তলোয়ার নিয়ে এক বাক্যে উপসংহার লিখেছেন রিচার্ড এফ বার্টন; তার ‘দ্য বুক অব দ্য সোর্ড’ বইয়ে ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য সোর্ড ইজ দ্য হিস্ট্রি অব হিউম্যানিটি (তলোয়ারের ইতিহাস মানবজাতিরই ইতিহাস)’। উল্টো করে বললেও আশা করি অত্যুক্তি হবে না—মানবজাতির ইতিহাস তলোয়ারেরই ইতিহাস। কিছুকাল আগেও এটি ছিল অবিসংবাদিত সত্য। রিচার্ড এফ বার্টনের উক্তির রেশ ধরে আরো মজার কথা লিখেছেন জে ক্রিস্টফ অ্যামবার্গার। ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অব দ্য সোর্ড’ বইয়ে তিনি লেখেন, ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য সোর্ড ইজ দ্য হিস্ট্রি অব ওয়াই ক্রোমোজোম’। অর্থাৎ, তলোয়ারের ইতিহাস মূলত পুরুষের ইতিহাস৷। মানুষের হাতিয়ার বানানোর সূচনালগ্ন থেকে হাজার বছরের পথপরিক্রমায় তলোয়ার পুরুষের শৌর্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মধ্যযুগের পুরোটাজুড়ে তারই একচ্ছত্র মঞ্চায়ন। তলোয়ারের শক্তিতে ভর করেই বদলেছে মানচিত্র, শাসন ব্যবস্থা, ইতিহাস।
তলোয়ারে প্রাণসঞ্চার করেন এর ধারক যোদ্ধা। তার নৈপুণ্যে তলোয়ারটিও মহিমান্বিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বীর চরিত্রের সঙ্গে তার ব্যবহৃত তলোয়ারটিও ইতিহাসে অমর হয়ে গেছে। এ লেখায় তেমনই কিছু তলোয়ারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরার অপরিপক্ব প্রয়াস পাঠক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে পাঠ করবেন আশা রাখি।
জুলফিকার
‘লা ফাতা ইল্লা আলী, লা সাইফ ইল্লা জুলফিকার।’ অর্থাৎ, ‘আলী ছাড়া কোনো বীর নেই, জুলফিকারের সমকক্ষ কোনো তলোয়ার নেই।’ কোনো তলোয়ারের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ইতিহাসে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ও চূড়ান্ত উক্তি, যার প্রথম অংশে রয়েছে তলোয়ারের অধিকারীর পরিচয় ও গুণকীর্তন। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবি ও ইসলামের অন্যতম বীর হজরত আলী (রা.)। কালক্রমে তলোয়ার ও এর অধিকারীর নাম হয়ে উঠেছে সমার্থক। আলী জুলফিকার কিংবা জুলফিকার আলী।
ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক জেন হাথওয়ে তার ‘দ্য ফরগটেন আইকন: দ্য সোর্ড জুলফিকার ইন ইটস অটোম্যান ইনকারনেশন’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘জুলফিকারের বয়স ইসলামের সমান৷ আর শিয়াদের মতে, এ তলোয়ার মানব ইতিহাসের সমান প্রাচীন।’ জেন হাথওয়ে তার প্রবন্ধে জুলফিকার নিয়ে সংক্ষেপে চমৎকার আলোচনা করেছেন। জুলফিকারসংক্রান্ত আমাদের পরবর্তী আলাপ জেন হাথওয়ের বর্ণনার আলোকেই এগিয়ে যাবে।
শিয়া বিশ্বাস অনুসারে, প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) বেহেশত থেকে ভূমিতে অবতরণকালে কয়েকটি জিনিস সঙ্গে এনেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম জুলফিকার।৷ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে তলোয়ারটি পৌঁছে দিয়েছিলেন ফেরেশতা হজরত জিব্রাইল। তবে সুন্নি ঐতিহ্য অনুসারে, জুলফিকার ছিল আল আ’স ইবনে মুনাব্বিহ ইবনে আল হাল্লাজের। তিনি ছিলেন মক্কার এক পৌত্তলিক গোত্রের ধনাঢ্য সর্দার। তিনি ইসলামের ঘোরবিরোধী ছিলেন। বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবহার করেছিলেন জুলফিকার। যুদ্ধের ফলাফল মুসলিমদের পক্ষে গিয়েছিল। পৌত্তলিক শিবিরের ৭০ জন নিহত হয়েছিলেন। তাদের একজন ছিলেন আল আ’স। নানাবিধ সামগ্রীর মধ্যে তার তলোয়ারটিও গনিমত হিসেবে মুসলিম বাহিনীর অধিকারে এসেছিল। হজরত মুহাম্মদ (সা.) সেটি হজরত আলী (রা.)-এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
আরবের এক কামার জুলফিকার তৈরি করেছিলেন। তার নাম মারজুক,৷ তবে এমনও দাবি করা হয় জুলফিকার ভারতবর্ষে তৈরি হয়েছিল। এ দাবির স্বপক্ষীয়দের যুক্তি, দ্বিফলাযুক্ত তলোয়ার তৈরিতে ভারতীয় কামাররা ছিলেন অনন্য। জুলফিকারেরও ফলা দুটি, এটি দেখতে মেরুদণ্ডের মতো। মেরুদণ্ডের আরবি প্রতিশব্দ ফিকার। তাই তলোয়ারটির নাম হয়েছে জুলফিকার। উল্লেখ্য, আরবি জু শব্দের অর্থ অধিকারী। তবে জুলফিকার শব্দের অর্থ ও তলোয়ারটির এমন নামকরণ নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। বীরত্বের গল্পে এমন অনেক মতবাদ যুক্ত হওয়াটা ইতিহাসে দেখা যায়।
এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকায় জুলফিকারকে সত্য, ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুফি সাধক ও কবি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি জুলফিকারকে দেখেছেন ‘হক্ব’-এর পুনরুজ্জীবন হিসেবে।
জেন হাথওয়ের বর্ণনা অনুসারে, হজরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন জুলফিকারের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। কারবালায় ইমাম হোসাইন শহীদ হওয়ার পর জুলফিকারের অবস্থান ও মালিকানা নিয়ে ধোয়াশা তৈরি হয়। এখনো বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের মাঝে বিতর্ক চলমান।
সোর্ড অব টিপু সুলতান
আমৃত্যু ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে ইতিহাসে অমর হয়েছেন মহীশূরের বাঘখ্যাত টিপু সুলতান। ১৭৮২-৯৯ সাল পর্যন্ত ছিল তার শাসনকাল। ১৭৯৯ সালের মে মাসে চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। রাজধানী শ্রীরঙ্গপাটনার প্রাসাদ থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যাবতীয় সম্পত্তি লুট করে। লুণ্ঠিত দ্রব্যাদির মধ্যে ছিল একটি তলোয়ার। টিপু সুলতানের শোয়ার ঘরে তলোয়ারটি পাওয়া গিয়েছিল। তিন ফুট লম্বা উটজ স্টিলের (বিশেষ ধরনের উচ্চমানসম্পন্ন স্টিল) তৈরি এক ফলাবিশিষ্ট এ তলোয়ারের হাতলে আছে স্বর্ণের কারুকার্য ও আরবি হরফে আল্লাহর গুণবাচক নামের ক্যালিগ্রাফি। তলোয়ারটি এমন শক্ত ও ধারালো ছিল যে তা প্রতিপক্ষের বর্ম ভেদ করে আঘাত হানতে পারত।৷ মোগল কারিগরদের তৈরি এ ধরনের তলোয়ারকে বলা হয় ‘সুখেলা’।
ভূগোলবিদ ফ্রান্সিস বুকাননের বর্ণনা অনুসারে, টিপু সুলতান বিরুদ্ধ শক্তির আক্রমণের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতেন। তাই ঘুমানোর সময় তলোয়ারটি হাতের পাশেই রাখতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, টিপু সুলতানের সবচেয়ে প্রিয় ও একান্ত ব্যবহার্য সামগ্রীর মধ্যে এ তলোয়ার ছিল অন্যতম।
সূর্যের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল যে তলোয়ার
তলোয়ারটি ছিল ইতিহাসখ্যাত রোমান শাসক শার্লেম্যানের (মৃত্যু-৮১৪ খ্রিস্টাব্দ)। এর নাম ‘জয়ুস’। ফরাসি শব্দটির অর্থ ‘আনন্দিত’। নয় শতকের প্রথম দশকে (সম্ভবত ৮০২-৮০৫ খ্রিস্টাব্দে) বিখ্যাত কামার গালাস তলোয়ারটি তৈরি করেছিলেন।৷সময় লেগেছিল তিন বছর। স্পেন থেকে ফেরার পথে শার্লেম্যান তলোয়ারটি নিজ অধিকারে নিয়েছিলেন।
বলা হয়, এ তলোয়ারের জাদুকরী ক্ষমতা ছিল,৷যা যুদ্ধক্ষেত্রে সূর্যরশ্মির চেয়েও অধিক তেজে এটি প্রতিপক্ষের চোখ ধাঁধিয়ে দিত। প্রাণ কেড়ে নিত হতবিহ্বল শত্রুসেনার। ‘সং অব রোল্যান্ড’ নামে এগারো শতকের এক কবিতায় তলোয়ারটির বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে—‘নেভার ওয়াজ দেয়ার আ সোর্ড টু ম্যাচ ইট; ইটজ কালার চেঞ্জড থার্টি টাইমস আ ডে (এর সমকক্ষ আর কোনো তলোয়ার ছিল না; এর রঙ দিনে ৩০ বার পরিবর্তন হতো)’।
জয়ুস ছিল শার্লেম্যানের সবচেয়ে প্রিয় তলোয়ার। আমৃত্যু তলোয়ারটি তার সঙ্গে ছিল। তেরো শতক থেকে ফ্রান্সের রাজাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল এ তলোয়ার। বর্তমানে এটি ল্যুভ জাদুঘরে সংরক্ষিত।
নেপোলিয়নের তলোয়ার
মিসরে সমরাভিযানে গিয়ে এ তলোয়ারের ধারণা পেয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বিজেতা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।৷ বাঁকানো ফলাযুক্ত আরব্য তলোয়ারগুলো বিশেষ পছন্দ হয় তার।৷ সে আদলে তিনি তলোয়ারটি তৈরি করিয়েছিলেন। এর গায়ে ছিল স্বর্ণের কারুকাজ। স্বর্ণ ও আবলুস কাঠ দিয়ে তৈরি হয় তলোয়ারের হাতল।
১৮০০ সালের ১৪ জুন অস্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এ তলোয়ার ব্যবহার করেছিলেন নেপোলিয়ন। ইতিহাসে ‘মারেঙ্গোর যুদ্ধ’ নামে পরিচিত সে সমরে নেপোলিয়ন প্রায় হারতে হারতে অলৌকিকভাবে জিতে যান। তলোয়ারটি তাই নেপোলিয়নের কাছে সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। সে কারণে ভাই জেরোমের বিয়েতে তিনি তলোয়ারটি উপহার দিয়েছিলেন।
দ্য গার্ডিয়ানের ১১ জুন ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, প্যারিসের এক অকশন হাউজের নিলামে তলোয়ারটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল।
দ্য সোর্ড অব মার্সি
দুনিয়ার বিখ্যাত তলোয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম এ তলোয়ারের নাম ‘কার্টানা’। ১৬১০-২০ সালের মধ্যে রবার্ট সাউথ নামে এক কাটলার (ছুরি, কাঁচি ইত্যাদি যন্ত্রসামগ্রী নির্মাতা) এটি তৈরি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ১৬২৬ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসের অভিষেক অনুষ্ঠানে কার্টানা ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়া অন্যান্য তলোয়ারের সঙ্গে কার্টানার একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে।৷ এর ডগা থেকে কিছু অংশ ভাঙা। কাউকে আঘাত করার জন্য এটি আর ব্যবহার করা সম্ভব নয়। তাই এর নাম দেয়া হয়েছে ‘দ্য সোর্ড অব মার্সি’ বা ‘করুণার তলোয়ার’। বর্তমানে তলোয়ারটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পত্তি।
বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে ও ব্যক্তিমালিকানায় এমন অনেক বিখ্যাত তলোয়ার সংরক্ষিত আছে। ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন হয়ে তারা স্বমহিমায় টিকে আছে, হয়ে আছে কালের সাক্ষী।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





