পাকিস্তানের অন্যতম বড় শহর এবং খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের (২০১০ সাল পর্যন্ত নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স নামে পরিচিত ছিল) রাজধানী পেশোয়ার। পেশোয়ারের বিশিষ্ট বাজার এলাকাগুলোর মধ্যে কিসসাখানি বাজার অন্যতম। অতীতে স্থানীয় অধিবাসী ছাড়াও বাজারটি অনেক পর্যটককে আকৃষ্ট করে। কারণ সেখানে তাজা ফুল, শুকনো ফলফলারি, কেহওয়া (গ্রিন টি বা সবুজ চা), চকমকে রঙিন মৃিশল্প এবং রুপা ও পিতলের প্রলেপ দেয়া হস্তনির্মিত বাসনপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস বিক্রি করা হয়। একসময় বাজার থেকে ব্যবসায়ীরা পেশোয়ারি হস্তশিল্প কিনে ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় নিয়ে যেত। তবে বর্তমানে অতীতের সেই জৌলুস না থাকলেও বাজারের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মোগল যুগের স্থাপত্য এবং বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবারের কারণে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। দুর্ভাগ্যবশত বাজারটি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন করার জন্য ব্রিটিশরাজের সবচেয়ে সহিংস প্রচেষ্টার অন্যতম স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই গণহত্যা ছিল ব্রিটিশ সেনা ও খান আবদুল গাফফার খানের (১৮৯০-১৯৮৮) ‘খুদাই খিদমতগার’ (অর্থাৎ আল্লাহর ভৃত্য) প্রতিরোধকারীদের মধ্যে প্রথম চরম সংঘর্ষ।

ঐতিহাসিক কিসসাখানি বাজার

পেশোয়ারের প্রাচীন বাজারের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী কিসসাখানি বাজার অন্যতম। বাজারটি পুরনো পেশোয়ার শহরের মাঝখানে অবস্থিত এবং শহরের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য স্থাপনা, যেমন—বালা হিসার কেল্লা, কাসিম খান মসজিদ, ক্রিতালি বাজার, চক ইয়াদগার (বা সরণি চত্বর), মহব্বত খান মসজিদ, খাইবার বাজার ও কানিংহাম ক্লক টাওয়ার থেকে হাঁটা দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত।

কিসসাখানি বাজার আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, মাহমুদ গজনভি, জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, নাদির শাহ, আহমেদ শাহ দুররানি ও তার নাতি শাহ জামানসহ যুদ্ধবাজ, আক্রমণকারী এবং রাজাদের শক্তি প্রত্যক্ষ করেছে। তারা সবাই ভারতে তাদের আগ্রাসনের সময় বিখ্যাত খাইবার পাস অতিক্রম করেছিলেন। কিসসাখানির ইতিহাসকে পেশোয়ারের ইতিহাসের মতোই প্রাচীন বলে মনে করা হয়। বলা বাহুল্য, পেশোয়ারকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ‘প্রাচীন জীবন্ত শহর’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ইতিহাস আনুমানিক ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পুরনো।

কিসসাখানি ফার্সি শব্দ কিসসা খোয়ান থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ গল্প বলা। অতীতে কিসসাখানি বাজারের ক্যাফে এবং সরাইখানাগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে মধ্য এশীয় দেশ থেকে আসা ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের স্বাগত জানানোর জন্য ব্যবহূত হতো। পেশাদার গল্পবলিয়েরা ব্যবসায়ীদের বিনোদনের জন্য তাদের কাছে গল্প বলত। তারাও তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে যাওয়ার আগে প্রেম-ভালোবাসা, সংস্কৃতি, শিল্প ও স্থাপত্য, সংগীত ও ঐতিহ্যের গল্প স্থানীয়দের সঙ্গে ভাগাভাগি করত।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ সৈন্যরা পেশোয়ারে আসে ১৮৪৯ সালে। তখন কিসসাখানি এলাকার অধিবাসীরা এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। ব্রিটিশরা স্থানীয়দের সুবিধার্থে স্ফটিক স্বচ্ছ বরা নদীর ধারা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া মোবাইল থিয়েটার এবং বাজার-ই-হুসন (রেড লাইট এরিয়া বা নিষিদ্ধ পল্লী) কিসসাখানি বাজারের কাছে নির্মাণ করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, কিসসাখানি আফগান রাজাদের জন্য শীতকালীন সময় কাটানোর জায়গা হিসেবে কাজ করেছে। তাদের ১৯৩৩ সালে নির্মিত চমত্কার আফগান ভবন (যা বর্তমানে আফগান বাণিজ্য কেন্দ্র) এখনো দেখা যায়, যা বর্তমানে আফগান সরকারের সম্পত্তি। এছাড়া কিসসাখানি বাজারে আরো ঐতিহ্যগত শৈলী স্থাপত্যের চিহ্ন রয়েছে।

কিসসাখানি বাজার গণহত্যা


১৯৩০ সালের ২৩ এপ্রিল কিসসাখানি বাজার গণহত্যা ছিল ‘সীমান্ত গান্ধী’ বলে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ফলাফল। উল্লেখ্য, খান আবদুল গাফফার খান একাধিক নামে পরিচিত ছিলেন, যেমন বাচা খান (প্রধানদের রাজা) ও বাদশা খান। এছাড়া তাকে সম্মানজনকভাবে ফখর-ই-আফগান (আফগানদের গর্ব) বিশেষণে সম্বোধন করা হতো। তিনি ছিলেন একজন পশতুন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে খুদাই খিদমতগার প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৩০ সালে খান আবদুল গাফফার খান ‘ধৈর্য ও ধার্মিকতা’ নিয়ে অহিংস আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। তখন তিনি তার অনুসারীদের বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের এমন একটি অস্ত্র দেব, যাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে। এটা নবীর অস্ত্র, কিন্তু তোমরা তা জানো না। এ অস্ত্র হচ্ছে ধৈর্য ও ন্যায়পরায়ণতা। পৃথিবীর কোনো শক্তিই এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না।’

বলা বাহুল্য, ১৯৩০ সালের মধ্যে খুদাই খিদমতগার পাখতুন উপজাতিদের এক ছাতার নিচে একত্র করার জন্য একটি বৈধ অহিংস স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং সংগঠনটি মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত ছিল।

আন্দোলন শুরু করার জন্য বেছে নেয়া দিনটি ছিল ২৩ এপ্রিল ১৯৩০। সেদিন সকালের দিকে অনেক নেতাকে গ্রেফতার করে কাবুলি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনগণ কংগ্রেস কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করে। খুদাই খিদমতগারের আরো অনেক নেতাকে গ্রেফতারের পর কিসসাখানি বাজারে প্রচুর লোক জড়ো হয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যরা বাজারে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনতা পাথর ছুড়তে শুরু করে। স্থানীয় গাড়োয়াল রাইফেলস বাহিনীর সৈন্যরা গুলি চালানোর আদেশ প্রত্যাখ্যান করে। একসময় জনতা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্যকে হত্যা করেছিল এবং তার দেহ পুড়িয়ে দিয়েছিল। তখন দুটি ব্রিটিশ সাঁজোয়া কোনো পূর্ব সংকেত ছাড়াই অতর্কিতে ভিড়ের মধ্যে খুব দ্রুত গতিতে ছুটে আসে। এতে ১৪ জন নিহত হয়। কেউ সাঁজোয়া গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সৈন্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তবে জনতা অহিংসতার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছিল, যদি তারা তাদের মৃত ও আহতদের একত্র করতে পারে এবং যদি ব্রিটিশ সৈন্যরা চত্ত্বর ছেড়ে চলে যায়, তবে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্যরা সেখান থেকে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তাই বিক্ষোভকারীরা মৃত ও আহতদের সঙ্গেই থেকে যায়। ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তারা ভারতীয় সৈন্যদের নিরস্ত্র জনতার ওপর মেশিনগান দিয়ে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। ফলে কিসসাখানি বাজার এলাকা তাজা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। যা হোক, বেঁচে যাওয়া জনতা শির উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল এবং তারা বন্দুকের গুলির শিলাবৃষ্টির মুখোমুখি হয়েছিল। কিসসাখানি বাজারে গোলাগুলি বিকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সেই দিনটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি ‘১৯৩০-এর শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

যা হোক, সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক জিন শার্প লিখেছেন, ‘যখন সামনে যারা ছিল, তারা গুলিবিদ্ধ হয় এবং আহত হয়ে নিচে পড়ে যায়, তখন পেছন দিকের লোকেরা নির্ভীকভাবে তাদের বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যায় এবং বুলেটের সামনে শির উঁচু করে দাঁড়ায়। সবাই আতঙ্কিত না হয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে ছিল। বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তা চলতে থাকে। লাশের সংখ্যা যখন অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন সরকারের অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি এসে মৃতদেহ তুলে নিয়ে যায়।’

১৯৩০ সালের গণহত্যা সম্পর্কে আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সিনেটর হাজি আদেল ‘দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’ পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘এটি ছিল গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন এবং ঘটনাটি ভারতবর্ষের মানুষের মধ্যে নতুন চেতনা সূচনা করেছিল, যা পরে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে পরিচালিত হয়।’

এ কথা সত্যি যে কিসসাখানি বাজার গণহত্যার পর স্থানীয় ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের পদক্ষেপ ভীষণ অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। যদিও রাজা ষষ্ঠ জর্জ সেই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে পেশোয়ার আর্কাইভের ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, পূর্ববর্তী অনেক ঘটনার মতো ব্রিটিশ সরকার বিচারক নাইমাতুল্লাহ চৌধুরীকে ঘুস দিয়ে কিসসাখানি বাজার গণহত্যাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সে সময় নাইমাতুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন লক্ষেৗয়ের প্রধান বিচারক। রাজা ষষ্ঠ জর্জ নাইমাতুল্লাহ চৌধুরীকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে গণহত্যার এলাকা জরিপ করেন এবং ব্রিটিশ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ২০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

শেষ কথা

এ কথা সত্যি যে কিসসাখানি বাজার পেশোয়ারের অন্যতম পরিচয় এবং সেখানে আজও ইতিহাস কথা বলে। তবে পরিতাপের বিষয় যে বর্তমানে কিসসাখানি বাজারের জৌলুস এবং চঞ্চলতা আগের মতো নেই। তাই এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্থাপত্য, শিল্পকর্ম সংরক্ষণের জন্য দৃঢ় প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদিও সাম্প্রতিক কালের একাধিক নৃশংস ও পাশবিক হত্যাকাণ্ড এবং সর্বোপরি করোনাভাইরাসের কারণে কিসসাখানি বাজারের কর্মতত্পরতা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে এবং অনেক দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশা করেন, বাজারের সৌন্দর্য এবং প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রেখে যথেষ্ট রাজস্ব উত্পন্ন করা সম্ভব। জানা যায়, উপমহাদেশ ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে নতুন প্রজন্মকে বাজারের ঐতিহাসিক অতীত সম্পর্কে অবহিত করার জন্য কিসসাখানির ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে একাধিক প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে।

পরিশেষে কিসসাখানি বাজার সম্পর্কে পোলিশ সাংবাদিক Wojciech Jagielski-এর বর্ণনা তুলে ধরা হলো। তিনি বলেছিলেন, নিজেকে হারানোর জন্য, ভুলে যাওয়া এবং সংকীর্ণ গলির গোলকধাঁধায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার জন্য এটি সবচেয়ে সহজ জায়গা। সেখানে রয়েছে কারুকাজ করা কাঠের দরজা এবং ব্যালকনির সঙ্গে বসতবাড়ির দীর্ঘ ছায়া, বিভিন্ন ফটক, স্টল ও ক্ষুদ্র সরাইখানা। সূর্যের উত্তাপ থেকে লুকিয়ে দাড়িওয়ালা পুরুষরা তাড়াহুড়ো করে মিষ্টি সবুজ চা পান করে, খানিক বাড়তি আফিম মিশিয়ে তামাক চিবোয় এবং হুক্কার সাহায্যে ধূমপান করে নিজেদের শক্তিশালী করে তোলে।

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক