প্রতিটি অঞ্চলেরই নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার থাকে। সময়ের পরিবর্তনে এখন বহু খাবার সব অঞ্চলেই তৈরি হয়, কিন্তু খুঁজলে দেখা যাবে এর উত্পত্তি নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে। বাকেরগঞ্জ বা বরিশালেরও এমন কিছু বিশেষ খাবার আছে, যা এ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে। এর মধ্যে বিসকি, মলিদা ও চিংড়ির ঝোল প্রধান।

প্রথমত, মলিদার কথা বলতে হয়। এটি মূলত চালের গুঁড়োর শরবত। আতপ চাল শিল-পাটায় গুেঁড়া করে এর সঙ্গে আখের গুড়, কোরানো নারকেল বা নারকেলের দুধ মিশিয়ে মলিদা তৈরি করা হয়। কখনো কখনো নারকেলের দুধের পাশাপাশি ডাবের পানিও ব্যবহার করা হয়। এখন কেউ মলিদা বানালে ব্লেন্ডারে মিশ্রণ করবেন, তবে আগে পাতিলে নিয়ে ডালঘুটনি দিয়ে মিশ্রণটি করা হতো। মলিদায় চালের গুঁড়োর পাশাপাশি চিড়াও ব্যবহার করা হয়।

মলিদার প্রায় কাছাকাছি আরেকটি খাবার বরিশালে জনপ্রিয়। বরিশালে এটি চিড়া-মুড়ি নামে পরিচিত। মুড়ি ধুয়ে ঘণ্টা পাঁচেক ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর নারকেল কোরা এবং গুড় গোলানো পানির সঙ্গে চিড়া মিশিয়ে খাবারটি তৈরি হয়। অনেকে দই-চিড়ার সঙ্গে একে মিলিয়ে ফেলে, তবে দুটো ভিন্ন আইটেম। চিড়া-মুড়ি সাধারণত ইফতারে খাওয়া হয়। যদিও আজকাল বরিশালের মানুষের কাছেও খাবারটি অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে।

চালের রুটি বাংলাদেশের বহু জায়গায়ই জনপ্রিয়। কিন্তু বাকেরগঞ্জের ক্ষেত্রে এ রুটি খাওয়ার জন্য আরেকটি বিশেষ খাবার তৈরি করা হয়। নারকেলের দুধ দিয়ে চিংড়ির ঝোল। খাবারটির বিশেষত্ব হলো ঝোলটা তৈরি হয় মূলত নারকেলের দুধ থেকে। এছাড়া রান্নায় অন্য সব ধরনের মসলাই ব্যবহার করা হয়। পর্যাপ্ত চিংড়ি ব্যবহার করে তৈরি এ ঝোলে চালের রুটি চুবিয়ে খাওয়া হয়। বরিশালে চালের রুটিকে ‘রুটি-পিঠা’ বলা হয়।

চিংড়ি খাওয়া হয় না, বাংলাদেশে এমন কোনো অঞ্চল নেই। চিংড়ির পাতুড়ি রীতিমতো কলকাতার রান্নার অনুষ্ঠানেও বিশেষ আইটেম হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু মসলা মাখিয়ে কলাপাতায় মুড়ে ভাতের মধ্যে ভাপ দিয়ে চিংড়ি রান্নার বিষয়টি বরিশালে বহু পুরনো। মূলত কলাপাতা বরিশালে নানা পদ তৈরির অন্যতম অনুষঙ্গ। বরিশালে তালের পিঠা তৈরি হয় কলাপাতার উল্টো পিঠে। বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। মূলত তাল ও চালের গুঁড়োর পাতলা গোলা তৈরি করে কলাপাতার উল্টো পিঠে গোলাকারে লেপন করে ভাপ দিয়ে তালের পিঠা তৈরি হয়। বরিশালে কলাপাতার নাম ‘বরগ’। বরগে-চিংড়ি, বরগের পিঠা এখানে তুমুল জনপ্রিয়। চিংড়ি যদিও বহু জায়গায় কলাপাতায় তৈরি হয়, বরিশালে আরেকটি পদ্ধতিতে পদটি তৈরি হতো। সুপারির খোলের ওপর এটি স্বচ্ছ আবরণ থাকে। সেটি তুলে সেই আবরণের মধ্যে মসলামাখা চিংড়ি জড়িয়ে ভাপ দিয়ে পাতুড়ি তৈরি হতো।

তালের আরেকটি পিঠার বরিশালে নাম ‘তাল গড়গড়ি’ বা ‘গড়গইড়্যা পিঠা’। কলাগাছের বাকল খুললে এর ভেতরটা খাঁজ কাটা দেখা যায়। গুড়সহ তালের গোলা তৈরি করে এর সঙ্গে চালের গুঁড়ো মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। সেখান থেকে সামান্য মণ্ড নিয়ে হাতের তালুর সাহায্যে কলাগাছের বাকলের ওপর রেখে ঘষা দিয়ে ছেড়ে দিলে সেটিতে কারুকাজ তৈরি হয়। মাকু আকারের তিন-চার সেন্টিমিটারের এমন অসংখ্য পিঠা একত্রে গরম পানির ওপর ভাপ দিয়ে তৈরি হয়। কলাগাছের বাকল থেকে গড়িয়ে পড়ে বলে পিঠার নাম ‘গড়গইড়্যা’।

বিসকি বরিশালের আরেকটি বিশেষ খাবার। আউশ চাল থেকে মিষ্টি ধরনের খাবারটি তৈরি হয়। বিসকি তৈরির পদ্ধতি বেশ জটিল। প্রথমে আউশ চাল তাওয়ায় ভাজা হয়। সেটি ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ করা হয়। বিসকি তৈরির জন্য ভাজা এ চাল ধুয়ে ভেজানো হয়। এরপর গুড় (সাধারণত খেজুরের গুড়), কোরানো নারকেল দিয়ে ভাতের মতো করেই রান্না হয়। কিন্তু এখানে মাড় ঝরানোর কোনো ব্যাপার থাকে না। বরিশালে সাধারণত বর্ষাকালে বিসকি সব ঘরে তৈরি হতো এবং এখনো হয়।

এছাড়া বরিশালে নানা পিঠা তৈরি হয়। তরকারিতে ঝাল খাওয়ার জন্য বরিশালের মানুষ বিখ্যাত, আবার বরিশালের মানুষ মিষ্টিজাতীয় খাবারও পছন্দ করে। খেজুরের গুড় থেকে শীতকালে বিভিন্ন পিঠা তৈরি হয়। এছাড়া মিষ্টির ক্ষেত্রে গৌরনদীর রসমালাই বিখ্যাত। কুমিল্লার রসমালাইয়ের চেয়ে তা কোনো অংশে কম নয় বলেই রসিকরা মনে করে। দুধ চিতই, চুষি পিঠা, চ্যাবা পিঠা এখনো বরিশালের মানুষ তৈরি করে।

‘মনু, ডাইলে লবণ দেছো না দেবা?’—কথাটি বরিশাল সম্পর্কে বহুল প্রচলিত। ডালের ক্ষেত্রে বরিশালের মানুষ ডালে আমড়া, চালতা দিয়ে টক ডাল রান্না করে। বরিশালে প্রচুর আমড়া ও চালতা হওয়ার কারণে তা তরকারিতে স্বাভাবিকভাইে যুক্ত হয়েছে। একইভাবে যুক্ত হয়েছে নারকেল। চিংড়ি দিয়ে কচুর লতি রান্না থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের শাক রান্নায়ও নারকেল ব্যবহার হয়। বলা বাহুল্য, এতে তরকারির স্বাদ বাড়ে বৈ কমে না।