জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এ পাক্ষিক
আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
(দ্বাত্রিংশ কিস্তি)
‘আফ্রিকার সাহিত্যে অনুবাদ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়’ (প্রথমার্ধ)
বাচনিক বা বাচিক ঐতিহ্যই আফ্রিকার সাহিত্যের ভিত্তি। কৃষ্ণ আফ্রিকায় লিখিত সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্য নেই, যা কিনা পৃথিবীর অন্যান্য অংশ, যেমন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কিছু কিছু অঞ্চলে রয়েছে। আর তাই সেখানে লিখিত অনুবাদের ইতিহাসও অনুপস্থিত। উপনিবেশ-পূর্ব যুগে, বামুম, বামিলেকে ও বেটি নামের ক্যামেরুনীয় জাতিগত গোষ্ঠীতে এবং আফ্রিকার অন্যান্য সংস্কৃতিতে চিত্রলিপিমূলক লেখাপত্র শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের বেশ প্রচলিত একটি মাধ্যম ছিল। আর তাই সম্ভবত এক ধরনের লেখা ও সেই সঙ্গে এক ধরনের অনুবাদের কথা বলা (এই যেমন আরবি হরফে আফ্রিকার আখ্যানের ট্রান্সক্রিপশন বা প্রতিলিপি) সম্ভব এবং সেটার উদ্ভব ঘটেছিল আফ্রিকায় ইউরোপীয়দের পদার্পণের আগেই। কিন্তু তার পরও ঊনবিংশ শতকে খ্রিস্টীয় মিশনারিরা লাতিন বর্ণমালা সঙ্গে করে না পৌঁছা অবধি আমরা আজ অনুবাদকে যেভাবে চিনি, তা সেখানে শুরু হয়নি। পরবর্তী অনুবাদ কর্মকাণ্ড আফ্রিকার নানা সাহিত্যের ওপর এক অমোচনীয় ছাপ ফেলে, যার প্রধান ফসল হচ্ছে একটি সাক্ষর সংস্কৃতির উদ্ভব।
আফ্রিকার পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতীয় ভাষা’, ‘জাতীয় সাহিত্য’ বা এমন কি ‘আফ্রিকার সাহিত্য’ও ধারণাটি সাধারণভাবে একটা সমস্যার উদ্রেক করে। পশ্চিমের সঙ্গে আফ্রিকার মুখোমুখি হওয়ার ফলস্বরূপ ইউরোপীয় ভাষাগুলো দেশী ভাষাগুলোর পাশাপাশি ঠাঁই করে নিয়েছে এবং সেগুলোর কিছু কিছু যেমন ইংরেজি, ফরাসি ও পর্তুগিজকে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্যামেরুনের কথা প্রণিধানযোগ্য; দেশটি বহুজাতিক ও বহুভাষী; ইংরেজি ও ফরাসি সেখানে দাপ্তরিক ভাষা হলেও সে দেশে একটি লিঙ্গুয়া ফ্রাংকাও রয়েছে (ক্যামেরুন পিজিন ইংরেজি), আর তার সঙ্গে আছে প্রায় ৩০০ স্বদেশী ভাষা।
{ইন্টারসোল ইনকরপোরেটের গ্লোবাল অ্যাডভাইজার নিউজলেটার অনুযায়ী ক্যামেরুনে ২৮৬টি স্বদেশী ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে ২৭৯টি বর্তমানে জীবন্ত ভাষা এবং এ ভাষাগুলো ২৪টি প্রধান আফ্রিকি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত (http://www.intersolinc.com/ newsletters/africa.htm, ২০১১ সালের জুনের অন্তর্ভুক্তি)।}
আফ্রিকি সাহিত্যের সংজ্ঞা ও ভাষার নির্বাচন নিয়েও সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে ও সারস্বত মহলের লোকজনের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে: কোনো ইউরোপীয় ভাষায়, অর্থাৎ যেটি লেখকের মাতৃভাষা তো নয়ই বরং উপনিবেশ স্থাপনকারীদের ভাষা, সেটিতে লেখা নিয়ে আফ্রিকার সাহিত্যিকদের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ততা বিদ্যমান। কেনীয় লেখক নগুগি ওয়া থিওংও তার ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড গ্রন্থে বলছেন যে, আফ্রিকার সাহিত্য কেবল আফ্রিকার ভাষাতেই লেখা সম্ভব। তার বইয়ের গোড়ার দিকেই একটি বিবৃতিতে তিনি ইংরেজি ভাষাকে বিদায় জানান এবং এর পর থেকে গিকুইয়ু ও সোয়াহিলি ভাষায় লেখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু তার পরও তিনি ‘তরজমা বা অনুবাদের সুপ্রাচীন মাধ্যম’-এর সাহায্যে চলমান সংলাপের দরজাটি বন্ধ করে দেননি। সত্যি বলতে কি, অনুবাদ ‘যেকোনো দেশের ভেতর নানা জাতির মধ্যকার নানা সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপের সূত্রপাত করে এবং তার ফলে একটি সত্যিকারের জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতি, একটি সত্যিকারের জাতীয় সংবেদনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে!’
আরেকজন প্রখ্যাত লেখক চিনুয়া আচিবি বিশ্বাস করেন যে, আফ্রিকি সাহিত্য ইউরোপীয় ভাষার অ্যাডাপ্টেড বা রূপান্তরিত চেহারায় লেখা যেতে পারে। Morning Yet on Creation Days বইটির (১৯৬৪) একটি প্রবন্ধে আচিবি আফ্রিকার লেখকদের ইংরেজি ভাষায় লেখা উচিত কিনা সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন: ‘আমি উপলব্ধি করি যে, ইংরেজি ভাষা আমার আফ্রিকি অভিজ্ঞতা বহন করতে পারবে। কিন্তু এটাকে একটা নতুন ভাষা হতে হবে, যে ভাষার সঙ্গে তার আদি নিবাস বা উেসর এখনো পূর্ণ যোগাযোগ বা সংযোগ বহাল রাখার পরও তা নতুন আফ্রিকি পরিপার্শ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য রূপান্তরিত হয়েছে।’ নতুন নতুন সংস্থানের সাহায্য নিয়ে, ইংরেজি ভাষাকে এভাবে আফ্রিকার লেখকের কল্পনাকে রূপ দেয়ার জন্য পুনরাত্তীকৃত করা হয়েছে। আচিবি জাতীয় সাহিত্য এবং জাতিগত সাহিত্যের মধ্যে একটা পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। তিনি বলতে চান, ইংরেজির মতো ভাষায় লেখা সাহিত্য এ অর্থে জাতীয় যে, সেটি গোটা ভূখণ্ডেই বোধগম্য; অন্যদিকে জাতিগত সাহিত্য তা-ই, যা একটি স্বদেশী ভাষায় রচিত এবং তা ভূখণ্ডের মধ্যকার কেবল একটি জাতিগোষ্ঠীর কাছেই গ্রহণযোগ্য। এদিক থেকে দেখতে গেলে আফ্রিকার সাহিত্য হচ্ছে জাতীয় সাহিত্যগুলো এবং বিভিন্ন জাতিগত সাহিত্যের সমষ্টি, যাকে একটি ‘পরস্পরসংশ্লিষ্ট ইউনিট বা এককের দল’ বলা যেতে পারে।
ক্যামেরুনের লেখালেখি নিয়ে রিচার্ড বিয়র্নসনের গবেষণায় একটি বিষয় উঠে এসেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যেখানে ‘একটি বিদ্যমান সাংস্কৃতিক বা ভাষাতাত্ত্বিক সম্প্রদায় কিংবা গোষ্ঠীকে ভিত্তি করে দানা বেঁধেছিল’, সেখানে আফ্রিকার সব রাষ্ট্রই অসংখ্য ভাষাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর উত্তরাধিকার বহন করেছে। ফলে আফ্রিকার অসংখ্য মানুষ তাদের নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে গেছে এবং যে উদীয়মান দেশে তারা জন্মগ্রহণ করেছে, তার প্রতি তাদের মধ্যে প্রবল কোনো আনুগত্য বোধ সৃষ্টি হয়নি। তার পরও এসব ‘জাতিগতভাবে বহুত্ববাদী সমাজগুলোয়’— যেসব সমাজ ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দিক থেকে আরো বিভক্ত— জাতীয় পরিচয়ের একটি বোধের উন্মেষ ঘটতে শুরু করেছে, আর তার পেছনে মুদ্রণ সংস্কৃতির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ভাষা-সমস্যা, ‘সাহিত্যিক কণ্ঠের বাড়-বৃদ্ধি’ এবং ‘উদ্দেশ্যের খণ্ডায়ন’ সত্ত্বেও আফ্রিকার দেশগুলোর উদীয়মান সাহিত্যগুলোয় ‘অংশভাগী উল্লেখ সূত্র’র (shared reference points) প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। সে কারণে বিয়র্নসের কাছে, জাতীয় সাহিত্য হচ্ছে ‘আফ্রিকার সাহিত্যিক রচনার বৈচিত্র্য অনুধাবনের একটি বৈধ কাঠামো’ এমন একটি কাঠামো, যা তিনি একটি নির্দিষ্ট দেশ ক্যামেরুনের বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যিক রচনা খতিয়ে দেখার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
আগের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, ক্যামেরুনে পা দেয়া প্রথম মিশনারিরা আফ্রিকার ভাষাগুলোর বিকাশকে প্রাণিত করেছিলেন। একইভাবে লিখিত সাহিত্যের উদ্ভবেও তারা অবদান রেখেছিলেন। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জ্যামাইকান রেভারেন্ড জোসেফ মেরিক (১৮০৮-৪৯) লন্ডনের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির নেতৃত্বাধীন একটি ক্যামেরুন অভিযানে অংশ নেন। ১৮৪৪-৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘জুবিলি মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল ক্যামেরুন উপকূলে প্রথম সফল মিশন। মেরিক ‘ইসুবু’ ও দৌআলা (দুয়ালা) ভাষায় ‘নিউ টেস্টামেন্ট’ অনুবাদ করেন এবং তার নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি ছাপাখানা থেকে সেটি ছেপে বের করেন। তিনি ইসুবু ভাষায় নির্দেশনামূলক ব্যবহারবিধি এবং একটি দৌআলা-ইংরেজি শব্দ বা পরিভাষাকোষ রচনার কাজও শুরু করেছিলেন। মেরিকের অল্পকাল পরে আরেকজন ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি আলফ্রেড সাকের (১৮১৪-৮০) এসে পৌঁছেন এবং ক্যামেরুনে লিম্বে (Limbé) নামে একটি শহরের পত্তন করেন, যার আগের নাম ছিল ভিক্টোরিয়া। তিনি দৌয়ালা ভাষা নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন এবং তার অনূদিত বাইবেল প্রকাশ করেছিলেন: ১৯৬২ সালে ‘নিউ টেস্টামেন্ট’, ১৯৭২ সালে ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’। সাকের পরবর্তীকালে তার আক্ষরিক অনুবাদের জন্য সমালোচিত হলেও তার প্রকাশনাগুলো আফ্রিকি ভাষাগুলোয় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে প্রবল উৎসাহের সঞ্চার করেছিল।
ড. অ্যাডলফ ভিয়েলহাউয়ার (১৮৮০-১৯৫৯) নামে এক জর্মন মিশনারি ক্যামেরুনের আরেকটি ভাষা ‘মুঙ্গাকা’য় বাইবেল অনুবাদ করেন; একজন দেশী শিক্ষক ও ধর্ম প্রচারক এলিসা নদিফন (১৮৮৮-১৯৭১) তাকে এ কাজে সাহায্য করেছিলেন। আবার তাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিলেন আনা হুমেল, এলিজাবেথ বুহলার ও একদল দেশী মুঙ্গাকাবাসী। প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে ৩০ বছর সময় লেগেছিল: মুঙ্গাকা ভাষায় অনূদিত বাইবেল শেষ অবধি ভিয়েলহাউয়ারের মৃত্যুর দুই বছর পর ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। একজন অনুবাদক হিসেবে তার কাজ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু কথা বলেন, যা ইউজিন নিডার মতো তরজমাবিষয়ক পণ্ডিতের কথার সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘ক্যামেরুনের তৃণক্ষেত্রগুলোর পাঠকদের’ কাছে বাইবেলোক্ত সত্য গ্রহণযোগ্যভাবে তুলে ধরার জন্য তিনি কিছু পরিবেশগত আপসরফার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন, যেমন ‘নেকড়ে’র স্থানে ‘চিতা’ ও ‘ভল্লুক’ ব্যবহার করা এবং ‘সুরাবৃক্ষ’কে ‘দ্রাক্ষালতা’ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা। ভিয়েলহাউয়ার ইউরোপীয় সাহিত্য— প্রধানত বাইবেলসংক্রান্ত রচনা— অনুবাদের মাধ্যমে মুঙ্গাকা সাহিত্যের ভাঁড়ার কেবল সমৃদ্ধই করেননি, বাচিক সাহিত্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করার মাধ্যমে তিনি স্বদেশী ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, তার প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছেন। ১৯১০ সালে তিনি মুঙ্গাকা সংস্কৃতি থেকে আসা সুপরিচিত প্যারাবল ও প্রবাদের একটি সংকলন Tsu Mana (লোককথা) প্রকাশ করেন এবং তার মাধ্যমে ক্যামেরুনের জাতীয় সাহিত্যগুলোর অন্যতম প্রাণোচ্ছলতর জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি রচনা করেন।
(ক্রমশ)





