[ভারতীয়
টিভি প্রযোজক-লেখক
নাসরীন মুন্নি
কবীর কথা
বলেছেন তবলা
মায়েস্ত্রো জাকির
হুসেনের সঙ্গে।
সেই কথোপকথনের
ভিত্তিতে তৈরি
জাকির
হুসেন: আ
লাইফ ইন
মিউজিক
গ্রন্থ থেকে
নির্বাচিত অংশের
অনুবাদ করেছেন
নিজাম আশ
শামস]
একটা নতুন তবলার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে কতটা সময় লাগে?
সংগীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সংগীতের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে সময় প্রয়োজন। একসময় যন্ত্রটিতে প্রাণ সঞ্চার হয়। তখনই ভালো কিছু ঘটে। বিষয়টা এমন নয় যে কেউ একটা সেতার কিনল, পরের দিনই মঞ্চে উঠে সেটা বাজানো শুরু করল! সেটিতে আগে ধাতস্থ হতে হবে। যন্ত্রটিকে কয়েক মাস বাজাতে হবে। তারপর একসময় মনে হবে, ঠিক আছে, এখন আমি মঞ্চে এটিকে বাজাতে পারব।
তবলায় আমি কী সংযোজন করেছি? আমি মনে করি, সরলতা ও স্বচ্ছতা। আর এগুলোই আমরা দর্শকদের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিই। আমি যা উপস্থাপন করি, তা অর্থবহ হতে হবে। বিষয়টি বাদ্যযন্ত্র ও বাদকের মধ্যে অন্তরের ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে হতে পারে। কিংবা চিন্তার প্রক্রিয়ায় দ্বিধাহীনতার মাধ্যমে হতে পারে। অথবা প্যারামিটারের ব্যাপারে চিন্তা না করার মাধ্যমেও হতে পারে। যতটা সম্ভব স্বচ্ছতার সঙ্গে আপনাকে সংগীত পরিবেশন করতে হবে।
চমৎকার একটি ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে। কিষাণ মহারাজ মঞ্চে উঠছিলেন। এমন সময় একজন বলল, ‘মহারাজ, খুব ভালো একটি কনসার্ট হোক।’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘দেখা যাক ভাই, আজ তবলা কী বলতে চায়।’
গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন সব বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেই বিষয়টি সত্য। প্রথমে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে বাদকের সম্পর্ক তৈরি হতে হবে। কারণ নিজের কাজের জন্য যন্ত্রটিকে আপনার প্রয়োজন। যন্ত্রটির আপনাকে গ্রহণ করতে হবে। যন্ত্রটি প্রকাশ করবে যে এটি আস্থা রেখে আপনার সঙ্গে পথ চলতে প্রস্তুত।
উদাহরণস্বরূপ তবলার চামড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ পুরু হওয়াটা আমার জন্য প্রয়োজন। কারণ আমি যখন এটিকে আঘাত করব, তখন তা যেন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সাড়া দেয় এবং ধ্বনি নির্গত করে। সে ধ্বনিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ উঁচু, নিচু ও মাঝারি সুর থাকতে হবে। অন্য কারো হাতের চেয়ে আমার হাতের চাপ ভিন্ন। তাই তা চামড়ার পুরুত্বের ওপর প্রভাব ফেলে। আমার বুঝতে হবে, সেখানে কী পরিমাণ অতিরিক্ত চামড়া থাকতে হবে। যেন আমি যেভাবে চাই, ঠিক সেভাবেই যন্ত্রটি সাড়া দিতে পারে।
অনেকে হয়তো জানেন না তবল শব্দটি এসেছে আরবি তবল্ থেকে, যার অর্থ ঢোল। তবলা কিন্তু আসলে দুটো হয়—ছোটটি তৈরি হয় কাঠ থেকে যাকে বলে ডাহিনা (ডানদিকের তবলা); বড়, পেট মোটাটি তৈরি হয় ধাতু দিয়ে যাকে বলে বাঁয়া। তবলা তৈরি করতে নিশ্চয়ই বেশ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তবলা নির্মাতারা কি উপযুক্ত প্রশংসা পান?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ভারতে তবলার কারিগররা উপযুক্ত মূল্য পান না, আর্থিকভাবেও তারা প্রাপ্য সম্মানী পান না। আমেরিকায় যদি কেউ কোনো বিখ্যাত গিটারবাদকের জন্য হাতে তৈরি গিটার তৈরি করে তাহলে সে পারিশ্রমিক পাবে ১২ থেকে ২০ হাজার ডলার। বেলা ফ্লেক ব্যাঞ্জোর মাস্টার। তার কোনো কোনো ব্যাঞ্জোর দাম ১ লাখ ২০ হাজার ডলার। ভারতে বাদ্যযন্ত্র নির্মাতারা উপযুক্ত দাম যেমন পান না, তেমনি সম্মান-মর্যাদা দিয়েও তাদের ক্ষতিপূরণ করা হয় না।
১৮ বছর ধরে আমার বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামত করছেন হরিদাস ভাটকর। তিনি কোলাপুরের মিরাজে বাস করতেন। তরুণ বয়সে তিনি মুম্বাই এসেছিলেন আমার তবলা শুনতে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তবলা তৈরি শিখবেন, যেন আমার জন্য তবলা বানাতে পারেন। অনেকে যন্ত্রে বানানো বিভিন্ন অংশ জুড়ে দিয়ে তবলাটি তৈরি করেন। কিন্তু হরিদাসজি সবকিছু হাতে করেন, যেমন—ছাগলের চামড়া পরিষ্কার ও পালিশ করে সেটা মসৃণ করে তোলেন। সবটাই হাতে করেন। পুরো প্রক্রিয়াটা শেষ করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। আপনি অবশ্যই একটা আদর্শ চলনসই তবলা বাজার থেকে কিনতে পারবেন। কিন্তু সেটা হরিদাসজির কাজের মানের ১০ শতাংশও হবে না। তিনি তবলার স্টেইনওয়ে!
আমি হরিদাসজির জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেছি। তাই আট মাস আমি ভারতে না থাকলেও তাকে দুশ্চিন্তা করতে হয় না। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিনি আমেরিকা আসেন। সেখানে আমার ৪০ জন ছাত্রের তবলা মেরামত করে দিয়েছিলেন। সেবার তিনি বেশ অনেক টাকা নিয়েই ভারতে ফিরেছিলেন। (হাসি)
বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক...
ওস্তাদরা বলেন যে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক এমন হতে হবে যে যন্ত্রটি হাঁটু গেড়ে বসে তোমার কাছে জিজ্ঞাসা করবে, তুমি তার কাছ থেকে কী চাও। তুমি যা চাও, তা বের করে আনো। যন্ত্রটির ওপর নিয়ন্ত্রণ, ওস্তাদি প্রতিষ্ঠা করো। এক্ষেত্রে ভিন্ন চিন্তাও আছে, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে সংগীত উপস্থাপনের জন্য বাদ্যযন্ত্র একটি অনুষঙ্গ মাত্র।
আরেকটি চমৎকার ঘটনা মনে পড়ে গেল। আলী আকবর খানসাহেব, সুলতান খানসাহেব এবং আমি একবার ক্যালিফোর্নিয়ায় তার ক্লাসে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, ‘সুলতান, তুমি কি তোমার সারেঙ্গি নিয়ে এসেছ? তুমি কি কিছু বাজিয়ে শোনাবে? সুলতান ভাই উত্তর দিলেন, ‘খানসাহেব, আমি দুঃখিত। আমি সারেঙ্গিটি হোটেলে ফেলে এসেছি। আমি কেবল আপনাকে দেখতে এসেছি।’ আলী আকবর খানসাহেব জোর দিয়ে বললেন, ‘আমাদের মিউজিক স্টোরে একটি সারেঙ্গি আছে। সেটিকেই তবে বের করা যাক।’
তারপর সারেঙ্গিটি বের করে এনে সুলতান ভাইয়ের সামনে রাখা হলো। সুলতান ভাই সেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘খানসাহেব, এ সারেঙ্গি তো ভাঙা। এর অবস্থা বেশ খারাপ। আমার মনে হয়, আমি এটি বাজাতে পারব না।’ আলী আকবর খান সাহেব হেসে বললেন, ‘সারেঙ্গি ঠিক নেই তো কী হয়েছে? হাতটা তো তোমার।’ সুলতান ভাই বললেন, ‘ওহ খোদা!’ তারপর তিনি ঘরের এক কোনায় গিয়ে সারেঙ্গিটি যথাসাধ্য টিউনিং করে বাজানো শুরু করলেন। আমার সংগীতবিশারদ বন্ধু মিকি হার্ট সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একটি টেপ রেকর্ডার দিয়ে তিনি সুলতান ভাইয়ের বাজনা রেকর্ড করলেন। দুই বছর পর আমরা অ্যালবামটি মুক্তি দিয়েছিলাম। তখন থেকে এ পর্যন্ত সুলতান ভাই ও তার পরিবার রয়্যালটি বাবদ ১২ হাজার ডলার পেয়েছে। আমার বলার উদ্দেশ্য হলো এখানে সংগীতজ্ঞই মুখ্য, বাদ্যযন্ত্রটি নয়।





