অখণ্ডিত বাংলার (১৯৪৬-৪৭) এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৬-৫৭) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন উপমহাদেশে একজন স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ ভারতে এবং স্বাধীন পাকিস্তানে ছিল তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। অখণ্ড বাংলার রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকেছেন প্রায় ২৬-২৭ বছর এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে ছিলেন প্রায় ১৫ বছর। বাংলায় তার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে কলকাতায় ছেচল্লিশের ১৬ অগাস্ট ঘটে যায় শতাব্দীর জঘন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে অভিহিত। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শাসনামল কলঙ্কিত হয়েছিল এ দাঙ্গার জন্য এবং খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন প্রতিবেশী সম্প্রদায়সহ অনেকের কাছে। ৭৬ বছর অতিক্রান্ত সেদিনের মানবতা ধর্ষিত ঘটনার কিন্তু বিতর্কের অবসান হয়নি আজও, বিশেষত পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে।

সোহরাওয়ার্দী পরিবারের বাগদাদ থেকে এ উপমহাদেশে ৮০০-৯০০ বছরের উজ্জ্বল আলোকিত পারিবারিক ইতিহাস আমাদের কাছে আজও বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ইসলামী সংস্কৃতি এবং অসাধারণ ঐতিহ্যবাহী বনেদি মুসলিম পরিবারটি মূলত এ দেশে মেদিনীপুরের সোহরাওয়ার্দী পরিবার নামেই বেশি পরিচিত, মুসলিম জাগরণে বিশেষত শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিলেন পরিবারটি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ ঐতিহ্যবাহী প্রখ্যাত পরিবারেরই সন্তান।

কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দী তার বাবা এবং মা উর্দু সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখিকা খুজিস্তা আখতার বানু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে এমএ, উর্দু সাহিত্যের প্রথম পরীক্ষক। তাছাড়া তিনি ছিলেন ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম সিনিয়র কেমব্রিজ পাস। এ দম্পতির দুই ছেলে—হাসান শাহেদ সোহরাওয়ার্দী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই হাসান শাহেদ সোহরাওয়ার্দী (জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৮৯০) একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কবি, ভাষাবিদ, লেখক, শিল্প সমালোচক এবং কুটনীতিক। শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু করাচিতে ৫ মার্চ ১৯৬৫, তিনি ছিলেন অকৃতদার।

কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় প্রবেশিকা, সেন্ট জেভিয়ার্সে বিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতক; শুধু বিজ্ঞানের ছাত্রই ছিলেন না, বহুমুখী জ্ঞানের সন্ধানে সদা তত্পর ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বিদুষী মায়ের বিশেষ আগ্রহে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ইংল্যান্ডে যান উচ্চ শিক্ষার্থে এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট ক্যাথরিন কলেজে আইন শাস্ত্রের মর্যাদাবান বিরল ডিগ্রি বিসিএল অর্জন করেন মাত্র ২৬ বছর বয়সে; গ্রেস-ইন থেকে বার-অ্যাট-ল বা ব্যারিস্টারি শেষ করেন ১৯২০ সালে। বিদুষী মায়ের মৃত্যু হয় ১৯১৯ সালের ১২ জানুয়ারি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিক্ষা শেষে ইংল্যান্ড থেকে ১৯২০ সালে দেশে ফিরে আইন ব্যবসা শুরু করেন কলকাতা হাইকোর্টে।

একই সঙ্গে তিনি আইন ব্যবসা ও সমাজ সেবায় যুক্ত হন এবং সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন প্রাজ্ঞ বিশ্ব ইসলামী চিন্তক, অভিভাবক মামা স্যার আবদুল্লাহ আল মামুন সোহরাওয়ার্দীর একান্ত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায়। খেলাফত ও স্বরাজ আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হয় তার প্রকাশ্য রাজনীতি, সম্পাদক নির্বাচিত হন কলকাতা খেলাফত কমিটির।

একটি জীবন, একটি ইতিহাস, একটি সংগ্রামের নাম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে তিনি অখণ্ড বাংলা নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা নামে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন; সঙ্গে পেয়েছিলেন শরত্চন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায়, সত্যরঞ্জন বক্সী, আবুল হাশিম প্রমুখকে। সেদিনের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে নানা কারণে তার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

দেশ বিভাগের পর পরই তিনি কলকাতা ছেড়ে পাকিস্তানে যাননি। মুসলমানদের জানমালের রক্ষায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে শান্তি মিশন তৈরি করে। দুর্ভাগ্য এ কাজ স্থগিত হয়ে যায় ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে, স্বভাবতই শহীদ সোহরাওয়ার্দীরও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। ১৯৪৯ সালের মার্চে তিনি কলকাতা ছেড়ে করাচি চলে যান।

পাকিস্তানে এসে তিনি দেখলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কায়েমি স্বার্থবাদীদের হাতে চলে গিয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলীয় আন্দোলনের পথে গিয়ে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকার গঠনে তিনি সাফল্য পান। ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও তিনি মাত্র ১৪ মাসের মাথায় পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য হন। পাকিস্তানে গণতন্ত্র উদ্ধারে তার ছিল সদা ব্রত। উপমহাদেশের রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একজন প্রতিভাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তাকে নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিষ্প্রভ করে দেয়া হয়েছে, এটা তার পক্ষে, দেশের পক্ষে চরম দুর্ভাগ্যজনক। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সুদূর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের এক হোটেল কক্ষে স্বজনবিহীন নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ১৯২০ সালে স্যার আবদুর রহিমের কন্যা নিয়াজ ফাতেমার বিয়ে হয়। স্যার আবদুর রহিম কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য এবং ইন্ডিয়ান লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নিয়াজ ফাতেমা ছিলেন একজন আদর্শ ও বিদুষী নারী। তার বিবাহিত জীবন স্থায়ী ছিল মাত্র তিন বছর। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এ বিয়ে বেশি দিন স্থায়ী ছিল না কারণ নিয়াজ ফাতেমা ইন্তেকাল করেন ১৯২২ সালে এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে। মায়ের মৃত্যুর সময় মেয়ে বেগম আখতারের বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। শিশুপুত্রদের লালনপালনের ভার পড়েছিল নানা-নানির ওপর। ছেলে শাহাব সোহরাওয়ার্দী ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ডে পড়াকালীন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান লন্ডনে। একমাত্র পুত্র শাহাবের মৃত্যুতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, শোকপ্রকাশ করে সে সময়ে তিনি বলেন, ‘বংশের শেষ আলোর সমাপ্তি হলো’।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগত জীবনে দুবার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী বেগম নিয়াজ ফাতেমার মৃত্যুর ১৮ বছর পর ১৯৪০ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন পোলিশ বংশোদ্ভূত একজন রাশিয়ান অভিনেত্রী ভেরা আলেকজান্দ্রোভনা তিশেঙ্কো ক্যাল্ডারকে (২৮ অগাস্ট ১৯০২-১৩ অক্টোবর ১৯৮৩)। মস্কো আর্ট থিয়েটারের সদস্য ছিলেন তিনি। ভেরা ছিলেন তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল না ভেরা অভিনয় জগতে আসুক কিন্তু তিনি কম বয়স থেকেই অভিনয় সম্পর্কে আকৃষ্ট হন এবং অভিনয় জগতে ঝুঁকে পড়েন। আন্তন চেখভের বিধবা স্ত্রী ওলগা নিপার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ১৯ বছরের ভেরা, তিনিই নিয়ে যান তাকে মস্কো আর্ট থিয়েটারের কনস্ট্যান্টিন স্ট্যানিস্লাভস্কির কাছে। মস্কো আর্ট থিয়েটার ছাড়াও তিনি অভিনয় করেন প্রাগেও।

ভেরা আলেকজান্দ্রোভনার মস্কো আর্ট থিয়েটারে অভিনয় সব সময় ছিল গতিশীল এবং অল্প দিনেই মন জয় করেন অসংখ্য দর্শকের। এ সময় অন্য অভিনেত্রী ভেরা বারানভস্কোয়ারের সঙ্গে ভেরা আলেকজান্দ্রোভনার সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং ইউরোপ সফরে যান দুজনে। বার্লিনে রাশিয়ান অভিবাসী মেডিকেল ছাত্র ইউজিন তিশেঙ্কোর সঙ্গে ভেরার দেখা হয় ও মেলামেশার অল্পদিনেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ২০ মে ১৯৩১ সালে তারা বিয়ে করে মাদ্রিদে বসবাস করতে থাকেন। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের জন্য তিশেঙ্কো দম্পতি অতঃপর ভিয়েনা হয়ে রোমে চলে যান। এখানে ভেরা একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, তার নাম রাখেন ওলেগ তিশেঙ্কো। মেডিকেল ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইউজিন ১৯৩৮ সালে চলে যান স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে। ছেলেকে নিয়ে একা মুসোলিনির রোমে বাস করা ভেরাকে ইউরোপীয় অস্থিরতা ক্রমেই বেশ চিন্তায় ফেলেছিল এবং ইউজিনের সঙ্গে ভেরার ক্রমেই দাম্পত্য জীবনেও ফাটল ধরেছিল।

শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই শাহেদ সোহরাওয়ার্দী ১৯১৭ সালের রাশিয়ান বিপ্লবের পর অন্যান্য উদ্বাস্তুর সঙ্গে জার্মান, রোম প্রভৃতি দেশে আশ্রয় নেন এবং বিভিন্ন দেশে থিয়েটারে যুক্ত হয়ে প্রযোজনা, পরিচালনা করে প্রভূত সুনাম অর্জন করেন; রাশিয়ায় অবস্থানকালে মস্কো আর্ট থিয়েটারের পরিচালক হিসেবে আগেই ভেরার সঙ্গে পরিচয় ছিল শাহেদের। ১৯৩৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রোম ত্যাগ করে শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে ছেলে ওলেগকে নিয়ে ভেরা ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় চলে আসেন। এখানে অবস্থানকালে ইসলামের শিক্ষার মধ্যে স্বস্তি ও শান্তি খুঁজে পান ভেরা, স্বামীকে তার ধর্মান্তরের খবর দিয়ে ইউজিনকেও অনুরোধ করেন ইসলাম গ্রহণের। কিন্তু ইউজিন তার নিজস্ব খ্রিস্টীয় ধর্মের প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখার কথা জানিয়ে ধর্ম পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানান।

ভেরা নিজ ইচ্ছায় কলকাতা নাখোদা মসজিদে ইমামের কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম নাম নেন নূর জেহান বেগম। কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলা করেন ইউজিনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের। শেষ পর্যন্ত বহু আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে বিচ্ছেদ পান ভেরা এবং বিয়ে করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। বস্তুত, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে ভেরা দেখতে পান একজন অক্সফোর্ডের কৃতি ছাত্র, গ্রেস-ইনের বিশিষ্ট ব্যারিস্টার এবং খুঁজে পান একজন রঙিন, উজ্জ্বল ও বুদ্ধিমান মানুষকে। তার ছিল ঘাত-প্রতিঘাতে ভরা জীবন। উল্লেখ্য, ভেরার চোখের সামনেই ঘটেছে রাশিয়ান বিপ্লব, স্পেনের গৃহযুদ্ধ, কলকাতার ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন অবশেষে ভারত পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তি প্রভৃতি।

ভেরা তিশেঙ্কো ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘরে জন্ম হয় রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর। ভেরার সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দাম্পত্য জীবন প্রথম কয়েক বছর ছিল খুবই সুখ ও আনন্দের। স্ত্রীকে নিয়ে কোনো জনসভা বা জনসমক্ষে নিয়ে না গেলেও একসঙ্গে সিনেমা থিয়েটার দেখতে যেতেন দুজনে। দেশের কাজই ছিল শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে মূলমন্ত্র। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় ধীরে ধীরে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাজকর্মের সময় বাড়ছিল; দৈনিক ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাস্তবিকই স্ত্রীকে সময় দিতে পারতেন না এবং ভাষা, সংস্কৃতির বিস্তর ফারাকের জন্যও ক্রমেই তারা দূরে সরে যেতে থাকেন একে অন্যের থেকে। ১৯৪৬ সালে প্রকৃতপক্ষে বিচ্ছেদ ঘটে এবং পরস্পরের থেকে তারা আলাদা বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ভেরা তিশেঙ্কোর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায় হয় ১৯৫১ সালে।

তার আগেই শিশুপুত্র রাশেদকে নিয়ে মা ভেরা তিশেঙ্কো পাড়ি জমান লন্ডন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার শৈশব, কৈশোর ও বহু বছরের রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র কলকাতা ত্যাগ করে ১৯৪৯ সালের মার্চে চলে যান পাকিস্তানের করাচিতে। উল্লেখ্য, এ বিবাহ বিচ্ছেদের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী বা ভেরা আর বিয়ে করেননি কেউই। ভেরা তার বাকি জীবন কাটিয়ে দেন অভিনয়ের পাঠ শিখিয়ে; হলিউডের অর্কিড এভিনিউর ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। সারা বিশ্বে প্রায় ২০ বছরের অধিক সময় তিনি সফর করেছেন বক্তৃতা দিয়ে। ১৯৮৩ সালের ১৩ অক্টোবর নিউইয়র্ক সিটির এক ফ্লাইটে মস্কো আর্ট থিয়েটারে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার পথে লস অ্যাঞ্জেলেসে হঠাৎ হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮১ বছর বয়সে ভেরা আলেকজান্দ্রোভনা তিশেঙ্কোর মৃত্যু ঘটে।

রাশিয়ান মায়ের কাছে লন্ডনে লালিত-পালিত হলেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী পুত্র রাশেদকে বিস্মৃত হননি কখনো। সর্বদা পুত্রের খোঁজখবর রাখতেন এবং পিতা-পুত্রের সম্পর্ক অটুট ছিল জীবনের শেষ দিন ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সুদূর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের এক হোটেল কক্ষে মৃত্যু পর্যন্ত।

ইংল্যান্ডের চার্টার হাউজ, অক্সফোর্ড ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। রয়েল একাডেমি অব রোমান্টিক আর্ট থেকে পড়াশোনা শেষে মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যোগ দেন অভিনয়ে, কয়েক বছর কাজ করেন রয়্যাল শেকসপিয়ার কোম্পানি ও আমেরিকান কোম্পানিতে। ‘জিন্নাহ’ চলচ্চিত্রে নেহরুর ভূমিকায় অভিনয় করে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন রাশেদ। গ্রেটার লন্ডনে বাস করতেন রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ছিলেন চিরকুমার। বাবার মতো তারও মৃত্যু হয় নিঃসঙ্গ অবস্থায়; লন্ডনে নিজ বাসভবনে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে ৭৮ বছর বয়সে।

 

আলিমুজ্জমান: ‘সোহরাওয়ার্দী পরিবার: ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার’ গ্রন্থের লেখক