তবলা ও বাঁয়ার নানা অংশ আছে এবং সেগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। ডান হাতে বাজান হয় বলে তবলাকে অনেকে ‘ডাহিনা’ বলে থাকেন এবং বাঁয়াকে বলা হয় ‘ডুগি’। নিম্নে তবলা, বঁয়া ও পখাবজের বিভিন্ন অঙ্গের পরিচয় দেয়া হলো—
তবলার অঙ্গ
(১) লকড়ি বা কাঠ—তবলার মূল কাষ্ঠনির্মিত সমগ্র অংশটিকেই বলা হয় লকড়ি বা কাঠ। অংশটি নির্মাণে নানা জাতের কাঠ ব্যবহার করতে দেখা যায়, যেমন নিম, চন্দন, বিজয়শাল, আম, কাঁঠাল, সীসম প্রভৃতি। অংশটির নিম্নভাগ ও উপরিভাগ গোলাকৃতি। তবে নিম্নভাগটি উপরিভাগ হতে চওড়া হয়। নিম্নভাগের ব্যাস হয় সাধারণত ৮-৯ ইঞ্চি এবং উপরিভাগের ব্যাস হয় ৫-৬ ইঞ্চি। কাঠটির উচ্চতা হয় ৯-১২ ইঞ্চি। কাষ্ঠাংশের মধ্যস্থল ফাঁপা থাকে।
(২) পুড়িবা ছাউনি—কাঠের উপরস্থ চর্মাচ্ছাদিত গোলাকার অংশটির নাম পুড়ি বা ছাউনি। অংশটি নির্মাণে ছাগ বা মেষ চর্ম ব্যবহার করা হয়। পুড়ি বা ছাউনিকে আবার তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যথা: (ক) স্যাহী বা গাব, (খ) কানি বা চাঁটি ও (গ) লব, সুর বা ময়দান।
(ক) স্যাহী বা গাব—চর্মাচ্ছাদিত অংশের ঠিক মধ্যস্থলে কাল রঙের গোলাকার অংশটিকে বলা হয় স্যাহী বা গাব।
(খ) কানি বা চাঁটি—ছাউনির কিনারাসংলগ্ন আধ ইঞ্চি মতো বৃত্তাকার চর্মটিকে বলা হয় কানি বা চাঁটি।
(গ) লব, সুর বা ময়দান—গাব ও কানির মধ্যবর্তী অংশটির নাম লব, সুর বা ময়দান।
(৩) গজরা বা পাগড়ি—১৬টি ছিদ্রযুক্ত চামড়ার যে মোটা অংশটি ছাউনিকে ঘিরে রাখে তাকে বলা হয় গজরা বা পাগড়ি।
(৪) গুড়রি—কাঠের নিম্নাংশে চর্মনির্মিত গোলাকৃতি বস্তুটিকেই বলা হয় ইণ্ডবি বা গুড়রি।
(৫) ছোট, বদ্ধি বা ডোরি—ছাউনিকে শক্ত বাঁধনে বাঁধার জন্য গজরা থেকে গুড়রি পর্যন্ত চর্মরজ্জুকে বলা হয় ছোট, বদ্ধি বা ডোরি।
(৬) গুলি বা গট্টা—ছোটের নিচে কাঠের ওপর যে ছোট ছোট আটটি কাঠের টুকরা থাকে সেগুলোকে বলা হয় গুলি বা গট্টা।
বাঁয়ার অঙ্গ
তামা, পিতল অথবা মাটি দিয়ে বাঁয়ার অবয়ব তৈরি হয় এবং তাকে বলা হয় হাঁড়ি বা কুড়ি। বর্তমানে মাটির বাঁয়ার প্রচলনই বেশি। বাঁয়ার উচ্চতা হয় সাধারণত সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৯ ইঞ্চি এবং এর নিম্নভাগ থেকে উপরিভাগের আয়তন বেশি। উপরিভাগের ব্যাস সাধারণত ১০-১২ ইঞ্চির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাঁয়ার ভেতরের অংশটি সম্পূর্ণ ফাঁপা থাকে।
তবলার মতো বাঁয়ারও ভিন্ন অংশ আছে, যেমন কুড়ি, পুড়ি, চাঁটি, গজরা, গাব বা স্যাহী, লব বা ময়দান, ছোট, গুড়রি ইত্যাদি। বাঁয়ার গুলি বা গট্টা নেই। তবলার বর্ণিত অঙ্গগুলোর মতোই বাঁয়ার এ অঙ্গগুলো বলে আর পুনরুক্তি করা হলো না। তবে তবলার সঙ্গে বাঁয়ার অঙ্গের নিম্নলিখিত পার্থক্যগুলো উল্লেখ্য—
(ক) তবলার গাব বা স্যাহী থাকে ছাউনির ঠিক মধ্যস্থলে। কিন্তু বাঁয়ার থাকে কিনারার দিকে।
(খ) তবলার গাবের অংশটুকু বিশেষ প্রয়োজনীয়, কারণ এর ওপর নানা প্রকার বোল বাজান হয়, কিন্তু বাঁয়ার গাবের ওপর কোনো বোল বাজান হয় না।
(গ) তবলার গাবের অংশ বাঁয়ার থেকে বড় হয়।
পখাবজের অঙ্গ বর্ণনা
আকৃতি—তবলা ও বাঁয়ার সংযুক্ত রূপের মতোই অনেকটা পখাবজ বা মৃদঙ্গের আকৃতি। কাঠামোটি রক্তচন্দন, নিম, কাঁঠাল, খদির ইত্যাদি নানা জাতের কাঠ দিয়ে তৈরি হয়।
তবে খদির ও রক্তচন্দন কাঠের পখাবজই উত্তম বলে সর্বজন স্বীকৃত। তবলার মতো অংশে তবলার মতোই পখাবজের পুড়ি, গাব, কানি, লব, গজরা, ছোট, গুলি প্রভৃতি অংশ আছে। পখাবজ লম্বায় সাধারণত ১ ফুট ৯ ইঞ্চি থেকে ২ ফুট পর্যন্ত হয়। এর ডানদিকের মুখের পরিধি হয় সাড়ে ৬ বা ৭ ইঞ্চি, বামদিকের মুখের পরিধি সাড়ে সাত ইঞ্চি এবং মধ্যস্থলের ব্যাস হয় ৯-১০ ইঞ্চি।
ছাউনি—পখাবজের উভয় প্রান্তই চর্মাচ্ছাদিত। বাঁয়ার মতো অংশে অর্থাৎ বামদিকের অংশের ওপর বাজানোর আগে বেশ পুরু করে আটা বা ময়দা লাগিয়ে নেয়া হয়। মৃদঙ্গের আওয়াজকে প্রয়োজনমতো গুরুগম্ভীর করার জন্য আটা বা ময়দা ব্যবহার করা হয়।
ছোট বা বিদ্ধ—দুই প্রান্তস্থ ছাউনিকে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত রাখার জন্য যে চর্মরজ্জু ব্যবহার করা হয় তাকেই বলা হয় ছোট বা বদ্ধি।
গজরা—ছাউনির নিম্নে চর্মনির্মিত পাগড়ির মতো গোলাকার বস্তুটির নাম গজরা। এ গজরার সঙ্গেই ছোটকে সংযুক্ত করা হয়।
গুলি—ছোটের নিম্নস্থ ছোট ছোট কাষ্ঠখণ্ডের নাম গুলি। গুলির সংখ্যা থাকে আটটি।
তবলা ও মৃদঙ্গের তুলনা
তবলা ও মৃদঙ্গ দুইই অবনদ্ধ বা আনদ্ধ শ্রেণীর বাদ্য হলেও দুটি বাদ্যের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। যেমন
(১) তবলার অনেক আগে মৃদঙ্গের উদ্ভব হয়েছে এবং পরবর্তীকালে মৃদঙ্গকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে আমির খুসরো তবলার উদ্ভাবন করেন বলে প্রবাদ আছে।
(২) তবলা ও মৃদঙ্গের গঠন প্রণালি আকৃতিতে কোনো মিল নেই। তবলা ও বাঁয়া—পৃথক অংশ, কিন্তু মৃদঙ্গের কোনো পৃথক অংশ নেই।
(৩) মৃদঙ্গের ধ্বনি তবলার তুলনায় অনেক গাম্ভীর্যপূর্ণ। তাই ধ্রুপদ, ধামার জাতীয় গানে তবলার পরিবর্তে মৃদঙ্গ উপযোগী।
দুটি বাদ্যযন্ত্রের বাজানোর মধ্যেও পার্থক্য আছে; তবলা বাঁয়া বাজানোর সময় ঊর্ধ্বমুখী থাকে, কিন্তু মৃদঙ্গ শায়িতবস্থায় রাখতে হয় এবং এর মুখ দুটি থাকে পার্শ্বে।
(৫) তবলা ও মৃদঙ্গের বোল বা বাণীর মধ্যে পার্থক্য আছে। দুটি বাদ্যযন্ত্রের বাজন-শৈলীও এক প্রকার নয়। তবলার বোল-গুলি বাজান হয় দুই হস্তের অঙ্গুলির সহায়তায়, কিন্তু মৃদঙ্গ বাজাতে হাতের পাঞ্জা ব্যবহার করা হয়। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে উভয় যন্ত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রমও দৃষ্ট হয়।
(৬) বর্তমান কালে তবলা মিলান হয় মধ্য সপ্তকের পঞ্চম বা তার ষড়জে; কিন্তু মৃদঙ্গের সুর মিলান হয় মন্ত্র ষড়জে।
(৭) ধ্রুপদ কিংবা ধ্রুপদাঙ্গের গান ব্যতীত অন্যান্য সব শ্রেণীর সংগীতে সাধারণত তবলা ব্যবহার করা হয়, তাই এর প্রচলন খুব বেশি। অন্যদিকে ধ্রুপদ কিংবা ধ্রুপদাঙ্গের গান বাজনাতেই কেবল মৃদঙ্গের ব্যবহার হয়, তাই তবলার তুলনায় বাদ্যযন্ত্রটির প্রচলন অনেক কম।
(৮) মৃদঙ্গের বামদিকের অংশে আটা বা ময়দা লাগান হয় আওয়াজকে গম্ভীর ও সুমধুর করার জন্য; কিন্তু বাঁয়াতে গাব লাগান থাকে, তাই এর আওয়াজ মৃদঙ্গের তুলনায় অনেক হাল্কা।
(৯) প্রয়োজন বোধে বর্তমানে মৃদঙ্গের কিছু তাল তবলায় পরিবেশন করা হয়, কিন্তু তবলার পরিবর্তে মৃদঙ্গে তবলার গৎ পরিবেশিত হয় না।
(১০) দুটি বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে তবলার রেলা, পেশকার, কায়দা ইত্যাদির অধিক প্রচলন, কিন্তু মৃদঙ্গে গৎ, পরণ প্রভৃতির প্রচলন বেশি।
[বর্তমান লেখাটি লেখকের তবলার ইতিবৃত্ত গ্রন্থ (প্রথম প্রকাশ: শ্রাবণ ১৩৬৬, গান্ধার প্রকাশনী, কলকাতা) থেকে সংকলিত। সংগীত-বিশারদ শম্ভু নাথ ঘোষ ছিলেন যাদবপুর সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। এছাড়া আরো অনেক সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন]





