আলেকজান্ডারের নামের শেষে ‘দ্য গ্রেট’—আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বিশ্বস্বীকৃত, পরিচিতি। কুবলাই খান নিয়ে পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখি প্রায় সব রচনাতেই তিনি ‘দ্য গ্রেট’ কুবলাই খান। তার বিশ্বখ্যাত পিতামহ চেঙ্গিস খানের সঙ্গে ‘শ্রেষ্ঠ’ কেন মানানসই হয় না, চেঙ্গিস খানের একটি উদ্ধৃতিতেই তা স্পষ্ট। তিনি বিজিত রাজ্যের জনগণের উদ্দেশে বলেছেন:

‘তোমরা যদি বড় ধরনের কোনো পাপ করে না থাকো, তাহলে ঈশ্বর আমার মতো আজাবকে তোমাদের জন্য কেন পাঠাবেন।’

আর তার দৌহিত্র কুবলাই খান বলেছেন:

‘আমি শুনেছি ঘোড়ায় চড়ে সাম্রাজ্য জয় করা যায়, কিন্তু ঘোড়ার পিঠে বসে সাম্রাজ্য শাসন করা যায় না।’

আরেকটি কথা, কেউ মনে করেন কুবলাই খানের, কেউ বলেন চেঙ্গিস খানের: যতক্ষণ না অনুসারীরা সুখী হয়, নেতা কখনো সুখী হতে পারেন না।

তবে সে জীবনাচরণ কুবলাই খানের, এ কথার প্রয়োগ তার বেলায়ই বেশি প্রযোজ্য।

চেঙ্গিস খানের কনিষ্ঠ পুত্র তলুইয়ের চতুর্থ পুত্রসন্তান কুবলাই খান। নাম শুনেই চেঙ্গিস খানকে মুসলমান মনে করার কারণ নেই। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র জসির ছেলে বার্কে খান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন; চেঙ্গিস খানের জীবদ্দশায় তাকেই একমাত্র মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কুবলাই খানের জন্ম ২৩ সেপ্টেম্বর ১২১৫; তার মা সোরঘাঘতানি বেকি একজন উদারতাবাদী নেস্টেরিয়ান খ্রিস্টান। ধর্মীয় ও সংস্কৃতির সহিষ্ণুতার শিক্ষা কুবলাই খান মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যের প্রধান হিসেবে তিনি যখন সং রাজাদের উচ্ছেদ করে সমগ্র চীনের অধিশ্বর হলেন, তিনি কর্তৃত্ববাদী বিজয়ীর মতো তাদের শিল্প ও সংস্কৃতি ধ্বংস করলেন না, এমনকি বহু কর্মকর্তাকেই নিজ অবস্থানে দায়িত্বে অক্ষত রাখলেন। তিনি মঙ্গোলীয় ও চীনের উভয় সংস্কৃতিকে নিজের মহিমায় অধিষ্ঠিত রাখার সুযোগ সৃষ্টি করলেন।

ভুল বোঝার সুযোগ নেই, কুবলাই খান কিন্তু চাইনিজ নন, বরং মঙ্গোলীয়। সাম্রাজ্য বিস্তার করতে করতে চীনের প্রায় পুরোটাই দখলে নিয়ে নিজের রাজধানী স্থাপন করেন এখনকার বেইজিংয়ের পাশে। বহিরাগত দখলদার কুবলাই খান একসময় হয়ে ওঠেন চীনাদের প্রিয় ‘বার্বারিয়ান’, প্রিয় বর্বর।

বর্বর শব্দটিকে যতটা নেতিবাচকভাবে আমরা গ্রহণ করে থাকি, শুরুতে তা ছিল না। গ্রিক ও রোমানরা তাদের ছাড়া ভিন্ন ভাষাভাষী আর সবাইকে বর্বর মনে করত। তারা সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত হয়। তারা আদিম, তারা সংস্কৃতি জ্ঞানসম্পন্ন নয়। চীনাদের কাছে মঙ্গোলীয়রাও বর্বর। কিন্তু কুবলাই খান তাদের প্রিয় বর্বর।

চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর সময় তার সাম্রাজ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে, কিন্তু নিকটবর্তী চীন তখনো ধরা দেয়নি। চীন তখন এমনিতেই হাজার বছরের অখণ্ড অঞ্চল, ক্ষমতায় রদবদল হলেও ভূখণ্ডে পরিবর্তন দেখা দেয়নি। চেঙ্গিস খানের দৌহিত্র ক্ষমতাসীন হয়ে সাম্রাজ্য চারদিকে বিস্তৃত করার চেয়ে প্রতিবেশী অঞ্চল নিয়ে অখণ্ড সাম্রাজ্য সৃষ্টি করতে চাইলেন। চীনাদের জন্য অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা ঘটিয়ে দিলেন। চীনাদের আনুগত্য লাভের জন্য তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন। তার বাহিনী যখন চীন দখল করল, চীনের নাবালক সম্রাট আত্মহত্যা করলেন। মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্তাদের আরো অনেকে সম্রাটকে অনুসরণ করে আত্মহত্যা করলেন।

হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় চীন একজন বর্বরের শাসনাধীনে চলে যাওয়ায় শিক্ষিতজনের মধ্যে যথেষ্ট যাতনা ছিল। নব্য ধর্মান্তরিত সম্রাট যে কাজটি করলেন তাও অবিশ্বাস্য এবং রাষ্ট্রক্ষমতা সংহত করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুকরণীয়। তিনি মঙ্গোলীয় সংস্কৃতি চীনের ওপর না চাপিয়ে সদলবলে চীনা সংস্কৃতির চর্চা শুরু করলেন। মঙ্গোলীয় এলিটদের প্রিয় কুস্তি, ঘোটকীর গাঁজানো দুগ্ধ থেকে প্রস্তুত পানীয়, গলা ফাটানো গান আর চীনা এলিটদের প্রিয় কারুকার্য চিত্র প্রদর্শনী করা, বিদ্যার্জন করা।

কুবলাই খান তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী বাহিনীর সঙ্গে পুরোটা লড়াই করে চীন জিতে নেননি, তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছেন। একটি বড় যুদ্ধ হয়েছিল জিয়াংইয়াংয়ে। শহরটি দুর্ভেদ্য দেয়াল ঘেরা। পাঁচ বছর অবরুদ্ধ রাখার পরও মঙ্গোলরা ভেতরে না গিয়ে কিংবা চীনারা বেরিয়ে তাদের পরাস্ত করতে পারছিল না। ইয়াংজি নদীর দক্ষিণাংশের দিকে যখন কুবলাই খানের নজর পড়ে, তখন চীনারা প্রতিরক্ষার জন্য ১০ লাখ প্রশিক্ষিত ও স্বল্প প্রশিক্ষিত সৈনিক মোতায়েন করে। তাদের হাতে বারুদসহ আধুনিক মারণাস্ত্রের ঘাটতি ছিল না। জিয়াংইয়াংয়ের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভাঙতে কুবলাই খানকে নিজ বাহিনীর বাইরেও দক্ষ গোলন্দাজ আমন্ত্রণ জানাতে হয় এবং তারা অত্যন্ত ভারী গোলা নিক্ষেপ করে দেয়াল দুর্গ ও প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দেয়।

বর্বর মঙ্গোলীয়দের হাতে কয়েক সহস্র বছরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক চীনের এ পতন দেশবাসীর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আত্মহত্যার হিড়িক পড়ে যায়। কিন্তু কুবলাই খান দ্রুত যুদ্ধের ক্ষত শুকিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং পরাজিতদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন। লুটপাট ও সম্ভোগ থেকে সৈনিকদের নিরস্ত করেন। রাষ্ট্রীয় কাজে কর্মরত চীনারা যে অবস্থানে ছিলেন তাদের সে অবস্থানে থেকেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলেন। সং রাজবংশের বিরোধীরা তাকে সমর্থন দিলেন।

কুবলাই খান যতটা সম্ভব ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার এবং সুশাসনের সিদ্ধান্ত নিলেন। মূলত মায়ের কাছে নীতিশিক্ষায় শিক্ষিত সম্রাট মানুষকে মর্যাদা দিতে জানতেন। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে চীনারাও অভিভূত হলো।

তিনি বহুসংখ্যক মুসলমানকে রাজকার্যে নিয়োজিত করলেন এবং চীনের ক্ষুদ্র নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করলেন। কার্যত তার সময়েই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছিল। তার খ্যাতির অন্যতম কারণ সহনশীলতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

১২৭৯ সালে তিনি দক্ষিণ চীন বিজয়ের মাধ্যমে সং রাজবংশের পতন ঘটিয়ে যখন সম্রাটের আসনে বসলেন, সার্বিকভাবে চীনের সিংহাসনে বসা প্রথম জাতিগত অচীনা শাসক হলেন কুবলাই খান। চীনা সংস্কৃতির অনুসরণে তিনি তার রাজবংশের নামকরণ করলেন ইউয়ান রাজবংশ।

কুবলাই খান রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। চীনে প্রথম কাগুজে মুদ্রা তার আমলেই চালু হয় এবং বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে দ্রুত সমাদৃত হয়ে চীনের অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে প্রাণের সঞ্চার করে।

তার আগের কোনো রাজবংশের শ্রেষ্ঠ শাসকও যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিতে সাহস পাননি, ইয়াংজি নদী ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সংযোজক গ্র্যান্ড ক্যানেল পার্বত্য পথের মধ্য দিয়ে তার পক্ষেই খনন করার উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়েছে।

খ্রিস্ট জন্মের ৫০০ বছর আগে পরিকল্পিত এ খালের কিছুটা অংশ তখনই খনন করা হয়েছিল, কিন্তু পার্বত্য ও পাথুরে অংশের কারণে পরবর্তী কাজ তেমন এগোয়নি। কুবলাই খান ৩০ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত করে কাজটি সম্পন্ন করেন। এটিই মনুষ্যসৃষ্ট সর্ববৃহৎ খাল।

চীনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রযুক্তি, গণিত ও বিজ্ঞানের বিশেষ অগ্রগতি হয়েছে তার সময়ে। চীনের সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক একাত্মতার বড় প্রমাণ সম্রাট ১২৭১ সালে নিজের জন্য চৈনিক নাম শিজু গ্রহণ করেন, রাজবংশের নাম করেন ইউয়ান মানে কেন্দ্রীয় বা মূল। সম্রাট হিসেবে তিনি যে পরিষদ বেষ্টিত থেকেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন চীনা মন্ত্রী, কনফুসীয় উপদেষ্টা, মঙ্গোলীয় দেহরক্ষী ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুসলমান কর্মকর্তা।

চীন ও কোরিয়ার উত্তরাংশসহ ১২টি আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশে বিভক্ত হলো ইউয়ান। সপ্তম শতাব্দীতে টাং রাজবংশের শাসনামলে ছয়জন চীনা মন্ত্রীর যে পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং তা অব্যাহত রাখা হয়েছিল, কুবলাই খানও তা বহাল রাখেন। তবে কনফুসীয় শিক্ষায় শিক্ষিত চীনা যে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সহজে উত্তীর্ণ হতো, তিনি তা রহিত করে সর্বজনীন সিভিল সার্ভিসের ওপর জোর দেন।

তবে মঙ্গোলীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একই মানের একজন চাইনিজ ও একজন মঙ্গোলীয়র মধ্যে মঙ্গেলীয়কে উচ্চতর গণ্য করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। কুবলাই খান আরো যেসব বর্ণবাদী সিদ্ধান্ত নেন তার মধ্যে রয়েছে: চীনারা মঙ্গেলীয় নাম গ্রহণ করতে পারবে না; চীনা ও মঙ্গেলীয়দের মধ্যে বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। চীনাদের বেলায় মঙ্গেলীয় ভাষাশিক্ষা ও মঙ্গোলীয় পোশাক পরাও নিষিদ্ধ করেন। এরও একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা কোনো কোনো ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রবিশ্লেষক দিয়েছেন, সে আমলে এমনকি অনেক সফল ও জনপ্রিয় শাসকও বিভিন্ন ধরনের জাতিগত ও গোত্রগত ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং এমনকি নিহতও হয়েছেন, এক্ষেত্রেও মঙ্গোলীয় হিসেবে তিনি চীনাদের সন্দেহের চোখে দেখতেন। কারণ তিনি চীনাদের ক্ষমতাচ্যুত করে তাদের গোটা দেশ দখল করে নিয়েছেন। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তার রাজত্বকালে চীনাদের অস্ত্র পরিবহন নিষিদ্ধ ছিল এবং ‘কেবল চীনা’ জনসমাবেশও করতে দেয়া হতো না।

তিব্বতীয় সন্ত ফাগস পা লাম ছিলেন তার একজন ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা। তার পরামর্শে তিনি তার বহুজাতিক সাম্রাজ্যের নাগরিকদের মধ্যে ভাষাগত ঐক্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটি নতুন সর্বজনীন ভাষা প্রচলনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু এতে গণসাড়া মেলেনি। নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি বিসর্জন দিতে মানুষ আগ্রহী হয় না, ধর্মের ব্যাপারেও তা-ই। চেঙ্গিস খানেরই উত্তরসূরিদের একজন ভারত সম্রাট আকবর সব ধর্মের সমন্বয়ে একটি একক ধর্ম দীন-ই-ইলাহি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তিনিও ব্যর্থ হয়েছেন।

কুবলাই খানের যে সাফল্য পরবর্তীকালে অর্থনীতিবিদদের আকৃষ্ট করেছে তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। যারা যে কাজে, যে উৎপাদনে দক্ষ সেই কাজ এবং উৎপাদন তাদের মধ্যে সীমিত রাখায় তাদের দক্ষতা আরো বেড়েছে, সঙ্গে উৎপাদনশীলতা। তিনি কোনো কোনো অত্যাবশ্যকীয় ও অর্থকরী পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য কর প্রত্যাহার কিংবা কর হ্রাস করার উদ্যোগ নিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে গতিশীলতা আনতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সড়ক ও নৌ-যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যবসার অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছেন। তার সময়ই চীন অত্যন্ত বাণিজ্য সফল একটি দেশে পরিণত হয়।

শক্তিশালী লেখক কুবলাই

ক্ষমতার দাপটে নয়, জ্ঞান, রুচি ও লেখার শক্তিতেই কুবলাই খান ছিলেন তার আমলের গুরুত্বপূর্ণ কবি ও গদ্যকার। তবে তার সব লেখাই বিলুপ্ত। তার লেখা একটি মঙ্গোলীয় কবিতার ইংরেজি অনুবাদ থেকে এখানে ভাষান্তর করা হচ্ছে:

বান্ধব ঋতু বসন্তে আমি সুঘ্রাণ পাহাড়ে আরোহণ করি

নিরুৎসাহিত না হয়ে আমি চূড়ায় উঠি

সোনালি মুখমণ্ডলের সাথে দেখা হয়

ফুল উজ্জ্বল আলোয় দীপ্তি ছড়ায়

স্বাগত রঙ রঙধনু হয়ে যায় আকাশে

ধূপের ধোঁয়া কুয়াশার মতো ছড়ায়

আর আশীর্বাদের আলো হয় দীপ্যমান।

 

রঙধনু সবুজ বাঁশের ওপর বুদ্বুদ, বড় পাহাড়ের প্রান্তদেশে

পর্বতের সবুজ পাইন বনে

বহমান বায়ুর সংগীত শোনা যায়

মন্দিরে বুদ্ধের মূর্তির সামনে আমি

ধুপ জ্বালানোর উৎসব করছি

ফেরার পথে আমি রাজবাহনের

নীল ড্রাগনে আরোহণ করেছি।

আরো কিছু রচনা হাতের কাছে পেলে ভালো হতো। একালের কবিও একে উড়িয়ে দেবেন না। ভালো কবিতার কিছু উপাদান তো অবশ্যই এতে আছে।

কুবলাই খানকে নিয়েও শক্তিশালী রোমান্টিক ধারার অন্যতম প্রধান একটি কবিতা রচনা করেছেন স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ। ১৭৯৭ সালের শরতে লিখিত তার দীর্ঘ কবিতাটির নাম ‘কুবলা খান’। সম্রাট কুবলাই খানের গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদ জানাদুর বিবরণ পড়তে গিয়ে মুগ্ধ কোলরিজ সম্মোহিত অবস্থায় কবিতার প্রায় পুরোটাই লিখে ফেলেন, কবিবন্ধু ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও ডারোথিকে পড়ে শোনান। আরো অনেককে শুনিয়েছেন কিন্তু প্রকাশ করেননি। ১৯ বছর পর কবি জন মিল্টনকে যখন শোনালেন তিনি তা প্রকাশের তাগিদ দিলেন, ১৮১৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো, সম্মানি পেলেন ৮০ পাউন্ড। ইউরোপীয় কোনো কবি এশিয়ায় কোনো চরিত্র নিয়ে এত দীর্ঘ কবিতা লিখেননি।

কুবলাই খান ও মার্কো পলোর কারণেই আমেরিকা আবিষ্কার

ইতালির অভিযাত্রী ব্যবসায়ী ও ভ্রমণ লেখক মার্কো পলোর জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১২৫৪ ভেনিসে; ৭০ বছর বয়সে ভেনিসেই প্রয়াত হন ৮ জানুয়ারি ১৩২৪। তার লেখা দ্য ট্র্যাভেলস অব মার্কো পলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থগুলোর অন্যতম। মার্কো পলোর বাবা নিকোলো পলোও অভিযানপ্রিয় ছিলেন। স্ত্রীকে গর্ভবতী অবস্থায় রেখে এশিয়া সফরে বের হলেন, ১৫ বছরেরও অধিককাল পর যখন ভেনিসের পথে ফিরলেন, ভাবলেন সবার আগে বাড়ি পৌঁছা দরকার। যথারীতি বাড়ি পৌঁছলেন। ততদিনে তার স্ত্রী মৃত। স্ত্রীর প্রসূত সেই পুত্রসন্তানের বয়স ১৫ বছর। তার নাম মার্কো। কোনো গবেষক মনে করেন, নিকোলো ও তার পুত্র মার্কোর যখন প্রথম দেখা, মার্কোর বয়স তখন ১৯ বছর। ২১ বছর বয়সে মার্কো যখন একালের বেইজিংয়ের অদূরে নতুন সম্রাটের রাজধানী জানাদু পৌঁছলেন, তার আগমনের কারণ এমুখ-ওমুখ ঘুরে সম্রাট কুবলাই খানের কাছে পৌঁছল। জানাদু পৌঁছার প্রায় ৪০ দিন পর দ্য গ্রেট কুবলাই খানের দূত এসে তাকে (সঙ্গে তার বাবা ও চাচা ছিলেন) সম্রাটের কাছে নিয়ে এলেন।

সম্রাটির সঙ্গে সাক্ষাতের মুহূর্তটিই মার্কোর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহূর্ত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তারা হাঁটু গেড়ে তাকে সম্মান জানালেন। তিনি প্রীত হয়ে তাদের বরণ করলেন।

পোপ প্রদত্ত একটি শুভেচ্ছা চিঠি সম্রাটের কাছে হস্তান্তর করলেন। তিনি তরুণ মার্কোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে নিকোলো পলোকে বললেন, সে আমার ছেলে, তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছি। তাদের দূতের মর্যাদা দিয়ে দরবারে আসন দেয়া হয়, সভাসদরাও তাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেন।

মার্কো পোলো কুবলাই খানের ব্যক্তিসত্তা ও তার বিশাল সাম্রাজ্যের বিচরণ লিপিবদ্ধ করে জীবদ্দশাতেই তাকে প্রবাদপ্রতিম মানুষে পরিণত করেন। এ বিবরণ পশ্চিমেও পৌঁছে, আগে চীন সম্পর্কে ইউরোপের অস্পষ্ট ধারণা ছিল। পশ্চাত্পদ মনে করে চীনে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কারো আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু মার্কো পলোর বিবরণী পশ্চিমে না পৌঁছলে উনিশ শতকের আগে তাদের চিনমুখী হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কলম্বাস চীন অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি পশ্চিমে যাত্রা করলেন। কলম্বাস চীন ভেবে যেখানে নেমেছিলেন সেটাই আমেরিকা। চীনের খোঁজে বেরিয়ে আমেরিকা আবিষ্কার করলেন, সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে কুবলাই খানের কীর্তি মার্কো পলোর মাধ্যমে কলম্বাসকে আমেরিকা আবিষ্কারের প্রেরণা জুগিয়েছে।

কিন্তু কুবলাই খানের নিজের স্বপ্নের একটি বড় অংশ অধরাই রয়ে যায়। জাপান বিজয়ের জন্য তিনি দুবার তার নৌবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। সে সময় এত সুগঠিত ও মারণাস্ত্র সজ্জিত নৌবাহিনী কারো ছিল না। দুবারই জাপানি ‘কামিকাজে’ কিংবা ঐশ্বরিক ঝড়ো বাতাসে কুবলাই খানের বাহিনী লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

কুবলাই খান ও মার্কো পলোর সম্পর্ক এতটা আলোচিত ছিল, তাদের দুজনকে নিয়ে সিনেমা ও সিরিয়াল বানানো অব্যাহত রয়েছে। ইতালো কালভিনোর ‘ইনভিজিবল সিটি’ উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে দুজনের কাল্পনিক কথোপকথন। মার্কো পলোর বিরুদ্ধে সমালোচকরা বলে থাকেন, কুবলাই খানের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয় পাওয়ার কারণে তিনি তার শাসনকাল সম্পর্কে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছেন। আর মার্কো পলো জীবদ্দশায় বলেছেন, আমি তার রাজত্বে যা দেখেছি তার অর্ধেকও বলিনি। মার্কো পলো সম্রাট কুবলাই খানের সভাষদ হিসেবে ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।

কুবলাই খানের একটি স্মরণীয় উক্তি: আমাকে পাথরের কথা বলো কেন? আমার কাছে কেবল খিলানের মূল্য আছে।

অন্য এক সময় বলেছিলেন: কোন পাথরটির কারণে সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে বলতে পারো।

এ জ্ঞানবান শাসকের জীবনের অন্যতম প্রেরণা ছিলেন তার সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ছাবি (১২২৫-৮১)। তিনি কুবলাই খানের অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টাও ছিলেন। সম্রাটের শিল্পানুরাগ সৃষ্টির পেছনে মূল ভূমিকা তিনিই পালন করেছেন বলে গবেষকদের ধারণা এবং এমনকি বলা হয়ে থাকে তারই উৎসাহের কারণে মার্কে পলোর মতো একজন দূরদেশী পর্যটক কুবলাই খানের প্রিয়জন হতে পেরেছেন।

কুবলাই খানের মা সোরঘাঘতানির মতো তার স্ত্রী ছাবিও ছিলেন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। বিজিত চীনাদের, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করে তাদের আস্থা অর্জনের জন্য যেসব রাজনীতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা ছাবির পরামর্শেই করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। নিজে খ্রিস্টান হয়েও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। এমনকি তার প্রেরণাতেই কুবলাই খানও ধর্মান্তরিত হয়েছেন বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনাদের সন্তুষ্ট করতে তিনি পরাজিত রাজপরিবারের সদস্যদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মাঙ্গোলীয়রা যখন চীনাদের কৃষিজমিতে নিজেদের গোচারণ ক্ষেত্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তিনি তা হতে দেননি। তিনি শাশুড়ির প্রেরণায় নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টির ধর্মতাত্ত্বিক নেস্টোরিয়াসের অনুসারী খ্রিস্টান হলেও নিজে বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হননি। ১২৮১ সালে তার মৃত্যুর পর কুবলাই খান অনেকটাই ভেঙে পড়েন। ১২৮৪-তে আরো একটি মৃত্যু তাকে হতাশ করে তোলে। ১২৪৩ সালে তার পুত্র সেনজিনের জন্ম হয়। তারই কুবলাই খানের পর সম্রাটের আসনে বসার কথা। তার অনুকূলে শাসনভার দ্রুত ত্যাগ করার পরামর্শ কুবলাই খানের একজন পরিষদ সদস্য প্রদান করলে তিনি ছেলের ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং ক’বছর তাকে কাছে আসতে দেননি। সেনজিন অতিরিক্ত মদ্যপানে ১৮৮৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এটি সম্রাটকে ভীষণ ধাক্কা দেয়। তিনিও মদ্যপান বাড়িয়ে দেন। তাকে মার্কো পলো যে সুদর্শন ও সুগঠিত পুরুষ হিসেবে দেখেছেন তা থেকে তিনি স্থূল হয়ে ওঠেন এবং শতরোগে কাবু হয়ে পড়েন। এক ধরনের হতাশার মধ্যে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১২৯৪ ইউহান রাজবংশের স্থপতি কুবলাই খান মৃত্যুবরণ করেন।

 

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা