[‘কুবলা খান’ স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের স্বপ্নে পাওয়া কবিতা। কবিতাটির ভূমিকায় কবি স্বয়ং এই স্বপ্নদর্শনের কথা লিখেছেন। মোঙ্গল শাসক কুবলা খানের জানাদু প্রাসাদ নির্মাণের কথা একটা বইতে পড়তে পড়তে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। এই ঘুমের মধ্যেই তিনি কবিতাটির দু-তিনশ লাইন রচনা করলেন। ঘুম থেকে উঠে সেই স্বপ্নে রচিত লাইনগুলো লিখতেও বসলেন। কিছুটা লেখার পর কোনো এক পরিচিত ব্যক্তি জরুরি কিছু কথা বলতে আসে কোলরিজের কাছে। কিন্তু হায়! অভিমানী অবুঝ কবিতা কি প্রয়োজন বোঝে? তাই প্রয়োজনীয় কথার মাঝে যথারীতি তার মাথার ভেতর রচিত লাইনগুলো মুছে যেতে থাকে ক্রমশ এবং পরবর্তী লাইনগুলো আর তিনি মনে করতে পারেন না। মুছে যাওয়া ওই লাইনগুলোর জন্যই কবিতাটি রচনা তার সম্পূর্ণ হয় না। যতটুকু লিখেছিলেন সেটুকুই নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। কোথাও প্রকাশের জন্য দেননি। ‘কুবলা খান’ লেখার প্রায় বছর ২০ পর এক বন্ধু সমাগমে, আড্ডায় তিনি ওই কবিতাটি পড়ে শোনান। কবি বন্ধু বায়রন মুগ্ধ হয়ে যান। তার মতে ‘কুবলা খান’ কোলরিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। ১৮১৬ সালে বায়রনের অনুপ্রেরণাতেই কবিতাটি প্রকাশিত হয়]
কুবলা খান
অথবা, একটা স্বপ্নে পাওয়া দৃষ্টি। একটি অংশ।
স্যামুয়েল টি কোলরিজ
অনুবাদ: রিমি মুৎসুদ্দি
কুবলা খান আদেশ দিলেন
জানাদুতে গড়ে উঠবে প্রমোদ-প্রাসাদ:
যেখানে পবিত্র নদী আলফ ছুটে যায়
মানুষের সীমাহীন অগণ্য গুহার মধ্য দিয়ে
সেখানে, যেখানে এক সূর্যহীন সমুদ্দুর
গড়েছে আবাদ।
সেকারণে পাঁচ ক্রোশ উর্বর জমিন
দেয়াল আর মিনারেই হয়ে গেল ঘেরা;
বাগান ঝলমলে হয়ে উঠল যত বিসর্পিল জলের ধারায়
গাছে রইল ফুল যত কাছে ভেসে এল সুগন্ধরা
পাহাড়ের মতো যত প্রাচীন অরণ্য ছিল ছিটিয়ে ছড়িয়ে,
সবুজের মধ্যিখানে সূর্যছাপ সর্বাঙ্গে জড়িয়ে
কিন্তু ওহ! গভীর প্রেমের সেই খাদ বেঁকে গেছে
সবুজ পাহাড় বেয়ে নিচে নামা পথ দারুবৃক্ষটিকে আচ্ছাদন হিসেবে পেয়েছে
আদিম এই স্থান! বড় পবিত্র ও জাদুময়
যেন কোনো ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের তলায়
কান্নায় কাতরাচ্ছে নারী, রাক্ষস-প্রেমিক পিপাসায়!
খাদের ভিতর থেকে অবিরাম ঘূর্ণনের ধ্বনি,
যেন এই পৃথিবীর ছুটে চলার প্রতিধ্বনি,
মহতী ঝরনাকে এক মুহূর্তে থামিয়ে
তার ভিতরের সব আধাআধি বিস্ফোরণে
বিপুল খণ্ডাংশগুলো পাক খায় ফিরে আসা ঝড়ের মতন
যেভাবে ঝাড়ুনি ঝাড়ালে পরে মাটিজুড়ে পড়ে থাকে
কত শস্য অগণন।
সেইসব নৃত্যরত পাথরের ভিতরেই একবার বারবার
নিক্ষিপ্ত হয়েছে তারা পবিত্র নদীতে
দশ ক্রোশ পথ এঁকেবেঁকে যেন গোলকধাঁধায়
বন আর উপত্যকা চিরে সেই নদী ছুটে গেছে তার নিজস্ব রীতিতে
তারপর পৌঁছেছে মানুষের সীমাহীন গুহার ভিতরে,
ডুবে গেছে প্রাণহীন সমুদ্রের তুমুল শোরগোলে
আর সেই শোরগোলে কুবলা শুনতে পেল দূর থেকে পূর্বপুরুষের গলা,
হেঁকে উঠছে, যুদ্ধ লাগল বলে!
সুখের গম্বুজ থেকে ছায়া
ভেসে যায় ঢেউয়ের মাঝখানে
শোনা যায়, মিশ্র ধ্বনিমালা, গুহা আর ঝরনার বিতানে
সে এক বিরল অলৌকিক,
সূর্যস্নাত গম্বুজের ভিতরের গুহাজুড়ে বরফ ঝিকমিক!
আদিম পিয়ানো হাতে কুমারী সে নারী
স্বপ্নে একবার আমি তাকে দেখলাম
হাবশি সেই মেয়ে তার বাদ্য বাজাচ্ছিল
গাইছিল অ্যাবোরা পর্বতের গান।
তার ছন্দ আর তার গান,
জাগাতে পারব কি আমি আমার ভিতরে
এমনই গভীর এক আনন্দে তা জিতবে আমাকে
উচ্চকিত বাজনা দিয়ে আমিও দীর্ঘক্ষণ ধরে
বানাব সে গম্বুজ হাওয়ায়,
সূর্যস্নাত যে গম্বুজে বরফের গুহা দেখা যায়!
আর যারা শুনেছিল তারা সবাই সব দেখবে ওখানে
সবাই চিত্কার করবে, ‘সাবধানে! সাবধানে!’
প্রজ্বলিত চোখ তার, তার ওই ভাসমান চুল!
তাকে ঘিরে তিন-তিনবার বৃত্ত গড়েছে নির্ভুল,
তোমার দু’চোখ বন্ধ করে নাও পবিত্র শঙ্কায়
কারণ মধুর আঠা খেয়ে তার ক্ষুধা মিটে যায়,
আর তারপরে সে স্বর্গের সুধা পান করে।





