ঢাকার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-১৮৮৫) আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেছেন। অখণ্ড বাংলায় অনগ্রসর মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।

আর খুজিস্তা আকতার বানু সোহরাওয়ার্দী (১৮৭২-১৯১২) নারী শিক্ষার অন্যতম অগ্রদূত। তিনিও লেখক ছিলেন, তার আইনা-ই-ইবরাত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোর পাঠ্য ছিল। খুজিস্তা তার চাচাতো ভাই জাহিদ সোহরাওয়ার্দীকে বিয়ে করেন। তিনিই স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৭০-১৯৪৯), কলকাতা হাইকোর্টের জজ ছিলেন। তখনকার মুসলমান সমাজের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব।

খুজিস্তা ও জাহিদের দুই সন্তান। বড় ছেলে হাসান শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯০-১৯৬৫) কবি, শিল্প সমালোচক, কূটনীতিবিদ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন ডি এইচ লরেন্স, রবার্ট ব্রিজেস, ফিলিপ আর্নল্ড হেসেলটাইন প্রমুখ। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন ও ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও শান্তিনিকেতনেও অধ্যাপক ছিলেন।

খুজিস্তা ও জাহিদের ছোট ছেলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩) অখণ্ড বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানেরও পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী। অত্যন্ত বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী তিনি অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন, গ্রেস ইন থেকে ব্যারিস্টার হন। পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম প্রথম পুরুষ। তার প্রথম স্ত্রী স্যার আবদুর রহিমের কন্যা বেগম নিয়াজ ফাতেমা। বিবাহিত জীবন খুব সংক্ষিপ্ত। ১৯২২ সালে নিয়াজ ফাতেমা এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে অকালপ্রয়াত। নিয়াজ ফাতেমার মৃত্যুর সঙ্গে স্বামীকে জড়িয়ে কিছু কাহিনী প্রচলিত। নিয়াজ ফাতেমার গর্ভজাতপুত্র সাহাব সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবস্থায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে লন্ডনে মারা যান। কন্যা বেগম আকতার সুলায়মান পাকিস্তানের বিশিষ্ট নারী নেত্রী। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দীর্ঘদিন বিপত্নীক জীবন যাপন করছিলেন। তারপর তার বর্ণাঢ্য জীবনে ভেরা তিশেঙ্কোর আগমন ঘটে। তিনি তাকে বিয়েও করেন। আমেরিকার ল অ্যান্ড রিভিউ জার্নালের নভেম্বর ২০১০ সংখ্যায় দ্য টু হাজব্যান্ডস অব ভেরা তিশেঙ্কো: অ্যাপোস্ট্যাসি, কনভার্সন অ্যান্ড ডিভোর্স ইন লেট কলোনিয়াল ইন্ডিয়া নামে রোহিত দের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। মূলত এ গবেষণাধর্মী রচনাকে ভিত্তি করে সোহরাওয়ার্দীর দ্বিতীয় স্ত্রী উপাখ্যানটি রচিত হলো। আরিফ সিদ্দিকীর দ্য স্টোরি ভেরা সোহরাওয়ার্দী থেকেও সাহায্য নিয়েছি। পঞ্চাশের দশকে চাকরি জীবনেরও করাচি পর্বে আমার বাবা তার কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে সেখানকার বাঙালি চাকরিজীবীদের সমস্যার কথা সোহরাওয়ার্দীকে শোনাতে তার করাচির বাড়িতে গিয়েছিলেন। তার জোড়াতালির বাংলা আমার বাবা মনে করতেন বেশ উপভোগ্য। তাদের সমস্যা বলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী বললেন বাকি সমস্যাগুলো তিনি জানেন। কিন্তু আসল সমস্যাটা কেউ বলে না তাই তিনিই বলে দিলেন, ‘তোমাদের বিবিজান থাকে ইস্ট বেঙ্গল, ওয়ান থাউজ্যান্ড মাইল ফারাকে। তোমরা থাকো করাচি। এত দূরের বিবিজান তো স্বপ্নেও দেখা যায় না। এটাই তোমাদের আসল সমস্যা।’

বিবিজানদের স্বপ্নে দেখার ব্রত নিয়ে তারা ফিরে আসেন। সোহরাওয়ার্দী আসলে কী বলেছেন আমার জানার কোনো উপায় নেই, বর্ণনাটা আমার বাবার। সম্ভবত সোহরাওয়ার্দী প্রভাবিত হয়েই তিনি বিবিজান শব্দটি বেশি উচ্চারণ করতেন। আমিও সেই সূত্রে লেখাটির নাম রেখেছি সোহরাওয়ার্দীর দ্বিতীয় বিবিজান।

মস্কো আর্টস থিয়েটারের পোলিশ অভিনেত্রী ভেরা তিশেঙ্কো স্বেচ্ছায় ২৭ জুন ১৯৪০ কলকাতার নাখোদা মসজিদে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মস্কো থেকে ঔপনিবেশিক নগর কলকাতা পর্যন্ত যাত্রার কাহিনী অনেক দীর্ঘ এবং কষ্টকরও। বিপ্লবের পর তাদের দেশছাড়া হতে হয়েছে তাকে। প্রথমে বার্লিনে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে রুশ অভিবাসী ইউজিন তিশেঙ্কোকে বিয়ে করেন। নািস অধ্যুষিত বার্লিন ছাড়েন, কিছুকাল কাটান গণযুদ্ধে জর্জরিত স্পেনে এবং সবশেষ এসে স্থিত হন মুসোলিনির রোমে। সেখানে একটি পুত্রসন্তান ওলেগ জন্ম গ্রহণ করে।  ব্রিটিশ মেডিকেল ডিগ্রি পরীক্ষায় পাস করতেই হবে তাই ১৯৩৮ সালে ইউজিন স্ত্রী ও পুত্রকে রোমে রেখে চলে এলেন ব্রিটেনের এডিনবরাতে। ভেরার সমস্যার কথা মস্কো আর্টস থিয়েটারের সাবেক পরিচালক প্রফেসর শহীদ সোহরাওয়ার্দী জেনেছেন এবং তিনি ভেরাকে কলকাতায় চলে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। দুজনের বিচ্ছেদের কারণটি স্পষ্ট নয়। অনুমান করা হয়েছে ইউজিন পরীক্ষায় পাস করে সম্ভবত ব্রিটিশ ভারতের কোথাও বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করে থাকবেন। কিন্তু ভেরা নিজেই বলেছেন তাদের সংসার ভালো চলছিল না। তিনি অসুখী ছিলেন। ইসলামের শিক্ষায় শান্তি ও আশ্রয় রয়েছে বলে তিনি যে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তা ইউজিনকে টেলিগ্রামযোগে জানালেন এবং তাকেও ধর্মান্তরিত হতে অনুরোধ জানালেন। ইউজিন তাকে জানিয়েছিলেন, তার নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি অনড় এবং কোনোভাবে এ বিশ্বাস তিনি ভঙ্গ করবেন না।

তখন নূর জেহান বেগম নাম নেয়া ভেরা তিশেঙ্কো ইডজিনের সঙ্গে তার বিয়ে অকার্যকর ঘোষণার জন্য মামলা করলেন কলকাতা হাইকোর্টে। ব্রিটিশ ভারতবর্ষের মুসলিম আইনের প্রখ্যাত পণ্ডিতরা বিভিন্ন আইনি সূত্র উল্লেখ করে জানালেন, স্ত্রী যদি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন এবং স্বামী বিধর্মী থেকে যান সে ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট স্বামীকে ডেকে মুসলমান হতে বলবেন। যদি স্বামী এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে স্বামী ও স্ত্রীর এই বিচ্ছেদই তালাক বলে বিবেচিত হবে। কলকাতা হাইকোর্ট দীর্ঘদিন এ নীতি অনুসরণ করে আসছে। যেহেতু তার স্বামী এ পর্যায়ে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি ভেরা আশা করেছেন শিগগিরই আদালতের আদেশ আসবে এবং তিনি কাঙ্ক্ষিত বিয়ে করতে পারবেন। পেছনের কাহিনী হচ্ছে তার এই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ হচ্ছেন কলকাতা বারের অন্যতম উজ্জ্বল আইনজীবী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, তিনি বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী। কাজেই তাড়াতাড়িই আইনি সুরাহা সবার কাছেই প্রত্যাশিত ছিল।

কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক নরমান এজলির মনে ভিন্ন চিন্তা। গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইনি বিষয়ের স্থায়ীকরণের জন্য তিনি তিন সদস্যের ‘এমিকি কিউরি’ নিয়োগ করলেন। অনুপস্থিত ইউজিনের পক্ষেও আদালতের নির্দেশে আইনজীবী নিয়োগ করা হলো।

যে আইনে দুজনের বিয়ে হয়েছে, সে আইন, পাত্রপাত্রীর দেশীয় আচার ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে রায় দেয়া হলো ভেরা তিশেঙ্কোর স্বামী ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করলে তার সঙ্গে বিয়ে তালাক জুড়ে দেয়া অযৌক্তিক, বেআইনি। ভেরা হেরে গেলেন, এ রায় দাম্পত্য সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

ভেরা ও সোহরাওয়ার্দী দুজনেরই চাওয়া ছিল নিষ্কণ্টকভাবে তাদের বিয়েটা হোক। অর্থাৎ আদালত ভেরা আর ইউজিনের বিয়েটা অকার্যকর ঘোষণা করুক। তাহলে দুজনের আনুষ্ঠানিক মিলনের বাধা দূর হয়ে যায়। কোর্ট বাধা হয়ে দাঁড়ালেও মানবিক সম্পর্কের কাছে আইনকেও পরাস্ত হতে হয়। ১৯৪০ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ভেরা তিশেঙ্কোর বিয়ে হয়ে যায়। তিনি স্বামীর উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যান। তিনি তার পক্ষে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির সঙ্গে সমঝোতার দরকষাকষিও করেন। তাকে দেখে সোহরাওয়ার্দী পরিবারের আরো অনেক নারী স্বাধীনচেতা হয়ে উঠতে শেখেন। একজন চেক নাগরিকের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী পরিবারের নারীর সাহসী প্রেমকাহিনী নিয়ে লিখেছেন পিটার স্মেতাসেক। পিটার সেই চেক পুরুষেরই পুত্র।

দুর্ভাগ্য ভেরা ও সোহরাওয়ার্দী দুজনেরই। তারা দাম্পত্য সম্পর্ক আন্তরিকভাবে ধরে রাখতে পারেননি। ভেরা দেখলেন সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ হচ্ছে বটে কিন্তু তার জীবন স্থবির হয়ে পড়ছে। ততদিনে ভারতবর্ষে অনেক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটল। ধর্মীয় বিভেদরেখা ধরে ভারত ভাগ হলেও সোহরাওয়ার্দী শুরুতে মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তানে এলেন না। একসময় তারও বোধোদয় হলো কলকাতাও তার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ভারতবর্ষে তার যত গুরুত্বই থাকুক না কেন খণ্ডিত ভারতে তার গুরুত্ব ক্রমেই কমে আসছে। একসময় পাকিস্তানে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিতে দেরি করে ফেললেও নেতৃত্বশূন্যতা তিনি দ্রুতই পূরণ করতে পারলেন এবং কিছুটা দেরিতে হলেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন।

এদিকে ভেরা তিশেঙ্কো লন্ডনে ফিরে যান। তিনি মস্কোর সেই মেধাবী ভেরা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চান। ততদিনে ১৯৪০ সালে জন্ম নেয়া সোহরাওয়ার্দী ও ভেরার সন্তান স্কুলে যেতে শুরু করেছে। ১৯৫১ সালে সোহরাওয়ার্দী লন্ডন এলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ভেরা ও ইউজিনের মধ্যে তালাক ঘোষিত না হওয়ায় ভেরা ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যকার ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিয়েটিরও পরিসমাপ্তি ঘটল সে সময়, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভেরাকে তালাক দিলেন।

তাদের একমাত্র ছেলে রাশেদ সোহরাওয়ার্দী ধীরে ধীরে রবার্ট অ্যাশবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে নয়, বরং মায়ের নাট্যপ্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করায় তিনিও নাটক ও সিনেমায় স্বনামে প্রতিষ্ঠিত হলেন।

ভেরা আলেকজান্দ্রোভনা তিশেঙ্কো ক্যালডারের জন্ম ১৯০২ সালে, সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে দশ বছরের ছোট। বাবা-মার বাধা অগ্রাহ্য করে শৈশব থেকেই ভেরার চাওয়া তিনি মঞ্চাভিনেত্রী হবেন। তিনি ‘চাইল্ড প্রডিজি’—বিস্ময়কর শিশু হিসেবে মস্কো আর্টস থিয়েটারে সবারই আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসেন। তার ওপর চোখ পড়ল চেখভের বিধবা স্ত্রী এলগা নাইপারের। তিনি ভেরাকে নিয়ে এলেন সেকালের থিয়েটার আইকন কনস্টেনটাইন স্টেলিসলাভস্কির কাছে। দুজনের এ সাক্ষাৎ ভেরার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। ভেরা তখন মঞ্চের অন্যতম আবেদন। নাট্যদলের সঙ্গে ইউরোপের মঞ্চ মাতালেন। এমন এক সফরেই ইউজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও প্রেম এবং তাড়াহুড়ো করে বিয়ে। সে বিয়ের অপূর্ণাঙ্গ তালাক আর সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালাক পাওয়ার পর পিছুটানগুলো কেটে গেল। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মাদার’-এর ভেরা ভ্লাসোভা নামে নিজের নামটা বদলে আমেরিকায় নাট্যকলার অধ্যাপনা শুরু করলেন। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন দলিলপত্রে তিনি ভেরা সোহরাওয়ার্দীই রয়ে গেলেন। তিনি টানা কুড়ি বছর নাট্যকলার ওপর নিয়মিত বক্তৃতা দিয়েছেন। তার প্রধান বিষয় স্তানিসলাভস্কির নাট্য পদ্ধতি শেখানো। তিনি ব্যস্ত জীবন পেয়ে গেলেন। ১৩ অক্টোবর ১৯৮৩ লস অ্যাঞ্জেলেসে স্ট্রোকে তার মৃত্যু হয়।

রাশেদ সোহরাওয়ার্দী কিংবা রবার্ট অ্যাশবি

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অপখ্যাত দুশমন হিসেবে অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আকতার সোলায়মানের নাম অবশ্যই নেয়া যায় কিন্তু একাত্তরের সক্রিয় বন্ধু রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর নাম প্রায় অনুচ্চারিত।

তার জন্ম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আইনগতভাবে তার ত্রুটিপূর্ণ দ্বিতীয় বিয়ের কনে ভেরা তিশেঙ্কোর সংসারে ১৯৪০ সালে। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত চার্টারহাউজ বোর্ডিং স্কুলে তাকে ভর্তি করে দেয়া হয়। স্কুলটি এখনো আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে রয়াল লন্ডনের একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টে যোগদান। তারপর দীর্ঘ সময় রয়াল শেকসপিয়ার কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেন। ডক্টর হুতে খলনায়কের ভূমিকা এবং জিন্নাহ চলচ্চিত্রে নেহরুর ভূমিকায় তার অভিনয় বহুল প্রশংসিত হয়েছে।

১৯৭১-এ রাশেদ সোহরাওয়ার্দী ৩১ বছর বয়সী সক্রিয় নাট্যকর্মী। তার বাবা সোহরাওয়ার্দীর দেশ বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করে তখনকার রবার্ট অ্যাশবি তার সম্পৃক্ততা ঘোষণা করতে পিছিয়ে পড়েননি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। সৎ মায়ের সন্তান বেগম আকতার সোলায়মান যখন পাকিস্তানের সমর্থনে সক্রিয় হলেন, তিনি বিরোধিতা করলেন এবং জানালেন আকতার সোলায়মান কখনো সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করেন না।

তিনি যুপগৎ মায়ের শিল্প ও বাবার রাজনীতি দুই-ই লালন করতেন। পরিণত বয়সে দেখতে বাবার মতো হয়ে উঠেছিলেন।

ডক্টর হুতে কাজ করার সময় লুইস জেমসনের সঙ্গে আবেগময় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অনেকদিন একসঙ্গে জীবন যাপন করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সংসার করা তার হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে বরাবর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন। সোহরাওয়ার্দীর লেখালেখি এবং তাকে নিয়ে লেখালেখি সংগ্রহ করে ঢাকা ও লন্ডনে সোহরাওয়ার্দী আর্কাইভ করতে চেয়েছিলেন। ১২ বছর আগে সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে ইংরেজিতে লিখিত কিছু প্রবন্ধ আলোচনা, বইয়ের অংশবিশেষের ফটোকপি সেই আর্কাইভের জন্য আমিও শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ইত্তেফাকের তত্কালীন নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূরকে দিয়েছিলাম। আমার প্রায় চার বছরের বিলেত জীবনে সেখানকার কজন বিশিষ্ট বাংলাদেশীকে বলতে শুনেছি সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাইকমিশনারের দায়িত্ব দিয়ে সম্মানিত করতে পারত। কিন্তু তা করা হয়নি। তিনি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতেন। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ লন্ডনের বাড়িতে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা