প্রথম কালো পুরুষ কবি
আমেরিকার স্বাধীনতার বছর ১৭৭৬। ওয়াল্ট হুইটম্যান জন্মগ্রহণ করেছেন আরো ৪৩ বছর পর আর এডগার অ্যালান পো ৩৩ বছর পর। আমেরিকার স্বাধীনতার ৬৫ বছর আগে আমেরিকায় কালো মানুষের সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা জুপিটার হ্যামনের জন্ম। প্রতিষ্ঠাতাই তো। ১৭৬১ সালে আমেরিকায় ছাপার অক্ষরে একজন কালো ক্রীতদাস সন্তানের লেখা প্রকাশিত হয়। আমেরিকা ধীরে ধীরে জানতে পারে কালোরাও লিখতে জানে। জুপিটার হ্যামন কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখতেন। আমেরিকান কালো মানুষের কবিতা ও গদ্যসাহিত্যের ভিত্তি তো তার হাতেই তৈরি।
১৭৬১-এর আগে কোনো কৃষ্ণাঙ্গের লেখা আমেরিকায় ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়নি। (শতবর্ষ পর বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম)। কবির সান্ধ্য খ্রিস্টভাবনা নিয়ে রচিত কবিতাটির আংশিক অনুবাদ নিবন্ধের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।
জুপিটার হ্যামনের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে গবেষকরা তেমন কিছু বের করতে পারেননি, তবে হেনরি লয়েডের একজন ক্রীতদাস এবং একজন দাসীকে জুপিটারের জনক-জননী মনে করা হয়। ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো দাসদাসীর নাম ঠিক করতেন। এমন একজন দাসের নাম ঠিক হয় অপিয়াম ও কৃষ্ণাঙ্গ বালিকার নাম রোজ। জুপিটার লয়েডদের চারটি প্রজন্ম হেনরি লয়েডের প্রভুত্ব মেনে কাজ করে গেছে। জুপিটার লয়েড তার মালিক সম্পর্কে প্রশংসাসূচক কবিতাও লিখেছেন। তিনি কালো মানুষের দাসত্ব নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন।
অ্যাঙ্গলিকান চার্চ সোসাইটির স্কুলের মাধ্যমে লয়েড পরিবার জুপিটারকে তার প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেয়। মেধাবী বালক গণিত ও হিসাবনিকাশে পারদর্শী হয়ে লয়েডদের ব্যবসায় সহযোগিতা করতে থাকেন এবং দাসত্বের বন্ধনে থেকেই অ্যাঙ্গলিকান ধর্মযাজক ও করণিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রথম প্রকাশনার ১৮ বছর পর প্রকাশিত হলো তার দ্বিতীয় কবিতা অ্যান অ্যাড্রেস টু মিস ফিলিস হুইটলি—প্রথম কৃষ্ণবাদ নারীর জন্য লেখা কবিতা। জীবদ্দশায় দুজনের কারোরই দেখা হয়নি। তার কবিতাটিতে চার পঙিক্তর একুশটি ছন্দোবদ্ধ অনুচ্ছেদ রয়েছে।
৭৬ বছর বয়সেও তিনি দাসত্বের বন্ধনে ছিলেন, নিজের জন্য তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তি চাননি, তবে তরুণ নিগ্রোরা যেন মুক্তি পায় তা চেয়েছেন। সে সময় তিনি জনতার উদ্দেশে বলেছেন, আমরা যদি কখনো স্বর্গে যাই আমরা যে কালো কিংবা ক্রীতদাস এজন্য কেউ হীন চোখে দেখবে না। তিনি আফ্রিকান আমেরিকান কালো মানুষের অবস্থান, তার শিক্ষার ঘাটতি, টিকে থাকার সংগ্রামে মার খেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা—সব বিবেচনা করে তিনি কালো ক্রীতদাসদের হঠাৎ মুক্তি চাননি, তিনি চেয়েছেন ধীরে ধীরে তারা প্রস্তুত হোক এবং মুক্তি লাভ করুক। তিনি মনে করতেন এক জীবনের দাসত্ব কালোদের স্বর্গ নিশ্চিত করেছে।
১৮০৬ সালে ৯৫ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়, লয়েড পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরসংলগ্ন পৃথক স্থানে তাকে সমাহিত করা হয় বলে গবেষকরা মনে করেন।
জুপিটার হ্যামনের কবিতা
সান্ধ্যচিন্তা : মুক্তি
এনে দেবেন খ্রিস্ট
কেবল যিশুখ্রিস্টই মুক্তি এনে দেবেন
ঈশ্বরের একমাত্র পুত্র তিনি
সবার জন্য মুক্তি
ভালোবাসা তার পবিত্র শব্দ
প্রিয় যিশু আমরা আপনার কাছে উড়ে যাব
সমস্ত পাপ ঝেড়ে ফেলব
আপনার কোমল করুণা সম্মত আছে
সম্রাটের কাছ থেকে মুক্তি এনে দেবেন।
প্রিয় যিশু আপনার কাছে কেঁদে আকুল
আমাদের প্রস্তুতি দান করুন
দয়ার চোখ সরিয়ে নেবেন না
আমরা আপনার কাছে সত্যিকারের মুক্তি চাই।
(আংশিক অনূদিত; ১৭৬০ সালের বড়দিনে ২৫ ডিসেম্বর জুপিটার হ্যামন এই কবিতাটি লিখেন এবং তা কালো মানুষের প্রকাশিত প্রথম রচনা হিসেবে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়)
প্রথম কালো নারী কবি
এই কৃষ্ণাঙ্গ কন্যার জন্ম আসলে কবে ও কোথায় তা বের করা সম্ভব হয়নি। গবেষকরা মনে করেন জন্ম ১৭৫৩ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় সম্ভবত আজকের গাম্বিয়া কিংবা সেনেগালে। তার বয়স যখন সাত বা আট বছর তখন স্থানীয় মোড়ল তার এলাকায় ক্রীতদাস-দাসী কিনতে আসা দাস ব্যাপারীর কাছে মেয়েটিকে বেচে দেন। টিমথি ফিচ নামক প্রভাবশালী ট্রান্স আটলান্টিক দাস ব্যবসায়ীর জাহাজ ‘দ্য ফিলিস’-এ চড়ে ১১ জুলাই ১৭৬১ তাকে ব্রিটিশ কলোনি ম্যাসাচুসেটসের বস্টনে আনা হয়। বস্টনের দাস বাজার থেকে মেয়েটিকে আবার সেখানকার ধনী ব্যবসায়ী ও দর্জি জন হুইটলি তার স্ত্রী সুজানার জন্য কিনে নেন। যে জাহাজে মেয়েটি আফ্রিকা থেকে আমেরিকা এসেছে সেই জাহাজের নামেই সুজানা তার নাম রাখেন ফিলিস। সঙ্গে যোগ হয় তাদের পারিবারিক নাম হুইটলি। ফিলিস হুইটলি। সে সময় দাসদের পরিচিতি নিশ্চিত করার জন্য তাদের নামের সঙ্গে মালিকের বংশ নাম আরোপের রেওয়াজ ছিল।
হুইটলি পরিবারের ১৮ বছর বয়সী কন্যা মেরি এই মেয়েটিকে পড়তে ও লিখতে শেখাতে শুরু করল। পরিবারের পুত্রসন্তান ন্যাথানিয়েলও তাকে পড়াশোনায় সাহায্য করতে থাকে। জন হুইটলি একজন প্রগতিশীল ও দরদি মানুষ হিসেবে গোটা নিউ ইংল্যান্ডে সুপরিচিত ছিলেন। সে আমলে কোনো মালিকের পরিবারে ক্রীতদাসের, তার ওপর আবার নারী ও কৃষ্ণাঙ্গ, এমন শিক্ষালাভের সুযোগ পাওয়ার ঘটনা বিরল। ১২ বছর বয়সেই ফিলিস গ্রিক ও ল্যাটিন ধ্রুপদ গ্রন্থ স্বাচ্ছন্দ্যে পড়তে শুরু করে এবং সেই সঙ্গে বাইবেল থেকে জটিল অধ্যায়গুলোও। ১৪ বছর বয়সে লিখিত হলো তার প্রথম কবিতা টু দি ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ ইন নিউ ইংল্যান্ড। সাহিত্যকর্মে তার দক্ষতা দেখে হুইটলি পরিবার গার্হস্থ্য কাজকর্ম থেকে তাকে সরিয়ে এনে সে কাজ অন্য দাসদের মধ্যে বণ্টন করে দেয় এবং তাকে দেয় পড়াশোনার পূর্ণ সুযোগ। তিনি আলেকজান্ডার পোপ, জন মিল্টন, গ্রিক ধ্রুপদ যুগের হোমার, হোরেস ও ভার্জিলের লেখা আত্মস্থ করলেন এবং তাদের প্রভাব মেনে নিয়ে কাব্যচর্চা অব্যাহত রাখলেন। হুইটলি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা বিশিষ্টজনদের তারা আগ্রহ ভরে ফিলিসের লেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। ১৭৭৩ সালে কুড়ি বছর বয়সে গৃহকর্ত্রী সুজানা ফিলিসকে ছেলে ন্যাথানিয়েলের সঙ্গে লন্ডনে পাঠালেন, তিনি মনে করেছিলেন যে লন্ডন এই কালো মেয়েটিকে তার কবিতা প্রকাশের সুযোগ করে দেবে। এখানে এসে ফিলিস দেখলেন তার জন্য অভাবনীয় সব ঘটনা ঘটছে। তিনি চাইতেই লন্ডনের মেয়রের সঙ্গে দেখা করতে পারলেন, ব্রিটিশ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু মানুষের সঙ্গে তার দেখা হলো, এমনকি তৃতীয় জর্জও সাক্ষাতের তারিখ দিলেন। এই সাক্ষাত্কারটি হয়ে ওঠেনি, কারণ নির্ধারিত তারিখের আগে তাকে বস্টনে ফিরে আসতে হয়েছে। কাউন্টেস অব হান্টিংডন সেলিনা হেস্টিংস এই তরুণ আফ্রিকান কালো মেয়ের ইংরেজি কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার কাব্যগ্রন্থ ছাপার ব্যবস্থা করে দিলেন। ১৭৭৩-এর গ্রীষ্মে প্রকাশিত হলো তার কাব্যগ্রন্থ পোয়েমস অন ভ্যারিয়াস সাবজেক্টস রিলিজিয়াস অ্যান্ড মরাল। দুর্ভাগ্য দুজনের প্যাট্রন সেলিনা হেস্টিংস এবং কবি ফিলিস হুইটলির মধ্যে কখনো সাক্ষাৎ হয়নি।
বইটি প্রকাশিত হলো ১ সেপ্টেম্বর ১৭৭৩, প্রশংসিত হলো আর হয়তো এরই পুরস্কার হিসেবে ১৭৭৩-এর নভেম্বরে হুইটলি পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস হুইটলিকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। তার একদা মালিকপত্নী সহূদয় নারী সুজানা হুইটলি ১৭৭৪ সালে প্রয়াত হন আর চার বছর পর জন হুইটলিরও মৃত্যু হয়। মুক্তির পর একজন কালো ক্রীতদাস এবং মুদি দোকানি জন পিটার্সের সঙ্গে ফিলিসের সাক্ষাৎ হয় এবং দুজনে বিয়ে করেন। ক্রীতদাস হলেও সদয় মালিক পরিবারের উন্নত জীবনের যে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল তা আর রইল না, দারিদ্র্য তাকে অনুসরণ করতে থাকল, তার গর্ভে জন্ম নেয়া দুটো সন্তানের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে তিনি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখলেন। তিনি চিহ্নিত হলেন মোস্ট ফেমাস আফ্রিকান ফেস অন দ্য আর্থ। ভলতেয়ার তার বন্ধুকে লিখলেন হুইটলি প্রমাণ করেছেন কালো মানুষও কবিতা লিখতে জানে। জর্জ ওয়াশিংটনকে নিয়ে লেখা তার কবিতা টু হিজ এক্সিলেন্সি জর্জ ওয়াশিংটন ১৭৭৬ সালের এপ্রিলে পেনসিলভানিয়া গেজেটে পুনর্মুদ্রিত হয়। সেনাপ্রধান জর্জ ওয়াশিংটন তাকে সদর দপ্তর কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটসে আমন্ত্রণ জানান এবং সাক্ষাত্কালে তার লেখার প্রশংসা করেন। আমেরিকায় প্রথম প্রকাশিত পুরুষ কবি জুপিটার হ্যামন ফিলিসকে নিয়ে কবিতা লেখেন।
দুর্ভাগ্য দাসত্ব থেকে মুক্তি পেলেও দারিদ্র্য থেকে তিনি মুক্তি পাননি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের জন্য তার স্বামী যে ঋণ নিয়েছিলেন তা শোধ করতে না পারায় ১৭৮৪ সালে কারারুদ্ধ হন। সংসায় চালাতে তিনি আবার কাজের ধরন অনুযায়ী বুয়ার কাজ নেন, এমনকি ক্রীতদাস থাকাকালেও এ কাজ তাকে করতে হয়নি। ফিলিস হুইটলি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মাত্র ৩১ বছর বয়সে ৫ ডিসেম্বর ১৭৮৪ আমেরিকায় প্রকাশিত প্রথম নারী কবি মৃত্যুবরণ করেন। কদিনের মধ্যে তার শিশুপুত্রেরও মৃত্যু হয়।
ফিলিস হুইটলির কবিতা
আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসার কথা
এটা ছিল দয়া যা আমাকে আমার পৌত্তলিক ভূমি থেকে
নিয়ে এসেছে, আমার আঁধার ছাওয়া আত্মাকে বুঝতে শিখিয়েছেন
যে ঈশ্বর আছেন, একজন ত্রাণকর্তাও আছেন
একদা আমি মুক্তির কথা জানিনি কিংবা চাইনি
কেউ কেউ আমাদের কৃষ্ণবর্ণ জাতিকে ঘৃণার চোখে দেখে
‘তাদের গায়ের রঙ শয়তানের মৃত্যুর
মনে রেখো সবাই পরিশুদ্ধ হতে পারে,
যোগ দিতে পারে স্বর্গের ট্রেনে।’
আন্দালিব
রাশদী: কথাসাহিত্যিক





