এ এলাকা হামলা ও মামলায় ঘেরা—হালের বরিশাল বিভাগের অনেকটা নিয়ে উপনিবেশ জামানায় গোরা শাসককুলের হাতে তৈরি বাকেরগঞ্জ জেলাসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র পড়তে পড়তে এমনটা কারো যদি মনে হয়, তাহলে তাকে দোষ দেয়া মুশকিল। বস্তুত, সেকালের বাকেরগঞ্জ বহু রকমের ধানের জন্য সুখ্যাত ছিল, কিন্তু ইংরেজ শাসকের দৃষ্টিতে এ জেলা ‘কুখ্যাত’ ছিল অপরাধপ্রবণতার কারণে। বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম পর্যায়ে, উনিশ শতকের গোড়ার দিকেই ইংরেজ কোম্পানির প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল—বাকেরগঞ্জ ভারি ‘বেয়াড়া’ জায়গা।

‘বাকেরগঞ্জ জেলার মানুষের নৈতিক চরিত্র মোটের ওপর সুবিধার নয়। এর ব্যতিক্রম প্রায় দেখতে পাওয়া যায়ই না। উঁচু জাতের লোকদের মধ্যে ঠকবাজি বা গুণ্ডামির অভিযোগ নেই, এমন লোক মিলবে না। আর নিচু জাতের লোক মাত্রই সুযোগ পেলেই খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি করে থাকে।...বিশেষ করে নিচু জাতের লোকেরা তো ডাকাতি চালানোর জন্য পরস্পরকে রীতিমতো সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে থাকে, কারণ তাদের মধ্যে খুব অল্পই ব্যবসা বা কৃষিকাজ করে জীবিকানির্বাহ করে। আর হাতেগোনা ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ জমিদার ও তালুকদাররাও নিশ্চিতভাবেই গোপনে গোপনে ডাকাতদের প্রশ্রয় এবং আশ্রয় দিয়ে থাকে।...’ ৭ জানুয়ারি ১৮০২ ইংল্যান্ডে পাঠানো এক চিঠিতে এসব কথা লিখেছেন ইংরেজ সাহেব জে উইন্টল, যিনি সেই সময় ছিলেন বাকেরগঞ্জের জেলা জজ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এখানেই শেষ নয়, উইন্টল আরো লিখেছেন— ‘...[বাকেরগঞ্জের] বাসিন্দারা আইনকানুন সম্পর্কে একদমই মূর্খ।...ব্রিটিশ সরকার প্রবর্ত্তিত আইনের শাসন তাদের নৈতিক চরিত্র উন্নয়নের বেলায় বিশেষ কোনো প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়নি। শুধুমাত্র ভয় দেখিয়েই দেশের এই অংশের স্থানীয় লোকদের বাগে আনা সম্ভব। কেবল শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়েই সম্ভবত তাদের অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে নিবৃত্ত করা যেতে পারে...।’

বাকেরগঞ্জের মানুষের বিষয়ে উইন্টলের এ চিঠির ছত্রে ছত্রে এমন সব কটু মন্তব্য। শুধু তাই নয়, উইন্টল নিজের সহকর্মী—তত্কালীন নদীয়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সি ওল্ডফিল্ডকে লেখা এক চিঠিতে এমন পরামর্শও দিয়েছেন, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বাঙালিরা—যদি এমন দেখা যায় তবে সুযোগ পেলেই ফাঁসিতে ঝোলানোর রায় দেওয়া উচিত! উইন্টল সম্ভবত তার করতলে থাকা বাকেরগঞ্জে এই নির্মম-নির্দয় ‘নীতি’-তেই চলতেন।

বাকেরগঞ্জ সম্পর্কে এমন নেতিবাচক ভাবনার প্রকাশ দেখা যায় ইংরেজ পুলিশের নথিপত্রেও। ঢাকা বিভাগের তখনকার নগর কমিশনার সি টি বাকল্যান্ডের Report on the police of the Dacca division শীর্ষক ১৮৬৬ সালের এক প্রতিবেদনে জানানো হচ্ছে, ‘...[বাকেরগঞ্জে] আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের বিষয়টি নজরে পড়ার মতো। কলকাতার চীনাবাজারের বন্দুকের দোকানগুলোর মেমোবই বিশ্লেষণ করে ১৮৬৭ সালের শেষে এই তথ্য পাওয়া যায় যে সেখান থেকে গত এক বছরে বাকেরগঞ্জে ১০৩০টি শিকারের বন্দুক, ২৪০টি গাদাবন্দুক, ১২১টি পিস্তল এবং ৪০২৪ বাক্স গুলি সরবরাহ করা হয়েছে। সেখানকার কৃষিজীবী শ্রেণী আরো বেশি ধনী হয়েছে, কারণ সেখানে ধানের প্রাচুর্য ও দাম বেড়েছে; এবং প্রত্যেকেই সেখানে নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের পেছনে বিনিয়োগ করতে চায়, কারণ তা নিরাপত্তা দেয়, টাকা বা অলংকারের তুলনায়ও তা অধিকতর সহজে বহনযোগ্য, পাশাপাশি দ্রুত বিক্রি করেও দেওয়া যায় অন্যের কাছে।...’

বাংলায় পুলিশের তখনকার ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. রাইলি এমন মন্তব্যও করেছিলেন, ‘[বাকেরগঞ্জে] প্রতি দশজনের মধ্যে একজন লোকের এক হাতে রয়েছে বন্দুক, আর আরেক হাতে পেনাল কোড।’ বাকল্যান্ডের রিপোর্টে উল্লিখিত আরো কিছু পরিসংখ্যানভিত্তিক মন্তব্য তুলে ধরা যেতে পারে। তার দেয়া হিসাব অনুযায়ী, বাকেরগঞ্জে ঢাকা বিভাগের অন্য জেলার তুলনায় দাম্পত্য সহিংসতা ছিল উল্লেখযোগ্য আকারে বেশি।

১৮৭৯ সালে প্রকাশিত, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল জে মনরো প্রণীত Report on the state of police in the Lower Provinces-এ এমন মন্তব্য করা হয়েছিল যে ‘বাকেরগঞ্জে মানবজীবনের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবজ্ঞা’ সরকারের গোচরে আনা জরুরি। বাংলার অন্য জেলার চেয়ে যে বাকেরগঞ্জ ‘অধিক’ অপরাধপ্রবণ, তা প্রমাণ করতে মনরো সাহেব কিছু পরিসংখ্যানও দিয়েছিলেন। যেমন ওই সময় এক বছরে বাকেরগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে গ্রেফতার করা হয়েছিল ৩ হাজার ৭৩৮ জনকে, আর ফরিদপুর জেলায় একই সময়পর্বে গ্রেফতার হয়েছিল ৩৮১ জন। যদিও শতাংশের হিসাবে চার্জশিটভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতারে সবচেয়ে পিছিয়ে বাকেরগঞ্জই। আবার ১৮৭৭ সালে বাকেরগঞ্জে ১০টি খুন হলেও ১৮৭৮ সালে তা দাঁড়িয়েছিল ২২টিতে। বাকেরগঞ্জে ‘খারাপ চরিত্রের লোকেদের’ বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ বিশেষ অভিযান চালানোর ফলেই সেখানে গৃহস্থের ঘরে চুরি-ডাকাতি নাকি কমে এসেছিল। কিন্তু জেলায় সবসময়ই অপরাধীরা নানাভাবে দরকারি সমর্থন ও সাহায্য পেয়ে এসেছে, কারণ অপরাধীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায় এমন লোকের কমতি নেই বাকেরগঞ্জে। মনরোর রিপোর্টে বাকেরগঞ্জের অপরাধজগতের যে চিত্র মেলে, তার বেশির ভাগটাতেই স্থানীয় সাধারণ জনগণের ওপর দায় দেয়ার চেষ্টা লক্ষণীয়। তবে এ সরকারি বয়ানে সেকালের জেলা প্রশাসনের অপকর্মের দু-একটি বিবরণেরও দেখা মেলে। যেমন বাকেরগঞ্জের এক থানার সাব ইন্সপেক্টর, তিন কনস্টেবল ও দুই চৌকিদার মিলে এক সন্দেহভাজন অপরাধীকে জেরার নামে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। পরে তারা মরদেহটিকে একটা আমগাছে ঝুলিয়ে প্রচার করে, আদতে লোকটি আত্মহত্যা করেছে। পরে তারা অবশ্য ধরা পড়ে ও তাদের আদালতে তোলা হয়। এছাড়া বাকেরগঞ্জের তদনীন্তন প্রধান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এমন অভিযোগ করেছিলেন, তার আজ্ঞাবহ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রায়ই নিজেদের ‘বিপন্ন হিসেবে দেখাবার জন্য’ ভুয়া বা গায়েবি মামলা দাখিল করে।

এ তো গেল পুলিশি বিবরণ, বাকেরগঞ্জ সম্পর্কে ইংরেজ সরকারের জেলখানাবিষয়ক প্রতিবেদনেও বিশেষ ইতিবাচক চিত্র মেলে না। বাংলার জেলখানা বিষয়ে ১৮৮৪ সালের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাকেরগঞ্জে জেল ও হাজতখানায় আটক কয়েদি-আসামিরাই ম্যালেরিয়ায় বেশি আত্রান্ত হচ্ছে।

পূর্বোক্ত বিবরণগুলো সবই উনিশ শতকের। বিংশ শতাব্দীতে এসে কি বাকেরগঞ্জ বিষয়ে ইংরেজ শাসকদের মন বদলেছিল? সম্ভবত নয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন এফ সি ডালি। অপরাধবিষয়ক একাধিক বইয়ের লেখকও ছিলেন তিনি। তো এই ডালি সাহেবও বাকেরগঞ্জ বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তার এক লেখায় এমন মন্তব্য পাই, ‘...ডাকাতের উৎপাত বাকেরগঞ্জ জেলায় অসহ্য আকার নিয়েছে।... এ জেলায় প্রচুর ফসল ফলে ও দুর্ভিক্ষের কার্যত দেখা মেলে না, তাও।...’ ডালির মতে, বরিশালের স্থানীয় পুরুষরা ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত হয় মুখ্যত ‘ব্যাটাগিরি’ দেখানোর উদ্দেশ্যে। টাকা-পয়সার জন্য নয়। তিনি এমনকি এও লিখেছেন, আরব সাগরের জলদস্যুরাও এদের নিষ্ঠুরতার সামনে লজ্জা পাবে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯১৫ সালের একটি ডাকাতির ঘটনার বিবরণ দেন। এক ডাকাত দল বাকেরগঞ্জের জনৈক গৃহস্থের বাড়িতে হানা দেয়; তাদের সর্বস্ব লুট করার পর বাড়িতে আগুন দেয়, তাতেও শেষরক্ষা হয়নি—বাড়ির বউয়ের কোল থেকে একটি দুধের শিশুকে কেড়ে নিয়ে তাকে আগুনে নিক্ষেপ করে। একবার বাকেরগঞ্জের এক কুখ্যাত ডাকাতকে সেখানে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকারোক্তি দিতে বললে সে জানায়, ‘...ডাকাতি আমার রক্তে। এ আমাকে ছাড়বে না। যখন রাতে চাঁদের আলো থাকে, আমার কিছু মনে হয় না। কিন্তু যখনই রাতে ঘন আঁধার নামে—আমার রক্ত গরম হয়ে ওঠে। তখন কী একটা জিনিস, আমি ঠিক জানি না, এসে আমাকে তাড়া দেয়। আর আমি লাঠি হাতে তুলে নিই, ডাকাতি করতে বের হই।...’

পুলিশ ছেড়ে এক ইংরেজ সিভিলিয়ানের কথা দিয়ে শেষ করি। ১৯১০ সালে ঔপনিবেশিক ভারতের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেয়া আর্থার ড্যাশের চাকরিজীবনের পুরোটাই কেটেছিল তত্কালীন পূর্ববঙ্গে। তো সেই ড্যাশকে ১৯৩২ সালে বদলি করা হয়েছিল বাকেরগঞ্জ বা আজকের বরিশালে। এ সম্পর্কে ড্যাশ নিজের আত্মজীবনীতে খুব খেদ করেছিলেন। কারণ বাকেরগঞ্জ এমন এক জেলা, যেখানে ‘তিন মাইলের বেশি পাকা রাস্তা নেই আর জেলাটি বিখ্যাত খুনখারাবির জন্য।’ বাকেরগঞ্জের শক্তিশালী স্থানীয় ভূস্বামী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়েও তিনি কড়া মন্তব্য করেন। লেখেন, এখানকার সাধারণ মানুষ অন্তত গরিবি জীবনযাপন করলেও স্থানীয় অভিজাতদের মধ্যে জনকল্যাণের কোনো বোধই নেই। তারা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। এখানকার জীবনযাত্রার মানও তাই নিঃস্বতর। সংবেদনশীল মানুষ আর্থার ড্যাশ শেষমেশ অন্তত এ জেলার অপরাধপ্রবণতার মূলকে খুঁজে দেখতে চেয়েছিলেন, এমনটা মনে হয়।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক