আন্তঃধর্মীয় বিয়ে থেকে উত্থাপিত মামলা-মোকদ্দমায় বহুল উদ্ধৃত কলকাতা হাইকোর্টের মামলাটির রায় হয় ৩ জানুয়ারি ১৯৪১। এটি নূর জাহান বেগম বনাম ইউজিন তিশেঙ্কো মামলা নামে পরিচিত। বিচারক ছিলেন নরমান এজলি। তিনিই পরবর্তী সময়ের স্যার এজলি, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট।
দীর্ঘ পর্যালোচনা ও বিস্তারিত আলোচনার পর বিচারক রায় দেন। দীর্ঘ দলিলটি খুব সংক্ষেপে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নিজেকে নূর জাহান বেগম পরিচয় দিয়ে ব্রিটেনের এডিনবরায় বসবাসরত রুশ নাগরিক ইউজিন তিশেঙ্কোর সঙ্গে তার বিয়ে বাতিলের ডিক্রি চেয়েছেন অথবা তিনি চেয়েছেন আদালত ঘোষণা করুক যে বিবাদী ইউজিন তিশেঙ্কোর সঙ্গে তার বিয়ে অকার্যকর হয়ে গিয়েছে।
আরজিতে তিনি উল্লেখ করেছেন তার জন্ম পোল্যান্ডে, বাবা-মা রুশ, তিনি আগে খ্রিস্টান ছিলেন। বিবাদীর সঙ্গে ২৮ মে ১৯৩১ বার্লিনে সিভিল ম্যারেজ বিধান অনুযায়ী তার বিয়ে হয়। ১৯৩৮-এর জুন পর্যন্ত তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন, স্বামীর সঙ্গে তার জীবন ছিল অসুখের। তারা সর্বশেষ একত্রে রোম শহরে বাস করেছেন। ব্রিটিশ মেডিকেল ডিগ্রির জন্য নিজেকে তৈরি করতে বিবাদী ব্রিটেনের এডিনবরায় চলে যান। আর বাদী ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে কলকাতা চলে আসেন এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। ভারতে আসার পর থেকে স্বামী তার ও তার সন্তানের ভরণপোষণের খরচ দিচ্ছেন না। ২৭ জুন ১৯৪০ অনেক চিন্তাভাবনা করার পর স্বেচ্ছায় কলকাতায় ১৯ নম্বর চৌরঙ্গি রোডে অবস্থিত নাখোদা মসজিদে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পূর্ব নাম বদলে নূর জাহান বেগম নাম ধারণ করেন। তিনি আরজিতে উল্লেখ করেছেন যে ইসলাম ধর্ম কবুল করার পর ২৮ জুন, ১৯৪০ তিনি বিবাদীকে তার ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন এবং তাকেও ইসলাম ধর্ম কবুল করার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি তার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে অসৌজন্যমূলক ভাষায় তার ঠিকানায় ২ জুলাই ১৯৪০ টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন।
আইনের ব্যাখ্যা যদি এমন হয়ে থাকে যে নূর জাহান বেগম ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে এবং তার স্বামীর একই ধর্মে দীক্ষা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তিনি বিয়ে ভাঙার ডিক্রি প্রাপ্তির হকদার হয়ে উঠেছেন অথবা আদালতও তার বিয়েকে অকার্যকর ঘোষণা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সবার আগে তাকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে তার ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টির সিদ্ধান্ত তিনি স্বাধীন ইচ্ছেতে গ্রহণ করেছেন। তিনি তার ধর্মান্তরিত হওয়ার যে কারণ ও প্রমাণ তুলে ধরেছেন প্রাথমিকভাবে তা স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বিচারক নরমান এজলি আদালতকে আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য ব্যারিস্টার এসএম বোস, ব্যারিস্টার ক্লাফ ও ব্যারিস্টার দাশকে এমিকাস কিউরি নিয়োগ করেন। কিন্তু এমিকাস কিউরির এটা এখতিয়ারভুক্ত নয় যে তিনি বাদীকে জেরা করে তার ধর্মান্তরকে অন্য কোনো বাধ্যবাধকতা বা প্রভাব রয়েছে কিনা খুঁজে বের করবেন। স্ত্রী এমনকি স্বেচ্ছায় খ্রিস্টান থেকে মুসলমান হলেই এবং স্বামী তাকে অনুসরণ না করে খ্রিস্টান রয়ে গেলে তা তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত কারণ কেন হবে তারও সাক্ষীকরণ দরকার। যে রিলিফের জন্য বাদী আদালতে এসেছেন এই রিলিফ অর্থাৎ আদালত ঘোষিত স্বামীর সঙ্গে তালাক তিনি লাভ করতে পারেন কিনা, কিংবা এটা ঘোষণার এখতিয়ার আদালতের আছে কিনা তাও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
চারটি বিষয়ের সুরাহা অনিবার্য হয়ে উঠেছে
১. একটি বৈধ বিয়ের সংঘটন চুক্তি নির্ভর করে যে জায়গায় বিয়ে হয়েছে সেখানকার বিদ্যমান আইনের ওপর (lex loci
contractus)।
২. বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রী-স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বামীর ডমিসাইল—তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে থাকার অধিকার অর্জন করেন।
৩. দম্পতির মর্যাদা ও অধিকার তারা যখন যে দেশে বাস করেন সেখানকার আইন দ্বারা (lea
domicile) নিয়ন্ত্রিত।
৪. তালাকজনিত অধিকার ও দায়িত্ব বিবাহ চুক্তির অংশ নয়, তা এ ধরনের অন্য চুক্তি দ্বারা নির্ধারিত (lex
domicile)
আইনজীবী বলেছেন, বর্তমান মোকদ্দমাটি কলকাতার হাইকোর্টের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এটি ১৯২৬ সালের কলোনিয়াল জুরিসডিকশন অ্যাক্টের আওতায় আসে না। বাদী স্বীকার করেছেন তিনি এবং তার স্বামী দুজনেই রুশ নাগরিক civil rites অনুযায়ী ২০ মে ১৯৩১ বার্লিনে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারা দুজনের রাশান ডোমিসাইল। দুজনই ঘোষিত খ্রিস্ট ধর্মের হলে, ব্রিটিশ ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ডোমিসাইল হলে ব্রিটিশ ভারতীয় আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে ভারতীয় আদালতে বিচার্য হতে পারত।
১৯৯৫ সালের উইলসন বনাম উইলসন মামলার অনুসরণে অন্য মামলায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যদি পক্ষগুলো অর্থাৎ বাদী ও বিবাদী ইন্ডিয়ান ডোমিসাইল না হন তাহলে বিয়ে অকার্যকর করার ঘোষণা দেয়ার কোনো অধিকার ভারতীয় আদালতের থাকবে না।
১৯২৬-এর ডিভোর্স অ্যাক্ট অনুসরণ করতে হলে বাদী ও বিবাদী উভয়কে ভারতে ডোমিসাইলড হতে হবে এবং উভয়কেই ঘোষিত খ্রিস্টান হতে হবে।
বাদী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। মুসলিম আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী তিনি আদালতের রায় পাওয়ার দাবিদার। তবে এ আইনের ‘অধিক্ষেত্রবহির্ভূত বৈধতা’ থাকার কোনো কারণ নেই।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের ফতোয়া-ই-আলমগীরী থেকে আদালতে উদ্ধৃত করা হয়:
স্বামী-স্ত্রীর দুজনের একজন যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়, তাহলে অন্যজনের কাছেও ইসলাম ধর্মের আমন্ত্রণ পৌঁছাতে হবে। যদি অন্যজন সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ইসলাম গ্রহণ করে নেন তাহলে উত্তম। যদি না করেন তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হতে হবে। যদি নিশ্চুপ থাকেন এবং কোনো কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তাহলে বিচারক তার কাছে বারবার ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকবেন। তিনবার আহ্বান জানানোর পরও যদি তিনি নিশ্চুপ থাকেন তাহলে বিচারকই তালাক হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন।
ব্রিটিশ অন মোহামেডান লতে স্যার সৈয়দ আমীর আলী উল্লেখ করেছেন; স্ত্রী ধর্মান্তরিত হলে, এই ধর্ম গ্রহণের প্রস্তাব স্বামীকে দিতে হবে। স্বামী তা প্রত্যাখ্যান করলে জজ তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের ডিক্রি জারি করতে পারেন অথবা বিয়েটা বাতিল করে দিতে পারেন। কিন্তু কোনো অমুসলিম দেশে স্ত্রী যদি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন এবং স্বামী যদি স্ত্রীর আমন্ত্রণে মুসলমান হতে অস্বীকৃতি জানান তাহলে এ পর্যায়ে বিচারকের ডিক্রি বা আদেশ ছাড়াই বিয়ের সমাপ্তি ঘটছে বিবেচনা করতে হবে।
পাকিস্তানি বিশ্লেষক আরিফ সিদ্দিকী এ মামলা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ব্যারিস্টার সৈয়দ আমীর আলী আদালতে উপস্থিত থেকে ভেরা তিশেঙ্গো ওরফে নূর জাহান বেগমের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। সিদ্দিকী সঠিক লেখেননি কারণ ব্যারিস্টার সৈয়দ আমীর আলী ১৯২৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন, আর এই মামলা রুজু হয় ১৯৪০ সালে। তবে আমীর আলীর গ্রন্থ উদ্ধৃত করে আদালতে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল। অধিকতর বিশ্লেষণে এটা প্রতীয়মান হয় যদি কোনো দেশে ইসলামী আইন কার্যকর অবস্থায় থাকে এবং বিবদমান স্বামী ও স্ত্রী সেই দেশের ডোমিসাইল বাসিন্দা হন কেবল তাহলেই এ আইনের প্রয়োগ সম্ভব। আইনের যে ধর্মীয় বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা তার বাস্তবায়ন কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিবেক ও বিবেচনাশক্তির ওপরই নির্ভর করে—ধর্ম চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়।
অন্য একটি মামলার উল্লেখ করা হয় ধর্মীয় বিবেচনায় হোক কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হোক বিয়েটা চুক্তিনামার চেয়েও বেশি—এতে দ্বৈত অধিকার ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। বিয়ে উভয়ের মর্যাদাও প্রতিষ্ঠিত করে। খ্রিস্টীয় আইনে তা হচ্ছে স্বামী ও স্ত্রীর মর্যাদা যা চাইলেই ক্ষুণ্ন করা যায় না। এখানে একক সিদ্ধান্তের সুযোগ খুব কম। বিয়েটা হচ্ছে আর সবাইকে বাদ দিয়ে দুজন নরনারীর স্বেচ্ছা মিলন। সেখানে আইনের সুযোগ খুব কম। খ্রিস্টীয় বিয়েটা হয়ে যাবে সারা জীবনের জন্য—ফর লাইফ। এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করার সুযোগও তাতে রাখা নেই।
১৯৩০ সালের ল্যাবিমসন বনাম ন্যাচিমসন মামলায় বলা হয়েছে, রাশিয়ায় সম্পাদিত বিয়ে ইংলিশ লতে ইংল্যান্ডেও বৈধ ও তা মর্যাদার সঙ্গেই দেখা হয়। কিন্তু এ বিয়ের সমাপ্তি ঘটানোর জন্য ভিন্ন দেশের ভিন্ন কোনো আইন বিয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ইসলামী আইনে বিয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকেন কাজি। এ ধরনের ক্ষেত্রে তালাকের উদ্যোগ কাজির গ্রহণ করার কথা। আদালত কি কাজির ভূমিকা গ্রহণ করে স্বামীকে তিনবার ডেকে ধর্মান্তরিত হতে বলবেন?
বিচারপতি স্যার বার্নস পিকক একটি মামলায় তার পর্যবেক্ষণ পেশ করেছেন: মুসলিম আইন ব্রিটিশ ভারতের আইন নয়। ভারতীয় আইন মুসলিম আইনের যতটুকু গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে ততটুকুরই কার্যকারিতা রয়েছে। ফতোয়া-ই-আমলগীরী বা অন্য অনুরূপ গ্রন্থ ভারতীয় আদালতের জন্য মান্য করা বাধ্যতামূলক নয়। আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক ১৭৯৩ সালের ৪ নম্বর রেগুলেশন।
অন্য একটি মামলার পর্যবেক্ষণ
বিয়ের মতো পবিত্র একটি সম্পর্ক কেবল একজনের ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে বাতিল হয়ে যেতে পারে না। বা আদালত হস্তক্ষেপ করে তা বাতিল করে দিতে পারেন না।
দীর্ঘ আলোচনার পর বিচারক এই বলে উপসংহার টানেন যদি বাদীকে বিয়ে বাতিলের মামলা করতেই হয় তাহলে তাকে স্বামীর ডোমিসাইলে গিয়ে তা করতে হবে যে আইনে বাদী প্রতিকারপ্রার্থী তা গণনীতি পরিপন্থী। সুতরাং আরজি খারিজ করা হলো।
নূর জাহান বেগম আদালত থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেও নতুন সম্পর্ক স্থাপন করা থেকে বিরত রইলেন না। অল্পদিনের মধ্যেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ধর্মান্তরিত ভেরা তিশেঙ্কো অতঃপর নূর জাহান বেগম মুসলিম আইনে বিয়ে করলেন। ত্রুটিপূর্ণ এ বিয়েও শেষ পর্যন্ত সুখের হয়নি।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





