২০১৫ সাল। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে ধ্রুপদি গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে কয়েক রাত ধরে। এ রকমই এক রাতে অন্যদের কণ্ঠ ও যন্ত্রবাদনের সঙ্গে ওস্তাদ জাকির হুসেনের তবলাবাদন ছিল। প্রতিটি রাত আমি এই ধ্রুপদি সংগীত উপভোগ করতে যেতাম। জাকির হোসেনের কারণে, আগে থেকেই তার তবলার বোলে এতটাই মুগ্ধ ছিলাম যে অবধারিতভাবে উপস্থিত ছিলাম। মাইকে জাকির মঞ্চে আসছেন শুনেই উপস্থিত কয়েক হাজার শ্রোতার মধ্যে চাঞ্চল্যের ঢেউ বয়ে গেল। এরপর প্রতিটি মুহূর্ত নৈঃশব্দ্য আর তবলাবাদনের সুধারসে ভরে উঠতে থাকল। যতবার তুঙ্গ অবস্থায় পৌঁছাচ্ছিল জাকিরের বোলচাল, ততই করতালিতে মুখর হচ্ছিল সেনাপ্রাঙ্গণ। শেষ ৩-৪ মিনিট তো চলল করতালির ঢেউ, শ্রোতাদের দুই হাত উজাড় করে অভিবাদন জানাল এই তবলাচার্যকে। এই যে মুগ্ধতা, এই যে প্রতীকী কুর্নিশ, এর সবটাই তবলার জন্যে, তবলাবাদনের জন্যে। তবলা যে শুধু ঠুকঠাক নয়, তবলাবাদনের যে সৌন্দর্য অপার, সেটা বোঝা যায় এ রকম বাদনের অভিজ্ঞতা অর্জন করলে। তো, এই যে তবলা, এই যন্ত্রটির জন্ম আরবে, কিন্তু জনপ্রিয়তা পায় ভারতবর্ষে। তবলার ইতিবৃত্তই আমার এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়। তবলা যারা বাজান তাদের জন্যে নয়, সাধারণ সংগীতপিপাসুদের জন্যে, যারা তবলা বাজানো শুনেছেন, কিন্তু ইতিহাসটা হয়তো জানা হয়নি। এখানে নিভৃতে আপনাদের বলে রাখি, ইউটিউবে জাকিরের তবলাবাদন শুনতে শুনতে এই লেখাটি আমি লিখছি।
২.
প্রথমেই ভারতীয় সংগীতের সূত্রপাতের কথাটা একটু বলি। সংগীতজ্ঞরা বলছেন ঠিক কবে এর সূচনা ঘটেছিল সেই ইতিহাস নির্ণয় করা দুরূহ। তবে তবলার ইতিহাস অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের। প্রাচীন সিন্ধু উপত্যকা তথা মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার ধ্বংসস্তূপ থেকে যেসব সংগীতের উপাদান পাওয়া গেছে, তা থেকে অনুমান করা হয় যে ৩০০০ থেকে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেকালের নগরবাসীর মধ্যে চিত্রশিল্প ও সংগীতের চর্চা ছিল। তারা নাচ, গান ও বাদ্যের অনুরাগী ছিলেন। ১৯২২ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধু উপত্যকার ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার করেন। জন মার্শাল, দয়ারাম সাহানী, আর্নেস্ট ম্যাকে, ননীগোপাল মজুমদার, রমাপ্রসাদ চন্দসহ অনেক বিচক্ষণ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মহেঞ্জোদাড়ো, হরপ্পা, ঝুকর বা চহ্নুদড়োর ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাগৈতিহাসিক ভারতীয় সভ্যতার যেসব বিচিত্র উপাদান আবিষ্কার করেন, তাতে সংগীতের উপাদান কম ছিল না। এখানেই পাওয়া গেছে সাতটি ছিদ্রযুক্ত একটি বাঁশি। এতে প্রমাণ হয় যে গানের সপ্তস্বরের বিকাশ তখনই ঘটেছিল। তন্ত্রীযুক্ত কয়েকটি বীণা (যে বীণার আকার বা অবয়ব অনেকটা এখনকার রবাব বা সরোদের মতো দেখতে), চামড়ার মৃদঙ্গ বাদ্যযন্ত্র, খঞ্জনী বা করতাল, একটি ব্রোঞ্জের নৃত্যরত নারী এবং একটি নৃত্যরত নর্তকের ভগ্নমূর্তি পাওয়া গেছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা বাদ্যযন্ত্রগুলোর উল্লেখ করে বলেছেন, সুদূর প্রাগৈতিহাসিক কালে ভারতে কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে সংগীতের চর্চা হতো। স্টুয়ার্ট পিগট ভারতীয় সভ্যতার নিদর্শন দেখে বিস্মিত হয়ে জানিয়েছেন, ভারতীয় সংগীতের চাক্ষুষ নিদর্শন মেলে সিন্ধু সভ্যতায়। একটি সিলমোহরে স্পষ্টভাবে নৃত্যের প্রতিচ্ছবি খোদাই করা আছে। একজন বাদক মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে আর অন্য অনেকে সেই মৃদঙ্গের তালে তালে নাচছে, এ রকম অভিব্যক্তি মেলে। হরপ্পার অন্য একটি সিলমোহরে দেখা যাচ্ছে একটা বাঘের পাশে দাঁড়িয়ে একজন মৃদঙ্গ বাজাচ্ছে। আরেকটিতে দেখা যায় একজন পুরুষের গলায় মৃদঙ্গ ঝোলানো। মৃদঙ্গ ছিল চামড়ার তৈরি। এছাড়া বেণু ও বাঁশি, তন্ত্রীযুক্ত বীণা, হার্প বা ল্যায়ার, অর্থাৎ রবাবজাতীয় বাদ্যযন্ত্রের সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। তবলার উল্লেখ সরাসরি না থাকলেও তবলার পূর্বসূরি মৃদঙ্গের কথা এখানে মিলছে। এখন যে তবলা আমরা দেখি, তার আবির্ভাব ঘটেছে আরো পরে।
তবলার জন্ম নিয়ে তীব্র মতভেদ এবং নানা ধরনের গালগল্প প্রচলিত আছে। ভারতীয় সংগীতজ্ঞরা বলছেন, আমির খুসরো তবলা আবিষ্কার করেছিলেন, সেতারও তারই আবিষ্কার। মৃদঙ্গকে (পরবর্তীকালে মুসলমান আমলে পাখোয়াজ) দুই ভাগে ভাগ করে ভারতীয় সংগীতে তিনি তবলার প্রবর্তন করেন। কেউ কেউ একে মুসলমানদের আবিষ্কার বলে ‘ম্লেচ্ছবাদ্য’ বলেছেন। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় সংগীতে তবলার নাম নেই। পৌরাণিক যুগে সন্ধান পাওয়া যায় মৃদঙ্গের। মৃদঙ্গ হচ্ছে তবলার পূর্বসূরি। বৈদিক যুগে মৃদঙ্গের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রথম এর সন্ধান মেলে ভরতের নাট্যশাস্ত্রে। আরো একটি বাদ্যযন্ত্রের কথা পাওয়া যায় নাট্যশাস্ত্রে, সেটি পুষ্কর। দুটি বাদ্যযন্ত্রই তৈরি করা হতো মাটি দিয়ে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে নাট্যশাস্ত্রে ভরত এই পুষ্কর ও মৃদঙ্গের কথা বলেছেন। অভিনব গুপ্ত নাট্যশাস্ত্রের ভূমিকায় বলেছেন, স্বাভি নামে একজন ঋষি পুষ্করবাদ্য আবিষ্কার করেন। পুষ্কর হচ্ছে মৃদঙ্গজাতীয় বাদ্য এবং তার শব্দ মেঘগর্জন ও মেঘবর্ষণের মতোই শোনাত। ভরত নাট্যশাস্ত্রে বলেছেন, মৃদঙ্গ ও পুষ্কর মাটি দিয়ে নির্মিত। আবার ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শারঙ্গদেব ‘সংগীত রত্নাকরে’ বলেছেন, মৃদঙ্গ রক্তচন্দন কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো। পুষ্কর থেকে সৃষ্টি হয়েছিল পাখোয়াজ। অতি প্রাচীনকালে বৃন্দবাদ্য হিসেবে চর্মজাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল। চর্মজাতীয় বাদ্যযন্ত্র বলতে বুঝতে হবে এগুলোর অগ্রভাগ বা মুখ চর্ম দ্বারা আবরিত থাকত। এই মৃদঙ্গ ও পাখোয়াজই ছিল চামড়াজাতীয় বাদ্যযন্ত্র আর তবলার পূর্বসূরি।
প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুসারে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতাব্দীতে ভুবনেশ্বরের (ভারতবর্ষে) মুক্তেশ্বর মন্দির এবং মুম্বাইয়ের একটি মন্দিরে নৃত্যশীল নটরাজের পাশে পুষ্কর বাদ্যযন্ত্রের চিত্র খোদাই করা আছে। অনেকে মনে করেন এর দুটি সোজাভাবে দাঁড়ানো এবং একটি শোয়ানো। পুষ্কর বা মৃদঙ্গের অনুকরণেই পরবর্তীকালে মুসলমান যুগে তবলার প্রবর্তন হয়। খ্রিস্টীয় ১৩ থেকে ১৭ শতক সময়ের মধ্যে খেয়াল গানের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তবলা ও বায়ার ক্রমোন্নতি ও বহুল প্রয়োগের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে খেয়াল গানের সঙ্গে সংগত করার জন্যেই সর্বপ্রথম তবলার প্রয়োজন হয় এবং ধীরে ধীরে তবলা খেয়াল গানের সঙ্গে সংগত করার জন্য ব্যবহূত হতে থাকে। এই বাদ্যযন্ত্রটির সূচনা ঘটে মুসলিম সংগীতশিল্পীদের হাতে। ভারতের একজন গবেষক তবলার দুর্লভ তথ্য সংগ্রহ করে এর জন্ম ইতিহাসের সন্ধান দিয়েছেন। তিনি লিখছেন, ‘পুরাকালে বিদ্যাদেবী ভারতী নারকেলের ওপরটা চামড়ায় আচ্ছাদিত করে একরকম বাজনা তৈরি করেন। এই বাজনাটার নাম ছিল “তাল-তরঙ্গ”। এরপর গৌতম বুদ্ধ পাথর কুঁদিয়ে তা থেকে এক রকম বাদ্যযন্ত্র তৈরি করলেন, নাম দিলেন “তবল-জাং”। পাঞ্জাবে এর এখনো প্রচলন আছে এবং সেখানকার লোকেরা একে বলে “ধামা” বা “দুষ্কর”।’
এরপর আরব দেশের লোকেরা এর অনেক পরিবর্তন করেন। চন্দ্রপাল এবং আনন্দপালের সময়ে মুসলমানরা ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্যে কম্বোজে এলেন, তখন তারা ‘তবল-জাং’কে কাঠে রূপ দিলেন আর নাম দিলেন ‘তবলা’। তারাই প্রচলন ঘটালেন বাঁয়ার। পূর্বে বাঁয়ার প্রচলন ছিল না। ‘তবলা’ নামটিও আরবি। ১৪ শতকে সংগীতজ্ঞ সুধাকলশ বলেছেন, তব্ল অর্থাৎ তবলা ‘ম্লেচ্ছবাদ্য’। ম্লেচ্ছ বলতে মুসলমানদের বোঝাত। মুসলমানরাই ভারতে তবলা এনেছিল। এখানকার স্থানীয় মৃদঙ্গ, পুষ্কর ও পাখোয়াজকে তবলায় রূপান্তর করেছিল। প্রথম দিকে তবলা গজলের সঙ্গে বাজানো হতো বলে ভারতীয়রা এ বাদ্যটিকে গুরুত্ব দেননি। তবে তবলার ঐতিহ্য ভিন্নরূপে এ দেশে ছিল। তবলা নামটির মধ্যে রয়ে গেছে আরবদেশীয় ঐতিহ্যের প্রমাণ। বাঁয়ার সৃষ্টিও তাদের অবদানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আরবে চর্মবাদ্য বলতে নক্কারকে যেমন বোঝাত তেমনি বোঝাত তবলকে। এ দুটি বাদ্য গঠনবৈশিষ্ট্য বদলে নানা সময়ে ইউরোপে গিয়েছিল এবং এরা পরিচিতি পেয়েছিল নকেয়র্স্ ও তিঁব্যাল নামে। ইতালিতে তিঁব্যালকে বলা হতো তিঁপানি। আরবীয়রা যে বাঁয়ার সৃষ্টি করেন তাকে তারা বলত ওবল্। তাদের একটিই মুখ, চামড়া দিয়ে টেনে বাঁধা থাকত। ১৩ শতকে এই তবল্ পশ্চিমে পৌঁছেছিল এবং ভারতে এসেছিল। সংগীতগ্রন্থ ‘সঙ্গীতোপনিষৎসার’ সে রকম ইঙ্গিতই দেয়। ১৮ শতকে এসে গজল ও খেয়ালের মধ্যে এটি ব্যবহূত হতে থাকে। অনেকে মনে করেন ১৫ শতকে কবীরের সময়ে তবলা বাজত।
সুতরাং তবলার ক্রমবিবর্তিত রূপ হলো তিনটি: (১) তাল-তরঙ্গ (পুরাকালে), (২) তবল-জাং (বৌদ্ধ যুগে) এবং (৩) তবলা।
৩.
ভারতীয় সংগীতজ্ঞ অথবা মিউজিকোলজিস্টরা বলছেন, খেয়াল গানের সঙ্গে সংগত করার জনাই সর্বপ্রথম তবলার প্রয়োজন দেখা দেয় এবং খেয়াল গানের সঙ্গে সংগত করার জন্যে শুরু হয় তবলার ব্যবহার। এই শুরুরও চমৎকার একটি ইতিহাস আছে। ভারতে তখন মুসলিম শাসনের প্রারম্ভিক কাল। বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রাম্যগীতি হিসেবে কাবালি বা কাওয়ালি ও সাহানার প্রচলন ছিল। এগুলো গাওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় এমন একটা বাদ্যযন্ত্রের যার মধ্য দিয়ে সুরবৈচিত্র্যের রূপগুলো ঠিক ঠিক প্রকাশ করা যায়। এভাবেই তবলা ও বাঁয়ার অপরিণত রূপের সৃষ্টি। পরে আধুনিক খেয়াল গানের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হলো আধুনিক পরিণত তবলার। খেয়াল গানের আবির্ভাবেরও চমকপ্রদ একটা গল্প আছে।
ত্রয়োদশ মুঘল সম্রাট মিরজা নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ শাহ্ (১৭০২-৪৮) ছিলেন সংগীতের প্রবল অনুরাগী শাসক। একদিন একজন অমাত্য সম্রাটকে জানালেন তিনি দুজন কিশোরের সন্ধান পেয়েছেন যারা অসাধারণ গান করে। সংগীতরসপিপাসু সম্রাট সঙ্গে সঙ্গে তাদের রাজদরবারে হাজির করার হুকুম দিলেন। তারা কণ্ঠসংগীত পরিবেশনের অনুমতি পেল। নবাব নাসিরুদ্দিন শাহ্ তাদের গান শুনে সাতিশয় মুগ্ধ হলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
—কে তোমাদের সংগীতগুরু?
—ওস্তাদ নিয়ামত খাঁ।
—নিয়ামত খাঁ?
সঙ্গে সঙ্গে সম্রাটের মনে পড়ে গেল নিয়ামত খাঁর কথা। নিয়ামত খাঁকে ঘিরে ঘটেছিল একটা অপ্রীতিকর ঘটনা।
আনুমানিক ১৭৩৮ সাল। দিল্লির সম্রাট নাসিরুদ্দিনের শাসনকাল। তানসেনের আত্মীয় নিয়ামত খাঁ ছিলেন রাজদরবারের শ্রেষ্ঠ যন্ত্রসংগীত শিল্পী। তানসেনের জামাতা মিশ্র সিংজি। তার সঙ্গেই তানসেনের কন্যা সরবতীর বিয়ে হয়। মিশ্র ছিলেন অদ্বিতীয় বীণকার। সম্রাট আকবর অনেক অনুরোধ করে তানসেনের ধ্রুপদ গানের সঙ্গে বীণায় সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করেছিলেন। মিশ্র সিংজি জাতিতে ছিলেন রাজপুত। সংগীত সাধক। নিয়ামত খাঁ ছিলেন এই মিশ্র সিংজির বংশধর। তিনি ছিলেন আকবরের রাজদরবারের অন্যতম বীণাবাদক। কিন্তু সে সময় যন্ত্রসংগীতের কদর তেমন একটা ছিল না। নবাবও কণ্ঠসংগীতের অতিশয় ভক্ত ছিলেন। নিয়ামত খাঁকে তিনি গুরুত্ব দিতেন না। নিয়ামত খাঁ রাজদরবারে একরকম অনাদৃত শিল্পী হিসেবে দিন কাটাচ্ছিলেন। সম্রাট তাকে যথোচিত সম্মান না দেয়ায় মর্মাহত হয়ে একদিন তিনি রাজদরবার থেকে বেরিয়ে এলেন। সম্রাটও তাতে বাধা দিলেন না।
ইতিমধ্যে কয়েকটা বছর কেটে গেল। নিয়ামত খাঁ মনপ্রাণ ঢেলে সংগীত সাধনা করতে থাকলেন। একদিন দিল্লির রাজপথ দিয়ে তিনি হেঁটে চলেছেন। হঠাৎ রাস্তার ধারে এক জায়গায় দেখতে পেলেন দুজন বালক ভিখারি অপূর্ব মিষ্টি গলায় গান গেয়ে ভিক্ষে করছে। এদের একজন জানি রসুল, অন্যজন গোলাম রসুল। তাদের কণ্ঠ শুনে নিয়ামত খাঁ মুগ্ধ হলেন। মনে মনে ভাবলেন, কী অপূর্ব গলা! তিনি বালকদ্বয়কে নিজে প্রতিপালিত করে কণ্ঠসংগীতে তালিম দেবেন, এ রকম একটা ইচ্ছে জাগল। তিনি তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সংকল্প থেকে শুরু হলো সাধনা। বারো বছর তিনি তাদের কণ্ঠসংগীতে শিক্ষা দিলেন। এই প্রতিভাবান দুই বালক তখন তরুণ। একজন অমাত্য তাদের সন্ধান পেয়ে সম্রাটকে অবহিত করলে তারা রাজদরবারে সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পায় এবং সম্রাটকে মুগ্ধ করে।
নিয়াতম খাঁ বালক শিল্পীদের গুরু শুনে নবাবের অনুশোচনা হলো। তিনি নিজেকে ধিক্কার দিলেন এই বলে যে গুণীর কদর না বুঝে তিনি নিয়ামত খাঁকে অবজ্ঞা করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি নির্দেশ দিলেন নিয়ামত খাঁকে দরবারে নিয়ে আসতে। আদেশ পাওয়া মাত্রই লোকলস্কর ছুটল তাকে নিয়ে আসতে এবং যথারীতি তিনি রাজদরবারে হাজির হলেন। সম্রাট সিংহাসন থেকে নেমে তাকে আলিঙ্গন করে সিংহাসনের পাশে আসন করে দিলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। শুধু তাই নয়, নবাব এক লক্ষ মোহর গুরুদক্ষিণা দিয়ে নিয়ামত খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। তাকে সম্রাট ‘শা সদারঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। নিয়ামত খাঁ আবার নাসিরুদ্দিনের রাজদরবারে অধিষ্ঠিত হলেন। এই নিয়ামত খাঁই হচ্ছেন আধুনিক খেয়াল গানের জন্মদাতা। নবাবের দরবারি সংগীতগুরু হিসেবে তিনি অসংখ্য খেয়াল গান সৃষ্টি করে গেছেন। এসব খেয়াল গান প্রসিদ্ধি লাভ করলে, এর সূক্ষ্ম সৌকর্যে যথাযথ সংগতের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই সময়, ভারতীয় সংগীতবিশারদরা বলছেন, খেয়ালের সঙ্গে অথবা কাওয়ালির সঙ্গে মৃদঙ্গ ও পাখোয়াজ বাজানো হতো। এ রকমই একজন বিখ্যাত পাখোয়াজ বাজিয়ে ছিলেন রহমান খাঁ নামে সেকালের একজন বিখ্যাত পাখোয়াজি। তার এক পুত্র ছিলেন আমির খুসরো। তিনি আলাউদ্দিনের সময়ের আমির খুসরো নন। আমির খুসরো শা সদারঙ্গ নিয়ামত খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে খেয়াল গান শিখতে থাকলেন। ভারতীয় সংগীতজ্ঞরা বলছেন, এই আমির খসরুই খেয়াল গানে পাখোয়াজের সঙ্গে তালযন্ত্রে সংগত করার জন্যে তবলা আবিষ্কার করেন। অনেকের মতে তিনি একা নন, নিয়ামত খাঁ যখন খেয়াল গানের প্রবর্তন করেন, তখন খেয়ালের সঙ্গে পাখোয়াজ বাজিয়ে সংগত করা হতো। কিন্তু পরে খেয়ালের উত্কর্ষ সৃষ্টি হলে শা সদারঙ্গ নিয়ামত খাঁই পাখোয়াজকে খেয়াল গানের সঙ্গে সংগত করা অনুপযোগী বলে ঘোষণা করেন। এরপর খেয়াল গানের সঙ্গে মৃদু আওয়াজে সংগত করার জন্যে ভিন্ন একটি যন্ত্রের প্রয়োজন হওয়ায় নিয়ামত খাঁরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিষ্য আমির খুসরো খেয়াল গানের সঙ্গে মৃদু আওয়াজে সংগত করার উপযোগী একটি তালযন্ত্র আবিষ্কার করলেন। এই তালযন্ত্রটিই হলো আধুনিক তবলা। তবলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় মধ্যযুগের মুঘল আমলেই। কিন্তু তবলার বিকাশ ও সমৃদ্ধি এখানেই থেমে থাকেনি। চর্চার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে শিল্পীরা যখন মনে করেছেন এর পরিবর্তন-পরিমার্জন দরকার, তখন তারা সেটা করেছেন। অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তবলা যন্ত্রটির সমৃদ্ধি ঘটেছে। এই ধারাতেই তবলার আকর্ষণীয় বাদনশৈলীর মধুর রূপ দেন দিল্লির প্রসিদ্ধ ওস্তাদ সিন্দুর খাঁ বা সিধার খাঁ। তিনিই তবলার যে কয়েকটি ঘরানার আবির্ভাব ঘটেছিল, তার একটি—দিল্লি ঘরানার স্রষ্টা। তিনি পাখোয়াজের কঠিন ও বড় বড় বোল-বাণী ভেঙে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম করলেন। কঠিন থেকে সহজ ও শ্রুতিমধুর করে তবলার এক বিশেষ ঘরানা সৃষ্টি হয় তার হাত ধরেই। ভারতীয় তবলার ভুবনে সিধার খাঁর অবদান তুলনাহীন বলা যায়। ১৮ শতকের মাঝামাঝি থেকে তবলাবাদনের উত্কর্ষ শীর্ষে ওঠে। সিধার খাঁর বংশপরম্পরা আর শিষ্যদের মধ্যেই তবলার বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রচলন ও উন্নততর বাদনশৈলীর পরিচয় মেলে। সিধার খাঁর দিল্লি ঘরানার পর তবলার বেশ কয়েকটি প্রসিদ্ধ ঘরানার সৃষ্টি হয়। এগুলো হচ্ছে লক্ষৌ ঘরানা, বেনারস ঘরানা, ফরুখাবাদ ঘরানা, পাঞ্জাব ঘরানা, অজরাড়া ঘরানা ইত্যাদি।
শুধু ঘরানাই নয়, আবির্ভাব ঘটে অসম্ভব প্রতিভাবান তবলাচার্যের। তাদের কয়েকজন হচ্ছেন কণ্ঠে মহারাজ, হাবীব উদ্দীন খাঁ, আহমেদজান থিরকুয়া, কেশবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ অসিত খাঁ, হীরেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, কেরামৎ খাঁ, আবিদ হুসেন খাঁ, পণ্ডিত সামতাপ্রসাদ, লালজি শ্রীবাস্তব প্রমুখ। এই মুহূর্তে যদি জনপ্রিয় তবলাশিল্পীর কথা বলি তাহলে যাঁকে দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম সেই তবলাচার্য জাকির হোসেন তো আছেনই। তাদের হাতেই তবলাবাদন উত্কর্ষ আর সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গেছে। এসেছে বৈচিত্র্য—কি আঙ্গিকে, কি সূক্ষ্মতায় ও মর্মবস্তুতে। তবলা ছাড়া ভারতীয় কোনো সংগীতের পরিবেশনার কথা ভাবাই যায় না। একদিন যে তবলা আরবের ঊষর মরুভূমি পেরিয়ে ভারতবর্ষে পৌঁছেছিল, তা-ই উপমহাদেশের শ্রোতাদের সংগীত সুধারসে তৃপ্ত করে চলেছে। বেজে চলেছে মধুর তালে তালে, কবীরের একটি গানে যেমন পাই:
সারঙ্গ জলতরঙ্গ ধুনিয়ারি
তব্লা চহুঁ ওর নরসিংহা ডফারি
ইহি বিধি ভোর গুফা ধুনি গাজৈ
নানা রঙ্গ মধুর ধুনি বাজৈ।
মাসুদুজ্জামান: কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক;
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





