অষ্টাদশ শতাব্দীতে রংপুরে যে প্রবল কৃষক বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তা রংপুর ডিং নামে ইতিহাসে লিখিত আছে। এ বিদ্রোহ সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অংশ। মূলত এ বিদ্রোহ হয়েছিল কৃষকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পর। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের আশীর্বাদপুষ্ট রাজা দেবী সিংহ উত্তরবঙ্গকে রীতিমতো শ্মশানে পরিণত করেছিলেন। এ অঞ্চলের যে আঞ্চলিক গীত—রঙ্গপুরের জাগের গান—সেখানে খুঁজলে এ বিদ্রোহের ইতিহাসের হদিস মেলে। রংপুর অঞ্চলে জাগের গানের গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি ছিলেন রতিরাম দাস। তিনি ছিলেন রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী গ্রামের বাসিন্দা।
জাগ গানের সংগ্রাহক পণ্ডিতরাজ যাদবেশ্বর তর্করত্ন (১৮৫০-১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ) রতিরাম দাসকে ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দের রংপুর ডিংয়ের সমসাময়িক বলে মনে করেন। কবি রতিরাম দাসের রচনায় (আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে) বেশ কটি জাগ গানের সন্ধান মিলেছে। এ গানগুলো ঐতিহাসিক নানা তথ্য, বিবরণীর উৎস। তার রচনায় এসেছে সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে (১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দ) মুঘল সৈন্যদের আক্রমণে ফতেপুর চাকলার ভাঙনের ফলে সৃষ্ট পাঁচটি জমিদারি ১. ঘড়িয়ালডাঙ্গা, ২. পাঙ্গা, ৩. ফতেপুর, ৪ বামনডাঙ্গা (ব্রাহ্মণডাঙ্গা) এবং ৫. মন্থনার (পীরগাছা) কথা। আরো এসেছে ১৭৭২-৭৭ খ্রিস্টাব্দের পাঁচসালা বন্দোবস্তের বিষয়, দেবী সিংহের অত্যাচার, ডিমলার রাজা হররাম সেন, ১৭৮৩-এর কৃষক বিদ্রোহসহ স্থানীয় নানা বিষয়। তার একটি গান এ রকম—
রঙ্গপুরের ফতেপুর প্রকান্ড চাকেলা
রাজা রায় রাজা তায় আছিল একলা।
ধর্ম মতে রাজা রায় কত কৈল দান
ব্রহ্মোত্তর ভূমি কত ব্রাহ্মণেতে পান।
ব্রহ্মোত্তর দেবোত্তর আর বৈদ্যেত্তর আদি
কতদান করিয়াছে নাহি যে অবাধি।
মন্থনা-বামনডাঙ্গা প্রভৃতি পরগণা
ফতেপুরের অন্তর্গত সব যায় গণা।
কোম্পানীর আমলেতে রাজা দেবী সিংহ
সে সময়ে মুল্লুকেতে হইল বার ডিং।
রাজার পাপেতে হইল মুল্লুকে আকাল।
শিয়রে রাখিয়া টাকা গৃহি মারা গেল।
সোয়ারিতে চড়িয়া যায় পাইকে মারে জোতা,
দেবী সিংহের কাছে আজ সব হলো ভোঁতা।
পারে না ঘাটায় চলতে ঝিউরী বউরী
দেবী সিংহের লোকে নেয় তাকে জোর করি।
পূর্ণকলি অবতারে দেবী সিংহ রাজা
দেবী সিংহের উপদ্রুপে প্রজা ভাজা ভাজা।
পেটে নাই অন্য তাদের পৈরনে নাই বাস
চামে ঢাকা হার কয়খানা করি উপবাস।
মাও ছাড়ে, বাপ ছাড়ে, ছাড়ে নিজের মাইয়া
বেটা ছাড়ে, বেটী ছাড়ে, নাই কারো মায়া।
আকালে দুনিয়া গেল দেবী চায় টাকা
মারি ধরি লুট করে বদমাইশ পাকা।
রাজা রায়ের পুত্র হয় শিবচন্দ্র রায়
শিবের সমান বুলি সর্বলোকে গায়।
ইটাকুমারীতে তার আছে রাজ বাটি
দেখিতে প্রকাণ্ড বড় অতি পরিপাটি।
কত ঘর কত দুয়ার কত যে আঙ্গিনা
তার সনে কোন বাড়ির তুলনা লাগে না।
রাজা দেবী সিংহের কীর্তি কেউ খুঁজতে চাইলে তার সব ইঙ্গিতই পাওয়া যাবে এ কবিতায়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও তাদের স্থানীয় দালাল শাসকদের যোগসাজশ স্থানীয় মানুষের ওপর যে অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রশাসনিক নিপীড়ন নামিয়ে এনেছিল তার বেশ উজ্জ্বল, পরিষ্কার নিদর্শন রংপুরের ডিং। ইতিহাসবিদ নরহরি কবিরাজ এ বিষয়ে তাত্পর্যপূর্ণ কাজ করেছেন। তার মতে, ঔপনিবেশিক শোষণ ব্যবস্থার মধ্যে যে মজ্জাগত নিপীড়ন যন্ত্র লুকিয়ে আছে সেটাই উন্মোচন করেছিল রংপুরের বিদ্রোহ। ঔপনিবেশিক শোষণ ব্যবস্থা ঠিক কেমন সেটা সহজে বোঝা যাবে এ বিদ্রোহের ইতিবৃত্তে।
রংপুর বিদ্রোহের পর জে ডি প্যাটারসনকে প্রধান কমিশনার করে রংপুর কমিশন গঠন করা হয়। প্যাটরসন মত দেন, এ বিদ্রোহ হুজুগে হয়নি। বরং পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। ১৭৮০ সালে ১৬২৪০১ টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব রংপুরের মানুষের ওপর আরোপ করা হয়। এ রাজস্ব আদায়ের জন্য নানা ধরনের কর ধার্য করা হয়। অনেকগুলো অবৈধ কর কৃষকদের ওপর আরোপ হয় যার মধ্যে আছে—বাট্টা, দেরিনওয়াল্লাহ, হুন্ডেরান, রুসুম, মুস্তাজির। দেবী সিংহের নিপীড়ন থেকে জমিদাররাও ছাড় পাননি। তদুপরি তিনি জমিদারদের বাধ্য করেন ফরাসিদের চালু করা রুপার আরকট রুপিতে কর দিতে। এর ফলে জমিদাররা তাদের রাজস্ব হারাতে থাকেন। দেবী সিংহ বছরের মাঝামাঝি এসে কিস্তবন্দী পরিবর্তন করেন এবং অতিরিক্ত বাট্টা আরোপ করেন। জমিদার, নায়েব আমলাদের তিনি যে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করেন তাতে তারা ব্যর্থ হলে তাদের মারধর করা হতো। দেবী সিংহের লোকজন রায়তের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করত। তাদের লাঙল, বলদ বিক্রি করে দেয়া হতো। তাদের রুপা বিক্রি করা হতো ১০ আনায়, পিতল-তামা ৮ আনায়, গবাদি পশু দেড় আনায়। প্রতি রুপিতে সুদ দিতে হতো উচ্চহারে। জমিদারি তালুক ভাড়া দিয়ে নানা ছলচাতুরী করে নির্দিষ্ট রাজস্বের অতিরিক্ত আদায় করতেন। জমিদারদের কাছে জমি বিক্রি করতেন আবার মুত্সুদ্দিদের দিতেন ভাড়ায়। তার এসব অত্যাচারে টিকতে না পেরে কাজীরহাটের জমিদার শাম চৌধুরী ও রাম কান্ত চৌধুরী, ফতেহপুরের জমিদার কালি প্রসাদসহ স্থানীয় অনেক জমিদার এলাকা ছেড়ে যান।
খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে দেবী সিংহ সংশ্লিষ্টদের শারীরিক নির্যাতন করতেন। খাজনা আদায়ে তিনি যাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর আচরণের অভিযোগ আছে। এদের মধ্যে আছেন কৃষ্ণ প্রসাদ, হরেরাম, সূরয নারায়ণ, বাহাদুর সিং। গৌরি মোহন চৌধুরীকে খারিজে মহলের দায়িত্ব দেন। রাজস্ব বাড়িয়ে দেন এক লাখ টাকা। ১,২৭,৬৬৮ টাকা জমার বিনিময়ে বেদা, পাটগঞ্জ, বৈকণ্ঠপুর, পেরাভঞ্জ তুলে দেন মির্জা তকির হাতে। প্যাটারসনের কাছে অভিযোগ দেয়ায় দেবী সিংহ জমিদার শিব চন্দ চৌধুরীকে বন্দি করেন।
বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার দুটো কমিশন গঠন করেন। সরকার কমিশনের প্রস্তাব আমলে নেয়। দেবী সিংহকে সরকারি নিয়মমতো রাজস্ব আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয় এবং অবৈধভাবে তিনি যে সম্পত্তি দখল করেছেন সেগুলো ফেরত দিতে বলা হয়। অবশ্য তাকে কোনো শাস্তি দেয়া হয়নি। বরং রাজা থেকে তাকে মহারাজার মর্যাদা দেয়া হয়। তবে তার আমলা ও গোমস্তাদের রংপুর থেকে বিতাড়িত করা হয়।
রংপুরের বিদ্রোহের ধারা পর্যালোচনায় দেখা যায় দেবী সিংহের নিপীড়নে এ অঞ্চলজুড়ে যে শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয় কৃষকরা তা থেকে মুক্তি পেতে ইংরেজ প্রশাসনের কাছে আবেদন-নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা প্রকাশ্যে বিদ্রোহের রাস্তা বেছে নেন। তারা গৌরি মোহন চৌধুরীকে হত্যা করেন। এভাবে বিদ্রোহ সহিংস হয়ে ওঠে। মূল লক্ষ্য ছিলেন দেবী সিংহ, তাকে না পেয়ে তার প্রতিনিধি গৌরিকে হত্যা করা হয়। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। স্বাধীন গবেষক ড. অমৃতা সেনগুপ্ত লিখেছেন, ‘এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে অতিরিক্ত কর ছিল এ বিদ্রোহের পেছনের কারণ। কিন্তু শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক অত্যাচারও মানুষের ক্ষোভে আগুন জ্বালাতে ভূমিকা রেখেছে। অবাধ্যতা প্রদর্শন করতে গিয়ে কৃষকরা ডাকাতি ও ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হন। তাদের বিশ্বাস ছিল যে তারা জয়ী হবেন। তাই তারা বিদ্রোহের সাহস পেয়েছিলেন। এখানে আরো যুক্ত করা প্রয়োজন যে রংপুর, দিনাজপুরের ভূপ্রকৃতি গেরিলা যুদ্ধের জন্য উপযোগী হলেও কৃষকরা সে রকম কিছু করেননি। পাহাড়ে-জঙ্গলে বিদ্রোহীদের খোঁজে হরকরা গুপ্তচরদের প্রয়োজন হয়নি। আমরা ধারণা করতে পারি এ কারণেই কোম্পানির সৈন্যরা দ্রুত এ বিদ্রোহ দমন করতে পেরেছিল। ১৭৮৩ সালে রংপুরে বিদ্রোহ শুরু হলে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিদ্রোহ দমনে মিলিশিয়াদের পাশাপাশি ২০০ বরকন্দাজ পাঠানো হয়। ১৭৯৫ সালে রংপুর থেকে নিয়মিত সেনা প্রত্যাহার করা হয়। সেনা গ্যারিসন একটি কোম্পানিতে নেমে আসে।
এস এম রশিদ: লেখক





