পৌরাণিক পুরুষদের নানা কারণে নামতে হয় অসম্ভব সব অভিযানে। কখনো কোনো শক্তিমান দানবকে দমন করতে কিংবা কখনো শান্তি ফেরাতে কোনো জনপদের জন্য। প্রতিরক্ষা কিংবা আক্রমণ উভয় ক্ষেত্রেই পৌরাণিক পুরুষরা ব্যবহার করেছেন বহুমাত্রিক সব অস্ত্র। কখনো কখনো সেসব অস্ত্র পৌরাণিক পুরুষের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে আলাদা খ্যাতি অর্জন করে। থরের প্রসঙ্গ এলেই যেমন হাতুড়ি চলে আসে, জিউসের প্রসঙ্গে যেমন চলে আসে মুঠোভর্তি বিদ্যুচ্চমক। ঠিক একইভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ ও সংস্কৃতিতে বিদ্যমান বিশ্বাসে পরিচিতি পেয়েছে বিশেষ কিছু তরবারি। সেগুলোর সক্ষমতা ও সামর্থ্যের কারণে বাকি সব অস্ত্র থেকে তৈরি করেছে স্বতন্ত্র স্থান।
এক্সক্যালিবার
আর্থার পেন্ড্রাগন ছিলেন ব্রিটেনের রাজা। তিনিই পাথর থেকে বের করেন তরবারি এক্সক্যালিবার। কিংবদন্তিতে ব্রিটেনের সার্বভৌমত্বের রূপক হিসেবে বর্ণনা করা হয় এক্সক্যালিবারকে। এর মাধ্যমেই কিং আর্থার ব্রিটেনকে একত্র করার মাধ্যমে প্রতিরোধ করেন অ্যাংলো স্যাক্সনদের আধিপত্যকে। এক পর্যায়ে আর্থার তার ভাগ্নে মোড্রেডের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আহত হন মারাত্মকভাবে। তারপর তিনি বিশ্রামে চলে যান আভালন দ্বীপে। আর তার তরবারি এক্সক্যালিবারকে দেয়া হয় পৌরাণিক চরিত্র লেডি অব দ্য লেকের কাছে। কিংবদন্তি অনুসারে, ব্রিটেন যখন খুব বিপদে পড়বে, তখন আবার ফিরে আসবেন আর্থার। সঙ্গে থাকবে এক্সক্যালিবার। ভাস্কর্য ও বর্ণনা থেকে মনে হয়, এক্সক্যালিবার মধ্যযুগের বহুল ব্যবহৃত তরবারির মতোই লম্বাটে ধরনের ছিল।
গ্রামর
আইসল্যান্ডের কিংবদন্তি হিসেবে ভোলসুঙ্গা সাগা বিপুলভাবে সমাদৃত। সে ভোলসুঙ্গা সাগারই এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম সিগমুন্ড। সিগমুন্ডের বোন সিগনির বিয়ের সময় দেবরাজ ওডিন আগমন করেন। সেখানে অতিথিদের নিয়ে এক বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন ওইদিন। প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে সেদিন ওডিনের থেকে উপহার হিসেবে তরবারি গ্রামর পান সিগমুন্ড। তারপর বেশকিছু যুদ্ধে তিনি ব্যবহার করেছেন তরবারিটি। জীবনের শেষভাগে ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায় গ্রামর। সিগনি সে দুই খণ্ড হয়ে থাকা তরবারিকে প্রথমে নিজের কাছে পরে ছেলে সিগার্ডের কাছে তুলে দেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তরবারি পান, যা নিয়ে পরবর্তী সময়ে তিনি বের হন দারুণ সব অভিযানে। টোলকিনের দ্য হবিট রচনার মধ্যে সিগার্ডের দানববধের গল্প ভালোভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।
হার্প
গ্রিক পুরাণে যত অস্ত্রের বিবরণ আছে, তার মধ্যে অনিবার্যভাবে হার্প অন্যতম। হার্প কিছুটা বাঁকানো তরবারি বিশেষ। সৃষ্টির শুরুর দিকে স্বর্গদেবতা ওরেনসকে হার্প দিয়েই হত্যা করেন ক্রোনস। পরবর্তী প্রজন্মে গিয়ে ক্রোনসকে একইভাবে হত্যা করেন তার পুত্র দেবতাদের রাজা জিউস। পুরাণ অনুসারে, ক্রোনস জিউসের জন্মের আগেই তার বড় ভাইবোনদের খেয়ে ফেলেছিল। পরে জিউস পিতার পাকস্থলি হার্প দিয়ে ফুঁড়ে বের করে আনেন তার ভাইবোনদের। এ ঘটনার পর তার পাঁচ ভাইবোন হন অলিম্পিয়ান দেবতা। অন্যদিকে ক্রোনস ও অন্যান্য টাইটানদের পাঠিয়ে দেয়া হয় টারটারোসে। যা-ই হোক, দেবরাজ জিউস তার পুত্র পারসিয়াসকে হার্পটি দেন গর্গন মেডুসাকে হত্যা করার জন্য। মেডুসা তার ভয়াল দর্শন ও বিধ্বংসী চুলের জন্য পরিচিত। তার পরও তাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে পারসিয়াস অনেকটা হার্পের কারণেই সফলতা পান। সফল হন মেডুসাকে বধ করার কাজে। বিভিন্ন ভাস্কর্যে হার্পের যে ছবি খোদাই করা দেখা যায়, তার আকৃতি অনেকটা প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার তরবারি খোপেশের মতো।
আমেনো-হাবাকিরি
আমেনো-হাবাকিরি মূলত জাপানি পুরাণের তরবারি। পুরাণের শুরু ইয়ামাতা-নো-ওরোচিকে ঘিরে। এ ইয়ামাতা-নো-ওরোচি এক রাক্ষুসী সাপ। তাকে হত্যা করার সময় দৈব তরবারি আমেনো-হাবাকিরি ব্যবহার করেন নায়ক সুসানো-ও। সুসানো-ও সর্বদা তার বড় বোন সূর্যদেবী আমাতেরাসুর প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন। একদিন একটা ভুলের জন্য তিনি নির্বাসিত হন এবং ইজুমো প্রদেশে চলে যান। সেখানে ঘোরাঘুরির সময় তিনি এক দম্পতিকে দেখতে পান। সে দম্পতি তাদের কন্যার অপহরণের জন্য শোকাহত। জিজ্ঞাসাবাদের পর সুসানো-ও জানতে পারেন এর আগে অন্য সাতটি কন্যাকেও নিয়ে গিয়েছিল আট মাথাওয়ালা সাপ ইয়ামাতা-নো-ওরোচি। সুসানো-ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন সাপটিকে হত্যা করার ব্যাপারে। প্রথমে তারা সবাই মিলে সাপটিকে বিভ্রান্ত করে আটকে ফেলল। তারপর সুসানো-ও তার সবক’টা মাথা ও লেজ কেটে ফেললেন। জাপানি কিংবদন্তিতে আরো একটি তরবারির কথা বলা হয়েছে আমে-নো-মুরাকুমো নামে। সুসানো-ও সমঝোতার জন্য আমাতেরাসুকে তলোয়ারটি দিয়েছিলেন।
শমশের
পারস্যের কবি ফেরদৌসী লিখেছেন শাহনামা মহাকাব্য। অতিকায় আকারের সে মহাকাব্যে বহু ঘটনার পাশে শোভা পাচ্ছে শমশেরের প্রসঙ্গ। কিংবদন্তি অনুসারে, শমশের প্রথমে ছিল নবি সোলাইমানের কাছে। পরবর্তী সময়ে তা দানবদের দখলে চলে যায়, সেখান থেকেই পৌরাণিক নায়ক আমির আরসালানের হাতে আসে তরবারিটি। তরবারিটি পরিচিতি পায় শমশির-ই জমরোদনেগার হিসেবে। বলা হয়, তরবারিটি কিংবদন্তি রাজপুত্র মিলাদের জন্য পৌরাণিক কামার কেভ হস্তগত করেছিল। কিন্তু মিলাদের মৃত্যুর পর চলে যায় ফুলাদ-জেরেহের হাতে। ফুলাদ-জেরেহ একদিকে ভয়ংকর, অন্যদিকে নৃশংস। তাকে শুধু শমশির-ই জমরোদনেগার ব্যবহার করেই হত্যা করা যেতে পারে। এজন্যই নিজের মৃত্যুর উপকরণকে বেহাত হতে দিতে চায় না ফুলাদ-জেরেহ।
অসি
অসি সম্পূর্ণরূপে পৌরাণিক দুনিয়া থেকে এসেছে। মহাভারতের শান্তিপর্বে এর কাহিনী সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। মানুষকে সৃষ্টির আগে মহাবিশ্ব বিশৃঙ্খল ছিল। সে সময় সংঘাত চলেছে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে। সে সময় দেবতারা সাহায্যের জন্য পরম দেবতা ব্রহ্মার কাছে গেলেন। তখন তিনি অস্ত্র তৈরির নিমিত্তে বলিদান করেছিলেন, যা প্রথমে একটি পশুর আকারে উদ্ভাসিত হয় আকাশে। ক্রমে প্রাণীটি তখন তরবারি ‘অসি’তে রূপান্তর হয়। ঝড়ের দেবতা রুদ্র, যিনি একই সঙ্গে শিবের অবতার হিসেবে পরিগণিত, এ তরবারি হাতে নেন। একাই পরাস্ত করেন অসুরদের সেনাবাহিনীকে। বিশ্বজুড়ে তিনি সুশাসন পুনরুদ্ধার করেন, প্রতিষ্ঠা করেন শান্তি।
থুয়ান থিয়েন
ভিয়েতনামের কিংবদন্তিতে বহুল পরিচিত তরবারি থুয়ান থিয়েন। মিং রাজবংশের দখলের অবসান ঘটাতে রাজা লে লেই ব্যবহার করেছিলেন এ তরবারি। সম্ভবত লে লেইয়ের অনেক সফল যুদ্ধের ফলস্বরূপ তরবারির কিংবদন্তি উদ্ভূত হয়েছিল। দীর্ঘ যুদ্ধের পর তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে লে রাজবংশের প্রথম রাজা ঘোষণা করতে সক্ষম হন। কিংবদন্তি অনুসারে, শক্তিশালী কচ্ছপ কিম কুই লে লেইকে তলোয়ারটি দিয়েছিলেন। তরবারি প্রাপ্তির পর একদিকে তার উচ্চতা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে বাড়ে শক্তি। বীরত্বপূর্ণ এ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি কচ্ছপটিকে তলোয়ারটি ফিরিয়ে দেন। ফিরিয়ে দেয়ার প্রধান কারণ ছিল, তার এত তীব্র শক্তিমত্তা যেন লে লেইকে পাগল করে না ফেলে।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক





