পেশোয়ারের পোশাক বৈচিত্র্যময়। এখানকার নারী ও পুরুষেরা ঐতিহ্যবাহী নানা পোশাক পরে। এর মধ্যে খত পারতুগ, ফিরাক পারতুগ, পেরহান তনবন বা পারতুগ কামিজ, চোগা, সারাই, সুথান প্রভৃতি অন্যতম। উচ্চ ও নিম্ন অঞ্চলের মধ্যে পোশাকের পার্থক্য রয়েছে। মূল পরিধেয়র সঙ্গে রয়েছে নানা অনুষঙ্গ, যেমন পাগড়ি ও বিভিন্ন ধরনের টুপি।

খত পারতুগ এখানকার অন্যতম পরিচিত পোশাক। মূলত নিচু অঞ্চলের মানুষ এ পোশাক পরে। এটি এক ধরনের সালোয়ার-কামিজ সেট। নারী ও পুরুষ উভয়ে এ পোশাক পরে। খত বা খাত মূলত এক ধরনের ঢোলা শার্ট, কোমরের দিকে ঢোলা হয়ে ছড়িয়ে যায়। নারীদের ক্ষেত্রে এর দৈর্ঘ্য পা পর্যন্ত হতে পারে। পারতুগ হলো এর সঙ্গে পরা সালোয়ারের নাম। খতে নানা রকম নকশা ও এমব্রয়ডারি থাকে। এর সঙ্গে নারীরা পাটকাই নামে স্কার্ফ পরে। কত্থক নৃত্যশিল্পীরা খত পারতুগ পরেন।

ফিরাক পারতুগে দুটি ভাগ রয়েছে—একটি জানলা খত, অন্যটি গিরদানা খত। প্রথমটি অবিবাহিত নারীরা পরে, যা হালকা রঙের। গিরদানা হয় গাঢ় রঙের এবং এটি পরে বিবাহিত নারীরা। পেরহান তনবনও কাছাকাছি ধারার সালোয়ার-কামিজ। পেহরান মানে কামিজ (ঊর্ধ্বাংশে পরার পোশাক)। এটি ঢোলা হয় এবং অন্য কামিজের তুলনায় লম্বা হয়। পেহরানের দৈর্ঘ্য হাঁটু পর্যন্ত। তনবন বিষয়টি বাংলায় প্রচলিত তহবন। এটি ঢোলা সালোয়ার, যাতে অসংখ্য কুঁচি থাকাই সাধারণ ঐতিহ্য। এর কাছাকাছি ডিজাইনের আরেকটি পোশাক পেশোয়ারি সালোয়ার ও খালকা। খালকা হলো বুক খোলা শার্ট এবং পেশোয়ারি সালোয়ার সাধারণ সালোয়ারেরই একটি।

পেশোয়ারে চোগাও বেশ জনপ্রিয়। বাংলায় এককালে ‘চোগা-চাপকান’ পরার রীতি ছিল। চোগা মূলত জামার ওপরে পরার একটি জ্যাকেটসদৃশ পোশাক। এগুলো উলের তৈরি হয়। এর মধ্যে পেশোয়ার ও আফগানিস্তানে তৈরি শাতুরি চোগা তৈরি হয় ভেড়ার লোম থেকে। এছাড়া বিশেষ ধরনের ভেড়ার লোম থেকে তৈরি হয় বারুকি চোগা। উঁচু অঞ্চলের ছাগলের লোম থেকে তৈরি হয় কুর্কি চোগা। এছাড়া দুম্বার লোম থেকেও চোগা তৈরির রেওয়াজ রয়েছে।

সারাই এক ধরনের চাদরের মতো বড় কাপড়, যা কখনো কখনো মাথায় বাঁধার পাশাপাশি কোমরবন্ধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। পেশোয়ার ও খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলের মানুষ নানা রকম পাগড়ি পরে। তবে পেশোয়ারের ঐতিহ্যবাহী পাগড়িটি মূলত দুই প্রস্থের। এর মধ্যে একটি অংশের নাম কুল্লা ও অন্যটি এর ওপরে একটি লম্বিত অংশ, যাকে তুররা বা শামলা বলা হয়। কথিত আছে, সুভাষ চন্দ্র বসু আত্মগোপনের সময় পেশোয়ারি পাগড়ি পরেছিলেন। পাগড়ি ছাড়াও কুল্লা টুপি, সিন্ধি টুপি ও বালুচি টুপি পেশোয়ারে জনপ্রিয়।

পোশাকের ক্ষেত্রে উচ্চ ও নিম্নাঞ্চলে পার্থক্য রয়েছে। উচ্চ অঞ্চলের ক্ষেত্রে চিত্রল জেলায় রঙবেরঙের পোশাক প্রচলিত। চোগা বা শুকা নামের এ পোশাক উল বা সুতির লম্বা জামা। হুনজা উপত্যকা ও গিলগিট-বাল্টিস্তানে পোশাকটি চোগা নামে পরিচিত। এর সঙ্গে পুুরুষরা ফিটিং সালোয়ার বা পাজামা পরে। নারীদের পাজামা ঢোলা হয়। এছাড়া নারীদের ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক সাধারণত ১০ গজের মতো দীর্ঘ হয় এবং এতে এমব্রয়ডারির ভারি কাজ থাকে। এর সঙ্গে মাথায় এক ধরনের টুপি জাতীয় অনুষঙ্গ ব্যবহার করা হয়। এতে এমব্রয়ডারি ও জরির কাজ করা থাকে। চিত্রলে পুুরুষেরা প্রায় সবাই চিত্রল টুপি ব্যবহার করে।

পেশোয়ারের পোশাকে বৈচিত্র্যময় রঙের ব্যবহার দেখা যায়। রঙের এ ব্যবহারের সঙ্গে মিল রয়েছে পেশোয়ারের ট্রাক-আর্ট। বাংলাদেশে যেমন রিকশা পেইন্টিং জনপ্রিয়, পেশোয়ারে তেমনি ট্রাক-আর্ট। গাঢ় রঙের নানা নকশা করা ট্রাকগুলো ‘জিঙ্গেল ট্রাক’ নামে পরিচিত। পাকিস্তানে জিঙ্গেল ট্রাক পেশোয়ারের হাইওয়েতে অহরহ দেখা যায়। পেশোয়ার শহর ও শহরের বাইরে, বিশেষত গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড ধরে জিঙ্গেল ট্রাক ছুটে চলতে দেখা যায়। শহরের পূর্ব দিকে দেয়ু বাস টার্মিনালে গেলে সার বাঁধা জিঙ্গেল ট্রাক দেখা যায়। অনেকে মনে করেন, শিখ ড্রাইভাররা এর সূচনা করেছিলেন। তবে এখন তা পেশোয়ারের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছে।

 

আসরার আবেদিন