিত্রগুলোর সংবেদনশীলতা। এ সংবেদনশীলতার দায় রক্ষা করতে গিয়ে ঐতিহাসিকদের যেমন নাস্তানাবুদ হতে হয়, ঠিক তেমনই কালঘাম ছুটে যায় শিল্পের অন্যান্য শাখায় কাজ করা ব্যক্তিদেরও। খানিকটা সংকুচিত করে ব্যক্ত করলে লেখক, চলচ্চিত্রকারদের। শিল্পের প্রাথমিক অবলম্বন হিসেবে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোকে যদি নেহাতই কঙ্কাল বলে বিবেচনা করা যায়, তবে এ কঙ্কালের শরীরে তাদের জুড়তে হয় মেদ, মাংস; এবং অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘রূপের লাবণ্য’। আর এসবের সুষম মিশ্রণেই একজন পিরিমকুল কাদিরভ গড়ে তোলেন দিগ্বিজয়ী বাবরকে, একজন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় গড়ে তোলেন ‘হিন্দুস্তানের পহেলা শাহজাদা’ দারাশুকোকে; একজন রিচার্ড অ্যাটেনব্রো গড়ে তোলেন মানুষ ও দেবতার মিশ্ররূপ মহাত্মা গান্ধীকে কিংবা একজন কমল আমরোহি গড়ে তোলেন যুগপৎ নারী ও শাসকের মূর্তি রাজিয়া সুলতানাকে। অবশ্য এ শিল্পকর্মগুলোর গুণের তারতম্য রয়েছে বা থাকতে পারে; সেটি মান্য বিবেচনা করেই নামগুলো উল্লেখ করলাম।

বাল্যে রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা জেনেছিলাম; কিংবা বিদ্যার সঙ্গে কল্পনার সংমিশ্রণে এক আপাত সরল জ্ঞান হয়েছিল—ওই রাঙা ঘোড়ার ’পরে যিনি ছুটে চলেছেন, তিনি বীরপুরুষ। বড় হয়ে মস্তিষ্ক জাগলে স্বভাবতই একটি প্রশ্ন পাখা মেলেছে—পুরুষের বিপরীত, মাতৃপরিচয়ের বাইরে, পালকির ওই নারী কি তবে কেবলই বীরভোগ্যা? এর উত্তর খোঁজার অভিপ্রায়ে ভারতবর্ষের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই কোনো ক্লিওপেট্রার, এলিজাবেথের। আমাদের ইতিহাসের প্রতি ফিরে চাইলেই প্রত্যক্ষ করা যায়—আট শতকের ওপার হতে, ধুলোর পুরনো আস্তর ভেঙে, কুচবরণ ঘোড়ায় চড়ে, ছুটে আসছেন উত্তর তিরিশের এক রণনিপুণা নারী। আগমনেই যিনি জানান দেন—কেবল পুরুষের বাহুলগ্ন হয়ে থাকার জন্য তার জন্ম হয়নি; জন্ম হয়নি নারীর। এ বীরাঙ্গনার নাম রাজিয়া সুলতানা, ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম নারী শাসক। বিশুদ্ধ ইতিহাসকে ব্রাত্য রেখে, শিল্পসাহিত্যের পরিমণ্ডলে দৃষ্টি দিলে, এটি ব্যক্ত করতে দ্বিধা নেই যে রাজিয়াকে আমরা অনেকটাই উপেক্ষিত রেখেছি। তার সমকালীন অন্য অভিজাত নারী পদ্মাবতীর সতীত্ব নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, বিদীর্ণবক্ষে যত হাহাকার হয়েছে, যত অশ্রু বিসর্জিত হয়েছে, তার ন্যূনতমও হয়নি রাজিয়া সুলতানার বীরত্ব নিয়ে। অথচ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বরং নারীর বীরত্বটাই বরণীয়, বন্দনাযোগ্য।

রাজিয়া সুলতানাকে নিয়ে ভারতবর্ষে প্রচলিত, বিভিন্ন ভাষায় নাট্যরচনার উদাহরণ রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত, বলবন্ত গর্গির ‘সুলতান রাজিয়া’ (১৯৭৩) বেশ উল্লেখযোগ্য। উত্তরকালে এ নাটকটি উর্দুতে ভাষান্তর করে দিল্লিতে মঞ্চস্থ করেছিলেন ইব্রাহীম আলকাজি। তার জীবনী নিয়ে পর্দায় প্রথম কাজ, দেবেন্দ্র গোয়েল পরিচালিত ‘রাজিয়া সুলতান’ (১৯৬১)। উর্দু ও হিন্দি ভাষার বিশিষ্ট কবি কমল আমরোহি ১৯৮৩ সালে তার জীবনী নিয়ে নির্মাণ করেন ‘রাজিয়া সুলতান’ নামের আরেকটি চলচ্চিত্র। এ প্রসঙ্গে কমল আমরোহির সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদানের প্রয়োজন বোধ করছি। তার জন্ম ভারতের উত্তর প্রদেশে ১৯১৮ সালে। এর ২০ বছর বাদে কাজের প্রয়োজনে তিনি লাহোরে চলে আসেন। এখানেই তার পরিচয় ঘটে প্রখ্যাত গায়ক কুন্দল লাল সাইগালের সঙ্গে। ‘মিনারভা মুভিটুন ফিল্ম কোম্পানি’র কাজের জন্য সাইগাল সাহেব তাকে মুম্বাইতে নিয়ে আসেন। এখানে থিতু হওয়ার পর তিনি ‘জেইলার’ (১৯৩৮), ‘পুকার’ (১৯৩৯), ‘ভরসা’ (১৯৪০), ‘শাজাহান’ (১৯৪৬) চলচ্চিত্রে প্রাথমিকভাবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেছিলেন। ‘রাজিয়া সুলতান’সহ কমল আমরোহি মোট চারটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন; অন্য তিনটি চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘মহল’ (১৯৪৯), ‘দাইরা’ (১৯৫৩) ও ‘পাকিজা’ (১৯৭২)।

কাহিনী, দৈর্ঘ্য ও নির্মাণ ব্যয় বিবেচনায় নিলে কমল আমরোহির ‘রাজিয়া সুলতান’ চলচ্চিত্রটিকে মহাকাব্যিক বলার অবকাশ রয়েছে। আরব সাগরের তীরের চলচ্চিত্র পাড়ায়, যার আরেক প্রস্থ তুলনা চলতে পারে—নন্দলাল যশবন্তলাল পরিচালিত ‘আনারকলি’ (১৯৫৩) ও কে আসিফ পরিচালিত ‘মুঘল-ই-আযম’ (১৯৬০)-এর সঙ্গে। তবে ‘রাজিয়া সুলতান’ বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে খুব একটা সমাদর লাভ করেনি। বরং বহু পয়সা প্রযোজককে স্রেফ জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিল। এ চলচ্চিত্রে বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে রাজিয়া সুলতানা চরিত্রে হেমা মালিনী, জালালুদ্দিন ইয়াকুত চরিত্রে ধর্মেন্দ্র ও শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ চরিত্রে প্রদীপ কুমার অভিনয় করেছেন। প্রথম দৃশ্যেই আমরা প্রত্যক্ষ করি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘ইষ্টক-ইমারত’ কুতুব মিনার ও ঘোড়ার পিঠে ছুটে আসা, ইলতুতমিশ নন্দিনী, শেহজাদি রাজিয়াকে। যা তাত্ক্ষণিক; কিন্তু যুগ্মভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়দিল্লি সালতানাতের ইতিহাস ও রাজিয়া সুলতানার বীরত্বকে। সুলতানি শাসন ব্যবস্থা, বন্দোবস্তের বহু দিকই চলচ্চিত্রটিতে ভাষা পেয়েছে, উন্মোচিত হয়েছে। আলোচনার অভিপ্রায়ে আংশিকভাবে সেগুলোকে স্পর্শ করে গেলেও আমরা চলচ্চিত্রের কাহিনী ধরে মুখ্যতা প্রদান করতে চাই রাজিয়া সুলতানার চরিত্রে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা উত্তম, সেটি হলো চলচ্চিত্রটিতে কমল আমরোহির অধিক মনোযোগ নিবদ্ধ থেকেছে মূলত ব্যক্তি রাজিয়ার চরিত্র নির্মাণে। যে চরিত্রটি কাঠামো পেয়েছে দুটি প্রধান বিশিষ্টতায়: প্রথমত, প্রেমপূর্ণ হূদয়ের এক নারীর; দ্বিতীয়ত, রণকুশলী ও সাহসী শাসকের।

‘সুলতানি লেবাস এক কাফন হ্যায়, লেকিন রাজিয়া জিন্দা হ্যায়’...

প্রারম্ভে উল্লিখিত, সাহিত্যে কিংবা চলচ্চিত্রে ঐতিহাসিক চরিত্রকে কেবল তার আদি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলে না। তাকে পূর্ণতা দেয়ার অভিপ্রায়ে প্রয়োজন হয় মেদ, মাংস ও রূপের লাবণ্যের। আর এখানেই নিহিত যেকোনো শিল্প করিয়ের নিজস্ব কুশলতা প্রদর্শনের সুযোগ। ‘রাজিয়া সুলতান’-এ পরিচালক কমল আমরোহিও এ সুযোগটি পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করেছেন। অবশ্য এতে বিশুদ্ধ ইতিহাসের খানিকটা বিকার ঘটেছে। কিন্তু এতে তিনি যে রাজিয়া সুলতানাকে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন, সেই চরিত্রটি নিঃসন্দেহে এক নবনির্মাণ ও শিল্পরূপে উপাদেয়। আড়াই ঘণ্টার এ চলচ্চিত্রে রাজিয়া সুলতানা চরিত্রের যে আপাত গড়ন দৃষ্টিগোচর হয়, সেই গড়নের এক প্রান্তে রয়েছেন তার পিতা সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ, যিনি চেতনাগতভাবে শাসক রাজিয়ার ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছেন। অন্য প্রান্তে রয়েছেন হাবসি গোলাম থেকে আমিরে পরিণত হওয়া জালালুদ্দিন ইয়াকুত। যিনি শাসক রাজিয়া সুলতানার সমান্তরালে পূর্ণতা দিয়েছেন তার নারীত্বকে; ব্যক্তি রাজিয়াকে। এখানে প্রত্যক্ষ করা যায়, রাজিয়া সুলতানা সেকালের আর দশজন নিরীহ রাজকন্যার মতো নন, যারা অন্দরমহলের চতুষ্প্রকোষ্ঠে একপ্রকার বাঁদীর জীবন অতিবাহিত করেন। বরং সুলতান পিতার ইচ্ছা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে, তার অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হয় ঘোড়ার পিঠে, দুর্গম পথে যাত্রা শিখে, রণপ্রশিক্ষক ইয়াকুতের কাছে সমরাস্ত্র পরিচালনার তালিম নিয়ে। রাজিয়া যেদিন তার প্রিয় ‘সুলতানবাবা’ ইলতুতমিশসহ ভরা দরবার-ই-আমে, রণপ্রশিক্ষণে তার সার্বিক কুশলতা ও নিপুণতা প্রদর্শন করেন, সেদিনই সুলতান খুশি হয়ে তার প্রশিক্ষক ইয়াকুতকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে আমিরের পদে নিযুক্ত করেন। এ ইয়াকুত কেবল একজন রণপ্রশিক্ষক বা আমিরই নন; রাজিয়া সুলতানার প্রাণের মানুষও বটে।

আমরা দেখি, পিতা ইলতুতমিশের স্নেহ-ছায়ায় রাজিয়া সুলতানা গড়ে ওঠেন তারই মতো করে। পিতার সাহস, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা—সব গুণই সঞ্চারিত হয়, বাসা বাঁধে রাজিয়ার চরিত্রে। একসময় তিনি হয়ে ওঠেন সার্বিক দিক থেকে পিতার ভরসার স্থল, যোগ্য উত্তরাধিকারী; এমনকি অবলম্বন। এর উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, রাজিয়াকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধযাত্রাকালে ইলতুতমিশ যখন উজির-এ-আযমের বার্তা পান যে দিল্লি দেখভালের দায়িত্বে থাকা তার পুত্র রুকনদ্দিন ফিরোজ লাগামহীন দুঃশাসন চালাচ্ছে, মেয়েদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করছে। তখন ন্যায়পরায়ণ শাসক ক্ষুব্ধ ইলতুতমিশ ইয়াকুতের সঙ্গে রাজিয়াকে দিল্লিতে পাঠিয়ে দেন শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেবার প্রয়োজনে। সাময়িকভাবে মসনদ পরিচালনার অধিকারী হয়ে রাজিয়া পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কোনো প্রকার অপরাধকে প্রশ্রয় দেন না; এমনকি পিতার তুল্যই বৈমাত্রেয় ভ্রাতা রুকনদ্দিন ফিরোজের হারেমে প্রবেশ করে তাকে প্রহার অবধি করেন। দরবারে অধিষ্ঠিত মুফতির ফতোয়া অনুসারে দুষ্কৃতির প্রতিবিধানে ইলতুতমিশ শাস্তি ঘোষণার পর অক্ষম পুত্রের বাকি শাস্তি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তেমনি রাজিয়াও ন্যায়দণ্ড হাতে নিয়ে আপন-পর বিবেচনা করেন না; বরং সেই পরিচিত চোখটাকে কালো কাপড়ে বেঁধে রাখেন। আমরা প্রত্যক্ষ করি, তার ভালোবাসার মানুষ ইয়াকুতের নামে যখন রুকনদ্দিন ফিরোজের নিযুক্ত ব্যক্তিরা নারী সম্ভোগের মিথ্যা অভিযোগ আনে, তখন রাজিয়া কালবিলম্ব না করে ইয়াকুতকে বন্দি করার আদেশ প্রদান করেন ও তাকে জনসম্মুখে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করান। এ ঘটনার মাধ্যমে তার অভ্যন্তরে শাসক ও নারীসত্তার একটি প্রাথমিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। কিন্তু প্রোজ্বল হয়ে ওঠে তার ন্যায়বিচারকের মূর্তি।

আবার একজন নারী হিসেবে ইয়াকুতের প্রতি হূদয়ের প্রেমকেও তিনি বাঁধ মানাতে পারেন না; অন্তত নিজের কাছে। এ কারণে রাতের অন্ধকারে সবাই যখন ঘুমিয়ে, তিনি কারাগারে গোপনে ইয়াকুতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাত্কালে অন্ধকার নেপথ্য হতে ইয়াকুতের উচ্চারণ ‘রাজিয়া সুলতান’-কে স্রেফ একটি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখে না। বরং করে তোলে এক রোমান্টিক আখ্যানও—‘বানু, মুঝে না পুকার, মুঝে আপনি তরফ না বুলা। তুঝে দেখনে কে বাদ, এ রাত মেরে বদন কি তামাম খুন পি যায়েঙ্গি।’ এখানে বলে রাখা উত্তম—চলচ্চিত্রে রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে ইয়াকুতের সম্পর্ককে কমল আমরোহি মুখ্য করে তুলেছেন। আর তাদের সম্পর্কের স্তরে স্তরে ইতিহাসকে মিশিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন কাহিনীকে। ফলে ইয়াকুত কেবল রাজিয়া সুলতানার প্রিয়পাত্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেন নি। বরং তিনি হয়ে ওঠেন সুলতান ইলতুতমিশের প্রিয় ও বিশ্বস্ত পাত্রদেরও একজন। কাহিনীতে দৃষ্টিগোচর হয়, মৃত্যুপথযাত্রী সুলতান তার কন্যা রাজিয়াকে সালতানাতের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনয়ন দিতে চাইলে দরবারের আমিররা বিরোধিতা করেন। এ বিরোধিতার মুখে সুলতান রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে একটি অসিয়তনামা লিপিবদ্ধ করেন; সেটি দিয়ে যান ইয়াকুতের হাতে। যাতে তার মৃত্যুর পর ইয়াকুত জনসাধারণের মাঝে গিয়ে বলতে পারে, রাজিয়া সুলতানাই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। ইয়াকুত সুলতানের এ অসিয়তনামা একটি খঞ্জরের সাহায্যে নিজের বুকে খোদাই করে নেয়, যাতে কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়। এমন বিশ্বস্ততা প্রকৃতই দুর্লভ।

সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর রাজিয়া সুলতানার পরিবর্তে আমিররা অযোগ্য, লম্পট ও মদ্যপ রুকনদ্দিন ফিরোজকে ক্ষমতার মসনদে বসান। প্রেমিক ইয়াকুতকে সঙ্গে করে রাজিয়া জনসাধারণকে সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ করেন, অযোগ্য শাসকের বিরুদ্ধে ঘোষণা করেন—‘চলো, ও শয়তানি হুকুমত কি তখত উলোট দো’। জনসাধারণ বিদ্রোহের মাধ্যমে রুকনদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসন থেকে হটিয়ে দিয়ে রাজিয়া সুলতানাকে ক্ষমতায় বসায়। সিংহাসনে বসে রাজিয়াকে বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দেয় তার বিয়ে নিয়ে। দরবারের অনেক আমিরেরই পছন্দ ছিল রাজিয়াকে; বিশেষত, ভাতিন্দার শাসক ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়ার। তাদের মধ্যে যুদ্ধের আয়োজন করেও রাজিয়া প্রাণের মানুষ ইয়াকুতকেই পছন্দ করেন। এ সময় আমিররা অভিযোগ তোলেন, একজন তুর্কি হয়ে একজন কালো হাবসি গোলামকে সুলতান কোনোভাবেই বিয়ে করতে পারেন না। চারদিক থেকে এ অভিযোগের মুখে ণ্ডায়মান রাজিয়া দৃঢ়ভাবে উজির-এ-আযমকে জানিয়ে দেয়, ‘সুলতানি লেবাস এক কাফন হ্যায়, লেকিন রাজিয়া জিন্দা হ্যায়’। শাসক হিসেবে তার দৃঢ় মনোবল আমাদের বিস্মিত করে। এ প্রাণের প্রমাণ দেয়ার অভিপ্রায়েই ‘নারী-প্রেমপূর্ণ’ সত্তার রাজিয়া সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে জনতার অনুরোধে পুনরায় ফিরে আসেন ও ইয়াকুতের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু সুচতুর আমিররা বসে থাকবে কেন? তারা আলতুনিয়ার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে রাজিয়ার অন্যান্য অযোগ্য ভ্রাতা মুইজউদ্দিন বাহরামকে সিংহাসনে বসায়। কাহিনীর অন্তে এ বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে গিয়ে রাজিয়া সুলতানা ইয়াকুতের সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে একই বর্শায় বিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সমাপ্তি ঘটে এক বিরল নারীজীবনের, সংগ্রামের; প্রেমেরও।

ইতিহাসের রাজিয়া, আমরোহির রাজিয়া...

বলাই বাহুল্য, ‘রাজিয়া সুলতান’ নির্মাণ করতে গিয়ে কমল আমরোহি ইতিহাসের কিছু বিকার ঘটিয়েছেন। সন্দেহ নেই, এটি তিনি করেছেন ব্যক্তি রাজিয়াকে প্রাণপূর্ণ করে ফুটিয়ে তোলার অভিপ্রায়েই। রাজিয়া সুলতানার সিংহাসনে বসা প্রসঙ্গে তিনি কেবল জনতার বিদ্রোহের যে কাহিনী নির্মাণ করেছেন; ইতিহাসে দেখা যায়, এর সমান্তরালে রুকনদ্দিন ফিরোজের অযোগ্যতার কারণে আমিররাও ১২৩৬ সালে রাজিয়া সুলতানাকে সিংহাসন অধিকার করতে সাহায্য করেছিলেন। ইয়াকুতের সঙ্গে রাজিয়ার বিয়ের প্রসঙ্গটিও চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার কমল আমরোহির সৃজনশীল কল্পনার ফসল। কারণ আমরা জানি, আমিরদের বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে রাজিয়া ১২৪০ সালে ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়ার হাতে বন্দি হয়েছিলেন; পরে মুক্তি পেয়ে তাকে বিয়ে করেছিলেন। মুইজউদ্দিন বাহরামের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইকালে রাজিয়া সুলতানা ও আলতুনিয়া নিহত হয়েছিলেন। তাকে এক ভৃত্য বিষ প্রয়োগ করেছিলেন, ইতিহাসে এমন বিবৃতিও প্রচলিত আছে। কমল আমরোহি এই প্রচলিত, পরিচিত পথে অগ্রসর হননি। বরং নির্মাণ করেছেন নতুন পথ।

চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ইয়াকুত আজীবন রাজিয়া সুলতানার পাশে থেকেছে। আবার ইয়াকুতকে অবলম্বন করেই সৃষ্টি হয়েছে তার জীবনের অধিকাংশ সমস্যা। কিন্তু ইয়াকুতকে তিনি ত্যাগ করেননি। আবার এটি ব্যক্ত করাও অত্যুক্তি হবে না যে রাজিয়া সুলতানাকে আদ্যোপান্ত ইয়াকুতনির্ভর কাঠামো দিয়ে কমল আমরোহি তার নারী মহিমাকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছেন। কারণ রাজিয়া সুলতানার মূল তাত্পর্যের জায়গা এখানেই যে তিনি নারী, পুরো মধ্যযুগে পুরুষ শাসকদের মাছের বাজারের ক্রেতাসুলভ ভিড়ে তিনি একমাত্র নারী। তাকে একটি পুরুষনির্ভর করে তোলায় তার মহিমা খানিকটা খাটো হয়েছে বৈকি! শেষে একটি বাক্যে হলেও ‘রাজিয়া সুলতান’-এ খৈয়ামের সুর করা গানগুলোর প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেই হয়, যে গানগুলো চলচ্চিত্রটির ঐতিহাসিক ও রোমান্টিক সংযোগের মধ্যে প্রধান বন্ধন হিসেবে ক্রিয়াশীল থেকেছে। প্রকৃতার্থে কমল আমরোহি ইতিহাসের মরুপ্রান্তর থেকে তুলে ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম নারী শাসক রাজিয়া সুলতানাকে নির্মাণ করার প্রয়াস দেখিয়েছেন এক মানবীর মূর্তিতে। যার মধ্যে একই সঙ্গে বিদ্যমান শাসক ও প্রেমিকার যুগ্ম সত্তা। ‘রাজিয়া সুলতান’ চলচ্চিত্রটি তারই এক প্রকৃষ্ট, শৈল্পিক উদাহরণ।

 

নাজমুল হাসান পলক: লেখক