আজকের বরিশাল একসময় ছিল বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ। মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার ইতিহাসে বাকেরগঞ্জ একটি আলোচিত জেলা। এ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তত্কালীন প্রভাবশালী জমিদার আগা বাকের খাঁর নাম। তার পুরো নাম মির্জা আগা মোহাম্মদ বাকের। পারস্য থেকে বাংলায় আসা এ অভিজাত সরকারি কর্মকর্তা বুজুর্গ উমেদপুর ও সলিমাবাদ পরগনার জমিদারি লাভ করেছিলেন। মোগল আমলে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা নিয়ে পরগনা দুটি গঠিত ছিল। নবাবি আমলে আগা বাকের বুজুর্গ উমেদপুর পরগনার দায়িত্ব লাভ করেন। শ্রীমন্ত নদীর তীরে তিনি একটি বন্দর তৈরি করেন বা অবস্থিত বন্দরে বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। বাণিজ্যকেন্দ্রটি কালক্রমে বাকেরগঞ্জ নামে পরিচিত হয়।

বলা হয়, আগা বাকের উড়িষ্যার নায়েব নাজিম দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি খান রুস্তম জংয়ের পালিত পুত্র। পরবর্তী সময়ে তার জামাতা হন। উড়িষ্যার অধিকার নিয়ে রুস্তম জং ও আলিবর্দি খানের মধ্যকার বিবাদ যুদ্ধে গড়ালে সে যুদ্ধে আগা বাকের দুঃসাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। আলিবর্দি খানের সঙ্গে সরফরাজ খানের যুদ্ধ হয় ১৭৪০ সালের ৯ এপ্রিল। মুর্শিদাবাদের অদূরে গিরিয়ার প্রান্তরে এ যুদ্ধে সরফরাজ খানের পরাজয় ও পতন ঘটে। বাংলার নবাব হন আলিবর্দি খান। উড়িষ্যা তখন বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি আলিবর্দির আধিপত্য অস্বীকার করেন। আলিবর্দির কাছ থেকে বাংলা পুনর্দখলের জন্য আগা বাকের তার শ্বশুর দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলির সঙ্গে যোগ দেন।

১৭৪১ সালের ৩ মার্চ দুই পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে রুস্তম জংয়ের পক্ষে মির্জা বাকের প্রথম আক্রমণ পরিচালনা করেন। রুস্তম জং যুদ্ধে পরাজিত হন। মারাত্মকভাবে আহত হন মির্জা বাকের। পরাজিত হয়ে আহত জামাতা বাকেরকে নিয়ে রুস্তম জং মসলিপট্টমে পালিয়ে যান। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারটি বিপদের মুখে পড়ে। এ সময় উড়িষ্যার খুর্দার জমিদারের সহায়তায় পরিবারটি আলিবর্দির সৈন্যদের হাত থেকে রক্ষা পায়। এরপর তারা দাক্ষিণাত্যে ফেরারি জীবনযাপন করেন।

কিন্তু এভাবে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি। তিনি আলিবর্দির খানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আলিবর্দি তাকে ক্ষমা করে বুজুর্গ উমেদপুর ও সলিমাবাদ পরগনার জায়গিরদার নিযুক্ত করেন। ১৭৫৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে বহাল ছিলেন। দায়িত্বে আসীন হয়ে ১৭৪১ সালে আগা বাকের বুজুর্গ উমেদপুরে নিজ নামে একটি বড় গঞ্জ প্রতিষ্ঠা করে বাকেরগঞ্জ নাম দেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর-শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। এ অঞ্চলে পারসিক ও আর্মেনীয় বণিক এবং কাশ্মীরি খাজারা লবণ ও চামড়ার ব্যবসা করতেন।

জমিদার আগা বাকের খাঁর নামের সঙ্গে নানা ধরনের জনশ্রুতি মিশে আছে। আগা বাকের ও নর্তকী খনি বেগমের প্রেমকাহিনীকে স্মরণীয় রাখতে ঢাকার প্রসিদ্ধ বাকরখানি রুটির নামকরণ করা হয়েছে বলে কথিত। কাহিনীটি হলো মুুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগম ও আগা বাকের পরস্পরের প্রেমে পড়েন। কিন্তু উজির জাহান্দার খানের পুত্র জয়নাল খানও খনি বেগমের প্রতি আসক্ত ছিলেন। নগর কোতোয়াল জয়নাল তাই আগা বাকেরকে অভিযুক্ত করে মিথ্যা খুনের সংবাদ রটিয়ে দেন। মুর্শিদ কুলি এ কথা শুনে বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করেন। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাকের জয়ী হন। বাঘটিকে তিনি হত্যা করেন। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অসত্যতা প্রমাণ হলে তাকে মুক্ত করা হয়। আগা বাকের মুক্ত হয়ে খনি বেগমকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। জাহান্দার খানও এ অভিযানের সঙ্গী হন। তিনি নিজ পুত্রকে তলোয়ার দ্বারা আঘাত করলে মৃত্যুর আগে জয়নালও খনি বেগমকে তলোয়ার বিদ্ধ করে হত্যা করেন। নিজের প্রেমিকার স্মৃতিকে জাগ্রত রাখতে আগা বাকের তাই ঢাকা শহরের তত্কালীন প্রসিদ্ধ রুটির নাম দেন বাকেরখনি, যা কালক্রমে বাকরখানি নাম লাভ করে।

অন্য জনশ্রুতি অনুসারে, দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলির কন্যাকে বিয়ের আগে আগা বাকের ও খনি বেগমের মধ্যে নিবিড় প্রেম ছিল। বিয়ের পরও খনি বেগমের স্মৃতি তিনি ভুলে যাননি। এ কারণে নিজের আবিষ্কৃত রুটির নাম তিনি দেন বাকেরখনি। পরে তা বাকরখানি নামে পরিচিতি পায়।

লোকশ্রুতি বাদ দিয়ে যুক্তির দিকে গেলে আরেকটি তথ্য পাওয়া যায়। আগা বাকের মূলত বাকেরগঞ্জে না থেকে ঢাকায় অবস্থান করতেন এবং তার প্রতিনিধির মাধ্যমে জমিদারি পরিচালনা করতেন। সেকালে ঢাকা থেকে বাকেরগঞ্জ যাওয়া ছিল সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ সময়ে তিনি তার বাবুর্চিকে এমন কোনো নোনতা খাবার তৈরি করতে বলেন, যা বহুদিন পর্যন্ত নষ্ট হবে না। সেখান থেকেই এ রুটির সূচনা। খেয়াল করে দেখা যায়, বাকরখানি ঢাকাতেই জনপ্রিয়, বাকেরগঞ্জ বা বরিশালে নয়। বাকরখানির উত্পত্তির এ তথ্যটি সমর্থন করা যায়। পাশাপাশি এটি আগা বাকেরে ঢাকামুখিতার একটি প্রমাণ। উল্লেখ্য, আগা বাকেরের সমাধিও ঢাকায়। আগা সাদেক ময়দানের উত্তর পার্শ্বে একটি সমাধিতে আগা বাকের সমাহিত আছেন। তার মৃত্যুর ঘটনাও কৌতূহলোদ্দীপক।

গোলাম হোসেন তবাতবায়ির মতে, আগা বাকের একজন বিত্তশালী ব্যক্তি ছিলেন এবং সিরাজউদ্দৌলা তাকে ব্যবহার করতেন। সিরাজের অনুসারী হওয়ার কারণে তারা ছিলেন নওয়াজেশ মুহম্মদের বিরোধী পক্ষ। নওয়াজেশ সে সময় প্রতিনিধির মাধ্যমে ঢাকার শাসন পরিচালনা করতেন। এক রাতে আগা বাকের ও আগা সাদেক ঢাকার নায়েব নাজিম হোসেন কুলী খানের প্রতিনিধি হোসেনউদ্দিন খানকে হঠাৎ আক্রমণ করে হত্যা করেন। নিহত হোসেনউদ্দিনের আত্মীয় ও ঢাকা শহরের কোতোয়াল মির্জা আলী নকী এ হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য শহরের লোকজন নিয়ে আগা বাকেরের বাড়ি আক্রমণ করেন। আগা সাদেক এ আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। আগা বাকের এ সময় হোসেন কুলীর সমর্থকদের হাতে মারাত্মক আহত হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবেই ১৭৫৪ সালে ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের রঙ্গমঞ্চে অভিনয় সাঙ্গ হয়।

 

উম্মে তাসবীহ: লেখক