সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময়ে কৃষক-সন্ন্যাসীরা একত্র হয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল বিবিধ ও গুরুত্বপূর্ণ কারণে।
বাংলার শেষ এবং প্রায়-স্বাধীন নবাব হিসেবে সিরাজউদ্দৌলা শেষের দিনগুলোতে কোনো রকমে শাসন ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারপর ঔপনিবেশিক প্রভু-নিয়ন্ত্রিত নবাবি শাসন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের ফেরে পড়ে গ্রামীণ প্রজাদের সাধারণ জীবন সংগ্রামে-হতাশায় জর্জরিত করে তুলেছিল। তখনকার সামাজিক জীবন ছিল নিস্তরঙ্গ, মানুষের চাহিদা ছিল আয়ত্তের মধ্যে যা সম্ভব ততটুকুই। গৃহস্থের অবস্থা তাই ধনী না হলেও ছিল সচ্ছল। যাযাবর ফকির আর সন্ন্যাসীরা গৃহস্থের ওপর নির্ভর করে সুখেই ছিল। গৃহস্থরাও অনায়াসে তাদের সাহায্য করতে পারত। ক্ষমতার হাতবদল সাধারণত গৃহস্থদের দৈনন্দিন জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন বয়ে আনত না। ওদিকে সিরাজউদ্দৌলা পরবর্তী নবাবদের কাছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু মসনদে বসার জন্যই বড় অংকের উেকাচ গ্রহণ করত। কোম্পানিকে দেয়ার জন্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান আসত বাংলার গ্রামীণ প্রজাকুল থেকে। অতিরিক্ত খাজনার চাপের কারণে প্রজারা যাযাবর, ফকির-সন্ন্যাসীদের প্রতি আগের মতো সদয় থাকতে পারছিলেন না। অন্যদিকে, ভারতীয় কৃষ্টির সঙ্গে পরিচয় না থাকাতে কোম্পানির লোকেরা ফকির-সন্ন্যাসীদের নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে নিয়েছিল, যেন তাদের দিতে হচ্ছে বলেই কোম্পানিতে কৃষকরা খাজনা দিতে গড়িমসি করছে। তাই প্রায় শুরু থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সন্ন্যাসীদের প্রতি বিরক্ত ছিল। ক্রমাগত বিক্ষিপ্ত অত্যাচারের মাধ্যমে সন্ন্যাসী নিধন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক নিয়মিত কাজে পরিণত হয়েছিল।
এ অত্যাচারের ফলে ফকির-সন্ন্যাসীরা একত্র হয়ে আওয়াজ তোলার চেষ্টা করে। ১৭৫৭ থেকে টুকটাক বিদ্রোহ শুরু হলেও তা বড় আকারে প্রকাশ পায় ১৭৭০ (বাংলা ১১৭৬) সালের দিকে যখন ছিয়াত্তরের মন্বন্তর শুরু হয়। আর তখনই শুরু হয় এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম। একে একে আবির্ভাব ঘটে ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী ও আরো অনেকের। মূলত তখন ফকির-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে গ্রামের কৃষকেরাও বিদ্রোহে যোগদান করে। ১৭৬৭ সালে ক্যাপ্টেন ডি ম্যাকেঞ্জির নেতৃত্বে রংপুরে ব্রিটিশ বাহিনী আসে। ১৭৬৮ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত প্রধানত শরণ (বিহার), বেনারস, পুর্নিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলায় ফকির-সন্ন্যাসীদের আক্রমণ অব্যাহত ছিল। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন নেতৃত্বে ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ চলতে থাকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত।
এ দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ-বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী জয়দুর্গা চৌধুরানী, দলিব খাঁ, মুসা শাহ্, চেরাগ আলী, শোভান আলী, বীর জয়রাম, সাধক কৃপানাথ, মোহন গিরি, দয়ারাম শীল ও কৃষক নেতা নূরুল উদ্দীন। এই বিদ্রোহীরা অতি সাধারণ সন্ন্যাসী বা খেটে খাওয়া মানুষ। এরা কেউই রাজপরিবারের সদস্য নন। যে কারণে রাজ্য জয়ের অভিপ্রায়ে এরা কেউ বিদ্রোহে অবতীর্ণ হননি। এদের বিদ্রোহের পেছনে একমাত্র কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের অনৈতিক উত্পীড়ন এবং লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের সুখ-শান্তি। ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাসে এদের তেমন পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও পাওয়া যায় লুটতরাজকারী ডাকাত কিংবা অরাজকতা সৃষ্টির হোতা হিসেবে।
২
ইতিহাসের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, দেবী চৌধুরানী ছিলেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার জয়দুর্গা দেবী, শিবুকুষ্ঠিরাম গ্রামের ব্রজ কিশোর রায় চৌধুরি ও কাশিশ্বরী দেবীর কন্যা। পীরগাছার জমিদার নারায়ণচন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। স্বামীর মৃত্যুর পরে নিঃসন্তান জয়দুর্গা দেবী ১৭৬৫ সাল থেকে শুরু করে ১৮০১ সাল পর্যন্ত এস্টেটের দায়িত্ব একা হাতে সামলান।
সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর দিনাজপুর-রংপুর জেলা বিবিধ সমস্যার মধ্যে পড়ে। ধীরে ধীরে গ্রামীণ সমাজে অশান্তি ও উপদ্রব ছাড়া আর কিছুই টেকে না। ওই সময়টিতে রংপুর অঞ্চলের কালেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন জনাথন গুডল্যাড এবং তার দেওয়ান নিযুক্ত হন দেবী সিংহ। দেওয়ানের কাজ ছিল প্রতিটি প্রজার কাছে যেকোনো প্রকারে রাজস্ব আদায় করা। দেবী সিংহ তার কর্মচারী রামসহ দরিদ্র কৃষকদের রাজস্ব প্রদানে বাধ্য করতে তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন। তাদের কার্যকলাপ ঔপনিবেশিক প্রভু ওয়ারেন হেস্টিংসের নির্দেশনায় চলত।
ইতিহাসে জানা যায়, দেবী সিংহের হাত থেকে দরিদ্র প্রজাদের বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখেন জমিদার জয়দুর্গা দেবী। মূলত তিনি তখন প্রজাকুলের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন। রাজস্ব আদায়ের অত্যাচারে কৃষকেরা তো বটেই, খোদ জমিদার জয়দুর্গা ইংরেজদের ওপর অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে একই সময়ে নীলকরদের অত্যাচারও বাড়ে। তারা উর্বর জমিতে কৃষককে জোরপূর্বক নীল চাষ করতে বাধ্য করে।
এসব অরাজকতার বিরুদ্ধে দেবী চৌধুরানী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। জমিদার জয়দুর্গার নেতৃত্বে কালেক্টর দেবী সিংহের বিরুদ্ধে প্রজারা বিদ্রোহে যোগদান করেন। সে সময়ে বাংলার ১৫টি বা ততোধিক জমিদার, রাজা ও মহারাজা বিবিধ সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে ইংরেজদের সহযোগী ছিলেন। বিদ্রোহীরা কেবল তাদের সঞ্চয় লুট করেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের কিছু অত্যাচারী কর্মচারীকে অপহরণ করেও তারা অর্থ আদায় করেন। জমিদারি এলাকাগুলোর মধ্যে দিনাজপুর, মোমেনশাহী, ঘোড়াঘাট, নাটোর, দিঘাপাতিয়া ও মুক্তাগাছায় প্রথম বিদ্রোহীদের পদচারণা দেখতে পাওয়া যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তাদের তত্কালীন কার্যকলাপ দমন করতে মীর কাশিমের নেতৃত্বে একদল ইংরেজ সৈন্য পাঠানো হয়। ফকির-সন্ন্যাসীদের পেছনে তখন যুদ্ধে জয়লাভের উদ্দেশ্যে যুক্ত হন দেবী জয়দুর্গা চৌধুরানী। যুদ্ধে ফকির মজনু শাহ, নূর উদ্দীন বাকের মুহাম্মদ জং, ভবানী পাঠকসহ দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া অঞ্চলের কয়েক হাজার সন্ন্যাসী ও কৃষক অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে ইংরেজ ক্যাপ্টেনসহ বহু সৈন্য নিহত হয় এবং মীর কাশিম পিছু হটতে বাধ্য হন। দেবী চৌধুরানীর জয়লাভের স্থানটি ‘জয়পুর’ এবং পরবর্তীকালে ‘জয়পুরহাট’ নামে পরিচিতি পায়।
বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় অবস্থিত দেবীগঞ্জ উপজেলা। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অন্যতম রূপকার ও তত্কালীন জমিদার দেবী চৌধুরানী ওই এলাকাটি নিজের আয়ত্তের মধ্যে রেখেছিলেন এবং সেখানে তার অবাধ বিচরণ ছিল। ওই এলাকার তিস্তা, আত্রাই ও কুড়ম নদীর তীরবর্তী ঘন বনাঞ্চলে তিনি নিজ বাহিনীসহ কয়েক দফা ব্রিটিশ সৈন্যদের মোকাবেলা করেন এবং প্রতিবারই বিজয়ী হন। ‘দেবীগঞ্জ’ নামের পেছনেও একই বিজয়ের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
দেবী চৌধুরানীর নিজস্ব সৈন্যবাহিনী ছিল, যার সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। সহযোগী ভবানী পাঠক ছিলেন উত্তর প্রদেশের ভোজপুর বিহারের বাসিন্দা। ভবানী পাঠকের নাম অনুসারে দিনাজপুরে ভবানীপুর নামের একটি রেলওয়ে স্টেশন আছে।
১৭৮৩ সালে পীরগাছার চণ্ডীপুরে ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী চৌধুরানী পরাজিত ও নিহত হন। তবে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি বাংলার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির উদ্দেশ্যে লড়াই করে গেছেন। জীবন উৎসর্গ করেছেন সেই অধিকার আদায়ের লড়াইয়েই। ওদিকে ১৭৮৭ সালে গোবিন্দগঞ্জের কাছে এক যুদ্ধে ভবানী পাঠক ক্যাপ্টেন ব্রেনানের কাছে পরাজিত হয়ে তার বাহিনীসহ নিহত হন।
ভবানী পাঠক, যিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবানী ঠাকুর বলে পরিচিত ছিলেন এবং দেবী চৌধুরানী, দুজনেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভু ও তাদের তাঁবেদার জমিদারদের অর্থ লুট করে সাধারণ দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এ কারণে ইতিহাসে তাদের ‘সেকালের রবিনহুড’ বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, সমসাময়িক কালে একই অঞ্চলে নূরুল উদ্দীন নামের এক কৃষক নেতা কৃষকদের বিপ্লবের উদ্দেশ্যে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। নূরুল উদ্দীনের আহ্বানে ও তত্পরতায় ব্রিটিশবিরোধী কৃষক আন্দোলন আরো খানিকটা এগিয়ে যায়।
নিম্নবর্গের ইতিহাস রচয়িতা প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ বলেন, ‘ব্রিটিশদের ইতিহাসে যাদের নাম ডাকাত আর অত্যাচারী হিসেবে উঠেছে, তারাই মূলত বিদ্রোহী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ।’ দেবী চৌধুরানী, ভবানী পাঠক ও নূরুল উদ্দীনের পরিচয় তাই ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে তৈরি ইতিহাসে ডাকাত বা লুটতরাজকারী ছাড়া আর কিছু নয়। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম স্ফুলিঙ্গ সন্ন্যাসী বিদ্রোহ তাই বহু ইতিহাসে একটি অরাজকতাময় তত্পরতার নামান্তর।
৩
সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, দেবী চৌধুরানী, ভবানী পাঠকের সংগ্রামের প্রায় একশ বছর পরে ১৮৮২ সালে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে একই এলাকায় যোগদান করেন। ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে স্বাধীনতার সম্ভাবনা হয়তো তখনো দুরাশা কিন্তু ততদিনে মানুষের মুখে মুখে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠকের মতো ‘রবিনহুড’ ধাঁচের নেতৃত্বের কাহিনী লোককাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। বঙ্কিম হয়তো ওই অঞ্চলের দুর্ভিক্ষ (ছিয়াত্তরের মন্বন্তর) ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ইতিহাসের মাধ্যমে এতটাই প্রভাবিত ছিলেন যে একই বছরে রচিত উপন্যাসের বিষয় হিসেবে তাকে গ্রহণ করেন।
রচিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একদিকে যেমন উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে শুরু থেকেই নানাভাবে বিতর্কিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মতো ঘটনাকে উপন্যাসের বিষয়বস্তু করায় আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালা হবে ভেবে ব্রিটিশ সরকার উপন্যাসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তখন অবশ্য উপন্যাসটির কপি পাঠকেরা হাতে লিখে ছড়িয়ে দেন। অন্যদিকে, প্রায় হাল আমলে উপন্যাসটি মুসলমান বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত। উপন্যাসে ভারতের মুসলমানদের অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করে ভারতকে কেবল হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে বলে অভিযোগ দেখা যায়। মুসলমানদের অনেকে মেনে নিতে অপারগ যে বন্দে মাতরম সকলের স্লোগান ছিল, মাকে তথা দেশকে মুক্তির আহ্বান ছিল। এ স্লোগানের ওপর কেবল হিন্দুদের একচ্ছত্র অধিকার থাকতে পারে না।
বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরানী উপন্যাস হয়তো আনন্দমঠ উপন্যাসের পরবর্তী কিংবা পরিপূরক অংশ। এ উপন্যাস ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূচনার মোড়কে প্রকৃতপক্ষে এক অদম্য ও দৃঢ় নারী, দেবী চৌধুরানীর কাহিনী।
ঐতিহাসিক উপন্যাস বা কল্পকাহিনী লেখা হয় ইতিহাস আর কল্পনার সংমিশ্রণে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার পরে যেমন অংশগ্রণকারী উপাদানকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না, ঐতিহাসিক উপন্যাসও তাই, লেখার পরে তা না ইতিহাস, না কল্পনা। রচনা স্বতঃস্ফূর্ত হলেও কোথাও না কোথাও তার একটি সীমানা থাকে, সীমানা বলে—এটুকু কল্পনা আর এটুকু সত্য। তাত্ত্বিকেরা হয়তো সেই সীমারেখাকে নানানভাবে ব্যাখ্যা করে থাকবেন, তবে রচনায় সত্য আর সাজানো আবহ যতটুকুই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা কখনো সুনির্দিষ্ট সীমানাটি প্রকাশ করে না। প্রকাশ যদি করের ফেলে, সেক্ষেত্রে একে কখনো দিনপঞ্জি, কখনো কল্পকাহিনী, কখনো আবার সরাসরি ইতিহাসের বর্ণনা বলে মনে হতে পারে।
ইতিহাসে যেখানেই দ্বন্দ্ব বিদ্যমান, সেখানেই লুকিয়ে আছে কল্পকাহিনী সৃষ্টির সুযোগ। উপরন্তু একজন ইতিহাসবিদ এবং একজন ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতার উদ্দেশ্য মূলত এক বিন্দুতে মেলে—অতীতকে চিনিয়ে দেয়া। তাদের ভাষার ব্যবহার ভিন্ন, শব্দ-বাক্যের চেহারা আলাদা, চিন্তাশীলতাও পৃথক, তবু স্বীকার করতেই হবে যে তাদের লক্ষ্য এক—ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের সমাধান, ঘটনার রহস্যের উন্মোচন। ইতিহাসবিদ ও ঔপন্যাসিকের কাজের পদ্ধতিও পৃথক। ইতিহাসবিদ ইতিহাসের রেকর্ড ঘেঁটে খুঁড়ে বের করেন সত্য তথ্য আর তা উপস্থাপন করেন ফুটনোট বা বিবলিওগ্রাফির জটিল সমীকরণে। অন্যদিকে ইতিহাস আশ্রয়ী কল্পকাহিনী রচয়িতা সেই একই ইতিহাসকে বিবৃত করার জন্য কল্পনার ওপর আস্থা রাখেন। কল্পনার আশ্রয়ে তিনি চরিত্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কৃষ্টি ও পটভূমিকে খুঁজে পান। তবে এর পরও বিবেচ্য, ‘কাব্যিক সত্য’ আর ‘বাস্তব সত্য’—এই দুইয়ের সংমিশ্রণইবা ঘটে কতটুকু আর দূরত্বইবা থাকে কতটুকু। এ পর্যায়ে যেকোনো একদিকে হেলে পড়লে কল্পকাহিনীর সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে।
এসব কারণে দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে সাধারণ ইতিহাসে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠকের যে জীবন, তার সঙ্গে খুব অল্পই সাদৃশ্য দেখা যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের ভূমিকায় নিজেই উল্লেখ করেন, ‘দেবী চৌধুরাণী, ভবানী পাঠক, গুডল্যাড সাহেব, লেফটেন্যান্ট ব্রেনান—এ নামগুলো ঐতিহাসিক। কিন্তু দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসকে ইতিহাস বিবেচনা না করলে খুশি হব।’
উপন্যাসে দেখা যায়, সাধারণ গ্রামীণ কন্যা প্রফুল্লকে বিয়ে করে জমিদারবাড়িতে নিয়ে আসেন পীরগাছার নারায়ণচন্দ্র চৌধুরী। ধনী শ্বশুর তখন অভিজাত বাড়িতে সাধারণ পুত্রবধূর অবস্থান মেনে নিতে পারেন না। তাই তাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সরল প্রফুল্ল বিপদে পড়ে প্রশ্ন করে, ‘আমি তাহলে কোথায় যাব? কী করব?’ শ্বশুর রাগের মাথায় জবাব দেন, ‘কোথায় যাবে তার আমি কি জানি? যা খুশি কর, ভিক্ষে করো, ডাকাতি করো।’ ডাকসাইটে শ্বশুরের নির্দেশে প্রফুল্লকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। উপন্যাসের সাধাসিধা তরুণী এই প্রফুল্ল আর কেউ নয়, স্বয়ং দেবী চৌধুরানী। ঔপন্যাসিক সত্যিকারের দেবী জয়দুর্গা চৌধুরীর চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহস, বীরত্ব ও ধৈর্য প্রফুল্ল চরিত্রটির মধ্যে এঁকেছেন। সঙ্গে এঁকেছেন ফকির-সন্ন্যাসী ভবানী পাঠকের বীরত্বের কাহিনী। মাতৃভূমিকে উপনিবেশমুক্ত করতে যে সর্বস্তরের মানুষের বীরত্ব ও অংশগ্রহণের প্রয়োজন পড়েছিল তা ভবানী ঠাকুরের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার কাহিনী থেকে স্পষ্ট।
শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রফুল্ল মনের দুঃখে লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলে প্রবেশ করে এবং সেখানেই ভবানী পাঠকের সঙ্গে তার দেখা হয়। দুজনে মিলে সমাজের উঁচু স্তরের শোষণের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পরিকল্পনা করে। শেষতক উপন্যাসে তাদের একরকম লুটপাট বা ডাকাতির কাজে মনোযোগী হতে দেখা যায়। তবে সে ডাকাতি থেকে অর্জিত ধন তারা ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ব্যবহার করে না। বরং দরিদ্র ও শোষিত কৃষক ও দানের ওপর নির্ভরশীল মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেয়।
উপন্যাসে ত্রিস্রোতা নামে যে নদীর ওপর দেবী চৌধুরানী বজরা ভাসাতেন, তা বাস্তবে তিস্তা নদী হতে পারে বলে ধারণা করা যায়। উপন্যাসের পটভূমির সঙ্গে ওই অঞ্চলের পুঙ্খানুপুঙ্খ সম্পর্ক পাওয়া যায়। বাস্তবে সেখানে সত্তরের দশকেও যে ব্রিজ, নদী, জঙ্গল দেখা যেত তা উপন্যাসের পটভূমির বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মেলে। সেখানকার মানুষের মুখে মুখে দস্যু দেবী চৌধুরানীর গল্প ফেরে। দেবী চৌধুরানী পরাজিত হয়ে নিহত হওয়ার স্থানটিতে এখনো প্রতি বছর মেলা বসে, যার নাম ‘নাপাইচণ্ডীর মেলা’। মানুষের মুখে মুখে এক বীর নারীর কাহিনী মিথের মতো শত শত বছর ধরে ঘুরে বেড়ানোর পেছনে একটি উপন্যাসকেও দায়ী করা যায়, যার নাম দেবী চৌধুরানী। সে কাহিনী হোক সত্য বা মিথ্যা, হোক সত্যমিথ্যার মাঝামাঝি কিছু, অন্তত সুসাহিত্যের শক্তি বলে তাকে মেনে নিতে হয়তো কারো আপত্তি থাকবে না।
৪
আবারো একশ বছর পরে ১৯৮২ সালে আরেকজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক, কবি কিংবা কাব্যগীতিময় নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেন এক অমর নাটক, যার নাম নূরলদীনের সারা জীবন। নাটকে নূরলদীন প্রকৃতপক্ষে ১৭৮৯ সালের কৃষক বিপ্লবের কর্ণধার নূরুল উদ্দীন। নাটকজুড়ে শিউরে ওঠার মতো নির্যাতনের কাহিনী, অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবধারিত জেগে ওঠার আহ্বান।
১৭৬৮ সালে ফসল খারাপ হওয়ার কারণে ১৭৬৯ সালে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষের শিকার নূরলদীনের পরিবার তখন জমির খাজনা দিতে অপারগ। কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রভুর পাঠানো কালেক্টর দেবী সিংহ খাজনা আদায়ে বদ্ধপরিকর। অর্থ না পেয়ে তাই পেটোয়া বাহিনী পরিবারের একমাত্র সম্বল কৃষিকাজে ব্যবহার করা গরুটি নিয়ে চলে যায়। গরুর অবর্তমানে কৃষিকাজ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ওদিকে আবারো খাজনা দিতে হলে কিংবা ফসল ঘরে তুলতে হলে জমিতে লাঙল দিতে হবে। তাই নিজের গলা লাঙলের নিচে দিয়ে শক্ত মাটি চিরতে চায় নূরলদীনের পিতা। লাঙলের জোয়াল ধরা থাকে নূরলের হাতে। পরিণতি ভেবে সে নড়তে চায় না কিন্তু বাবার ধমক খেয়ে লাঙল ঠেলে। শক্ত জমিতে পিতা লাঙলের চাপে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে তার মুখ থেকে কেবল গরুর মতো হাম্বা ডাক বেরিয়ে আসে। ঔপনিবেশিক প্রভু যে সাধারণ প্রজাকে লাঙল-টানা পশুতে পরিণত করেছে, রূপকের মাধ্যমে নাট্যকার তা স্পষ্ট তুলে ধরেন। আর তারপর শোষকের বিরুদ্ধে নূরলদীনের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। সে নিজের পরিতাপের সঙ্গে সবাইকে মিলিয়ে নেয়, ঘুমন্ত অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিত্কার করে বলে, ‘জাগো বাহে, কোনঠে সবায়?’
বাংলা কাব্যনাট্যধারায় নূরলদীনের সারা জীবন নাটকটি যেকোনো বিবেচনায় একটি অনন্য সংযোজন। এ রচনায় নাট্যকারের মেধা, ইতিহাস সচেতনতা, পরিশ্রম ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে লক্ষ করা যায়। ঐতিহাসিক একটি সমাজ পরিবর্তনের পথে কত ছোট-বড় আন্দোলনের জন্ম হয়! একক কোনো আন্দোলন বিচ্ছিন্নভাবে পরাধীনতাকে স্বাধীনতার দিকে নিতে পারে না। যুগ যুগ ধরে নানান প্রয়াস, বহু মানুষের আত্মত্যাগের পরিণতিতে একটি আন্দোলনের সফলতা দেখা যায়। উত্তর-ঔপনিবেশিক চেতনাকে এ রকম রচনার মাধ্যমে তাই আবিষ্কার করা সম্ভব। প্রতিটি ক্ষুদ্র আন্দোলনের লক্ষ্যে মসনদ বা সিংহাসন ছিল না। ছিল নিতান্তই বাঁচার চেষ্টা, নিজে এবং দলবদ্ধভাবে। তাই তো নূরলদীনের মুখে উচ্চারিত হয়, ‘মুই নবাব না হবার চাঁও। মুই সিংহাসন না চাঁও।’
৫
নূরলদীন হোক, হোক দেবী চৌধুরানী কিংবা ভবানী পাঠক—তাদের চরিত্র উদ্ঘাটন বা জীবন বর্ণনা করা লেখক-ঔপন্যাসিক-নাট্যকারের উদ্দেশ্য নয়। বরং ওইসব জীবন্ত ও ঐতিহাসিক চরিত্রের আধারে ওই সময়ের শোষিত মানুষের প্রতিচ্ছবি আঁকাই তাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। নূরলদীনের আহুতি, দেবী চৌধুরানীর বীরত্ব, ভবানী পাঠকের সাহসের মধ্য দিয়ে তাই বাঙালির চিরন্তন মানবিক আবেদন ফুটে ওঠে। বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে অবিরাম কল্পনাশক্তির মিলন ঘটিয়ে সৃষ্টিশীল লেখক এমন সৃষ্টি করতে পারেন যা সমাজ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে নিম্নবর্গের সাহিত্য-চেতনার ভেতর দিয়ে রচিত হয় বাঙালির জীবনে শোষক ও শোষিতের আখ্যান। ঐতিহাসিক চরিত্রের ওপর নির্ভর করে মূলত এ সাহিত্যে বাঙালির কৃষিভিত্তিক সমাজের আবহমান চিত্র এবং অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গে পরিণত হওয়ার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরা হয়।
আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক





