মানুষের বাহ্যিক
আর পারিবারিক
জীবনের মধ্যে
একটা বিরোধিতা
লেগে আছে,
আর এটা
চিরকাল থেকেই
যাবে বলে
আমি মনে
করি। কারণ
দুটো পরিবেশ
জীবনের দুটো
দিক, যার
একটি আরেকটিকে
ছাড়িয়ে বেড়ে
ওঠে এবং
একটি আরেকটিকে
গ্রাস করে।
এ বিরোধিতা
সহ্য করে
যেতে হবে।
কারণ দেশের
সামাজিক পরিস্থিতির
কথা বিবেচনা
করতে গেলে
জীবনের দুটো
দিকের মধ্যে
সমতা রক্ষা
করা কঠিন।
জেফারসনের সেই
গল্পটা পড়ে
আমি অভিভূত
হয়েছিলাম, যেখানে
প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের
পর তিনি
একা হেঁটে
বাড়ি ফিরছিলেন।
একটা সময়
ছিল যখন
একজন শিল্পী
সত্যিকার অর্থেই
একটি গোটা
জাতির প্রতিনিধিত্ব
করত। শিল্পী
তার নিজস্ব
ভাবনায় জাতিগত
ভাবধারা বজায়
রাখার জন্য
আপ্রাণ চেষ্টা
করত। একজন
কোথাও উপস্থিত
হয়ে জাতির
চিন্তাভাবনাকে তুলে
ধরতে পারত।
কৃষ্ণাঙ্গ
আমেরিকান বা
আফ্রিকান আমেরিকানদের
মধ্যে জীবনীগ্রন্থ
লেখার ধারা
পুরনো হয়ে
গেছে। কারণ
ওই ধারার
লেখায় লেখক
একটি গোষ্ঠীর
প্রতিনিধিত্ব করেন।
বলা যেতে
পারে, ‘আমার
নিজস্ব জীবন
আসলে আমার
গোষ্ঠীর সবার
জীবনের মতোই,
তবু কিছু
কিছু ক্ষেত্রে
তা আলাদা।
কারণ একই
সঙ্গে তা
আমার জীবন
ও গোষ্ঠীর
জীবনের প্রতিনিধিত্বকারী।’
এ রকম
গতানুগতিক জীবনীগ্রন্থ
বলতে চায়,
‘আমি
কী করে
বড় হয়ে
উঠলাম—আমাকে
দেখো—একাকী
আমি—দাঁড়াও
দেখাই, কী
করে আমি
ওটা করলাম।’
শিল্পের ক্ষেত্রে
এটা এক
রকম বিরুদ্ধাচরণ,
অন্তত আমি
তাই মনে
করি, কৃষ্ণাঙ্গ
শিল্পীদের শিল্পে
এ রকমটি
প্রায়ই দেখা
যায়।
উপন্যাস
মানে যখন
আমি একটি
গদ্য লিখছি,
যা কিনা
ছোট গল্পের
চেয়ে ঢের
বড়। উপন্যাস
সম্পর্কে আমি
এটাই ভাবি
যে একটি
বিশেষ শ্রেণী
অথবা দলের
ভেতরে উপযুক্ত
মানুষদের নিয়ে
সেটা লেখা
হয়। উপন্যাসের
ইতিহাস ঘাঁটলে
দেখা যায়,
তার সৃষ্টি
হয়েছে তখনই,
একটি নতুন
শ্রেণী, বিশেষ
করে মধ্যবিত্ত
যখন ও
রকম কিছু
পড়ার জন্য
তৈরি। শিল্পের
এ শাখাটি
তাদের জন্য
তখন দরকার
ছিল। নিম্নবিত্ত
মানুষের জন্য
উপন্যাসের প্রয়োজনীয়তা
ঘটেনি। কারণ
তাদের জন্য
শিল্পের অন্যান্য
শাখা ছিল,
যেমন—গান
বা নাচ,
উৎসব, গল্পগুজোব
আর নির্দিষ্ট
দিবস পালন।
উচ্চবিত্তের মানুষের
জন্যও উপন্যাসের
প্রয়োজন ছিল
না। কারণ
তাদের ছিল
নিজস্ব জগৎ
আর শিল্প,
নিজেদের ছবি
আঁকত তারা,
নিজেদের বাড়ি
বানাত আর
সাজাত। তারা
শুধু একটি
বিষয়ে নিশ্চিত
হতে চাইত
যে তাদের
স্বকীয়তা যেন
পৃথিবীর আর
সবার থেকে
পৃথক থাকে।
কিন্তু যখন
শিল্প বিপ্লব
শুরু হলো,
একটা নতুন
শ্রেণীর আবির্ভাব
ঘটল, যারা
না নিম্নশ্রেণী
না উচ্চশ্রেণী।
ভালো করে
চিন্তা করলে
সেই নব্য
শ্রেণীর জন্য
নতুন পরিবেশে
নিজেদের প্রকাশ
করার মতো
কোনো শিল্পমাধ্যম
তখনো তৈরি
হয়নি। তাই
তারা নিজেরাই
একটা শিল্পমাধ্যমের
সৃষ্টি করল।
বাস্তবে সেটাকেই
আমরা উপন্যাস
বলি। এটা
এমন এক
শিল্পমাধ্যম, যার
মাধ্যমে মানুষকে
জীবনের ভেতরের
কথা বলে
দেয়া যায়,
যা তারা
জানত না।
এটা হতে
পারে একজন
কী করে
পৃথিবীতে নিজেকে
টিকিয়ে রাখবে
বা হতে
পারে কী
করে ভালো
আর মন্দের
তফাত বুঝবে।
বিবাহিত জীবন
কেমন হবে,
কী করে
ভালো থাকা
যায়, কোন
পরিস্থিতিতে পড়লে
একজন মানুষ
কী প্রতিক্রিয়া
দেখাতে পারে।
আমরা যখন
নিম্নবিত্ত শ্রেণী
বা মধ্যবিত্ত
শ্রেণীর কথা
বলি, বলি
শহুরে বা
উচ্চবিত্ত শ্রেণীর
কথা, সব
মিলিয়ে কেমন
একটা ভুল
বোঝাবুঝির সৃষ্টি
হয়। বহুদিন
ধরে শিল্পের
যে মাধ্যমটি
কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য
উপযুক্ত ছিল,
তা হলো
সংগীত। সেই
সংগীত একসময়
আর তাদের
সম্পত্তি থাকল
না, অন্য
মানুষও তা
শিখতে আর
গাইতে শুরু
করল, চারদিকের
সমসাময়িক গানের
স্রোতে তা
মিশে গেল।
তাই আরেকটি
মাধ্যম জরুরি
হয়ে পড়েছিল,
যা সেই
সংগীতের জায়গাটি
নিতে পারে।
আমার মনে
হয় সেই
সময়টাতে, উপন্যাস
আফ্রিকান-আমেরিকানদের
জন্য প্রয়োজনীয়
একটি মাধ্যম
হয়ে উঠেছিল,
যা আগে
হয়নি। নতুন
ধ্যান-ধারণা
ছড়িয়ে যেতে
হতো, তার
নানা রকম
উপায়ও ছিল।
উপন্যাস তাদের
মধ্যে একটি।
উপন্যাস এক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করেছে,
নির্দিষ্ট কিছু
উদ্দেশ্য সাধন
করেছে।
উপন্যাস হতে হবে সুন্দর, শক্তিশালী বক্তব্য থাকবে তাতে—আবার একই সঙ্গে সেসব কাজেও লাগতে হবে। তার ভেতরে এমন কিছু থাকতে হবে, যা মানুষকে আলোকিত করে। এমন কিছু যা নতুন দরজা খুলে দেয় আর সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় বলে। থাকবে এমন কিছু, যা দেখায় সমস্যা কোত্থেকে শুরু আর সত্যিকারের ঝামেলাটা ঠিক কোথায়। কিন্তু সব সমস্যারই যে সমাধান সেখানে থাকবে, তেমন নয়। কারণ উপন্যাস তো কেস স্টাডি নয়, কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তুত প্রণালিও নয়। আমি আমার ফিকশনে এমন সব বিষয় তুলে ধরতে চাই, যেসব সাধারণত অনায়াসে আমার মত অনুযায়ী কৃষ্ণাঙ্গদের শিল্পের মূল ধারাটা ফোটায়। মনের ভেতরে লালিত গল্পকে লিখিত রূপ দিতে হয়, একজন যেন নিঃশব্দে সেটা পড়তে পারে আর সে যেন সেই কথাগুলো শুনতেও পায়। এটা যেন একজনকে উদ্দীপ্ত করে, নিজের দাবি নিয়ে বলতে সাহস জোগায়, ঠিক একজন ধর্মপ্রচারক যেভাবে নির্দ্বিধায় তার নীতিকথাগুলো বলার জন্য উঠে দাঁড়ান, একটি নির্দিষ্ট নিয়মে কথা বলেন, কাঁদেন, আহ্বান করেন—তারপর তার কথার রেশটা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। একইভাবে একজন সংগীতজ্ঞের গানের আবেদন বেড়ে চলে যখন শ্রোতাদের তিনি গানের মধ্যে বুঁদ করে তুলতে পারেন। তাই একটা বই পাঠককে যেন টানে, বইটি থেকে জানা গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো একইভাবে তার মাথায় যেন ঘুরতে থাকে। আমার হাতে কেবল থাকে কিছু অক্ষর, শব্দ আর দাঁড়ি-কমা, যা আমি এমনভাবে ব্যবহার করব যেন পাঠক তাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। কারণ আমি মনে করি, শিল্প একটি সমবেত কাজ, যেখানে একজন সৃষ্টি করে এবং অন্যরা অংশগ্রহণ করে। সফল অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব শিল্পমাধ্যমই সার্থক হয়ে ওঠে।
মোটের
ওপর কথা
হলো এই,
এমনভাবে একটা
গল্প লিখতে
হবে, যা
মনে হবে
কেউ মুখে
বলছে, যেন
অনায়াসে কানে
ঢুকে যাচ্ছে,
যেন লেখককে
না দেখে,
না চিনেই
তার ভাবনাটা
জানা যাচ্ছে,
তাকে বোঝা
যাচ্ছে, যেন
পাঠক নিজেও
সেই বইয়ের
নির্মাণে অংশ
নিচ্ছে। আর
সেই বইয়ে
যা কিছুর
অবতারণা করা
হয়েছে, সব
যেন পাঠকের
চোখের সামনে
ঘটছে। যৌন
দৃশ্যের বর্ণনা
যেন এমন
না হয়,
যা মনে
হয় বই
পড়ে শেখা,
অবাস্তবও যেন
না হয়,
যেন এমন
হয় যে
পাঠক তার
নিজস্ব যৌন
অনুভূতি নিয়ে
সেখানে হাজির
হতে পারে
এবং নিজের
মতো করে
দৃশ্যটা উপভোগ
করে। ওই
ঘটনাটা যেন
তার নিজেরই।
ডায়ালগ এমনভাবে
আসবে সেখানে
যেন পাঠক
কাউকে বলতে
শোনে বা
নিজেই বলে।
কখনো জোরে,
কখনো ফিসফিস
করে, কখনো
আবার কোরাস।
কোরাসের বাক্য
এমনভাবে পাঠক
শোনে, যেন
একসঙ্গে অনেক
মানুষ বইটি
পড়ছে।
আমি যত
কাহিনী লিখেছি,
বহু মানুষের
কণ্ঠস্বর একসঙ্গে
বেজেছে সেখানে।
ব্লুয়েস্ট
আই
বইয়ে যদিও
প্রথম পুরুষের
বর্ণনা, শহুরে
মেয়েটির নাম
সুলা, কিন্তু
সেখানে সে
সোলোমন শহরের
দুই দিকের
সাধারণ মানুষের
কথা বলছে।
অথবা সর্বোচ্চ
যা আমি
করতে পেরেছি
তা হলো,
টার
বেইবি
বইয়ে। কথা,
স্পর্শ, অনুভূতি,
আঘাত, যাবতীয়
বিষয়কে একসঙ্গে
উপস্থাপন করার
চেষ্টা করেছি।
কাহিনীতে সেসবের
উপস্থিতি লক্ষ
করা যাবে,
গাছ ব্যথা
পাচ্ছে, মাছ
ভয় পাচ্ছে,
মেঘেরা কথা
বলছে আর
মৌমাছিরা উত্তেজিত
হয়ে উঠছে।
উপন্যাসের বরাবরের
ধরন থেকে
বেরিয়ে নতুন
কিছু করার
উদ্দেশ্যে আমি
ওই কাহিনীটা
লিখেছিলাম, কোনো
রকমের সমাজ
জীবনমুক্ত হয়ে
লেখাটা লিখেছিলাম,
অবাস্তব চরিত্রের
সমারোহ ঘটিয়েছিলাম।
তাই আমার
দৃষ্টিতে সেটা
কৃষ্ণাঙ্গদের উপন্যাস।
কারণ সেখানে
আছে কালো
জাদুর ক্যারিশমা।
এটা অবশ্য
আমি হলফ
করে বলতে
পারব না
যে ওই
বইটিতে যা
যা করেছি
তার কিছু
আগে কোথাও
করা হয়নি।
আমি কেবল
আমার নতুন
কিছু করার
স্পৃহা আর
কারণ বর্ণনা
করছিলাম। সেখানে
চরিত্রগুলোকে যতটা
সম্ভব বাস্তব
হিসেবে তুলে
ধরেছি। সেই
বইটি ছিল
আমার তুমুল
প্রচেষ্টার অংশ
বিশেষ। আমি
আশা করেছিলাম,
ওটা নিয়ে
অনেক সমালোচনা
হবে। আসলে
সমালোচকদের ব্যাপারে
আমি হতাশ,
শুধু শুধু
অনেক প্রশংসা
বাক্য শুনে
কী লাভ।
কাহিনীর বর্ণনায়
যে শব্দ
আমি ব্যবহার
করেছি, সেগুলোর
ভালোমন্দ নিয়ে
কেউ কিছু
বললে খুশি
হতাম। আমি
আসলে চাই
না কেউ
এসে বলে
দিক যে
আমার বইটা
খুব ভালো
বা খুব
খারাপ, চাই
গঠনমূলক সমালোচনা।
জানতে চাই
যে সমাজের
কাহিনী আমি
লিখছি, সেখানে
আমার লেখার
গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু।
আমি মনে
করি না,
কৃষ্ণাঙ্গদের সাহিত্য
কেবল কৃষ্ণাঙ্গরাই
লিখবে, অথবা
কেবল কৃষ্ণাঙ্গদের
নিয়ে সৃষ্ট
সাহিত্যই তাদের
সাহিত্য। কৃষ্ণাঙ্গদের
সাহিত্যে আছে
বিশেষ এক
বৈশিষ্ট্য আর
আমার লক্ষ্য
হলো সেই
বৈশিষ্ট্যটি চমত্কারভাবে
তুলে ধরা।
তবে কয়েকবার
আমি সেটা
করতে পেরেছি
বলে মনে
হয়েছে। বিভিন্ন
সময়ে বিভিন্ন
লেখায় আমার
মনে হয়েছে
ঠিক যা
করা দরকার
ছিল, আমি
তা-ই
করেছি। বিশেষ
করে সং অব
সোলোমন
বইটিতে আমি
কয়েকবার সেটা
করতে সমর্থ
হয়েছি। ওই
বইয়ে আমি
আমার কল্পনা
আর আমাদের
শিকড়ের কাহিনীকে
এক করে
মিশিয়ে দেয়ার
চেষ্টা করেছি
অথচ কোনোটাকেই
বাড়াবাড়িভাবে উপস্থাপন
করিনি। সেখানে
আমার সেই
মনোভাবটিই প্রকাশিত
হয়েছে, কৃষ্ণাঙ্গ
মানুষেরা বাইরের
পৃথিবীকে যে
চোখে দেখে।
আমরা ভীষণ
বাস্তববাদী মানুষ,
আমাদের চিন্তাভাবনা
একেবারে সাধারণ,
এমনকি চক্ষুলজ্জা
বর্জিত। কিন্তু
সেই বাস্তববাদিতার
ভেতরেই আমরা
কল্পনাকে স্থান
দিই, যাকে
অন্য মানুষেরা
অন্ধবিশ্বাস কিংবা
জাদু বলে
মনে করতে
পারে। কিন্তু
বাস্তব আর
অবাস্তব, দুটো
পৃথিবীকে একসঙ্গে
এক সুতোয়
গাঁথতে হলে
অনেক বড়
পরিসর দরকার,
সীমিত জায়গায়
সেটা সম্ভব
নয়। আর
তার মধ্যে
কিছু কিছু
জিনিস আছে,
যা বোঝা
বা জানা
‘অপমানজনক’।
বিষয়গুলো অপমানজনক;
কারণ কৃষ্ণাঙ্গ
মানুষের যেহেতু
সম্মান নেই
তাই তারা
যা জানে
তার ওপরও
কারো আস্থা
থাকবে না,
সেটাই স্বাভাবিক।
বলছিলাম
মুখে মুখে
গল্প বলার
কথা, ফিকশনের
চরিত্ররা আর
পাঠকেরা যেন
একসঙ্গে কোরাস
করতে থাকে।
একটি মাত্র
বিষয় এখানে
আমি যোগ
করতে চাই,
তা হলো
পূর্বপুরুষের উপস্থিতি,
কৃষ্ণাঙ্গদের সাহিত্যে
এ বিষয়টি
আমার কাছে
খুব আনন্দময়
মনে হয়
যে লেখক
যেন তার
পূর্বপুরুষের সঙ্গে
মিলে একসঙ্গে
লেখাটা লিখছে।
ধরা যাক,
রাল্ফ
এলিসন-এ বর্ণিত
দাদা কিংবা
টনি
কেড বাম্বারায় বর্ণিত
দাদির কথা।
সবসময় কাহিনীতে
এমন কিছু
বয়স্ক চরিত্র
থাকে, যারা
কেবল অভিভাবক
নয়, এক
রকমের সময়োত্তীর্ণ
মানুষ, মূল
চরিত্রের প্রতি
যাদের টান
অসামান্য। টানটি
অনেকটা মাথার
ওপরে থাকার
মতো কিংবা
আগলে রাখার
মতো। আর
তাদের আছে
এক অদ্ভুত
আদর্শ।
কৃষ্ণাঙ্গ
লেখকেরা যেভাবে
বর্তমান যুগের
প্রতি তাদের
প্রতিক্রিয়া দেখায়,
সেটা আমাকে
কৌতূহলী করে।
তাদের মধ্যে
কেউ কেউ,
যেমন রিচার্ড
রাইটের লেখায়
পূর্বপুরুষদের সঙ্গে
সমস্যা থাকে।
আবার তাদের
মধ্যে কেউ
কেউ, যেমন
জেমস বাল্ডউইন
পূর্বপুরুষের উপস্থিতিতে
কখনো অস্বস্তি
বোধ করেন।
নতুন লেখকদের
লেখার যে
বিষয়গুলো নিয়ে
আমি ভাবি,
দেখি উপন্যাসটি
শহর নাকি
গ্রামের পটভূমিতে
লেখা। একজন
পূর্বপুরুষের উপস্থিতি
কিংবা অনুপস্থিতি
অনেক সময়ে
চরিত্রগুলোর সফলতা
অথবা বিফলতার
জন্য দায়ী
হতে পারে।
আমার কাছে
ইতিহাস বা
পূর্বপুরুষের অনুপস্থিতি
ভয়ানক। এটা
এক হুমকিও
বটে, এক
রকমের ছন্দপতন,
সঠিক চিত্র
অপ্রকাশিত থাকা।
তাকে অপ্রকাশিত
রেখে যেন
অদ্ভুত এক
শান্তি খোঁজা
হয়। শেতাঙ্গদের
সাহিত্যে এমনটা
হয়নি আর
যতই অপরাধপ্রবণ
কোনো জায়গাই
হোক না
কেন, পূর্বপুরুষ
আছেই। চরিত্ররা
যেখানকারই হোক
না কেন,
হতে পারে
হারলেমের, হতে
পারে আরাকানসাসের,
সেখানকার কথাই
তারা বলবে,
বলবে সেখানকার
বিভিন্ন যুগের
কথা, আর
যারা বলবে
তারা হলো
সেখানকার প্রাচীন
মানুষ। আর
সেটাই হবে
আফ্রিকান-আমেরিকান
শিল্পের সৌন্দর্য।
বিষয়টি যেন
আসে অনায়াসে,
বিনা পরিশ্রমে,
বিষয়টি যেন
লেখকের শিল্পীসত্তার
মধ্যেই নিহিত।
তিনি সেসবকে
যেমন বুদ্ধিমত্তা
দিয়ে তেমনই
আবেগ দিয়ে
তুলে ধরবেন
পাঠকদের কাছে,
যাদের কাছে
তিনি পৌঁছতে
চান।
একজন
লেখকের কাছে,
যেসব চরিত্রের
মধ্য দিয়ে
সে কথা
বলে, তারা
খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টা এমন
যেন লেখক
নিজেও তাদেরই
একজন, তার
কণ্ঠস্বর তাদের
থেকে পৃথক
করা যায়
না, পাঠকের
কানে লেখকের
চেয়ে অনেক
আলাদা একজনের
কণ্ঠেও লেখকই
বাজে। পাঠক
ও সমালোচকের
চোখে অনেক
সময়ে লেখকের
সেই কণ্ঠস্বরটি
বিরক্তিকর। বিরক্তিকর
এজন্য যে
পাঠক মনে
করে ওই
মতামত বা
কণ্ঠটি লেখকের
নিজের। ওভাবেই
লেখক তার
নিজের সমাজকে
দেখে যা
সমাজ বিরোধিতামূলক।
এভাবে একটি
সাহিত্যকে মানুষ
অনুধাবন করে।
স্যুলা চরিত্রটি
গ্রামের মানুষদের
সমর্থন পেয়েছিল
কিনা সেটা
ভাবা পাঠকের
ওপর নির্ভর
করে। কেউ
কেউ নিশ্চয়ই
ভেবেছিল যে
গ্রামের লোকেরা
তার ক্ষতি
করেছে। আমার
নিজস্ব মতামত
হলো স্যুলা
সেখানে ছাড়া
অন্য কোথাও
যেতে পারত
না। অন্য
কোথাও গেলে
চরিত্রটি ধ্বংস
হয়ে যেত।
তাকে সেখানে
গ্রামেই থাকতে
হলো, যেখানে
পাথর ছুড়ে
তাকে মারার
কথা ছিল।
একটি কাহিনীতে
কে জয়ী
হলো সেটা
একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি
থেকে ভিন্ন।
ঘটনাপ্রবাহে নায়ক
যখন তার
গোষ্ঠীর কাছে
ফিরে আসে,
কোনো কোনো
শেতাঙ্গ সমালোচক
মনে করেছেন
সেটা পরাজয়,
কারো কারো
মতে সেটা
বিজয়, আর
এভাবেই শিল্পের
পরিণতির বিচিত্র
ব্যাখ্যা পাওয়া
যায়।
সং অব
সোলোমন-এ
পাইলেট চরিত্রটি
বয়স্ক, পূর্বপুরুষের
প্রতিরূপ। হ্যাগার
নামের চরিত্রটি
(বাড়িতে তিনটি
নারী চরিত্রের
একজন) যে
সমস্যায় পড়েছিল
তা থেকে
সে মুক্ত
হয় পাইলেটের
অভিজ্ঞতার কারণে।
পাইলেট ততদিনে
প্রায় এক
যুগ ধরে
দুজন পুরুষের
সঙ্গে সম্পর্ক
টিকিয়ে রেখেছিল—তার
বাবা ও
তার ভাই।
তাদের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠতার কারণে
সে জানত
সম্পর্কে উত্থান-পতনের
কথা, সেসব
বিষয়ে তার
ছিল বাস্তব
অভিজ্ঞতা। তার
মেয়ে ছিল
রেবা, যার
সঙ্গে পুরুষদের
সম্পর্ক ছিল
ভাসা ভাসা।
মেয়েটির আসলে
বলতে গেলে
পুরুষদের সঙ্গে
মেলামেশা করার
তেমন সুযোগই
হয়নি। জীবনে
পুরুষের উপস্থিতির
অভাবে যেভাবে
চরিত্রটি বেড়ে
ওঠার কথা,
সেভাবে বাড়ছিল
না। পাইলেটের
মধ্যে ছিল
একাধারে নারী
ও পুরুষ
থেকে অর্জিত
সেসব অভিজ্ঞতা,
যা সে
তাকে দিতে
পেরেছিল। ফলে
তার চরিত্রটিতে
ভারসাম্য ফিরে
এসেছিল। একজন
নারী যদি
একটি কন্যাশিশুর
জন্ম দেয়,
সে আবার
জন্ম দেয়
আরেকটি কন্যাশিশুর—এভাবে
কিছুটা ভারসাম্যহীনতা
আসতে পারে।
বাস্তবে দেখা
যায়, পুরুষ
চরিত্ররা থাকে
আমাদের মনোযোগের
কেন্দ্রবিন্দুতে, কিন্তু
প্রমাণিত হতে
পারে কেন্দ্রবিন্দুতে
আছে আমাদের
বয়স্যরা, যাদের
ধ্যান-ধারণা
ছাড়া আমরা
অচল।
বইটির
মূল উদ্দেশ্য
হলো আমাদের
দায়িত্ব আমাদেরই
বুঝিয়ে দেয়া।
কেউ যদি
নিজের ভেতর
থেকে তার
পূর্বপুরুষকে মেরে
ফেলে, তবে
প্রকৃতপক্ষে নিজেই
মৃত্যুবরণ করবে।
আমি সেই
বিপদগুলো মনে
করিয়ে দিতে
চাই, দেখাতে
চাই কেবল
নিজের ভেতরে
থাকলে বরাবরা
ভালো কিছু
না-ও
হতে পারে,
সচেতনভাবে ইতিহাসের
সঙ্গে সম্পর্ক
অবশ্যই থাকতে
হবে। আর
সেটা বোঝাতেই
একটা কাহিনীর
অবতারণা, যেখানে
দেখানো হয়েছে
যে এমন
হলে কেমন
হতে পারে।
আমার
আসলে এ
বিষয়ে অনেক
বেশি কিছু
বলার নেই
(কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের
নারীবাদিতা নিয়ে
যে বিশেষ
কোনো মডেল
তৈরি করতে
হবে, তা
নয়), কেবল
বলব, পুরুষবিহীন
একটি জীবন
যেমন অচল,
নারীবিহীন জীবনও
তাই—সাহিত্যেও
তেমনি একই
ব্যাপার, দুটো
চরিত্রকে সমানভাবে
বাড়তে দিতে
হবে। সমালোচকদের
জন্য কিছু
মডেলের প্রয়োজনীয়তা
আছে বটে,
তারা মডেলের
কথা তুলে
কথা বলতে
পছন্দ করে।
কিন্তু আমার
মনে হয়
তাতে কিছু
সমস্যাও আছে।
উপন্যাস
লিখতে গিয়ে
আমি যদি
নতুন কিছু
করতেই চাই,
তা যদি
না হয়
একজন মানুষ
সম্পর্কে, যদি
না হয়
একটি সমগ্র
গ্রামের ব্যাপারে
বা একটি
জনগোষ্ঠীকে নিয়ে,
তবে তা
আসলে কিছুই
না। আমি
কেবল নিজের
অনুভূতি চর্চা
করতে বা
আনন্দের বর্ণনায়
বুঁদ হয়ে
একান্ত কল্পনা
চরিতার্থের লক্ষ্যে
অথবা ব্যক্তিগত
একটি স্বপ্ন
পূরণের আশায়
কোনো লেখা
লিখি না।
হ্যাঁ, তাই
স্বীকার করতে
চাই, লেখা
হতে হবে
রাজনৈতিক। সেটা
যেন এমন
একটা কিছু
হয়, যার
সেই মুহূর্তে
প্রয়োজন ছিল।
অবশ্য এক
রকমের ভুল
ধারণাও এখন
প্রচলিত যে
শিল্পের ওপরে
যখন রাজনৈতিক
কোনো প্রভাব
থাকে তখন
সেটা অখাদ্য
হয়ে যায়।
আমি মনে
করি ঠিক
তার উল্টো।
তাতে যদি
রাজনৈতিক পরিস্থিতির
উল্লেখ না
থাকে তবে
সেটা হয়ে
পড়ে মূল্যহীন।
সমস্যাটা তখনই হয় যখন মনে হয় শিল্পের নামে পক্ষপাতিত্ব করে কিছু শোরগোল করা হচ্ছে। আমার মতে সেই রাজনৈতিক শিল্পই প্রকৃত শিল্প, যা প্রশ্নাতীতভাবে পক্ষপাতহীন এবং একই সঙ্গে অনাবিল সুন্দর।





