রেজা খান যে সময়ে বাংলার দেওয়ানি লাভ করেন, সে সময়ে সমগ্র বাংলা এক ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ইংরেজদের সহায়তায় মীর জাফর ঘরানার লোকেরা মসনদ লাভ করলেও ক্ষমতার মূল সুতো ইংরেজ কোম্পানির হাতেই ছিল। তবে ইংরেজরা খুব দ্রুত সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়নি। তাদের অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে শাসন ও রাজস্বে আধিপত্য অর্জনের জন্য কোম্পানি বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে ‘দ্বৈত শাসন’ অন্যতম। রেজা খানকে অনেকটা সেই দ্বৈত শাসনের একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। নায়েব দেওয়ান এবং নায়েব নাজিম—উভয় পদ লাভ করার ব্যাপারটি একাধারে তার জন্য সাম্মানিক হলেও বাস্তবিক তিনি পরবর্তী সময়ে এর কারণেই আক্রান্ত হন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর ষাটের দশকে ইংরেজরা ক্রমাগত বাংলায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। স্কুলপাঠ্য থেকেই আমরা জানি, এ কাজের জন্য ইংরেজরা দেশীয় লোকজনকে নানা পদ দান করেছিল। রেজা খানের ক্ষেত্রে ইংরেজরা রেজা খানকে সামনে রেখে নিজেদের কাজ হাসিলের চিন্তা করে। রেজা খান ইংরেজদের সহযোগিতা নিজে লাভ করেছিলেন এবং কোম্পানিকে কৃতজ্ঞতা জানাতে তার আপত্তি ছিল না, তিনি মোগল ঘরানার একজন সমর্থকও ছিলেন। বিশেষত প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি পুরনো নিয়মে চলতে পছন্দ করতেন। একাধিকবার তিনি মোগল কেতা পুনরায় চালু করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি তিনি নিজ দায়িত্ব সম্পর্কেও কোম্পানির কাছে প্রশ্ন তুলেছেন। দেওয়ানি লাভ করলেও রেজা খানের হাতে নিজামতের দায়িত্বও ছিল। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর তিনি মুর্শিদাবাদ কন্ট্রোলিং কাউন্সিলে প্রশ্ন তোলেন যে অন্যান্য সাধারণ অপরাধের পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে তিনি কী করবেন?

বিষয়টি বুঝতে হলে নবাবি বা মোগল কেতায় একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। মূলত একজন ‘নায়েব নাজিম’ বিচার ব্যবস্থার কর্তা। কোনো প্রদেশে ফৌজদারি অপরাধের বিচারের অধিকার তার। ‘নায়েব দেওয়ান’ মূলত রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনার অধিকারী। কাউন্সিলে প্রশ্নটি তোলার মাধ্যমে রেজা খান মূলত মনে করিয়ে দিলেন যে আনুষ্ঠানিকভাবে তার উপাধি নায়েব দেওয়ান হলেও তিনি নিছক কোম্পানির কর্মচারী নন। প্রশ্নটি মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা কাউন্সিলে প্রেরণ করা হয়। ২২ তারিখ জানিয়ে দেয়া হয় যে ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি বিধিমতো ফৌজদারি আদালতে নিষ্পত্তি হবে এবং জমি ও খাজনাসংক্রান্ত সমস্যা খালসা কাচারিতে প্রেরণ করতে হবে। ঋণসংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে মুর্শিদাবাদ কাউন্সিলের পরামর্শ নিতে হবে এবং যেকোনো ধরনের জটিলতার ক্ষেত্রেও কাউন্সিলকে জানাতে হবে। ডাকাতি কিংবা হত্যার ক্ষেত্রে কারো বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করার ক্ষেত্রে কাউন্সিলকে পরোয়ানার নকল জমা দিয়ে পরোয়ানা জারি করতে বলা হয়। অর্থাৎ এ সময়ে রেজা খানের হাত থেকে সব ধরনের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়।

অবশ্য কলকাতা কাউন্সিল থেকে আসা জবাবে সরাসরি কোনো মত দেয়া হয়নি। তবে বলা হয়, বিচারিক বিষয় আগের মতোই থাকবে। তবে বিকার অবশ্য রেজার পক্ষেই মত দেন। তিনি বলেন, রাজস্ব ক্ষেত্রে নানা বিষয়ে কাউন্সিল তদারক করতে পারে। কিন্তু ফৌজদারি মামলা যেমন খুনোখুনি, জমিজমাসংক্রান্ত সমস্যায় কোম্পানির নাক গলানো ঠিক হবে না। নায়েব দেওয়ান ও নাজিমের প্রায়োগিক ক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা টানার এক ধরনের প্রয়োজন অনুভব করেন রেজা খান। ৩ ডিসেম্বর রেজা খান সরাসরি প্রশ্ন রাখেন, ‘আগের রীতি অনুসারে নায়েব নাজিম ও নায়েব দেওয়ানকে স্বয়ং সম্রাট নিয়োগদান করতেন। প্রথমজন (নায়েব নাজিম) সম্রাটের এবং দ্বিতীয়জন (নায়েব দেওয়ান) প্রধান উজিরের প্রতিনিধিত্ব করতেন।’ এভাবে নাজিম ও দেওয়ানের মর্যাদা বুঝিয়ে তিনি কিছু প্রশ্ন ও প্রস্তাব রাখেন। স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদ কাউন্সিল বিষয়টিকে কলকাতায় প্রেরণ করে। তবে বিষয়টি এক রকম ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। পাশাপাশি এমন কিছু নিয়ম জারি হয়, যা রেজা খান ও পুরনো নিয়মের পরিপন্থী।

কলকাতা কাউন্সিল প্রকাশ্যে নিজামতের ওপর হস্তক্ষেপ না করলেও নেপথ্যে বেশকিছু কাজ করেছিল, যা নিজামত তথা রেজা খানের ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। বারবার তারা বলে, ‘ইংরেজরা কোনো হস্তক্ষেপ করবে না’, অন্যদিকে ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ইংরেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুর্শিদাবাদ কাউন্সিলকে জানানো হয় যে হিন্দুদের মামলা নিষ্পত্তিতে ব্রাহ্মণ ও মুসলিমদের মামলায় মুসলিমদের নিয়োগ ও জরিমানা করার অধিকার সম্পর্কিত সনদ রদ করতে বলা হচ্ছে। মূলত রেজা খান প্রায় দুই বছর ধরে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে নীরব যুদ্ধ করে গেছেন। রেজা খানের ক্রমাগত লাড়াইয়ের উদ্দেশ্য ছিল নিজামতের মর্যাদা রক্ষা এবং অবশ্যই নিজস্ব ক্ষমতার নিরাপত্তা। যেমন নানা সময়ে নানা অজুহাতে ব্রিটিশ প্রশাসন রেজা খানের বেতন বা প্রাপ্য থেকে টাকা কেটেছে। তবে এসব অনেক কিছুই রেজা খান মেনে নিলেও খেলাৎ প্রদানের ক্ষেত্রে কোম্পানি নানা বিধিনিষেধ আরোপ করলে রেজা খান এর প্রতিবাদ করেন।

খেলাৎ মূলত সম্রাট বা নবাবের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেয়া পোশাক। খেলাৎ নানা প্রকার হয়, তবে নবাবি উপহার হিসেবে তা অবশ্যই বহুমূল্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ ফোর্ট উইলিয়াম থেকে প্রেরিত একটি চিঠিতে বলা হয়, ইউরোপীয়দের মধ্যে একমাত্র গভর্নর, মুর্শিদাবাদ কাউন্সিলেরে প্রধান ও সদস্যরা খেলাৎ পাওয়ার যোগ্য হবেন। এক্ষেত্রে খেলাতের মূল্য ব্যক্তিভেদে যথাক্রমে ৫ হাজার, ২ হাজার ও ৫০০ রুপির বেশি হতে পারবে না। কাউন্সিল থেকে যুক্তি দেখানো হয় খরচ কমানোর জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। রেজা খান নবাবের পক্ষ থেকে ৪ হাজার রুপির বেশি মূল্যের খেলাৎ নিতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়। রেজা খান নিজের খেলাৎ ত্যাগ করতে রাজি হন। তবে তিনি বলেন, ‘অন্যদের উপযুক্ত খেলাৎ দিতে হবে। নচেৎ খোদ নিজামতের মর্যাদায় আঘাত লাগবে।’ এছাড়া খরচ কমানোর নামে ব্রিটিশরা নিজামতের বরাদ্দ হতে সোয়া লাখ রুপি কমিয়েছিল। রেজা খান এ অর্থ পুনরায় প্রদানের দাবি করেন। নবাবের পক্ষ থেকে প্রতি বছর তার কর্মচারীদের কিছু পরিমাণ খেলাৎ দেয়াই নীতি। মুর্শিদাবাদ কাউন্সিল এক্ষেত্রে রেজা খানের পক্ষে মত দিলে এ অনুষ্ঠানে অনধিক ৬০ হাজার রুপি খরচের অনুমোদন দেয়া হয়।

খরচ কমানোর নামে স্থানীয় জমিদার ও রাজাদের ক্ষমতা হরণের চেষ্টা করেছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। রেজা খান তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, বাংলা এখনো মোগল শাসনাধীন এবং ব্রিটিশ কোম্পানি কেবল দেওয়ানি ক্ষমতার অধিকারী। এদিকে কোম্পানি প্রশাসন দেশীয় জমিদারদের ভূমি হরণের চেষ্টা করে। যেমন বর্ধমানের রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তিই কেবল তার জীবনযাপনের জন্য রাখা হয়। দেওয়ানি অধিকারের অঞ্চলের ক্ষেত্রে রাজশাহী ও নদীয়ায় কোম্পানি নিযুক্ত কৃষকদের জমি দেয়া হয়। রেজা খান এ পর্যায়ে জমিদারদের পক্ষ হয়ে ব্রিটিশদের কাছে দাবি করেন। নদীয়ার রাজার সম্মান, তার পরিবার ও অধীনস্থদের হিসাব করে তার সাড়ে ৩ লাখ রুপি প্রয়োজনের বিপরীতে রেজা খান ৩ লাখ রুপির দাবি করেন। তবে ইংরেজদের অবস্থা দেখে তিনি ২ লাখ রুপির বেশি জোরাজুরি করেননি। রানী ভবানীর জন্য সাড়ে ৩ লাখ রুপি চাওয়া হয়। তবে বলা হয়, আড়াই লাখেও কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। উভয় ক্ষেত্রেই তার দাবি মঞ্জুর করা হয়। ইউসুফপুর তথা যশোরের জমিদারির ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক জমিদারের ক্ষেত্রে মাসিক ২ হাজার রুপির মাসোয়ারা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়।

ইংরেজরা লক্ষ করতে থাকে যে রেজা খান নানা ক্ষেত্রে তাদের বিরোধী মত ব্যক্ত করে চলেছেন। যেমন জমিদারদের স্বাধীন তালুক তৈরিতে রেজা খানের সম্মতি ছিল। অন্যদিকে ইংরেজ কোম্পানি যখন দেশীয় ভূমি ব্যবস্থার নানা কর্মচারীদের সরিয়ে দিতে চাইছিল, রেজা খান তখন তাদের পুরনো পদে বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। কানুনগো, মুহতাসিব, আখবারনবিশ, শানিগর প্রভৃতি কর্মচারীদের পদ বিলোপ করার পক্ষে তিনি ছিলেন না। ইংরেজ অফিসারদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কানুনগো পদটি রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। রেজা খান স্বীকার করেন যে বড় জমিদারিতে তাদের কোনো কাজ নেই, কিন্তু ছোট ছোট এস্টেট আছে এমন সব ফৌজদারি জেলায় কানুনগোদের প্রয়োজন রয়েছে।

মুদ্রা তৈরি ও প্রচলন বিষয়েও রেজা খানের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরোধ হয়। ইংরেজরা নতুন মুদ্রা প্রচলন করতে চাইলে রেজা খান প্রথমে তাতে সায় দেন। কিন্তু পরে তার মনে হয় এ রকম করা হলে পুরনো মুদ্রা ও নতুন মুদ্রার পার্থক্যের কারণে দেশীয় মহাজন এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও ‘বাট্টা ব্যবস্থা’ নানা জটিলতা তৈরি করত, কিন্তু সে সময় পর্যন্ত এছাড়া কোনো সহজ ব্যবস্থায় আসা সম্ভব ছিল না। ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে ‘বাট্টা’ ব্যবস্থা বিলোপ করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। এ সময়ে ভারতে নানা ধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল। কোনোটি আর্কটের, কোনোটা ওয়াজিরি, কোনোটা বেনারসের রুপি; এর পাশাপাশি ছিল ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা ও কলকাতার সিক্কা। রেজা খান নতুন করে একই মানের মুদ্রা তৈরির নির্দেশ দেন, কিন্তু ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুর্শিদাবাদের টাঁকশালে অন্য প্রকার মুদ্রা তৈরি করে নজরানা প্রেরণ করেন। বহুদিন পর্যন্ত সম্রাট কিংবা কার্টিয়ার, কারো কাছ থেকে জবাব না পেয়ে রেজা খান ব্যক্তিগতভাবে কার্টিয়ারকে চিঠি দেন। কার্টিয়ার জবাবে জানান কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুসারে মুদ্রা তৈরি করে তা বিতরণ করতে হবে।

ছোট ছোট নানা বিরোধ ক্রমে বৃহদাকার ধারণ করে। কিংবা বলা যায়, ব্রিটিশরা তাদের প্রভাব বাড়িয়ে চলছিল, যা ক্রমে প্রত্যক্ষ হতে শুরু করে। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে নবাব মুবারক-উল-মূলকের সেনাদের অব্যাহতি দিয়ে কোম্পানির চার ব্যাটালিয়ন সৈন্যকে সে স্থানে নিয়োগ দিতে কার্টিয়ারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়। কেবল এখানেই শেষ নয়। সৈন্যদের বেতনও নিজামতের বরাদ্দ ১৬ লাখ রুপি থেকে দেয়ার কথা বলা হয়। রেজা খান বেশ চতুরতার সঙ্গে এর জবাবে (নবাব অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে রেজা খান তার পক্ষ থেকে চিঠি লিখেছিলেন) লেখেন, ‘নবাবের এ সম্মান বৃদ্ধিতে তিনি খুশি।’ কিন্তু অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের নিজামতের অর্থে পুষতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ এ সময়ে এসে রেজা খান সরাসরি ইংরেজদের অনুরোধরূপী আদেশের বিরোধিতা করেন। পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। অর্থা, ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের অন্তরায়।

পরবর্তী সময়ে রেজা খানের ভাগ্য খারাপই বলতে হয়। একদিকে ইংরেজদের সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হচ্ছিল, অন্যদিকে কলকাতায় ক্লাইভের সমর্থক গোষ্ঠীকে সরিয়ে দেয়া হয়। সেখানে আসেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা। রেজা খান ক্লাইভের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছিলেন। হেস্টিংসের তিনি চক্ষুশূল হবেন তা স্বাভাবিক। তবে রেজা খান হেস্টিংসের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করেন। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে তিনি একটি চিঠিসহ হেস্টিংসকে কিছু উপহার পাঠান। হেস্টিংস জবাব দিয়েছিলেন, তবে এমন ব্যবস্থা করেন যেন তা কার্টিয়ারের চোখে পড়ে। মূলত রেজা খানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বা সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা তার ছিল না।

হেস্টিংসের দায়িত্ব নেয়ার এক পক্ষকালের মধ্যে রেজা খান বুঝে যান তার সময় হয়ে এসেছে। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ এপ্রিল ‘ল্যাপউইং’ নামক জাহাজে একটি চিঠি আসে। সিক্রেট কমিটির পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, রেজা খানের যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে কলকাতায় পাঠাতে হবে। হেস্টিংস কাজটি বহরমপুর ব্রিগেডের কমান্ডিং অফিসারকে দিতে পারতেন, কিন্তু তাতে কাজটি কঠিন হবে মনে করে মিডলটনকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়। ২৬ এপ্রিল মিডলটন আদেশনামা লাভ করেন। ২৭ এপ্রিল সকালে বহরমপুর ব্রিগেডের আট কোম্পানি সৈন্য মুর্শিদাবাদে মোতায়েন করা হয়। রেজা খানের সঙ্গে কথা বলার জন্য অ্যান্ডারসন তার প্রাসাদে যান এবং মিডলটন নবাবের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের ইচ্ছা ছিল রেজা খানকে বুঝিয়ে বা ভয় দেখিয়ে কম ঝামেলা করে গ্রেফতার করা।

কিন্তু রেজা খান প্রস্তুতই ছিলেন। কোনো রকম সমস্যা না করে তিনি গ্রেফতার বরণ করেন। এ সম্পর্কে মিডলটন বলেন, ‘এ কথা উল্লেখ না করলে ভুল হবে যে তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে নিজের এ পরিণতি বরণ করেছেন।’ মুর্শিদাবাদে তত্ক্ষণাৎ কোনো গোলযোগ হয়নি। রেজা খানের ‘নিশাত বাগ’ নীরবে দখল করে নেয়া হয়। তার ১০০ ঘোড়সওয়ার ও ৫০০ সিপাহিকে সরিয়ে কোম্পানির সিপাহি মোতায়েন করা হয়। রেজা খানের সঙ্গে তার দেওয়ান মহারাজা অমৃত সিংকেও গ্রেফতার করা হয়। বলা চলে বাংলার একজন ক্ষমতাধর এবং পদধারী প্রতিবাদী ব্যক্তির গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ সময়ে ১৫ বছরের মধ্যে ‘চতুর্থ বিপ্লব’টি সম্পন্ন হয়। রেজা খানের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে ইংরেজ শক্তির ক্ষমতা সুসংহত হওয়ার পথ তৈরি হয়।

কিন্তু ব্যক্তি রেজা খানের জীবনের পরবর্তী অধ্যায় চমকপ্রদ। গ্রেফতারের পর তাকে বিচারের অধীনে আনা হলে দেখা যায়, রেজা খানের তেমন কোনো অপরাধ পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত তিনি ক্লাইভের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। কিন্তু কার্যকালে তিনি কোনো অপরাধ বা দুর্নীতি করেছেন বলে প্রমাণ হয়নি। বরং ফোর্ট উইলিয়ামের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা দুর্নীতির কথাই এ সময়ে উঠে আসে। মূলত ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষ রেজা খানকে বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা করেছে। ফলে কোনো অপরাধ প্রমাণ না হওয়ার কারণে রেজা খানকে সসম্মানে মুক্তি দেয়ার পাশাপাশি তাকে তার পদে বহাল করা হয়। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘নায়েব দেওয়ান’ পদটি পুনরায় লাভ করেন। বলা যায়, রেজা খান নাটকীয়ভাবে নবজীবন লাভ করেন।

কিন্তু ততদিনে বাংলার রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গিয়েছিল। ওয়ারেন হেস্টিংসের নানা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাংলার প্রশাসনে পরিবর্তন চলছিল। ১৭৭৩-এর ‘রেগুলেশন অ্যাক্ট’ এবং অন্যান্য নিয়মের মধ্য দিয়ে প্রশাসনে লোকবল কমানোর ব্যবস্থা হতে থাকে। এসবের মধ্যেও রেজা খান তার দায়িত্ব পালন করে চলছিলেন। বলা চলে ভালোই করছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি বেশ লম্বা সময় তার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মূলত ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস আনুষ্ঠানিকভাবে পদটি বিলুপ্ত করলে রেজা খানের আর কিছু করার ছিল না। তিনি দ্বিতীয়বারের মতো পদটি হারান। ধারণা করা হয়, এতে তিনি হতাশ হয়ে সে বছরই মৃত্যুবরণ করেন। বাংলার দেওয়ানির সঙ্গে সঙ্গে রেজা খানের নামটিরও সমাধি হয়।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক