‘নিহত আহত বীরেরে মাড়ায়ে ছুটেছে রাজার রথ,
যুদ্ধ-ফেরত খঞ্জ পঙ্গু পালা পালা ছাড় পথ!
বন্ধু এমনই হয়
জনগণ হ’ল যুদ্ধে বিজয়ী, রাজার গাহিল জয়’
(কাজী নজরুল ইসলাম, কবিতা ‘রাজা-প্রজা’, কাব্য ‘সাম্যবাদী’)
খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হ্যাংলা-পাতলা নিথর একটা শরীরের ছবি আমাদের অনেকের কাছে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর দোসর রাজাকারদের নৃশংসতার ছবিগুলোর কথা ভাবলে ওই ছবিটা মন থেকে সরানো কঠিন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা জগতজ্যোতি দাস। একাত্তরে টেকেরঘাট সাবসেক্টরের বিশাল এলাকায় পাকিস্তান সেনাদের কাছে ত্রাস হয়ে ওঠা ‘দাস পার্টি’র নেতৃত্বে ছিলেন ২২ বছর বয়সের জগতজ্যোতি দাস। সিলেট ও সুনামগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তান সেনাদের খাদ্য ও অস্ত্র সরবরাহের লাইফলাইন নদীপথ ধ্বংস করে দেয়া ছিল দাস পার্টির মূল দায়িত্ব।
শুরুতেই বলে রাখা দরকার, ‘দাস পার্টির খোঁজে’ গ্রন্থটি ইতিহাসের কথা বলে। বলে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় সময়ের কথা। সেদিক দিয়ে ভাবলে এটি একটি মৌলিক ইতিহাসের বই, যা অত্যন্ত নিষ্ঠালব্ধ গবেষণার ফল। কিন্তু অন্যদিকে বইটি কেবল ইতিহাসের বর্ণনামাত্র নয়, বরং অজানা অচেনা বা প্রায় হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পথে লেখকের এক রোমাঞ্চকর যাত্রা, যে যাত্রায় পাঠককেও সঙ্গী হতে হয়। লেখক কি পারতেন না এ ইতিহাসকে কেবল রসকষহীন কিছু বাক্যের মাধ্যমে তৃতীয় পুরুষে বর্ণনা করতে? কিন্তু তা না করে চার দশকেরও বেশি সময় আগেকার পদচিহ্ন অনুসরণ করে লেখক হাঁটেন, নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন, সংগ্রহ করেন নানা চমকপ্রদ তথ্য। আর তখন পাঠকও তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটেন, চাঞ্চল্যকর তথ্যের মুখোমুখি হয়ে বিস্মিত হন। তাই সত্যি কথা বলতে কি, বইটি কেবল ইতিহাসভিত্তিক রচনা নয়, বর্তমান থেকে ইতিহাসে সফর শেষে আবারো বর্তমানে ফিরে আসার, চোখে আঙুল দিয়ে পরিণতির অসঙ্গতি ধরিয়ে দেয়ারও। বইয়ে বর্ণিত একাত্তরের আর বর্তমানের (২০১৫-১৭) ভিন্ন দুটো পরিস্থিতি বা কাহিনী সমান্তরালে এগিয়ে নেয়ার এটাই উদ্দেশ্য। কাজের প্রতি সততার কারণে লেখক দুই লক্ষ্যেই সফল হয়েছেন।
২০১৫ সালের শুরুর দিকে লেখকের গবেষণা শুরু হয়। দাস পার্টির সদস্য ও তাদের কাহিনী বা পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছতে তিনি প্রথম সালেহ চৌধুরীর শরণাপন্ন হন। জমিদার পরিবারের সন্তান হলেও একসময়ের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী এবং পরবর্তীকালে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক সালেহ চৌধুরীর, লেখকের ভাষায়, ‘ভরাট কণ্ঠে’ বলতে থাকেন যুদ্ধদিনের ইতিহাস।
ভাটি অঞ্চলের উত্তরে পাহাড় আর হাওড়-নদীর মাঝখানের দিরাইয়ের সন্তান সালেহ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে টেকেরঘাট সাবসেক্টরে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। এমনিতে অসহযোগ আন্দোলনের শুরু থেকে দিরাই-শাল্লা এলাকায় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। শেরপুর যুদ্ধের পর তিনি উত্তর সীমান্তে চলে গেলে ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট আবদুল লতিফ সর্দার, আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা আবদুল কুদ্দস ও ডাক বিভাগের কর্মী চান মিয়া কমিটির কাজ চালাতে থাকেন। থানা দখল, রাজাকারদের নিষ্ক্রিয় করাসহ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চলাচলের নৌপথ বন্ধ করা। নৌপথ বন্ধ করা কোনো সাধারণ দলের কাজ নয়, তাই সালেহ চৌধুরীর দাবিমতো বাছাই করা সাহসী ও বুদ্ধিমান কিছু ছেলেকে ভারী অস্ত্র ও নৌযান ধ্বংসের কলাকৌশলের প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয়। হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ এলাকার জলসুখা গ্রামের জগতজ্যোতি দাসের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দলটি দিরাই এসে পৌঁছে তখন। প্রশিক্ষণের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়ার আগে জগতজ্যোতি সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র ছিলেন। সেখানে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) সক্রিয় কর্মী। একাত্তরের আগস্টে অপারেশন শুরু করতেই তার নাম হয়ে যায় ‘টেরর দাস’, যিনি অদম্য আর অপ্রতিরোধ্য। তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়, জীবিত কিংবা মৃত। দাস পার্টির তত্ত্বাবধানে তখন নদী আর হাওড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রসদবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া, অস্ত্রবাহী লঞ্চ দখল আর রাজাকারদের নৌকা উড়িয়ে দেয়া চলতে থাকে। বিষয়টি এমন দাঁড়ায় যে, বেগতিক কর্তৃপক্ষ পাকিস্তান রেডিওতে ভৈরব থেকে শেরপুর হয়ে সুনামগঞ্জ নৌপথ বিপত্সংকুল বলে ঘোষণা দেন। জানিয়ে দেয়া হয়, নৌযান যেন ওই পথ এড়িয়ে চলে। কারণ বিপদ হলে সরকার দায়িত্ব নেবে না।
ঢাকাবাসী সালেহ চৌধুরীর কাছে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত দিরাই থানা আক্রমণ, জগন্নাথপুর থানা দখল ও জয়কলস রাজাকার ঘাঁটি উত্খাত, জগন্নাথপুর থানা আক্রমণ এবং আজমিরীগঞ্জ অপারেশনের সফল কয়েকটি কাহিনী শুনে লেখক দাস পার্টির ইতিবৃত্তের টানে সশরীরে সিলেট-সুনামগঞ্জের পথে রওনা হন।
দাস পার্টির সদস্য ছিলেন ৩৬ জন। জুলাইয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে সাবসেক্টর গঠন হলে জামালগঞ্জ থানা ও সাচনা বাজার আক্রমণের পরিকল্পনা হয়। সাচনা বাজার আক্রমণে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম। সিরাজ শহীদ হওয়ার আগে আগে বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন। সহযোদ্ধারা চিঠিটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠান। যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে সেই চিঠি পাঠ হতো সেখানে। চিঠির দুটো লাইন উল্লেখ না করলেই নয়, ‘...তাই যুদ্ধকেই পাথেয় হিসেবে নিলাম। ...যেকোনো সময়ে মৃত্যু হইতে পারে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত। দোয়া করিবেন যেন মৃত্যু হইলেও দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখবেন লাখ লাখ ছেলে বাংলার পুত্রহারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন।’ শহীদ হওয়ার পর সাচনা বাজারের নামকরণ হয় ‘সিরাজনগর’, কিন্তু পরে তা টিকে থাকেনি। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে নাম মুছে ফেলার এ রাজনীতির সঙ্গে আমরা পরিচিত। লেখক আরেকটু এগিয়ে দেখেন সিরাজের মৃত্যুবরণের স্থানে নামমাত্র সৌধ। জীবনের বিনিময়ে যিনি জামালগঞ্জকে স্বাধীন করেছিলেন, দেখেন তার সৌধে বাজার আর লুঙ্গি শুকাতে দেয়া। হতাশ লেখকের কলম থেকে তখন হয়তো বেরিয়ে না এসে পারেনি যে, ‘দালাল লাল মিয়া যেখানে ক্ষমতাসীন থাকে যুগের পর যুগ, সেখানে শহীদ সিরাজের স্মৃতিসৌধ এমন অবহেলায় থাকাই স্বাভাবিক।’ লেখকের পরপর দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা সিকন্দর আলী আর গেরিলা যোদ্ধা আলাউদ্দিনের সঙ্গে। সিকন্দর আলীর দায়িত্ব ছিল টার্গেট এলাকায় প্রথমে ঢুকে পাহারাদারকে নিষ্ক্রিয় বা হত্যা করা। তার ভাষায়, খালি হাতে জাতি সাপের ফনায় ধরা। ‘গুরুদায়িত্ব পালন করে কোনো পদক তো পেলেন না’ বলে লেখক তাকে উসকে দেন। তিনি স্পষ্ট উত্তর দেন, ‘যুদ্ধ শেষে ছাত্ররা চলে গেছে পড়ালেখা করতে, আমরা চলে আসছি হালচাষে আর আর্মির স্যারেরা পদক-টদক নিয়ে গেছেন নিজেরাই। আমাদের খবর কেউ রাখে নাই। কিন্তু যুদ্ধের সময় সব থেকে বিপদের কাজগুলা আমরাই করছি।’ আরো এগিয়ে গেরিলা যোদ্ধা আলাউদ্দিনের জরাজীর্ণ ছাপড়া ঘর আর শীর্ণ দেহ দেখেন লেখক। অবস্থা ভয়ানক খারাপ হলেও একাত্তরের সেই তেজ তার অবিকৃত আছে। দালাল লাল মিয়ার কর্মকাণ্ড, এমনকি তার ছেলেদের ১৬ ডিসেম্বরের পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠান নিয়ে ধারালো মন্তব্য করতে ছাড়েন না তিনি। বর্তমানের নিঃস্ব মানুষ প্রবল আত্মসম্মান নিয়ে লেখকের সামনে উপস্থিত হন। লেখক লেখেন, ‘যেন এক গেরিলা যোদ্ধা তার সমগ্র অহং নিয়ে আমার সামনে দণ্ডায়মান আর ১৬ কোটি নপুংসকের অকৃতজ্ঞতার গুরুভার কাঁধে নিয়ে আমি নতজানু তার কাছে।’
এরপর লেখক আরেক যোদ্ধার দেখা পান, তিনি মদরিস আলী। পাশাপাশি আটটা গ্রামে যেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়ত, তালিকাভুক্ত রাজাকার ছিল ১২০ জন, সেখানে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনি। সাহসী মদরিসের ব্যাপারে তাই আঞ্চলিক কথার প্রচলন হয়েছে, ‘ছয় কুড়ি দলালে এক মুক্তি’।
এ রকম আরো বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর কাহিনীর মধ্য দিয়ে লেখক এগিয়ে যান তার মূল লক্ষ্য জগতজ্যোতি দাসের গ্রাম জলসুখার দিকে। জলসুখার কাছে গিয়ে তার বর্ণনা হয়ে ওঠে কল্পকাহিনীর মতো। এখানে লেখকের রহস্যপ্রিয়তা আর গল্প বলার ধাঁচের পরিচয় পাওয়া যায়। জলসুখায় বসে জগতজ্যোতির কাহিনী শোনার জন্য আরো দূর থেকে তিনি নিয়ে আসেন ইলিয়াস চৌধুরীকে। ইলিয়াস ছিলেন জগতজ্যোতির সবচেয়ে আস্থাভাজন আর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা। ১৮-১৯ বছরের তরুণ ইলিয়াস জগতজ্যোতির সঙ্গেই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছিলেন আর জীবনের শেষ যুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধে তার সহচর ছিলেন। এ পর্যায়ে ইলিয়াস আসতেই পাঠক দাস পার্টির কাহিনীতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। বালাট সীমান্ত তখন কয়েক লাখ শরণার্থীর আশ্রয় কেন্দ্র। কলেরার প্রাদুর্ভাবে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও বিরোধী দলের একমাত্র নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেখানে তখন উপস্থিত, তবু পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তারই মধ্যে আরেক উপদ্রব হয়ে ওঠে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর অত্যাচার। রাজনৈতিক কারণে তারা ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধী, তাই কয়েক লাখ বাঙালি শরণার্থী তাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অসহায় শরণার্থীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়া থেকে শুরু করে তাদের ধমকাধমকি বা নির্যাতন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু জগতজ্যোতি দাস কয়েকজন তরুণকে নিয়ে যে দল গঠন করেন, একবার সেই দলের পাল্টা আক্রমণের শিকার হলেই খাসিয়াদের অত্যাচারের সমাপ্তি হয়। ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত, একাধিক ভাষায় দক্ষতা, সুনামগঞ্জের প্রতিরোধযুদ্ধে ট্রেজারি ভেঙে রাইফেল লুট করে আনা— এসব গুণের কারণে জগতজ্যোতির জনপ্রিয়তা পেতে সময় লাগে না। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ৩৬ জনের প্রশিক্ষিত গেরিলা ‘দাস পার্টি’ জোয়াই-শিলং-চেরাপুঞ্জি-বালাট হয়ে টেকেরঘাট সাবসেক্টরে সংযুক্ত হয়। তাদের সামরিক পরামর্শক থাকেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর ভাট ও ক্যাপ্টেন ভার্মা। দাস পার্টির অপারেশনের কাহিনীর কাছাকাছি পর্যন্ত যেতে পারার উত্তেজনায় লেখকের বর্ণনা আরো কাব্যিক হয়ে ওঠে, ‘পুব আকাশে তখন সন্ধ্যাতারা। টমটম নিয়ে কাকাইলছেও পৌঁছতে পৌঁছতে আকাশজুড়ে লক্ষ তারার হীরে; একজন ১৮ বছরের গেরিলা এখন ৬৫ বছরের প্রৌঢ়— তাদের যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতির গল্প শুনতে শুনতে আকাশপানে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যাতারা শুকতারা হয়ে গেছে, সরু চাঁদ অনেকটাই পশ্চিমে।’
অবিস্মরণীয় ১৬ নভেম্বরের কাহিনী। ৪২ জনের দল নিয়ে দাস পার্টি যাত্রা করেছিল খালিয়াজুড়ীর কল্যাণপুর থেকে। আজমিরীগঞ্জ পেরিয়ে বাহুবল গিয়ে বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংস করা ছিল তাদের মূল অপারেশন। বদলপুর থেকে মাইলখানেক আগে তারা দেখেন, রাজাকাররা জেলেদের নৌকা আটকে চাঁদা তুলছে। এক জেলে ইলিয়াসকে অনুরোধ করেন তাদের বাঁচাতে। দাস পার্টি রাজাকারদের আক্রমণ করলে তারা নৌকা নিয়ে পালাতে থাকে। জগতজ্যোতি বাকিদের অপেক্ষা করতে বলে ১২ জনকে নিয়ে রাজাকারদের নৌকা তাড়া করেন। কিন্তু যেতে যেতে একসময় চাইনিজ রাইফেলের আওয়াজ শুনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উপস্থিতির কথা বুঝতে পারেন। বিলের কাছে গিয়ে দেখেন, দুদিক থেকে গানবোট নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঘিরে ফেলেছে। দাস পার্টি যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার, তা বুঝতে সময় লাগে না। সামান্য দূরত্ব থেকে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। পেছনে বাকি যোদ্ধাদের রেখে সামনের সারিতে ইলিয়াস ও জগতজ্যোতি লড়াই করেন। আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে সময় কাটে। ওদিকে বদলপুরে তাদের দলের বাকিরা যেন এদিকে আসতে না পারে, তাই সেখানেও পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করে। এদিকে বেলা বাড়তে বাড়তে বিলের প্রান্তে দুদিকে ঘিরে রাখা পাকিস্তানি বাহিনীর মাঝখানে তাদের গুলি ফুরাতে থাকে। তারই মধ্যে ইলিয়াসের বুকের বাম পাশে হঠাৎ গুলি লাগে। অদ্ভুত আবেগহীন যোদ্ধা তখন নিজের আঙুল দিয়ে গুলির ক্ষত পরীক্ষা করে দেখেন, নাহ্, গুলি হূিপণ্ড ভেদ করেনি! গামছা দিয়ে তাকে বেঁধে দিতে দিতে জ্যোতি জানতে চান, ‘বাঁচবি?’ ইলিয়াস জবাব দেন, ‘বাঁচতে পারি।’ জ্যোতি বলেন, ‘তাহলে যুদ্ধ কর।’
পেছনের সারিতে একে একে সবাই হাওয়া হয়ে যায়। এমনকি জগতজ্যোতির এলএমজিতে গুলি সরবরাহ করারও কেউ থাকে না। প্রায় শীতকালের ক্ষণস্থায়ী সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে তারা আশার আলো দেখেন, ভাবেন, পুরোপুরি অন্ধকার হলেই পালিয়ে যাওয়া যাবে, ততক্ষণ লড়তে পারলেই হলো। কিন্তু ওইটুকু সময় আর আগায় না, তার আগেই জগতজ্যোতির মাথায় বুলেট এসে লাগে। তার মুখ দিয়ে শুধু একটা বাক্য বেরিয়ে আসে, ‘আমি যাইগ্যা।’ ইলিয়াসের বর্ণনার ঘোরে পাঠক চোখের সামনে দেখতে পাবে, যেন তিনি পানিতে নেমে গেছেন, যেন সত্যিই পানির মধ্যে যন্ত্রণায় ছটফট করা জগতজ্যোতির শরীরটা দেখতে পাচ্ছেন তখনো, প্রায় ৪৪ বছর পর! হয়তো বা এত বছর পর শূন্যে জ্যোতির দেহ জড়িয়ে ধরতে চান, কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি জড়ায়ে ধরি তারে, দাদা, ও দাদা। আমার দাদা একবার মাথা তুলে, মাথা পড়ে যায়। নাই, আমার দাদা নাই...’ লেখকও সেখানে নিজস্ব উপলব্ধির কথা বলেন, ‘সেদিন হয়তো ইলিয়াস কাঁদতে পারেননি, কাঁদার সুযোগ ছিল না যোদ্ধার। আজ ৪৩ বছর পর স্বাধীন মাটিতে ইলিয়াস কাঁদেন, চিত্কার করে কাঁদেন তার দাদার জন্য, তার কমান্ডারের জন্য।’
ইলিয়াস তার কমান্ডারের শরীর বিলের কাদা পানির মধ্যে পুঁতে ফেলেন, যেন শত্রুর হাতে তার অবমাননা না হয়। নিজের এলএমজির সঙ্গে হাতে তুলে নেন দলনেতার এলএমজি। দলের কাছে ফিরে এলে ইলিয়াসের হাতে জ্যোতির এলএমজি দেখেই কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে, দলনেতা আর নেই। কিন্তু যুদ্ধের মাঠে শোকগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে আত্মরক্ষা জরুরি, এ শিক্ষা গণযোদ্ধাদের ছিল। ফিরতি পথে আরো এক সহযোদ্ধা গোপেন্দ্র দাসের লাশ তারা হাওড়ের পানিতে ফেলে দেয়। লেখকের ভাষায়, ‘এটাই যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই অস্বাভাবিকতা। ইলিয়াস তার দাদার লাশটা না আনলেও এলএমজিটা এনেছিলেন। এটাই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ।’
পরে জগতজ্যোতি দাসের লাশ টেনেহিঁচড়ে এনেছিল রাজাকাররা। এনেছিল তার মা-বাবাকেও। নির্ভীক সন্তানের অসামান্য সাহসী মা তখন বলেছিলেন, এ লাশ তার ছেলের নয়, জ্যোতির বাম হাতে একটা আঙুল বেশি। লেখকের মনে তো প্রশ্ন এসেছেই, পাঠকের মনেও নিশ্চয় এ দৃশ্য ভাবলে প্রশ্ন আসবে, গ্রামের সাধারণ এক মানুষ, জ্যোতির মা কী করে ওই পরিস্থিতিতে এতটা সাহস দেখাতে পারলেন? তিনি কি তার বেঁচে থাকা অন্য সন্তান বা স্বামীর কথা ভাবছিলেন?
বাড়ি ফিরে তারা দেখেছিলেন, বাড়িতে আগুন। তারপর অসামান্য বীর মৃত্যু পর্যন্ত লড়ে যাওয়া জগতজ্যোতির লাশ জলসুখা থেকে আজমিরীগঞ্জে পাশবিক উল্লাসে প্রদর্শন করে রাজাকাররা। শেষে আজমিরীগঞ্জ বাজারের মধ্যখানে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। বাজারে আসা মানুষ যেন দেখতে পায়, যেন দেখে একজন দুষ্কৃতকারী, ভারতীয় দালালের ক্ষতবিক্ষত লাশ।
জগতজ্যোতির কাহিনী জানার পথে লেখকের পরিচয় হয় আরো বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। সহযোদ্ধারা একই ঘটনা নিজ নিজ বয়ানে, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা করেন। সেখানে একই ঘটনার বর্ণনা নানাজনের ভাষায় বারবার আসে। যে যা বলেছেন, লেখক যথাসম্ভব তা সেভাবেই রাখতে চেষ্টা করেছেন, পুনরাবৃত্তি নিয়ে ভাবেননি। বইয়ে এ বিষয়টি বিরক্তির পরিবর্তে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের ছাপ নিয়ে আবির্ভূত হয়; যেন একের বর্ণনায় অন্যে সাক্ষী দেয়। পাঠকও ভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ঘটনাকে ভিন্ন বর্ণনায় আবিষ্কার করেন আর তারপর টুকরো টুকরো ছবি নিজের মনে মিলিয়ে বড় চিত্র তৈরি করে নেন। একাত্তরের সমগ্র চিত্র। এছাড়া জগতজ্যোতি বা দাস পার্টি ছাড়িয়েও চলতি পথে কিছু গণহত্যার স্থান লেখকের সামনে পড়ে যায়। সেসব জায়গায় প্রত্যক্ষদর্শী মানুষ গণহত্যার বীভৎস বর্ণনা দেন। ধর্ষণের হূদয়বিদারক কাহিনী শোনান ধর্ষিত নারীরা। মানুষের সামনে মানুষকে মেরে ফেলে কাঁদতে পর্যন্ত দেয়নি পাকিস্তানি সেনারা, জীবিতদের দিয়ে লাশ ভাসানোর কাজ করিয়েছে, কোথাও প্রিয়জনের লাশের পাশেই ধর্ষণ করেছে। সাদা শাড়ি পরিহিতা এক বৃদ্ধা নিজেই এগিয়ে এসে লেখককে নিজের কথা বলেন। লেখকের বর্ণনায়, ‘তার শরীর কাঁপে কিন্তু কণ্ঠ কাঁপে না। ছেলের বয়স আট, তাকে মেরে ফেলল দায়ের কোপে। কোলে ছিল দুই বছরের মেয়ে, টান দিয়ে নিয়ে আছাড় মেরে শেষ করে দিল, স্বামীর বুকে গুলি— অনবরত রক্ত ঝরছে, সেই রক্তের ওপর দিয়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে...’ এরপর লেখকের কলম থেমে যায়। পরে অবশ্য কোনো রকমে ভাবতে পারেন, ‘কেন এলাম এসব ভয়ঙ্কর সত্য জানার জন্য?’ লেখকের শোনা গণহত্যার বর্ণনা কল্পকাহিনীর ভয়াবহতম দৃশ্যকেও হার মানায়। কারণ যুদ্ধ নিশ্চয় তার থেকে ভয়াবহ, তার থেকেও নিষ্ঠুর। লেখকের ভাষায়, ‘এমন কোনো পরিবার নেই, যেখানে শহীদ নেই! একাত্তর এরা ভুলবে কী করে?’ আমাদের সমাজে ধর্ষিত নারীরা প্রত্যেকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পাননি, এটুকু সম্পর্কে আমরা অবগত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা তার থেকেও কঠিন। কুলসুম বিবি নামে এক নারী ব্রজেন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু মাঝিকে শরীরে গুলি লাগা অবস্থায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। ‘মালাউনকে’ আশ্রয় দেয়ার অপরাধে রাজাকারের দল তার স্বামীকে হত্যার পর তাকে ধর্ষণ করে। সাহসী কুলসুম স্বামী হত্যাকারী আর নিজের ধর্ষণকারীদের নাম প্রকাশ্যে বলেন। তারা সবাই তখন ছিল রাজাকার দলের সদস্য।
এবারে আসি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে। মৃত্যুবরণের পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে উপযুক্ত খেতাব ছাড়া সরাসরি দেয়ার মতো আর কিছুই থাকে না। লেখকের ভাষায়, ‘সেই যুদ্ধদিনের মাঝে নিশ্চয় বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক— এসব বিভাজন হয়নি। আমরা জানি, এগুলো আরো পরের ঘটনা, ১৯৭৩-এর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জগতজ্যোতির মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল খুব গুরুত্ব দিয়ে এবং বলা হয়েছিল, সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেবে।
এ ঘোষণা কি শুনেছিলেন কেউ?
সালেহ চৌধুরী বলেছেন, তিনি শুনেছেন। ইলিয়াস, কাইয়ুমও বলেছেন। ভাটি এলাকার সে সময়ের সব মানুষই জানেন, জগতজ্যোতিকে সর্বোচ্চ পদক দেয়ার কথা হয়েছিল। ...জগতজ্যোতিকে একেবারে পদকবিহীন রাখা হয়নি। তাকে তৃতীয় ধাপের বীর বিক্রম প্রদান করা হয়েছে। ...মনে পড়া ঠিক অপ্রাসঙ্গিক নয়, মেজর এসএইচএমবি নূর চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি, একাত্তরে প্রধান সেনাপতির এডিসি ছিল, যা মূলত অফিসিয়াল পদ, এ পদে থেকে তাকে সত্যিকারের কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি, সেও বীর বিক্রম খেতাবে সম্মানিত।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ ফলাফল তারাই ভোগ করতে পারেননি, যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। রাজনীতির উত্থান-পতনে তারা মৃত হলে হয়েছেন বিস্মৃত আর জীবিত থাকলে নিগৃহীত। সেই সুযোগে উত্থান ঘটেছে ঘাতক আর মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের, পাকিস্তান সেনাদের টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে যারা কাজ করছিল। লেখকের সফরের অভিজ্ঞতায় ওই অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ দেশের নমুনা হিসেবে ক্রমাগত তারই প্রমাণ দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক উপাখ্যান হিসেবে ‘দাস পার্টির খোঁজে’ একই সঙ্গে বীরোচিত যুদ্ধবিষয়ক একটি আনন্দদায়ক অন্যদিকে বেদনায় কাতর হওয়ার মতো পাঠ। এ বেদনাকে অস্বীকার করা যায় না, এ জানাকে এড়ানো যায় না।
যে কথা না বললেই নয়, সম্পাদনায় পরবর্তীকালে আরেকটু নজর দিলে বইটি আরো সুচারুভাবে উপস্থাপিত হতে পারে; বিশেষ করে প্রথম দুই-তৃতীয়াংশ। যেহেতু কল্পকাহিনীর ধাঁচে লেখা, কিছু ক্ষেত্রে শব্দ বা বাক্যের এলিয়ে পড়া লক্ষ করা যায়। তাই বাক্যের গঠন প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে লিখিত বাক্যের গঠনের উপযুক্ত হওয়ার দাবি রাখে। আরেকটি বিষয়, যে যোদ্ধাদের সাক্ষাত্কার নেয়া হয়েছে, বইয়ে যুদ্ধের ক্ষেত্রসহ তাদের নামের একটি পরিপূর্ণ তালিকা সংযোজন করলে পাঠক উপকৃত হবে। তাতে বিক্ষিপ্তভাবে লিখিত বক্তব্যগুলোকে ধারাবাহিকভাবে ভেবে নেয়া পাঠকের জন্য আরো সহজ হবে। পরবর্তী মুদ্রণে বিষয়গুলোর প্রতি লেখক যত্নবান হবেন বলে আশা রাখি।
অত্যন্ত হতাশার বিষয়, বইটির প্রায় শেষ পাতায় এসে জানা যায়, ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ— সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস’ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত এ ইতিহাসের ‘সেক্টর-৩’-এর ২৪২ পৃষ্ঠায় জগতজ্যোতি দাসের শেষ যুদ্ধের বর্ণনায় লেখা হয়েছে, জ্যোতি একাধারে ৮ ঘণ্টা যুদ্ধ করে টিকতে না পেরে নিজের গুলিতে নিজে শহীদ হন। পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণাই তার এ ধরনের আত্মহত্যার কারণ’।
এ বর্ণনাটুকু পড়লে জগতজ্যোতি দাসের শেষ যুদ্ধের সহযোদ্ধা ‘মাথা গরম’ ইলিয়াস চৌধুরীর কতটা ক্রোধ হয়, পাঠক হিসেবে তা আন্দাজ করার চেষ্টা করি। তবে এতদিনে আমরা জেনেছি, যে যখন ক্ষমতায় ইতিহাস যেন তার সম্পত্তি; নিজের সুবিধামতো একই ইতিহাসকে যার যার মতো করে সাজানোর এ মহোৎসবে ইতিহাস আজ ইতি পর্যন্ত হাসার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অতীত নিয়ে বিভ্রান্তির এ আখড়ায় ‘দাস পার্টির খোঁজে’ বইটি গবেষণার শুদ্ধতার কারণে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।






