পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবাসস্থল। সেখানে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের বৈচিত্র্য। আফগান সীমান্তে অবস্থানের পাশাপাশি একদিকে পাঞ্জাব থাকার কারণে এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির মানুষ একত্রিত হয়েছে। তাছাড়া অখণ্ড ভারতবর্ষে খাইবার পাখতুনখাওয়াকে ভারতের প্রবেশদ্বার বলা হতো। আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে বাবর, নাদির, আবদালি—সবাই খাইবার গিরিপথ পার করে খাইবার পাখতুনখাওয়া হয়ে ভারতে ঢুকেছিলেন। ফলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ তথা খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নানা দেশ ও জাতির মানুষের আগমন হয়েছিল। যেহেতু এ অঞ্চলের প্রধান শহর পেশোয়ার, সেখানে গড়ে উঠেছিল তাদের বসতি ও বাণিজ্য কেন্দ্র। মধ্য এশিয়া থেকে আসা সূর্য উপাসক, ইহুদি, পাঞ্জাবের শিখ, আফগানিস্তানের পাঠান—সবারই ঘর হয়ে উঠেছিল পেশোয়ার।
পেশোয়ারে ইহুদিদের বসতি ছিল বললে অনেকে আশ্চর্যান্বিত হবেন, কিন্তু এটি কোনো কথার কথা নয় বরং ইতিহাস। মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের ইহুদিরা পেশোয়ারে বসতি তৈরি করেছিল। ইতিহাসবিদ নওয়াজ খানের মতে, পেশোয়ারের ক্লক টাওয়ারের কাছে থাকা সিনাগগের অবশেষ পেশোয়ারে ইহুদি বসতির সাক্ষ্য দেয়। পেশোয়ারের পাঠানদের সঙ্গে ইহুদিদের যোগসূত্র নিয়ে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। ১৮৫৫ সালে ইসিদোর লোয়েন্থাল নামে এক ইহুদি মিশনারি পেশোয়ারে এসেছিলেন। হিব্রুতে তার বিশেষ দখল ছিল এবং পেশোয়ারে এসে শিখেছিলেন পশতু। তার ধর্ম প্রচার ও অন্যান্য কারণে পেশোয়ারে ইহুদি সংস্কৃতি প্রসারিত হয়। এমনকি অনেকে পশতুর সঙ্গে হিব্রু ভাষার মিল লক্ষ করেন। এর পাশাপাশি পেশোয়ারে প্রচলিত নানা লোকগল্পের মূল উৎস ওল্ড টেস্টামেন্ট।
এনসাইক্লোপিডিয়া জুডিকায়ও খাইবার অঞ্চলে ইহুদি বসতি সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। মধ্যযুগের অনেক সাহিত্য ও স্মৃতিকথায় আফগানিস্তানে ইহুদিদের বেশকিছু বাণিজ্যকেন্দ্রের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে বলখ অন্যতম। ইসলামী নানা সূত্র থেকে পাওয়া যায়, গজনিতে একটি ইহুদি সম্প্রদায় ছিল এবং তারা দশম ও একাদশ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানের এ ইহুদি পরিবারের মধ্যে কেউ কেউ খাইবার পেরিয়ে পেশোয়ারে এসে তাদের বাণিজ্য বিস্তার করেছিলেন।
র্যাচেল খাফি জানাচ্ছেন, তার দাদা বেঞ্জামিন খাফি পরিবার নিয়ে আফগানিস্তানে বসবাস করতেন। তার পরিবার বড় হওয়ার কারণে আয় বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কার্পেটের ব্যবসা সে সময় ভালো চলছিল না বলে বেঞ্জামিন পাকিস্তানে আসার কথা ভাবেন। পরিবারকে রেখে পাকিস্তানে এসেছিলেন তিনি ভাগ্যান্বেষণে এবং পাকিস্তানে এসে তার ঠিকানা হয়েছিল পেশোয়ার। সেখানে বেঞ্জামিন তার ব্যবসা বাড়িয়েছিলেন এবং পেশোয়ারের তত্কালীন প্রশাসকের সুদৃষ্টি লাভ করেন। র্যাচেলের বক্তব্য অনুসারে একসময় তার দাদার সাফল্য পেশোয়ারের মানুষের ঈর্ষার কারণ হয়। তারা বেঞ্জামিনকে হত্যার চেষ্টা করলে পেশোয়ারের প্রশাসকই তাকে সে খবর দেন এবং বেঞ্জামিন কেবল নিজের নয়, অন্যান্য ইহুদির প্রাণও বাঁচিয়েছিলেন। র্যাচেলের ভাষায়, ‘তিনি সে রাতে ইহুদিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সবাইকে ডেকে নিয়েছিলেন। ভাগ্য ভালো সবাই তার কথা শুনেছিল এবং ট্রেনে উঠে যাওয়ার কারণে জীবন বেঁচেছিল সবার।’
র্যাচেলের কথা থেকে স্পষ্ট যে সে সময় পেশোয়ারে বহু ইহুদি বসবাস করত। সে কারণেই দ্বারে দ্বারে যেতে হয়েছিল বেঞ্জামিনকে। ১০ বছর পর তিনি ফিরেছিলেন আফগানিস্তানে। এরপর ইতালি, ইসরায়েল পার হয়ে তিনি আমেরিকায় থিতু হয়েছিলেন। কিন্তু সবসময় বলতেন ভারত (ভারতভাগের আগে পেশোয়ার ভারতেই ছিল) সেরা জায়গা।
পেশোয়ারে একসময় শিখদেরও প্রাধান্য ছিল। পাঞ্জাবের কোলঘেঁষা এ অঞ্চলে শিখরা থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। পাখতুনদের মধ্যে শিখদের এ অবস্থানের ইতিহাস বহুদিনের পুরনো। পেশোয়ার একটা সময়ে আফগানিস্তানের অধীনে ছিল। মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের সেনাপতি হরি সিং নালওয়া ১৮৩৪ সালে আফগান শাসককে পরাজিত করে পেশোয়ার দখল করেন। এ সময় এটি অবিভক্ত পাঞ্জাবের অধীনস্থ হয়। ফলে পেশোয়ারে শিখ জনতার আধিপত্য কায়েম হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে পেশোয়ার ও উত্তরের অন্যান্য পাঞ্জাবি শহর একত্র করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (নর্থ-ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স) গঠন করা হয়।
পাকিস্তানে বা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো একসময় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসীদের মধ্যেও স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন ওঠে। তারা সিন্ধি, বালুচি, পাঞ্জাবিদের মতো নিজেদের আলাদা পরিচয়ের দাবি করেন। এর মধ্যে এ অঞ্চলে বসবাসকারী শিখরাও ছিলেন। তারা নিজেদের পাঞ্জাবি শিখদের তুলনায় আলাদা মনে করেন। পশতু ভাষাভাষী শিখরা মূলত কুররাম, খাইবার, পেশোয়ার ও ওজাকিতে বসবাস করতেন। তাদের মূল ভাষা পাঞ্জাবি (গুরুমুখী বা শাহমুখী) নয়। তারা পশতুতেই কথা বলেন। অনেকে হিন্দাকি ও উর্দুও বলে থাকেন। অবশ্য গুরু গ্রন্থসাহেব পড়ার মতো গুরুমুখী তাদের জানা।
পাকিস্তানের গুরুদুয়ারার রক্ষণাবেক্ষণ সমিতির প্রেসিডেন্ট আমীর সিংয়ের মতে পাকিস্তানে বর্তমানে মাত্র ১৫-২০ হাজার শিখ বসবাস করে। এর মধ্যে পেশোয়ারেই রয়েছে প্রায় ৫০০টি শিখ পরিবার। পাকিস্তানে শিখদের মুখপাত্র বাবা গুরপাল সিং বলেন, ‘এখন পেশোয়ারে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিখ বসবাস করে। পশতু ভাষাভাষী শিখ পরিবারগুলোর বসবাস পেশোয়ারে, কিন্তু অন্যান্য পরিবার কুররাম, খাইবার, ওজাকিতে চলে গেছে।’ তবে এদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ করা হয়। শিখরা বর্তমানে এ অঞ্চলে সংখ্যালঘু এবং সে কারণে তারা নানাভাবে অবহেলিত। গুরপাল বলেন, ‘দেশভাগের পর অনেক শিখই ভারতে চলে গেছে, কিন্তু বাকিরা রয়ে গেছে এখানে, যেন আমাদের গুরুদুয়ারাগুলো দেখাশোনার জন্য কেউ না কেউ থাকে।’
প্রচলিত কথা হচ্ছে শিখরা পাঞ্জাব থেকে স্থানান্তরিত হয়ে পেশোয়ারে এসেছে। তবে বাস্তব সত্য হলো তারা রণজিৎ সিংয়ের সময় থেকে পেশোয়ারেরই বাসিন্দা। কিন্তু পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর তারা পেশোয়ারে নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের অনেক ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এমনকি সরকারি কর্মকর্তারা তাদের দলিলাদি সত্যায়ন করার ক্ষেত্রেও নানা টালবাহানা করেন। একটি প্রতিবেদনে একজন পাখতুন শিখ জানান যে তাদের সেহাত ইনসাফ কার্ড দেয়া হয় না। কেননা এটি জাকাতভিত্তিক একটি ব্যবস্থা। এছাড়া সমস্যা রয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। শিখ সম্প্রদায় তাদের অঞ্চলে আরো বেশিসংখ্যক স্কুল ও সন্তানদের শিক্ষা সুবিধার দাবি করেন। অধিবাসীরা নানা সময়ে অভিযোগ করেছেন যে ক্লাসরুমে তাদের সন্তানদের বিদ্রূপ করা হয়। সতীর্থদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও অনেক সময় তাদের ধর্ম ও রীতি সম্পর্কে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন। একাধিকবার এমন হয়েছে যে পাগড়ি নিয়ে বিরূপ কথা শুনতে হয়েছে তাদের। তবে গোপাল সিং নামে এক তরুণ শিখ ২০১৩ সাল নাগাদ একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে শিখদের পাশাপাশি অন্যান্য গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার সুযোগ পায়। তবে এ স্কুলের জন্য অন্তত তিনবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে তাকে।
পেশোয়ারে হিন্দুদের চারটি সম্প্রদায় বসবাস করে বা মূলত তারাই সংখ্যাগুরু। এরা হলেন বাল্মিক, রাজপুত, হীর রতন রাঠ ও ভাইজোগা। দেশভাগের পর থেকে তারা স্থানীয় মুসলিমদের সঙ্গে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মধ্যেই বসবাস করেছেন। এখানকার এক বাসিন্দা কুমার বলেন, ‘আমরা সবসময়েই এখানে মুসলিমদের সঙ্গে সৌহর্দ্য নিয়ে বসবাস করেছি। আমরা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করি। সুখ-দুঃখে তারা আমাদের পাশে থাকে এবং আমরাও তাদের পাশে থাকি। মহররমের সময় সাবিল তৈরিতে আমরা তাদের সহায়তা করে থাকি।’
পেশোয়ার একসময় ছিল আফগানিস্তানের শাসকের অধীনে, কখনো ছিল পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্ত। এখানে নানা সময়ে তাই গড়ে উঠেছে আফগান বসতি। ব্রিটিশরা যে সময় আফগানিস্তানে আক্রমণ করে, বহু আফগান পালিয়ে এসেছিল পেশোয়ারে। পরবর্তী সময়েও আফগান শরণার্থীদের অভাব হয়নি এখানে। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধের সময় বহু আফগান তাদের সীমান্ত পেরিয়ে পেশোয়ারে চলে আসে। ১৯৮০ সালের হিসাব অনুসারে, ১৯৭৯ থেকে প্রতি মাসে এক লাখ করে শরণার্থী আফগানিস্তান থেকে পেশোয়ারে এসেছে। তারা পেশোয়ারে জনমিতিই বদলে দিয়েছিল। ১৯৮১ সালের হিসাব অনুসারে পেশোয়ারের মোট জনগোষ্ঠীর ২৫ শতাংশ ছিল শরণার্থী। যারা এসেছিল তাদের কেউ কেউ ফিরে গেলেও এখনো এ শহরে বহু শরণার্থী রয়েছে। এ শতকের শুরুতে পেশোয়ারে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ছয় লাখের কিছু বেশি, মোট অধিবাসীর হিসাবে তারা প্রায় ২০ শতাংশ।
আফগান শরণার্থীদের একটি বড় অংশ জালোজাই ক্যাম্পে বসবাস করে। ২০০১ সালের হিসাব অনুসারে ক্যাম্পের অধিবাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ। তাদের প্রয়োজন ছিল নিজস্ব একটি পরিচয়। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। যদিও বহুকাল ধরে পেশোয়ার নানা সম্প্রদায়ের মানুষকেই আশ্রয় দিয়েছে। এবার আফগানদের নিজ দেশে ফেরানোর চেষ্টা করছে পাকিস্তান সরকার। এর মধ্যে অনেকে প্রায় পুরো জীবন পাকিস্তানেই কাটিয়েছেন। তবে একুশ শতকের বাস্তবতা অনুসারে এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ‘আশ্রয়’ দেয়া পেশোয়ারের পক্ষে সম্ভব নয়। তবু এখনো মুসলিম, হিন্দু, শিখ, ইহুদি, আফগান, খ্রিস্টান—বহু মানুষের বিচিত্র গল্প নিয়ে টিকে আছে পেশোয়ার।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





