এবারের মেলায় উপন্যাসের চেয়ে গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে বেশি! (তথ্যটি কতখানি সত্যি!)। তার মানে কি চিত্র উল্টে যাচ্ছে? বেশির ভাগ প্রকাশক যেখানে গল্পের বই শুনলেই চুপসে যান, গল্প সংকলন কেন চলে না তার একশ একটা কারণ বলতে শুরু করেন, সেখানে ২০১৮ সালে কি এমন হলো যে উপন্যাসকে ছাড়িয়ে গেল গল্পের বই? একটা সহজ উত্তরই আমি খুঁজে নিই— বড় দমের কথাসাহিত্যিক কমছে, স্বল্প দমে গল্প লেখাই শ্রেয়তর মানছেন অনেকে, তাই যদি হয় তার মধ্যে থেকে আমি সত্যিকার কয়টি বই পাঠ পর্ব শেষে আমার শেলফে রাখতে পারলাম? বেশি নয়, হাতেগোনা, সাকল্যে দু-তিনটি বইয়ের বেশি তো নয়! এত বইয়ের ভিড়ে মাত্র গুটিকয় বই? প্রশ্নটা আমারই করা আর এর উত্তরটা পেতেও খুব একটা দেরি হলো না।
আগেই আমার খোঁজখবরের সীমা গোটা দশেক বইয়ের মধ্যেই নামিয়ে এনেছিলাম, নানাবিধ যাচাইবাছাইয়ের পর এবং এর মধ্যে সর্বাগ্রে হাতে নিয়েছিলাম ক্রাউন সাইজের ক্ষীণকায় একটা বই, দ্রুত পড়ে শেষ করা যাবে এ আশায় (আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, সেটা একটু পরই স্পষ্ট হবে)।
ক্ষীণদেহী এ বইয়ের গল্পকারের নাম সুমন রহমান। এর আগে এ লেখকের আরেকটি বই আমি পড়েছিলাম, নাম ‘গরিবি অমরতা’। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল সম্ভবত ২০০৮ সালে, কিন্তু আমি পড়ি আরো অনেক পরে। তখন আমি প্রথম আলোয়। সহকর্মীদের অনেকেই আমার কাছে তাকে ভয়ানক এক ব্যাঘ্রশাবক হিসেবে বর্ণনা করলেন এবং সাবধান করলেন, সমঝে চলো! এতে বরং সেদিন হিতে বিপরীতই হয়েছিল। কারণ আমি উল্টো এ ভদ্রলোক সম্পর্কে আরো জোরেশোরে খোঁজখবর শুরু করলাম, তখন তিনি সম্ভবত অস্ট্রেলিয়াবাসী। আর তখনই আমার হাতে এল ‘গরিবি অমরতা’ নামে ক্ষীণকায় বইটি, (এখনও খুব ভালোভাবেই স্মরণ করতে পারি), বইটি পড়ে আমি অন্য এক ব্যাঘ্রকে আবিষ্কার করেছিলাম, এবং একটু বিস্ময়ও মানি, গরিবি অমরতার লেখকের এমন গরিবি হাল কেন? তার আর লেখা নেই কেন? এ প্রশ্নের জবাব আমার কাছে আজ অব্দি নেই। খোঁজখবরের ওই একই সময়ে তার কবি পরিচয়ের খবর জেনেও হোঁচট খেয়েছিলাম! সেখানেও দেখি মহাআকাল চলছে! (এবং যথারীতি সেই আকাল এখনো চলছে)। তবে গরিবি অমরতা পড়েই তাকে সঠিকার্থে সমঝে চলার কারণটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এবং আজো আমি দ্বিতীয়বারের উপলব্ধি থেকে বলছি, তিনি লেখালেখিতে সচল থাকলে আমি মনে করি, আরো অনেক দিনই তাকে সমঝেই চলতে হবে।
ওই যে শুরুতে বললাম না, গুটিকয় বই হাতে নিয়ে বসে আছি (অথচ এবারই গল্প সংকলনে মেলা ছিল সরগরম, কিন্তু আমার তাতে কোনো লাভ হয়নি।) আমার পাঠ-ক্ষুধা তাতে নিবৃত তো হয়ইনি, উল্টো এখন অপূর্ণতায় বিরক্তি লাগছে— আর এসব কিছুর জন্য দায়ী ওই ‘সমঝে’ চলোর ব্যক্তিটিই। এবারের মেলায় তার একটিই গল্পের বই বের হয়েছে, সবেধন নীলমণি, নাম ‘নিরপরাধ ঘুম’ এবং বলেছি আগেই এ বইটি আমি প্রথম পড়া শুরু করেছিলাম, সর্বনাশটি হয়েছে ওখানেই, তিনি এখানেও ওই শ্রেষ্ঠত্বের হুঙ্কারই দিচ্ছেন। ফলে নিরপরাধ ঘুম আমাকে পরিণত করেছে অপরাধীতে, ওই বই পাঠের পর আমি অন্য যে বই-ই ধরছি, তাতে বিরাট গোলই বেধেছে কেবল। কোনো বই নিয়েই বেশি দূর এগোনো যায়নি, যতই মাথা থেকে নিরপরাধ ঘুম ও তার গল্পগুলো আমি দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করি না কেন, কিছুদূর পড়ার পরই তুলনাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলেই আসছে, এবং এতেই বাকি বইগুলো আমাকে পরিত্যাগ করছে মানে মানে করে, আমি মেঠো, প্রতিবাদী, বহু কারিকুরির পত্র-গল্প, পুনরুজ্জীবিত গল্প, নতুন নতুন কল্পগল্প— এ রকম নানা সাধের গল্পের কোনোটাতেই আটকে থাকতে পারছি না...
কেন, তার কিছু সংক্ষিপ্ত ময়নাতদন্ত এ রকম হতে পারে:
এক.
নিরপরাধ ঘুমের রাশেদ আমার সামনে বার বার আইসা দাঁড়াইতেছে, মায়ের সঙ্গে কারেন্টহীন হ্যারিকেনের আলোয় তার কথোপকথন শুনতে পাই চোখ বুজলেও। বই বন্ধ রাইখা আমি টের পাই, আমার বুক থম ধইরা আসতেছে, নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসতেছে... অনেক রাশেদকে দেখি আমি চারপাশে, ভিড় করে এসে দাঁড়াইতেছে। যেন তারা আমার ঘাড়ে একেক জন নিঃশ্বাস ফেলতেছে।
ভয়ে আমার কলজে আছাড়িপিছাড়ি করে। বুঝি, এই ভয় কোনো হরর গল্প পড়ার ভয় নয়, এই ভয় নিখোঁজ হওয়ার।
কবে কারো বই পড়ে এমন অনুভূতি হয়েছে? মনে করতে পারি না।
তাই নিরপরাধ ঘুমের এই শক্তিমান কথককে তো সমঝে চলতেই হবে!
দুই.
পত্রিকার পাতায় রোহিঙ্গাদের জীর্ণশীর্ণ মুখ সুমন রহমানের রোহিঙ্গা উপকথারই সব মুখ যেন। সেই রখইঙ্গ রাজের সময়কার আলাউলকে দেখি তাদের ভিড়ে, দেখি ৩০০ বছরের ঘটনাপ্রবাহ এক লহমায় চোখের সামনে ফুইটা উঠতেছে... পলায়নরত রোহিঙ্গা কিশোরকে নিয়ে ছুটে চলা ট্রাক মুহূর্তেই মনে করিয়ে দেয় এক পর্তুগিজ ডাকাততরীর উত্তাল সাগরে ভেসে চলার স্মৃতিকে, যা থেকে বেঁচে যাওয়া আলাউলের গন্তব্য হবে মুলুক ফতেহাবাদের দিকে, যে আলাউল পরে বাংলা মহাকাব্যের এক অমর পুরুষ।
চিন্তার জালের এ পরিব্যপ্তির জন্যই এইখানে, রোহিঙ্গা উপকথা এক অফুরান আখ্যান। তাই এ কথা হলফ করে বলতে পারি এ গল্প শেষে পাঠকের মনে হতে পারে, সে গল্প পড়ল না, না কোনো উপন্যাস? অতি ক্ষুদ্রায়তনে বলা হয়েছে বিশাল পরিসরের এক গল্প। এটা খামতি না সঙ্গতি, তা পাঠক বিবেচনার জন্যই রেখে দিলাম, সব রায় না দিয়ে!
এখন এই দু-তিনটে বিবেচনাতেই শুধু নিরপরাধ ঘুম অনন্য এক গল্পগ্রন্থ, তা-ও নয়।
দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশিত এ বইয়ের পাতায় পাতায় আছে ধারালো, মেদহীন আর ছোট ছোট বাক্যের বিন্যাসে অতি বিশ্বস্ত চিত্র-চিত্রণের অনন্য এক খেলা। আমার মতো অসংখ্য পাঠক, বাজি ধরে বলতে পারি এ বই পাঠে জাদুগ্রস্তের ঘোরাক্রান্ত হবেন। এই ঘোরের অবমুক্তি ঘটবে সুপারহিরো পরিবারের একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন গল্প পাঠের বিহ্বলতা দিয়ে।
তাই আমার কাছে লেখক সুমন রহমান এই সময়, সমাজ বাস্তবতা নিয়ে অতি স্পর্শকাতর এক লেখক। এ কারণেই বিহ্বলতা দিয়ে যে বইয়ের পাঠ সমাপ্তি ঘটবে, সেই বইয়েই নিরপরাধ ঘুমের আতঙ্ক কাটিয়েই আমার মতো পাঠককে হাসতে হবে বাস্তবের (কিঞ্চিৎ ভিন্ন পরিচয়ে, হাশেম বিন আবদুল্লাহ) যুগান্তকারী লেখক কাশেম বিন আবু বকরের আবির্ভাবে, হাজার হাজার বইয়ের মারকাটারি লেখক তিনি। তার নায়িকারা নীল খামে এই যুগেও চিঠি লিখে... কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই গল্প শুধু কাশেম বিন আবু বকরের গল্প না। নীল হিজাব পরা এক নারীর বারংবার জন্ম নেয়ার গল্প। প্রেমের গল্পের লেখক কাশেম বিন আবু বকর যেমন নতুনভাবে হাজির হয়েছেন নতুন এক সমাজ বাস্তবতায়— যখন চারদিকে জঙ্গি উত্থানের সরগরম প্রচারণা, নারীর মাথায় উঠছে নীল হিজাব— তখন গোয়েন্দা কাহিনীর মতো ঘটনাপ্রবাহের গতি থাকলেও নীল হিজাব কোনো গোয়েন্দা বা থ্রিলার গল্পও নয়, নীল হিজাব বরং আমাদের রুচির আঁচল উন্মুক্ত করে দেয়া এক গল্প, আমার বিবেচনায়।
শেষে পাঠকের উদ্দেশে আমার একখান পরামর্শ: হাবা যুবকের হাসি— এ গল্পটি সতর্ক হয়ে পড়বেন। আগেই সতর্ক করছি সুমন রহমান আপনাকে এক মহাপরীক্ষার মুখোমুখি করতে যাচ্ছেন। এই গল্পে র্যাবো হাজির নতুন গদ্যভাষায় কবিতা থেকে মুক্তকচ্ছ হয়ে। কিন্তু পাঠক আপনি হুমড়ি খাবেনই, কে র্যাবো, কে কবি সুমন রহমান আর কে মাহাদি? আপনিই যাচাই করুন।
শুধু জিজ্ঞাসা রেখে যাই, মাহাদির জন্য কার এ অনন্ত হাহাকার, কথকের না প্রটাগনিস্টের? কিংবা ছদ্মবেশী প্রটাগনিস্ট, কে?
গল্পের শক্তি কত গভীর, তার উজ্জ্বল নমুনা সুপারহিরো পরিবারের একটা খুব অর্ডিনারি পাতা ঝরা দিন— এ গল্প পড়ে আমি স্থবির হয়ে যাই। লেখক সুমন রহমান নিষ্ঠুর। তাই আবার মনে করিয়ে দেই, তাকে সমঝে চলাই শ্রেয়।





