আটশ বছর আগের ভারতবর্ষে কেন ইউরোপও নারীর শাসন মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। আর তা যদি মুসলিম শাসনাধীন ভারতে হয় তাহলে সঙ্গে যোগ হয় জায়েজ-নাজায়েজ বিতর্ক। সে বিতর্কের একটি বৈশ্বিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নারীর কথিত পাক ও নাপাক অবস্থা—রজঃকালীন নারীর শরীরকে নাপাক ঘোষণা করে তাকে মূলধারা থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টাটি পুরনো। বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার সময় তার তারুণ্যের দিকে ইঙ্গিত করে গোঁড়াবাদীরা নারীকে শাসক হিসেবে মেনে না নেয়ার কথা বলেছেন। স্মর্তব্য যে বেনজির প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় গর্ভধারণ করেছেন এবং সন্তানের জননী হয়েছেন। সে সন্তানের নাম বখতওয়ার, বেনজিরের দ্বিতীয় ছেলে। শুধু মুসলমানদের মধ্যে নয়, ক্ষমতাসীন নারী সরকারপ্রধানদের মধ্যে তিনিই প্রথম ক্ষমতাসীন অবস্থায় সন্তান প্রসব করেছেন, দ্বিতীয় জন নিউজিল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন। মূলত অ্যালিসা গ্যাবের In Reality a Man: Sultan Iltutmish, His Daughter, Raziya and Gender Ambigaity in Thirteen Century Northern India অবলম্বনে এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ রচিত হয়েছে।

প্রাক-আধুনিক মুসলমান সমাজে একজন নারী যে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে ভারত শাসন করতে পারেন, ১২৩৬ থেকে ১২৪০ পর্যন্ত দিল্লি সুলতানাতের শাসক রাজিয়া তার প্রমাণ। তিনি সুলতানা হতে চাননি (যদিও এখনো সুলতানা রাজিয়া নামেই তার পরিচিতি)। তিনি মনে করতেন সুলতানা হচ্ছে সুলতানের অন্দরমহল শোভিত করার জন্য তার স্ত্রী অথবা তার হেরেমের গুরুত্বপূর্ণ একজন উপপত্নী। তিনি চেয়েছেন সুলতান হতে এবং হয়েছেনও।

রাজিয়ার ক্ষমতারোহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় তার বাবা দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশের প্রজ্ঞা, বিবেচনা ও তার কন্যার ওপর অগাধ আস্থা—তিনি তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করতে দ্বিধান্বিত হননি, যদিও তার বাস্তবায়নে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। তিনি সফল হয়েছেন উচ্চতর সক্ষমতার (সুপিরিয়ার অ্যাবিলিটি) কারণে। কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, পৃথিবীর জন্য একটি বড় শিক্ষা রেখে গেছেন, দেশ শাসনের যোগ্যতা ও দক্ষতা দুটিই নারীর আছে। পৌরুষ বা ম্যাসকিউলিনিটি যেসব গুণাগুণের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তিনি প্রায় সবই অর্জন করেছেন, অশ্বপৃষ্ঠে কিংবা হস্তীপৃষ্ঠে রণসাজে সজ্জিত হয়ে আরোহণের নজির নারীর জন্য অবশ্যই দুর্লভ। সে কালের ব্যাখ্যায় শাসক হতে এবং সেনানায়ক হতে যে বেশ ধারণ করতে হয় তাই ধারণ করে তিনি মধ্যযুগীয় জেন্ডার ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

পিটার জ্যাকসন রাজিয়ার সমকালীন, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের (মৃত্যু ১২৬০) বিবরণ অনেকটাই ত্রুটিপূর্ণ মনে করেন। তার পরও এটাও সৌভাগ্যের ব্যাপার তার কালের একজন তার শাসনকাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন।

১২৩৬ সালে গোয়ালিয়র অভিযান থেকে ফেরার পর সুলতান ইলতুতমিশ আর প্রধান স্ত্রী তোরকান খাতুনের কন্যা রাজিয়াকে তার উত্তরাধিকার নিয়োগ করেন। কারণ ঐতিহাসিকদের মধ্যে তার বাবা লক্ষ করলেন, রাজিয়ার মধ্যে অনেক গুণ নিহিত আছে এবং তিনি কর্তৃত্ব খাটাতে জানেন। তিনি আরো মনে করেন যদিও তার কন্যা অবগুণ্ঠনের আড়ালেই থাকেন, তবুও তার মধ্যে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের যোগ্যতা রয়েছে। সমালোচকরা গোপনে ও প্রকাশ্যে মেয়ের প্রতি ইলতুতমিশের এই পক্ষপাতকে ভালো চোখে দেখেননি। তারা বলে বেড়িয়েছেন যোগ্য পুত্র থাকতে সার্বভৌমের দায়িত্বে কন্যাকে নিয়োজিত করলে পরিণতি খারাপই হবে।

পুত্রদের ব্যাপারে সুলতান কী মনে করতেন ঐতিহাসিক মিনহাজ তার বিবরণ দিয়েছেন—সুলতান মনে করতেন তারা যৌবনের আনন্দ উপভোগে মশগুল, রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার যোগ্যতা তাদের নেই।

মিনহাজ বলেছেন, ইলতুতমিশের মৃত্যুর পর রাজিয়া প্রমাণ করেছেন সুলতানের পুত্রকন্যাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে যোগ্য। রাজিয়ার বৈমাত্রেয় ভাই রোকন আল-দিন ফিরোজ শাহকে সুলতান ইলতুতমিশ লাহোরের শাসনকর্তা নিয়োজিত করেছিলেন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মালিক নাসির-উদ-দিন আগেই মৃত্যুবরণ করায় অন্য দুজনের মধ্যে বড় ফিরোজ শাহই রাজ্যসভার অন্য সদস্যদের প্রত্যাশিত সুলতান ছিলেন। গোয়ালিয়র অভিযানের পর ফেরার সময় যারা ফিরোজ শাহকে সঙ্গে নিয়ে আসেন তারা তাকে নিয়েই মেতে ওঠেন এবং সুলতানের জ্ঞাতে ও অজ্ঞাতে তার নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাকেই সিংহাসনে বসান। কিন্তু ফিরোজ শাহ প্রকৃতপক্ষে স্বল্প সময় রাজত্ব করেন। বরং সবকিছু দেখাশোনা করতে শাহ তেরকেন। অন্যদিকে ফিরোজ মেতে রইলেন যৌন সম্ভোগ, বেপরোয়া জীবনযাপন ও আহাম্মকি সব কাজকর্ম নিয়ে।

শাহ তেরকেনের ক্ষমতাপ্রাপ্তি এক অর্থে নারী নেতৃত্ব হিসেবে রাজিয়াকে সাফল্যমণ্ডিত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু শাহ তেরকেন পুত্রের জায়গায় নিজে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা ও ব্যক্তিগত অপছন্দকে সামনে এনে সভাসদদের অনেককেই অপদস্থ করতে শুরু করলেন। ফলে বিদ্রোহ সূচিত হতে দীর্ঘ সময় লাগল না। এর মধ্যে তার সবচেয়ে বিতর্কিত ও ভয়াবহ যে উদ্যোগটি ধরা পড়ে গেল তা হচ্ছে রাজিয়াকে হত্যা করার চেষ্টা। দিল্লির জনগণ রুখে দাঁড়াল, তারা রাজপ্রাসাদ অবরোধ করল এবং শাহ তেরকেনকে ধরে নিয়ে গেল। কয়েক দফা আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের পর সুলতানের নিজস্ব দাস বাহিনী (স্মর্তব্য, সুলতান হাবশি দাস ছিলেন) ফিরোজ ও তার মায়ের অনুগত সবাইকে বন্দি করল এবং রাজিয়াকে সিংহাসনে বসাল। রাজিয়া ফিরোজ শাহকে প্রথমে বন্দি ও পরে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। ১৯ নভেম্বর ১২৩৬ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো।

ঐতিহাসিক মিনহাজ লিখেছেন, রাজিয়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রাদেশিক গভর্নরদের কেউ কেউ তাকে অস্বীকার করলেও তার অধীনে রাষ্ট্রের সবকিছুই সাধারণ রীতিনীতি অনুযায়ী চলতে লাগল এবং বিদ্রোহীরাও শান্ত হতে বাধ্য হলো। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা আরো সম্প্রসারিত করলেন। মিনহাজ লিখেছেন, বাংলার পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে সিন্ধু অববাহিকা পর্যন্ত অর্থাৎ লক্ষেৗবর্তী থেকে দিবাল ও দামরিলা পর্যন্ত তা সম্প্রসারিত হয়।

সব মালিক ও আমির তাদের আনুগত্যের ঘোষণা দিলেন এবং নতুন সুলতানের সব হুকুম তামিল করলেন। তিনি একদিকে যেমন রাষ্ট্রসীমানা বাড়ালেন, অন্যদিকে হিন্দু অধ্যুষিত রত্নাবুর ও গোয়ালিয়র থেকে তার পূর্ব দখল প্রত্যাহার করে নিলেন। কৌশলগতভাবে তিনি সঠিক কাজটি করলেও পিটার জ্যাকসন মনে করেন ইলতুতমিশের দাস বংশোদ্ভূত যে সৈন্যরা সুলতানের সঙ্গে এসব অভিযানে অংশ নিয়েছেন এবং সুলতানের বিজয় তাদের অহংকারের কারণ হয়েছে তারা এতে অসন্তুষ্ট হলেন।

মিনহাজ দুটো বিষয়ের উল্লেখ করেন, যা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে রাজিয়ার প্রতি বিরূপ করে তোলে। প্রথমত, একটি হচ্ছে নারীর পরিধেয়  পোশাক ত্যাগ করে পুরুষের পোশাক পরা, মাথায় পাগড়ি বাঁধা, ঘোমটা সরিয়ে জনগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। তিনি যখন হাতি থেকে নামেন নামার ভঙ্গিটা অন্য পুরুষের সামনে প্রকাশ করা। দ্বিতীয়ত, আবিসিনিয়ান হাবশি গোলাম জামাল আল-দিন ইয়াকুতকে ক্ষমতাশালী করা ও কাছে টানা—যা তুর্কি আমির ও কর্মকর্তাদের ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে।

নারীর পোশাক ত্যাগ এবং পুরুষালি আচরণের (পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিভাজন অনুযায়ী) কারণে যারা একসময় রাজিয়ার পক্ষে ফিরোজ শাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, তারাও বিরুদ্ধে চলে যেতে শুরু করলেন। দিল্লি সুলতানদের আওতাধীন লাহোরের বিদ্রোহ রাজিয়া সাফল্যের সঙ্গে গুঁড়িয়ে দিলেন। কিন্তু তাবারহিন্দ দুর্গের কমান্ডার ইখতিয়ার-আলতুনিয়ার প্ররোচনায় সৃষ্ট বিদ্রোহের পেছনে আরো কিছুসংখ্যক আমিরেরও হাত ছিল—বিশেষ করে তুর্কি আমির। এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে তার বাহিনীকে ধরাশায়ী করেন। তারা রাজিয়ার বিশেষ প্রশ্রয় পাওয়া হাবশি আমির জামাল আল-দিন ইয়াকুতকে হত্যা করে এবং রাজিয়াকে বন্দি করে তাবারহিন্দ দুর্গে পাঠিয়ে দেয়। এর মধ্যে তার ভাইকে ক্ষমতায় বসিয়ে তাকে মোয়াজ্জেম আল-বিন শাহরাম শাহ নামে অভিসিক্ত করে। তারা অধিকতর ক্ষমতা প্রয়োগের পথ নিশ্চিত করতে রাজিয়ার সামরিক কর্মকর্তা আরেক্তিগিনকে সুলতানের ভাইসরয় নিয়োগ করান। কিন্তু আরেক্তিগিন যখন নতুন সুলতানের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যান তার নির্দেশে আরেক্তিগিনকে হত্যা করা হয়।

রাজিয়া হয়তো মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কিন্তু যিনি রাজিয়াকে বন্দি করে তাবারহিন্দ দুর্গের কারাগারে পাঠিয়েছিলেন তিনিই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং যৌথভাবে লড়াই করে দিল্লির সুলতানাত পুনরুদ্ধার করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। রাজিয়ার দিক থেকে সম্ভবত তা ভালোবাসার বিয়ে ছিল না, ছিল কৌশলগত বিয়ে, তাতে জীবন বাঁচাতে আর সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার সম্ভাবনাও জেগে থাকবে। দুর্ভাগ্য তাদের, যখন দিল্লি অবরোধের জন্য তারা এগোচ্ছিলেন তখন ২০ এপ্রিল ১২৪০ দুজনেই নির্মমভাবে নিহত হন।

ঐতিহাসিক হাবিবুল্লাহ লিখেছেন, নারীর সার্বভৌম হিসেবে আত্মপ্রকাশে ইসলামে কোনো সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা নেই, তা সত্ত্বেও ইসলামের দোহাই দিয়েই বলা হয় ‘যে জাতি নারীকে শাসক নির্বাচিত করে সে জাতি কখনো সফল হতে পারে না।’ এমনকি এটাও বলা হয়, ‘তারা অবগুণ্ঠন পরিধানকারী, তাদের কখনো সম্পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা থাকে না।’ সাসানিয় অভিজাত ও ধর্মীয় নেতৃত্ব যে রাজতান্ত্রিক আদর্শ ধারণ করত, তাতে এটা স্পষ্ট ছিল পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে রাজত্ব ভেঙে পড়ত।

এ ধরনের মানসিক ও শাস্ত্রীয় বাধাকে ডিঙ্গাতেই সম্ভবত রাজিয়া পুরুষের পোশাক ধরেছেন, যে পোশাকে মুখ ঢাকার নেকাব নেই। তাতে ঐতিহাসিক নেজাম আল-দিন আহমদ রাজিয়ার পৌরুষের আত্মপ্রকাশের কৃতিত্ব অনেকটাই অর্পণ করেছেন তার বাবা সুলতান ইনতুতমিশের ওপর। তিনি সুলতানকে উদ্ধৃত করেছেন—‘যদিও দেখতে নারীর মতো, মানসিক গুণাগুণের দিক থেকে একজন পুরুষ এবং সত্যি কথাটি হচ্ছে সে আমার ছেলেদের চেয়ে বেশি যোগ্য।’

মধ্যযুগীয় পাশ্চাত্য সমাজে নারী ও পুরুষের বিভাজন ছিল আরো বেশি তীব্র, যে সমাজে একজন রাজিয়ার উত্থান কেউ কল্পনাও করতে পারত না। বরং মধ্যযুগীয় পার্সি-ইসলামিক সংস্কৃতিতে নরনারী প্রশ্নে উদারতা অবশ্যই বেশি ছিল। এমনকি আরব সংস্কৃতিতেও, সে কারণেই মরুর দেশে আরবের ইয়েমেনে হাজার বছর আগে আসমা বিনতে শিহাবের মতো নারী শাসকের আবির্ভাব এবং জুমার নামাজে সেই নারীর নাম খুতবায় অন্তর্ভুক্ত করানোর মতো অভাবনীয় ঘটনাও ঘটেছে। ফারসি কবিদের রচনায় একটি পর্বে নরনারীর সীমারেখা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কোনো কোনো চিন্তাবিদ সেকালেই জীবতাত্ত্বিক যৌনতার চিহ্ন দিয়ে মানুষের বিভাজনের বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেছেন ইংরেজির ‘ম্যান’ ফার্সি ‘মর্দ’ কিংবা আরবির ‘রাজুল’ মূলত মানুষ অর্থেই ব্যবহূত হয়েছে, জেন্ডার বিভেদ তৈরি করার জন্য নয়।

ফার্সি প্রবচনে রয়েছে: সকল নারীই নারী নয়/সকল পুরুষই পুরুষ নয়/ আল্লাহ হাতের পাঁচ আঙুল একভাবে সৃষ্টি করেননি।

আরবি উৎস থেকে আসা ত্রয়োদশ শতকের উত্তর ভারতীয় প্রবচন: যে ঈশ্বরকে চায় সে পুরুষ, যে পৃথিবীকে চায় সে নারী। এটাকে মেনে নিলে পৃথিবীর অধিকাংশ পুরুষই নারী।

রাজিয়ার মৃত্যুর শতবর্ষপূর্তির আগেই কবি আমির খুসরো তার নিজের কাব্যের জন্য উপদেশ রেখে গেছেন: সাধারণ নারীর মতো হয়ো না, তোমাকে পৌরুষ ধারণ করতে হবে।

সেই নারীই শ্রেষ্ঠ, পোশাকে যাকে পুরুষ দেখায়

নারী যদি ভাবে পুরুষ হয়, সে-ই হয় বিভাজন

সুচ এবং চাকু হয়ে ওঠে তার বল্লম ও তরবারি।

মোগল রাজকুমারী গুলবদন বেগমের রচনায়ও নারীর পৌরুষের কীর্তির প্রশংসা করা হয়েছে। তৈমুরীয় মধ্য এশিয়ায় পুরুষের পোশাক পরে দুজন নারী রাজকীয় সভায় এসেছিলেন। তারা এসে বসেছেন এবং তীর-ধনুকের কারসাজি দেখিয়েছেন, তাদের কোনোভাবেই সমাজচ্যুত করা হয়নি।

রাজিয়ার পুরুষালি আচরণ এবং পোশাক এবং অনৈসলামিকভাবে মুখমণ্ডলের অবগুণ্ঠন সরানো তার পতনের জন্য দায়ী বলে যারা মনে করেন পিটার জ্যাকসন তাদের সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন এটিকে একটি ছুতা হিসেবে ব্যবহার হরা হয়েছে। যেসব তুর্কি সিংহাসন সুলতান ইলতুতমিশের প্রশ্রয়ে ছিল তারা ধরে নিয়েছিল তার কন্যাকেও তারা তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু তিনি তো কারো হাতে ব্যবহূত হওয়ার নন। অন্যদিকে ফরাসি ইখতিয়ারের প্রতি দুর্বলতা তাদের ষড়যন্ত্রকে প্ররোচনা শেখায়। তার ‘কলঙ্কজনক’ চেহারা দেখানো আচরণ দিল্লির ‘ওলামা’দের ক্ষুব্ধ করলেও তুর্কি সৈন্যরা এ নিয়ে বিতর্কে যায়নি, কারণ বড় পদে নারীকে দেখতে তারা অভ্যস্ত।

ঐতিহাসিক ইসামি মনে করেন তুর্কিরাই তার পৌরুষেয় আচরণকে অশোভন, অনারীসুলভ ও ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে তার পতনের ষড়যন্ত্র করে।

রাজিয়া আল-সুলতান আল মুয়াজ্জেম বিনতে সুলতান ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক এবং সফল শাসককে নিয়ে যে জেন্ডার বিতর্ক একালের জেন্ডার বিশ্লেষণের সঙ্গে তার মিল রয়েছে। সেখানেও রাজিয়া ছিলেন পুরুষ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকে আজ এ প্রশ্নটি করেন—সেই চ্যালেঞ্জটি কি নারীর পোশাক পরেই নেয়া যেত না?

 

ইবনে মোতালিব: লেখক