ইতিহাস লিখিত হয় বিজেতাদের হাতে। সে কারণেই ইতিহাসের বহু নায়ক পরিচিত হয় খলনায়ক হিসেবে। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্রোহীদের খল হিসেবে চিহ্নিত করা। এ কারণেই ব্রিটিশ রচিত ইতিহাসে তাদের উল্লেখ করা হয়েছে ডাকাত, লুটেরা হিসেবে। কিন্তু আদতে তারা ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের অন্তরালে শোষিত জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদী রূপ। এ কথা অবশ্য সত্য যে তাদের কাজের ধারাটি সোজা বা সহজ পথে যায়নি কিন্তু ব্রিটিশ শাসনে সেটা সম্ভবও ছিল না। কোম্পানির সে শাসন ছিল এক বিশৃঙ্খলার নাম। কিন্তু তার মধ্যেও থেমে থাকেনি প্রতিবাদ, প্রতিরোধ। বিশেষত বাংলা থেকে শুরু হওয়া কোম্পানি শাসনের প্রতিবাদও শুরু হয়েছিল বাংলা থেকে। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ তার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের। কিন্তু এ বিদ্রোহের অন্যতম কাণ্ডারি ভবানী পাঠক ইতিহাসে প্রায় অনুপস্থিত। ব্রিটিশরা তার সম্পর্কে লেখেনি। সে কারণেই পরবর্তী ইতিহাসবিদরাও প্রায় নিশ্চুপ। কিন্তু লিখিত বা প্রামাণ্য ইতিহাসে তাকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হলেও ভবানী পাঠককে মনে রেখেছে প্রান্তিক মানুষ।
ভবানী পাঠক কে ছিলেন, সে প্রশ্ন উঠলে একটি সহজ উত্তর পাওয়া যায়—দেবী চৌধুরানীর সহযোগী। এই দেবী চৌধুরানীকেও আবিষ্কার করতে হয় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে। সেখানে বঙ্কিমও ফিকশনের কারণে মূল ঘটনায় রঙ চড়িয়েছেন। আদতে দেবী চৌধুরানীকে যেভাবে ‘ডাকাত সর্দার’ (ইতিবাচকভাবেই) হিসেবে দেখানো হয়েছে, তিনি তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সংগঠক। রংপুর অঞ্চলে তিনি কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। সেখানে অত্যাচারী জমিদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল। ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে নূরল দীনের বিরুদ্ধে লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ডের একটি যুদ্ধ হয়। এ সময় থেকে দেবী চৌধুরানীও কৃষকদের একত্র করে তাদের সহায়তা দিতে শুরু করেন। কিন্তু ব্রিটিশের সরকারি নথিতে তার সম্পর্কে তথ্য দুর্লভ। সেনাদলের পক্ষ থেকে রংপুরের তত্কালীন কালেক্টরের কাছে দেবী চৌধুরানী সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট ব্রেনান। জবাবে লেখা এক চিঠিতে আছে, I can
not at present live you any soldiers with respect to the female decoct
mentioned in your letter. If on examination of Bengal (1) Papers which you have
dent it shall appear that there are sufficient grounds for apres handing her
any if one shall be found within the limits of my jurisdiction. I shall here
arrest send you such or dears as my jurisdiction. I shall hereafter send you
such orders as may be necessary.
বিখ্যাত দেবী চৌধুরানী সম্পর্কে তথ্যের যদি এ অবস্থা হয় তাহলে ভবানী সম্পর্কে কতটা তথ্য আছে, তা আন্দাজ করাই যায়। ভবানী পাঠক সম্পর্কে সূত্র অপ্রতুল। এর কারণ হতে পারে ব্রিটিশরা তার কথা উল্লেখ করতে চায়নি কিংবা ছদ্মবেশ ও আত্মগোপনের কারণে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই সম্ভব হয়নি। ইংরেজ সেনা ও প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের নথিপত্রেও ভবানীর উল্লেখ খুবই কম। গ্লেজিয়ারের ‘রংপুর জেলার বিবরণ’ বইয়ে ভবানীর পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ভবানী পাঠক রংপুর জেলার বাজপুরের অধিবাসী। এছাড়া তার মতে, মজনু শাহের সঙ্গে ভবানীর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন, ‘ভবানী পাঠক প্রথম হইতেই “সন্ন্যাসী”-বিদ্রোহের সহিত জড়িত ছিলেন এবং ময়মনসিংহ ও বগুড়া জেলার মধ্যবর্তী জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে স্থানীয় কৃষকদের লইয়া বিদ্রোহ সংগঠিত করিয়াছেন। গ্লেজিয়ার সাহেব আরো উল্লেখ করিয়াছেন যে, তাঁহার দলের মধ্যে বহু পাঠান ও বিহারের লোক ছিল এবং একজন পাঠান ছিলেন ভবানী পাঠকের বাহিনীর প্রধান সেনাপতি।’
একথা ইতিহাসেই স্পষ্ট যে ভবানী পাঠকের উত্থান নূরল দীনের (নূরুল উদ্দিন) বিদ্রোহের কিছুকাল পরে। ‘ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ সূত্রে জানা যায়, ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠক সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়। মূলত এ সময়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী ঢাকার সরকারি কাস্টমসের সুপারিনটেন্ডের কাছে ভবানী পাঠকের নামে অভিযোগ করে। তাদের অভিযোগ ছিল ‘ভবানী পাঠক নামে এক দুঃসাহসী ব্যক্তি পথে তাদের নৌকা লুণ্ঠন করিয়াছে।’ এরপর এই ‘দস্যু’ ও তার দলকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানাসহ একদল বরকন্দাজ প্রেরণ করা হয়। ভবানী পাঠক এ শাসন ব্যবস্থাকেই মানতেন না এবং পরোয়ানার বিপরীতে তিনি সে কথাই প্রচার করেন। ইংরেজ ও তাদের সমর্থক ব্যবসায়ীদের প্রচুর নৌকা পণ্যসহ লুণ্ঠন করেন।
ভবানী পাঠকের অস্তিত্ব সম্পর্কে আরো স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে হান্টারের বিবরণে। তার মতে, ভবানী ছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত। তাকে ভোজপুরী ব্রাহ্মণ বলে উল্লেখ করে হান্টার জানিয়েছেন, ভবানীর অনুসারীরা সবাই ছিলেন রাজপুত। ১৭৮৭ সালের জুন মাসে লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের নেতৃত্বে ২৪ জন সেনাসহ ভবানী পাঠকের নৌকায় অতর্কিতে আক্রমণ করা হয়। হান্টার জানিয়েছেন, এ আক্রমণেই তিন অনুচরসহ ভবানীর মৃত্যু হয়। বন্দি হয় ৪২ জন। হান্টারের বইয়ে ব্রেনানের সঙ্গে ভবানীর এ যুদ্ধের সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। এর বাইরে নীতিশ সেনগুপ্তও হান্টারের প্রতিধ্বনি করেছেন।
নীতিশ সেনগুপ্ত তার Land of two rivers: A History of Bengal from
the Mahabharata to Mujib বইয়ে লিখেছেন, “In 1787, Lt. Brenan led an expedition against
Bhabani Pathak, the notorious dacoit. Twenty four sepoys led by an Indian
officer were sent and they attacked Bhabani Pathak and his 60 followers who
were in their boats. There was a naval fight which ended in the death of
Bhabani Pathak and three of his men, injuries to eight others and the capture
of 42 men. Lt. Brenan’s report discloses that Bhabani Pathak had contact with a
female dacoit by the name of Debi Chowdhurani who lived in a boat and used to
be accompanied by a host of paid fighters. She would take part in the raids
herself and was allotted a share of the plunder of the Pathak’s gang.”
ভবানী পাঠকের সম্পর্কে ইতিহাসে এর বেশি পাওয়া যায় না। কিন্তু তাকে মনে রেখেছে রংপুর ও জলপাইগুড়ির মানুষ। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কাচারী পয়রাডাঙ্গা এলাকায় আছে ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহে অংশ নেয়া সন্ন্যাসীদের আশ্রয়স্থল ভবানী পাঠকের মঠ। একে অনেকে শিবমন্দির, অনেকে দুর্গাদেবী চৌধুরানীর আস্তানাও বলে থাকেন। কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৭৭০-১৭৭২ সালের মধ্যে এ শিবমন্দির নির্মাণ করেন ভবানী পাঠক। তার নাম অনুসারে এ গ্রামে পাইকপাড়াও আছে বলে জানা যায়। এছাড়া জলপাইগুড়িতে রয়েছে দেবী চৌধুরানীর মন্দির। মঠ আকৃতির এ মন্দিরে ভক্তরা নিয়মিত পূজা দেয়। মন্দিরগুলো পুরনো ধারার স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। তবে জলপাইগুড়ির রায়গঞ্জ ব্লকের শিকারপুর চা বাগানের মধ্যে থাকা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর মন্দিরটি ভিন্ন ধারার। মন্দিরটির স্থাপত্য প্যাগোডার মতো। এ মন্দিরে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরনীর প্রতিমা রয়েছে।
ভবানী পাঠক সম্পর্কে তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা মিথ। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ মূলত শুরু হয় পলাশীর যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পাশে ছিলেন তার অনুগত মোহনলাল। তার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অনেক ইতিহাসবিদ। এমনকি অমলেন্দু দে পর্যন্ত মনে করেন মোহনলাল মারা যায়নি। প্রচলিত কথা হলো মোহনলাল ছদ্মবেশ নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সঙ্গে তাই তাকে যুক্ত করা হয়। এর কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু অনেকেই মনে করেন বা বিশ্বাস করেন, মোহনলালই ভবানী পাঠক। তিনি সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে বিদ্রোহ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাকে ‘লোককথা’ হিসেবে মেনে নেয়াই ভালো। তবে গণমানুষ যে ভবানী পাঠককে ভোলেনি এবং তাকে নানাভাবে স্মরণ রেখেছে এটি তারই প্রমাণ।
মাহমুদুর রহমান: লেখক






