বাগেরহাটের বিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা খান জাহানের নাম কে না শুনিয়াছে? কেবল বাগেরহাট নহে, যশোর-খুলনার আরো বহু স্থান তাঁহার কীর্তিরাজিতে সমুজ্জ্বল। লোকে তাঁহার নামে শিরনি দেয়। তাঁহার সম্মানার্থে মেলা বসায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরূপ সর্বজনমান্য, কীর্তিমান দরবেশ-মুজাহিদের সন্ধান আর পাওয়া যায় না।
কে এই মহাপুরুষ, কোথা হইতেই বা তিনি এই দেশে তশরিফ আনিলেন, ইতিহাস এ বিষয়ে অদ্যাপি নীরব। যশোর গেজেটিয়ারে আছে, যশোর কখন চূড়ান্তরূপে মুসলমান শাসনে আসে জানা যায় না; তবে কিছুতেই পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের পূর্বে নয়। তখন ইহার দক্ষিণাংশ খান জাহান আলী নামক একজন মুসলমান শাসকের অধীনে ছিল বলিয়া জানা যায়। সুন্দরবন ছিল তখন পতিত ও জংলাবৃত। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী ৫৫০ বত্সর পূর্বে তিনি এখানে আসিয়া এই জঙ্গল আবাদ ও চাষ করিতে শুরু করেন। কথিত আছে ৬০ হাজার লোক লইয়া রাস্তা তৈয়ার করিতে করিতে তিনি যশোর জেলার ভিতর দিয়া অগ্রসর হন এবং পরিশেষে বাগেরহাটে গিয়া বসতি স্থাপন করেন। লোকে তাহার অনেক কীর্তিচিহ্ন দেখাইয়া থাকে। তন্মধ্যে কতগুলি আছে যশোর হইতে ২৪ মাইল দক্ষিণে ও কেশবপুর হইতে চার মাইল পশ্চিমে বেদ্যানন্দ কাঠিতে এবং যশোরের ১০ মাইল উত্তরে বারবাজারে। ভৈরব নদীর কূল দিয়া একই রাস্তার চিহ্ন বর্তমান আছে। ইহা তাঁহার গমনের জন্য নির্মিত সড়ক বলিয়া শণাক্ত করা হয়। বৃদ্ধকালে তিনি দুনিয়াদারি ছাড়িয়া দিয়া বাগেরহাটে দরবেশি হালে জীবন-যাপন করেন। সেখানে তাঁহার সমাধি অদ্যাপি দেখিতে পাওয়া যায়। উহার শিলালিপি পাঠে জানা যায় যে, ৮৬৩ হিজরি বা ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই নশ্বর পৃথিবী ছাড়িয়া যান। তিনি এখন গাজী ও দরবেশ বলিয়া পরিচিত।
উপকথার বাহিরে প্রাথমিক মুসলিম যুগের এই শাসনকর্তার কথা অতি অল্পই জানিতে পারা যায়। এমনকি লোকে তাঁহাকে যে খান জাহান আলী নামে অভিহিত করে, তাহারও কোনো প্রমাণ নাই। তাঁহার মাজারের শিলালিপিতে তাঁহাকে শুধু উলুগুজ খান জাহান বলা হইয়াছে। তবে তিনি যে নাসিরুদ্দীন (আবুল মুজাফ্ফর) মাহমুদ শাহের আমলের (১৪৪৪-৬০ খ্রি.) বহুপূর্ব হইতেই এতদঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন, তাহা নিঃসন্দেহ। ঢাকার একটি প্রাচীন মসজিদের দ্বারে লেখা আছে, “ইহা মাহমুদ শাহের রাজত্বের জনৈক খান কর্তৃক নির্মিতঃ তাঁহার উপাধি খাজা জাহান।’ এই শিলালিপির তারিখ ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুন। অধ্যাপক ব্লকম্যান তাঁহাকে ও যশোরের খান জাহানকে অভিন্ন বলিয়া মনে করেন। ইহার বাহিরে ইতিহাস নীরব। তবে বংশপরম্পরাক্রমে যে সকল উপকথা চলিয়া আসিয়াছে, উহাদের যে কোনোই ঐতিহাসিক মূল্য নাই, এমন নহে? ডা. রচ বলেন, দিল্লির বাদশাহ তাঁহাকে দূরবর্তী দেশ জয়ে প্রেরণ করেন, এই বাদশাহ মাহমুদ শাহ তুগলক (১৩৯৪-১৪১৪ খ্রি.) হওয়াই সম্ভব। খান জাহান অনেক কেরামত প্রদর্শন ও বহু অদ্ভুত কার্য সম্পন্ন করেন। এ সকল কাহিনী প্রকৃতই হউক আর কল্পিতই হউক না কেন, বড় বড় মারফতি সমাজের দরবেশ ও নেতারা ভারতের মুসলিম রাজত্বের প্রথম কয়েক শতকে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেন, এগুলি অদ্যাপি তাহার অস্পষ্ট প্রতিধ্বনি জাগাইয়া তোলে।
‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থের রাজত্ব তালিকা হইতে এতদঞ্চলের আরো কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। উত্তর যশোর ছিল তখন সরকার মাহমুদাবাদ ও দক্ষিণ যশোর সরকার খলিফাতাবাদের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে যতদূর জানা গিয়াছে, মাহমুদাবাদ নাম প্রথম পাওয়া যায় নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের একটি মুদ্রায়। স্পষ্টত তাঁহারই নামে ইহার নাম রাখা হয়। সম্ভবত তিনিই মধুমতী নদীর তীরে মাহমুদাবাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। মাহমুদাবাদের দক্ষিণে ছিল সরকার খলিফাতাবাদ বা খলিফার প্রতিনিধির আবাদ (সাফ-থাকার-জায়গা)। সুন্দরবনের প্রথম আবাদকারী খান জাহানের নামে এই নাম রাখা হয় বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে।
এক লোক তাঁহাকে এত ভক্তি করিত যে, খাঞ্জালীর দীঘির পাড়ে তাঁহার নামে নির্মিত অট্টালিকার একখানা ইষ্টক সংযোগী না করিয়া বিদ্যানন্দকাঠিতে হিন্দু-মুসলমান কেহই কোনো দালান উঠাইত না। চতুষ্পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকে এখনো তাঁহাকে মুরুব্বি-পীর বলিয়া মনে করে এবং তাঁহার নামে গাভীর প্রথম দুধ নেয়াজ দেয়। তাঁহার সম্মানার্থে তাঁহার ওরসের (মৃত্যুবার্ষিকী) দিনে ফাল্গুন বা চৈত্র পূর্ণিমায় অদ্যাপি এই দীঘির দক্ষিণ পাড়ে মেলা বসিয়া থাকে। হান্টার সাহেব বলেন, আমাদের নিকট খান জাহান যে আবাদকার্য চালান, তাহা স্থায়ী হয় নাই। সম্প্রতি সেখানে তাঁহার মসজিদ আবিষ্কৃত হওয়ায় স্থানটির নাম হইয়াছে মসজিদ কুড়। তবে বাগেরহাটের আবাদ স্থায়ী হয়। সম্ভবত ইহার প্রাচীন নাম খলিফাতাবাদ এই শ্রেণীভুক্ত খাঁয়ের নামের সহিত সংশ্লিষ্ট। ‘আবাদ’ শব্দের দ্বারা সুস্পষ্টরূপে পরিষ্কৃত ভূমি বোঝা যায়! আজ পর্যন্ত এ অঞ্চলের প্রত্যেকটি আবাদি ভূখণ্ড সুন্দরবনাবাদ বা শুধু আবাদ নামে অভিহিত হয়। খলিফাতাবাদ বা দক্ষিণ যশোরের প্রায় প্রত্যেকটি দীঘি ও রাস্তা তাহার নির্মিত বলিয়া জনশ্রুতি আছে।
এই সর্বজন-বরেণ্য খান জাহান আলীকে সরওয়ার নামক জনৈক প্রতিপত্তিশালী খোজা আমির ‘খাজা-ই-জাহান’ উপাধিতে ভূষিত করিয়া শেষে তুগলক সুলতানদের উজিরের পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে মাহমুদ শাহ তুগলক তাহাকে হিন্দুস্তানে প্রেরণ করেন। এইরূপে জৌনপুরের শকী সুলতানাতের প্রতিষ্ঠা। অযোধ্যা, বিহার প্রভৃতি স্থানের বিদ্রোহীদিগকে শায়েস্তা করিয়া তিনি একই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন যে, জাজনগরের রাজা ও বাংলার সুলতানেরা দিল্লির বাদশাহের পরিবর্তে তাহাকেই খাজনা পাঠাইতে আরম্ভ করেন। ডা. বুচ, অধ্যাপক ব্লকম্যান প্রভৃতির অনুসরণ করিয়া ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ লেখক সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁহাকেই যশোরের খান জাহান বলিয়া ধরিয়া লইয়াছেন। স্পষ্টত মাহমুদ শাহ তুগলকের অভিপ্রায় অনুযায়ীই তিনি বিশেষ কার্যে এ দেশে আগমন করেন এবং বাংলার সুলতানেরা তাহার বশীভূত ছিলেন বলিয়া তাহাতে আপত্তি করেন নাই। পুঁথিতেও আছে, ‘খান জাহান মহামান্য বাদশা নফর, যশোরে সনদ (সনদ) লয়ে করিলা সফর।’
বস্তুত তিনি ছিলেন সুন্দরবন বা দক্ষিণবঙ্গের জন্য দিল্লির সুলতান কর্তৃক স্বতন্ত্রভাবে নিযুক্ত শাসনকর্তা। তিনি যেভাবে অবাধে রাজধানী প্রতিষ্ঠা, কৃষিকার্য সম্পাদন, রাজস্ব সংগ্রহ, দান-খয়রাত ও জায়গির দান করিতেন, তাহা হইতেই এই মতের সমর্থন পাওয়া যায়। বাংলা বা দিল্লির সুলতানদের কেহই তাহার কার্য বা অগ্রগতিতে কখনো হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায় না; এমনকি তিনি দিল্লিতে রাজস্ব পাঠাইতেন বলিয়াও মনে হয় না। জনহিতকর কার্যেই তাহা ব্যয়িত হইত। মোটের উপর তিনি ছিলেন বিশেষ কার্য অর্থাৎ বন আবাদ, রাজ্য জয় ও ধর্ম প্রচারার্থে প্রেরিত বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন বিশিষ্ট শক্তিশালী আমির। নামে অধীন হইলেও কার্যত পরবর্তীকালের নওয়াব আলীবর্দি খাঁ প্রমুখের ন্যায় তিনি স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করেন। নতুবা বাংলার সুলতানেরা তাঁহাদের সীমান্তে কিছুতেই এরূপ অনধিকার-চর্চা সহ্য করিতেন না।
খান জাহান সম্পর্কে লেখা বড় একটা নাই। কেবল সতীশচন্দ্র মিত্রই তাঁহার সম্পর্কে অনেকটা বিশদ আলোচনা করিয়াছেন। মরহুম ডা. আবদুল গফুর সিদ্দিকী সাহেব এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছেন (মাহে-নও, ভাদ্র, ১৩৬৩ খ্রি.)। দুর্ভাগ্যবশত উহাতে তিনি নিছক ধর্মপ্রচার হিসাবেই চিত্রিত হইয়াছেন। তাহার চরিত্রের সর্বাপেক্ষা বড় দিকটাই— দিগ্বিজয় ও আবাদ একদম বাদ পড়িয়াছে। তাহা ছাড়া হাজার হাজার সাহেবের পরিবেশিত কয়েকটি তথ্য স্পষ্টত ভ্রমাত্মক। খান জাহানের জলপথে আক্রমণের কথা আর কোথাও নাই। যদি ৬০ হাজার লোক আসিয়াই থাকে এবং প্রত্যেক কিস্তিতে ৫০ জন লোক আসিয়া থাকে, তবে ১ হাজার ২০০ কিস্তির দরকার হয়। এত কিস্তি তিনি কোথায় পাইলেন? ‘শাহে জামানা’ বলিতে তিনি কাহাকে বুঝাইয়াছেন বোঝা গেল না। তিনি যদি তাঁহাকে এক হাজার বিঘা জমি আয়মা দিয়া থাকেন ও প্রত্যেক নওমুসলমান ১০ বিঘা করিয়া জমি পাইয়া থাকে, তবে তাহাতে মাত্র ১০০ লোকের স্থান সংকুলান হয়। তাহা হইলে দলে দলে নওমুসলমান আসিয়া কিরূপে সেখানে বসবাস করিল, তাঁহার নিজের দলবলই বা কোথায় রহিল? সুন্দরবনের গৌরবান্বিত আবাদি নওয়াব তাহার লেখায় সামান্য আয়মাদারে পরিণত হইয়াছেন। কোথা হইতে কোন পথে আসিয়া তিনি এ দেশে কিস্তি ভিড়াইলেন ও কোন প্রধানতম শিষ্যকে তিনি তাঁহার আয়মা দিয়া গেলেন, উক্ত প্রবন্ধটিতে তাহার কোনো হদিস মিলে না। তিনি সেখানে তাঁহাকে সাতক্ষীরার খাঞ্জেপুর হইতে খুলনা সদরের খাঞ্জেপুর হইয়া (কিছুদিন পরে) সটান বাগেরহাটে চালান দিয়াছেন, সতীশ বাবু সেক্ষেত্রে তাঁহাকে গঙ্গা পার করিয়া নদিয়ার মধ্য দিয়া প্রথমে যশোরের বারবাজারে আনয়ন করিয়াছেন এবং প্রায় সমগ্র উত্তর সুন্দরবন ঘুরাইয়া ছাড়িয়াছেন। ‘শাহে জামানা’ হইতে কোনো আয়মা পাওয়া তো দূরে থাকুক, পুঁথিতে দেখা যায়, তিনি নিজেই লোককে আয়মা ও জায়গির দিতেছেন। ‘তখন ডাকিয়া দোহে (দক্ষিণ ডিহির জমিদার কামদেব ও জয়দেব) আলি খাঁ জাহান। সিঙ্গির জায়গীর দিল করিতে বাখান।’ খান জাহান মুড়লী কসবা ও পয়োগ্রাম কসবা নামে দুইটি কসবা বা শহর স্থাপন করেন। সতীশ বাবুর মতে, পয়োগ্রাম নাম পূর্ব হইতেই ছিল। ডাক্তার আবদুল সিদ্দিকীর মতে, কসবাই পয়োগ্রামের অপর অংশ। কিন্তু রূপামনে খান জাহান আলী সংস্কৃত নাম রাখিতে চাহিলেন কেন? বরং মুড়লী যদি মুড়লী কসবা হইয়া থাকে, তবে পয়োগ্রামও পয়গ্রাম কসবা হওয়া স্বাভাবিক ও সম্ভবপর।
সমস্ত লোককে নিজের সঙ্গে না রাখিয়া চাষাবাদ ও ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি তাঁহার কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোককে প্রধান প্রধান কর্মক্ষেত্রে রাখিয়া যাইতেন ও কিছু লোককে সুন্দরবনের ভিতরে পাঠাইতেন। কথিত আছে, কোনো সামাজিক বিবাদ মিটাইবার জন্য জনৈক ব্রাহ্মণ খান জাহানকে পথ দেখাইয়া যশোরে আনয়ন করেন। তিনি পরে মুসলমান হইয়া প্রথমে মুহাম্মদ তাহির ও ধর্মনিষ্ঠার দরুন পীর আলী নামে পরিচিত হন। ইহার শিষ্যরা ‘পীর আলী’ মুসলমান নামে পরিচিত। খান জাহান পয়োগ্রামের নওয়াব হইলে তিনি তাঁহার উজিরি লাভ করেন। ‘তার মুখ্য মহাপাত্র মামুদ তাহির। সুবিধা পাইয়া তাহির হইল উযীর।’
এই তাহিরকে তিনি তাঁহার প্রতিনিধি হিসাবে রাজ্য শাসনের জন্য পয়োগ্রামে রাখিয়া গেলেন। তাঁহাদের চেষ্টায় ও ধর্মজীবনের আদর্শে মুগ্ধ হইয়া বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলামে দীক্ষিত হয়। যাহারা মুসলমান হয় নাই, তাহারাও তাঁহাদিগকে দেবতার ন্যায় ভক্তি করিতে লাগিল। সে ভক্তি অদ্যাপি বিলুপ্ত হয় নাই। কেহ যশোরে গিয়া এখনো গরীব শাহের দরগায় শিরনি না দিয়া কোনো কাজকর্ম করে না, তাঁহার ক্ষুদ্র মসজিদ আজিও সর্বজাতির লোকের তীর্থ।
বাগেরহাটে চার মাইল দীর্ঘ ও দু-তিন মাইল প্রশস্ত এক বিরাট রাজধানী নির্মাণ করিয়া খান জাহান তাহার নাম দেন খলিফাতাব। পরবর্তীকালে তাঁহার বাগেরহাট বসে বলিয়া উহার নাম হয় বাগেরহাট। বারবাজার হইতে বাগেরহাট ৭০ মাইল। এই বিশাল ভূভাগে— সমগ্র দক্ষিণ যশোর ও উত্তর খুলনায় যে তাঁহার হুকুম চলিত, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। বাগেরহাটের নিকটস্থ রণজিত্পুর, রণবিজয়পুর প্রভৃতি গ্রামের নাম হইতে বোঝা যায় যে, তিনি সম্পূর্ণ বিনা বাধায় তাঁহার মহৎ কার্য সম্পন্ন করিতে পারেন নাই। স্থানীয় রাজা বা ভূস্বামীদের সহিত তাঁহাকে কিছু কিছু যুদ্ধও করিতে হইয়াছিল। তিনি ‘শাহজালাল প্রভৃতির মতো সাধুচরিত্রের লোক ছিলেন’, কিন্তু তিনি ঠিক তাঁহাদের মতো কেবলমাত্র ধর্ম প্রচারার্থ শিষ্য পরিবৃত হইয়া আসেন নাই। তাঁহার কার্যগণ্ডি যশোর হইতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে যুদ্ধের চেয়ে তাঁহার চরিত্র-মাহাত্ম্য, সুশাসন ও জনহিতকর কার্যই লোককে তাঁহার দিকে আকৃষ্ট করে বেশি। দুর্ধর্ষ সুন্দরবন প্রদেশে তিনি না আসিলে কোনো ক্রমেই হয়তো মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রবেশ লাভ করিতে পারিত না।
খান জাহানের অপূর্ব জয়যাত্রা
খান জাহান প্রথমে যশোরের বারবাজারে তশরিফ আনেন, উহা ছিল তখন বৌদ্ধপ্রধান। তাঁহার আগমনে তাহাদের কিছু মুসলমান হয়। অবশিষ্ট পলাইয়া যায়। এ সময়ে সেখানে কতকগুলি দীঘি কাটা হয় এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির ধ্বংসাবশেষ অদ্যাপি বর্তমান আছে।
বারবাজার হইতে খানজাহান যশোরের পথে মুড়লীতে গিয়া একটি শহর (কসবা) স্থাপন করেন। মুড়লী কসবা হইতে তাহার সৈন্যরা দুইভাগে বিভক্ত হইয়া যাত্রারম্ভ করে; সঙ্গে সঙ্গেই দুইটি জাঙ্গাল বা রাস্তা প্রস্তুত আরম্ভ হইয়া যায়। বহু সৈন্য ও দরবেশ সঙ্গে লইয়া তাহার সহচর বুড়া খান রাস্তা নির্মাণ ও তাহার উত্তর পার্শ্বে দীঘি খনন করিয়া লোকের জলকষ্ট নিবারণ করিতে করিতে প্রথমে খানপুরে গমন করেন। এখানে বহু লোক ইসলামে দীক্ষিত হয়। অতঃপর তিনি বিদ্যানন্দকাঠিতে গিয়া একটি প্রকাণ্ড দীঘি খনন করেন; ইহার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৬০০ ও প্রস্থ ৭০০ হাত। এ সময় খান জাহান কিছুকাল এখানে অবস্থান করেন। এই দীঘির দক্ষিণ পাড়ে প্রতি বত্সর দোলযাত্রার দিনে ‘খাঞ্জালীর মেলা’ বসে। পার্শ্ববর্তী সারবাবাদ ও মির্জাপুরেও কয়েকটি খাঞ্জালী দীঘি আছে।
এখান হইতে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বুড়া খানের লোকেরা যে রাস্তা করে, তাহা বর্তমানে ডি.বি. রোডে পরিণত হইয়াছে। একটি রাস্তা যশোর, খানপুর, কেশবপুর, বিদ্যানন্দকাঠি ও তথা হইতে ঘোনা, চাপান ঘাট, খলিল নগর, গঙ্গারামপুর, ঘোষনগর, রামনাথপুর মঠবাড়ী প্রভৃতি গ্রামের ভিতর দিয়া পাইকগাছা পর্যন্ত গিয়াছে। সেখান হইতে শিবসা নদী পার হইয়া বক্ষ্মীগোলা গজালিয়া, আমতলা, মসজিদকুড় ও আমাদি হইয়া গভীর অরণ্য-মধ্যস্থ বেদকানীতে গিয়া মিশিয়াছে। ইহার পাশে স্থানে স্থনে বহুকীর্তি চিহ্ন আছে। তন্মধ্যে মাগুরাঘোনা ও আরশনগরের দীঘি উল্লেখযোগ্য। শেষোক্তটিতে ও লস্করবেড়ের দীঘিতে এখনো বেশ পানি থাকে। লস্করবেড়ের দীঘির পানি বেশ মিষ্ট। আরশনগর ও মঠবাড়ীতে দুইটি মসজিদ ছিল; বর্তমানে উহাদের চিহ্নমাত্র বিদ্যমান। আরশনগরের মসজিদের (৪৫^৪০ ফুট) একটি পাথরে তোগরা অক্ষরে আরবিলিপি দেখিতে পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যবশত অদ্যাপি তাহার পাঠোদ্ধার হয় নাই। শাহাজী নামক এক ফকির উহা প্রাপ্ত হন। পাথরখানার ওজন প্রায় ২৫ সের। শাহজীর বংশধরেরা দুধ দিয়া উহার সেবা করিয়া থাকে।
মসজিদকুড়ে বুড়া খানের পুত্র ফতেহ খানের আস্তানা ছিল। কালক্রমে স্থানটি আবার জঙ্গলাকীর্ণ হইয়া যায়। পরে জঙ্গল কাটিয়া ও মাটি খুঁড়িয়া একটি মসজিদ পাওয়া যায়। ইহাতে নয়টি গম্বুজ থাকায় ইহাকে নব গম্বুজ মসজিদ বলে। মধ্যের গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ। ইহা সুন্দরবনের একটি প্রধানত স্থাপত্যকীর্তি। ভিতরে ৪০ ফুট বর্গ, ভিত্তি ৭ ফুট, চার কোণে চারটি মিনার ও পশ্চিম দিকে তিনটি মাহরাব (কুলুঙ্গী) আছে। অপর তিন দিকে তিনটি করিয়া খিলান ও খোলা দরজা; প্রত্যেক দিকেই মধ্যের দরজাটি একটু বড়। পূর্ব দিকের কার্নিশে ও খিলানের উপরের দিকে স্টকে কারুকার্য আছে। কতকগুলিতে আছে পদ্র ও কতকগুলিতে জড়োয়াবৃত্ত। খিলান ও গম্বুজের গঠন এতই সুন্দর মনে হয় যে, এখন স্তম্ভগুলি সরাইয়া লইলেও এগুলি ধসিয়া পড়িবে না।
এই মনোরম মসজিদটির এখন অতি দুরবস্থা। মিনারগুলির মাথা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। উপরিভাগ জঙ্গলে ঢাকা পড়িয়াছে, স্তম্ভের মাথা দিয়া বৃষ্টির পানি পড়ায় এগুলি ক্ষয় পাইতেছে, লোকে খিলানের ইট ভাঙ্গিয়া নিতেছে। বর্ষাকালে ভিতরে পানি জমিয়া মসজিদটি ব্যবহারের অযোগ্য হইয়া পড়ে। ময়নামতির সলমান রাজার বাড়ীকে বৌদ্ধ বিহার বলিয়া চালাইয়া দিয়া উহাকে সর্বজাতির তীর্থস্থানে পরিণত করিতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উত্সাহের অবধি নাই। এই অখ্যাত ও অবজ্ঞা নানা পানির দেশে পাঁচ শতাধিক বত্সর পূর্বে নির্মিত এমন একটি সেরা কীর্তি মেরামতের দিকে যে উহার দৃষ্টি আকুণ্ঠ হয় না; তদপেক্ষা গভীর পরিতাপের বিষয় আর কি হইতে পারে।
বুড়া খানের কবর এখন নদীগর্ভে। যতদিন উহার অংশমাত্র বিদ্যমান ছিল, হিন্দু-মুসলমানে মিলিয়া ততদিন সেখানে মানত করিত। ধর্ম প্রচার ছাড়া তাঁহার আর একটি বড় কাজ ছিল রাজ্য শাসন ও নয়াবাদ জমি পত্তন। কবরের অদূরে ছিল দুইদিকে নদী ও অপর দুইদিকে গড়-বেষ্টিত সুরক্ষিত কাছারি বাড়ি। গড় ও কাছারির কিঞ্চিৎ ভগ্নাবশেষ এখন বর্তমান আছে।
বুড়া খানের অনুচরেরা আবার অন্যান্য স্থানে ছড়াইয়া পড়েন। বেদকাশী আবাদে খালাস খাঁর দীঘি আছে। ইহার দৈর্ঘ্য ৭০০ হাত এবং প্রস্থ ৪০০ হাতেরও অধিক; পানি অতি উত্কৃষ্ট; কিন্তু পুরু দামের নিম্নে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এই দীঘির উত্তর-পূর্বে একটি প্রকাণ্ড বাদ্রীর বেষ্টন প্রাচীরের অংশ ও ৭০/৮০ বিঘা জমির উপর স্থাপিত পীরের আস্তানার পাশে পরে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।
গোপালপুরে নদীর ধারে একটি সুন্দর বাঙালি মসজিদ দৃষ্ট হয়। আরো দক্ষিণে মেহেরপুরে আছে মীর মেহেরুদ্দীনের প্রাচীর-বেষ্টিত দুর্গ ও মসজিদ। দরজা মাত্র একটি। চার পার্শ্বের ইষ্টক-কারুকার্য খচিত। উত্তরে আছে পাকা ইদারা ও কুয়া। মেহেরপুরেরও দক্ষিণে মাগুরায় পীর জয়ন্তীর দরগা; ইহার প্রচুর লাখেরাজ সম্পত্তি আছে। অম্বুবাচ্চির সময় এইখানে একটি মেলা বসে। আরো দক্ষিণে আছে শুজন শাহি গ্রামে জুজন শাহ ফকিরের দরগা। ইহারা সকলেই বুড়া খানের অনুচর। লোকে ইহাদের নামে গ্রামের নাম পর্যন্ত রাখিয়া অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছে। হালে খাকসারদের যেমন বেলচা, খান জাহানের অনুচরদের সঙ্গে থাকিত তেমনি একখানা করিয়া কোদাল। লোকে তাঁহার জনহিতৈষী কাজে মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে এতই ভক্তি করিত যে, অনেক সময় বিনা যুদ্ধেই বশ্যতা স্বীকার করিত। সুতরাং প্রায়ই তাহাদের হাতে কোনো কাজ থাকিত না। আধুনিক সরকার অবসরকালে সৈন্যদের দক্ষ রাখেন ফুটবল খেলিতে দিয়া ও কুচকাওয়াজ করাইয়া। খান জাহান তাহাদের কর্ম দেন কোদালি দিয়া, মিঠা পানির পুকুর খনন করিতে করিতে দেশময় পুণ্যকীর্তি রাখিয়া তাহারা সম্মুখে অগ্রসর হইত। সরকার এখন পুকুর না কাটাইয়া বসান নলকূপ। এগুলি কিছুকাল পরেই পুনঃ পুনঃ বিকল হইয়া যায়। কিন্তু খান জাহানের দীঘিগুলি ৫০০ বত্সর পরেও পুষ্টিকর আহার্য যোগাইতেছে। এমনভাবে দেশ ও দশের স্থায়ী উপকারের উপায় আর নাই। পরবর্তীকালে রাজা সীতারাম, নশের গাজী, প্রমুখ নরপতি ও জমিদার তাঁহার প্রতি বহু দৃষ্টান্তের অনুসরণ করায় যশোর-খুলনা ও বেনাপোল-ত্রিপুরার বহুস্থানে পানীয় জলের দুর্ভিক্ষ ছড়াইয়া গিয়াছে। কবে সরকারের সুমতি হইবে কে জানে?
মুড়লীর চার মাইল দক্ষিণ-পূর্বে রামনগর গ্রামে খানজাহান একটি দীঘি খনন করেন। ইহাকে শাহবাটির দীঘি বলে। ইহা উত্তর ও দক্ষিণে দীর্ঘ। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা দীঘির পানি হিন্দুরা ব্যবহার করেন বলিয়াই তিনি তাহাদের সুবিধার্থে এরূপ অসংখ্য দীঘি খনন করান। অনেক প্রাচীন হিন্দু দীঘি আবার পরিষ্কার করেন। কাজেই উত্তর-দক্ষিণে দীঘি মানেই হিন্দু কীর্তি মনে করা মূর্খতার পরিচয়।
পায়োগ্রাম কসবা ছিল একদা একটি উন্নত শহর। ইহার মধ্যভাগস্থ প্রধান রাস্তা হইতে আর একটি রাস্তা উত্তর ডিহির মধ্য দিয়া উত্তর মুখে নদীর দিক গিয়াছে। এই অসাধারণ রাজপথটি ৫০ ফুট চওড়া। উহা হইতে আবার উত্তরে-দক্ষিণে বহু রাস্তা নির্গত হইয়া শহরটিকে বহু খণ্ডে বিভক্ত করিয়াছে। দেখিলেই বোঝা যায় যে, ইহা কোনো কৃতী পুরুষের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত। উত্তরমুখী বড় রাস্তার দুই পাশে দুইটি পুকুর আছে। এগুলির নাম আঠার পুকুর ও শানের পুকুর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তীকালীন কোনো রাষ্ট্র-বিপ্লবে শহরটি জনশূন্য ও জঙ্গলাকীর্ণ হইয়া পড়ে। বন কাটিয়া খান জাহানের এই অপূর্ব কীর্তি লোক লোচনে আনিবার কোনোই ব্যবস্থা নাই।
বড় রাস্তাটি নদীর ধারে গিয়া পূর্ব মুখে ফিরিয়াছে। বাঁকের বাম পার্শ্বে ১০০ ফুট বর্গ ও ৮ ফুট উচ্চ একটি দীঘি আছে। এখানে যে কোনো বিরাট মসজিদ বা দরবার ভবন ছিল, তা নিঃসন্দেহ। শ্রীধরপুরের ঈশ্বর চন্দ্র বসু তাহার নীলকুঠি নির্মাণের জন্য ইহার ধ্বংসাবশেষ ভাঙ্গিয়া মধ্যপুরে লইয়া যান। নিকটে ৩ ফুট লম্বায় ও প্রায় পৌনে ২ ফুট প্রশস্ত একখানা সুন্দর কষ্টিপাথর আছে। নিম্নে আছে আর একখানা পাথর। ইহা প্রায় পৌনে ২ ফুট বর্গ ও পৌনে ১ ফুট উচ্চ। আরো কত ছিল কে জানে? নীলকরেরা এরূপ বহু পুরাকীর্তি বিনষ্ট করিয়াছে। কুঠিটি খনন করিলে এই বিরাট সৌধের তলদেশেও খান জাহানের আমলের বহু নিদর্শন পাওয়া যাইতে পারে। পয়োগ্রাম হইতে খান জাহান রাস্তা নির্মাণ ও পুকুর খনন করিতে বাসুড়ী গ্রামে গিয়া কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখানে ৫৫০ হাত দীর্ঘ ও ৪৫০ হাত প্রশস্ত তাঁহার এক বিরাট দীঘি আছে। তীরসহ উহা ৭০ বিঘা জমি দখল করিয়া আছে। দুঃখের বিষয়, দীঘিটি ক্রমে ভরাট হইয়া আসিতেছে। গ্রীষ্মকালে পাঁচ-ছয় হাতের বেশি পানি থাকে না। অথচ ইহার পঙ্কোদ্ধারের কোনোই ব্যবস্থা নাই। দীঘির দক্ষিণ পাড়ে চৈত্র পূর্ণিমায় দীর্ঘস্থায়ী মেলা বসে। বহু লোক খাঞ্জালীর নামে মানত করে ও শিরনি দেয়।
সম্ভবত খান জাহানের উদ্দেশ্য ছিল নড়াইল যাওয়া। কিন্তু নদী উত্তীর্ণ হওয়ার পর চাঁদের বিলে বাধা পাইয়া শুভরায় গ্রামে ফিরিয়া আসেন। এখানে তাঁহার একটি মসজিদ আছে উহা ভিতরে প্রায় ১৭ বর্গফুট। ইহাতে তিনটি দরজা, কিন্তু চারটি কোণের চারটি মিনার অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছে ও বহু স্থান ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। ইটগুলির আকার ৩/৪ ইঞ্চি হইতে ১০/১২ ইঞ্চি পর্যন্ত। অথচ ময়নামতির অনুরূপ ইট বৌদ্ধযুগের বলিয়া প্রচারণার অন্ত নাই।
শুভরাটা হইতে খান জাহান রানীগতি, গোপীনাথপুর ও নাউটি হইয়া ধুলগ্রামে হাজির হন। ধুলগ্রাম ও নাউটির মধ্যে প্রকাণ্ড খাঞ্জালী রাস্তা ও উহার পাশে একটি দীঘি আছে। ধুলগ্রাম হইতে সিদ্ধিপাশার ভিতর দিয়া রাস্তা নির্মাণ করিতে করিতে যেখানে গিয়া তিনি ছাউনি ফেলেন, উহার নাম দেওয়া হয় বারাকপুর বা অশ্বশালা। পাঠান আমলে ইহা ছিল সেনানিবাসের নাম। বারাকপুর হইতে কোষগতি, দীঘলিয়া প্রভৃতি গ্রামের ভিতর দিয়া রাস্তা তৈয়ার করিতে করিতে তিনি দেবনগরে উপনীত হন, পরে ইহার নাম হয় ফরমাইশখানা। সেখান হইতে সেনহাটীর চাঁদনি মহল দিয়া আত্রাই নদী পার হইয়া তিনি সেনের বাজারে পৌঁছেন। বারাকপুর হইতে সেনের বাজার পর্যন্ত আট-নয় মাইল দীর্ঘ রাস্তা এখন হুলনা-মুজদখালী ডি.বি. রোডে পরিণত হইয়াছে। অদ্যাপি ইহা এ দেশের একটি বিখ্যাত রাজপথ। সেনের বাজার ছিল তখন এক মাইল দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, তাহার বিপরীত দিকে খুলনা। সেখান হইতে সেকালে সুন্দরবন আরম্ভ হয়। খান জাহান নদী পার হইয়া তালিমপুর হইয়া শ্রীরামপুরে গিয়া বাঁকা পথে লখখুর দিয়া বল্লখপুরে পৌঁছেন। সেখানে তিনি আধি পুকুর খনন করেন। তত্পরে রায়দিয়া ও মধুদিয়া ভেদ করিয়া বাগেরহাটের সন্নিকটে গিয়া ছাউনি ফেলেন। এজন্য এ স্থানের নাম হয় বারাকপুর। এখানে তিনি বিখ্যাত ঘোড়দীঘি খনন করেন। এক হাজার হাত দীর্ঘ ও ৬০ হাত প্রশস্ত। ইহাতে এখনো ১২ মাস পানি থাকে। একমাত্র সীতারামের দীঘি ভিন্ন এত পানি আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ।
খান জাহান প্রাচীন খুলনার আধুনিক রেনীগঞ্জ ভৈরবের কুল পরিত্যাগ করিলেও উহার দুই খানে তাঁহার অজস্র কীর্তি, রাস্তা, পুকুর ও মসজিদ বিদ্যমান। ফকিরহাট খানার নিকট অদ্যাপি একটি পুরাতন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। পরপারে মূলঘরের জেন্দার আলী খান এবং সৈয়দ মহল্লা ও কামটা গ্রামের খাঞ্জালী দীঘি উল্লেখযোগ্য।
খান জাহান প্রাচীন খুলনার আধুনিক রেনীগঞ্জ ভৈরবের কূল পরিত্যাগ করিলেও উহার দুই খানে তাঁহার অজস কীর্তি, রাস্তা, পুকুর ও মসজিদ বিদ্যমান। ফকিরহাট খানার নিকট অদ্যাপি একটি পুরাতন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। পরপারে মূলঘরের জেন্দার আলী খান এবং সৈয়দ মহল্লা ও কামটা গ্রামের খাঞ্জালী দীঘি উল্লেখযোগ্য।
ঘোড়দীঘির পূর্ব দিকস্থ সুন্দর ঘোনায় খান জাহানের কীর্তি ষাটগম্বুজ মসজিদ। ইহার বাহিরের মাপ প্রায় ১৬০ ফুট ^ ১০৪.৫ ফুট এবং ভিত্তি ৮ ফুট। গম্বুজের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে ৭৭টি, তবে স্তম্ভ ৬০টি। কাজেই উহার নাম হওয়া উচিত ষাট খামের মসজিদ। প্রতি সারিতে ১১টি করিয়া মোট সাত সারি গম্বুজ আছে। প্রথম সারি কিছু বড়। অধিকাংশ গম্বুজেরই উপরের আস্তর খসিয়া পড়িতেছে, কিন্তু অপূর্ব স্থাপত্য কৌশলে গম্বুজ এখনো সুদৃঢ় রহিয়াছে। খান জাহান ইহাতে বসিয়া দরবার কারিতেন। সম্মুখে ছিল প্রকাণ্ড সিংহদ্বার ও দুই পাশে হর্ম রাজ; এগুলির এখন চিহ্নমাত্র নাই। মসজিদটি এখনি মেরামতের দরকার। খান জাহানের খলিফাতাবাদ শহর ঘোড়দীঘি হইতে পূর্ব দিকে ভৈরবের তীর পর্যন্ত পাঁচ মাইল ও উত্তরে মগরার খাল হইতে দক্ষিণে কাড়া পাড়ার বিল পর্যন্ত প্রায় চার মাইল বিস্তৃত ছিল। কথিত আছে, তাঁহার ৩৬০ জন সঙ্গী দরবেশের প্রত্যেকে একটি করিয়া মসজিদ নির্মাণ ও পুকুর খনন করেন। ইতিমধ্যে শতাধিক মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। কাজেই কিংবদন্তি সত্য বলিয়াই মনে হয়।
ষাটগম্বুজ হইতে একটি রাস্তা উত্তরে ভৈরবের কূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল; উহার পূর্ব দিকে ছিল খান জাহানের হাবেলী বাগড়-বেষ্টিত বাড়ি ও মসজিদ। তাহার স্থানে আছে এখন ১৫০ ফুট দীর্ঘ ও ১২০ ফুট প্রস্থ একটি বিশাল ইষ্টকস্তূপ। ইহা খনন করিয়া ১৪-১৫টি প্রস্তর পাওয়া গিয়াছে।
অথচ দক্ষিণবঙ্গের কোথাও পাহাড় নাই। তবে প্রস্তর আসিল কোথা হইতে? কথিত আছে, খান জাহান চাটগাঁও হইতে প্রস্তার আনাইতেন। পাথরবোঝাই জাহাজ বলেশ্বর ও ভৈরব নদ দিয়া মগরার খালে প্রবেশ করিয়া ষাটগম্বুজের আধ মাইল উত্তরে ভিড়িত। স্থানটি অদ্যাবধি জাহাজঘাট নামে পরিচিত। সুন্দরবন অঞ্চলে নিচের ২/৩ ফুট লোনা ধরে বলিয়া তিনি তাহার অট্টালিকার নিম্নভাগে পাথরের গাঁথুনি দিতেন। এগুলি অদ্যাপি অক্ষুণ্ন থাকার ইহা একটি কারণ।
খান জাহান ষাটগম্বুজ হইতে বাগেরহাটের ভিতর দিয়া চাটগাঁও পর্যন্ত একটি সুদীর্ঘ রাজপথ নির্মাণ করেন। কাড়াপাড়া রাস্তা ছাড়িয়া আর একটু আগাইয়া গিয়া ইহা বাসাবাটি গ্রামের ভিতর দিয়া পুরাতন ভৈরব অর্থাৎ মগরা খালের বাঁকের মাথা দিয়া বৈটপুর, কচুয়া ও চিংড়াখালী হইয়া হোগলাবুনিয়ার নিকট বলেশ্বর নদী পার হইয়া বাখরগঞ্জে প্রবেশ করিয়াছে। সেখান হইতে চাঁদপুর পর্যন্ত বিশেষ কোনো নিদর্শন নাই, তবে চাঁদপুর হইতে চাটগাঁও পর্যন্ত একটি জঙ্গলাবৃত রাস্তা খাঞ্জালীর রাস্তা বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে।
কোতওয়ালী চৌরাস্তা হইতে একটি রাস্তা পশ্চিমে ও আর একটি পূর্ব দিকে চলিয়া যায়। এগুলির দক্ষিণ পাশে অনেকগুলি মসজিদ ছিল। এখনো এগুলির ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। পূর্বমুখী রাস্তার পাশে দিদার খাঁর মসজিদ ৪০ বর্গফুট, ভিত্তি ৭ ফুট। ইহার নয়টা গম্বুজ ও নয়টা দ্বার। এগুলি চারটি প্রস্তর স্তম্ভের উপর স্থাপিত।
এই মসজিদ হইতে একটু আগাইয়া গেলেই ষাটগম্বুজের প্রধান রাস্তা। সেখান হইতে সোজা পূর্ব দিকে তিন মাইল গেলে বাগেরহাট। দুই ধারের গ্রামগুলিতে অজস্র দীঘি, দরগা ও মসজিদ ছিল। ইহাদের কোনো কোনোটি এখনো অক্ষুণ্ন আছে? কোনোটার বা চিহ্নমাত্র বিদ্যমান। তন্মধ্যে বিজয়পুরে খান জাহানের দরগা, কাঁঠাল গ্রামের কাট্যালি মসজিদ ও দরীয়া খান এবং আমরু খাঁর মসজিদ ও দীঘি, কৃষ্ণনগরে এখতিয়ার খাঁর প্রকাণ্ড দীঘি ও কাচড়া পাড়ার রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে অর্ধ মাইল দীর্ঘ পচা দীঘি উল্লেখযোগ্য। পার্শ্ববর্তী আফরা গ্রামের দীর্ঘ লাল দীঘি, থলসী গ্রামের বুড়া খানের দীঘি, পাঁচালীর শরফ কাদি দীঘি, বাদখালীর তালপুকুরিয়া ও দওলতের পুকুর এবং রাজাপুরের হাজী বুনিয়া পুকুর খান জাহান আলীর মহিমা কীর্তন করিতেছে।
এতদভিন্ন আরো কত কীর্তি বিনষ্ট হইয়াছে, কে তাহার ইয়ত্তা রাখে। সমস্ত প্রাচীন শহরের জঙ্গলেই মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দৃষ্ট হয়। ঘুঘুখালীর শহরের মধ্যে পাতোষ খাঁর দীঘির পশ্চিম পাড়ে মসজিদ কে বা কাহারা ভাঙ্গিয়া লইয়া গিয়াছে। কোতওয়ালী চৌতারার সুন্দর অট্টালিকা ভাঙ্গিয়া লইয়া গিয়াছে। বন্ধুবাটীর মসজিদ দুইটিরও একই দশা ঘটিয়াছে। উহার হাম্মামখানাগুলিও প্রাচীরে বেষ্টিত গম্বুজাকৃতি গভীর কূপ দুইটি আর নাই। রণবিজয়পুরের মসজিদ ও পুকুরের তোরণ ভাঙ্গিয়া গিয়া আরেক পাষণ্ড মুসলমান নিজের ঘর উঠাইয়াছে। সুন্দরঘোনা ও বাদামতলীর মসজিদগুলিও এভাবে লোকে আত্মসাৎ করিয়াছে। কিছু তাহারা বিক্রয় করিয়াছে, কিছু দিয়া নিজেদের ঘরবাড়ি তোরণবারের সিঁড়ি প্রভৃতি বানাইয়াছে।
খান জাহান তাঁহার শাসনকার্যের ব্যয় নির্বাহ ও দান-খয়রাতের উপর উদ্বৃত্ত অর্থের কিছু মাটির নিম্নে ও কিছু অট্টালিকার ভিতর লুকাইয়া রাখিতেন। টাকার লোভে মাটি গভীর করিয়া খোঁড়ায় অনেকের ফসল ভালো হইয়াছে। কিন্তু মসজিদ প্রভৃতির সর্বনাশ হইয়াছে। ষাট গম্বুজের তিনি যে উচ্চ মিনারের উপর দরবারে বসিতেন, তাহার পশ্চািদকে পাথরের আড়ালে বহু অর্থ লুক্কায়িত ছিল; প্রাচীরগাত্র ভাঙ্গিয়া তাহা অপহরণের চিহ্ন এখনো বর্তমান আছে।
খান জাহান ছিলেন রাস্তা নির্মাণে একজন পাকা ইঞ্জিনিয়ার। যথেষ্ট উচ্চ করিয়া সর্বত্র সমভাবে প্রশস্ত রাখিয়া মাটি ফেলিয়া রাস্তা নির্মাণ সহজ কথা নহে। খলিফাতাবাদের সমস্ত রাস্তাই ছিল পাকা। ৫০০ বত্সর পূর্বে বাংলাদেশে এমন রাস্তা আর কোথাও ছিল না। রাস্তা পাকা করার তিনি একটি সুন্দর কায়দা জানিতেন, বর্তমানের ন্যায় এক ফর্দ ইট পাতিয়া তাহার উপর খোয়া ফেলিয়া তিনি সংক্ষেপে কাজ সারিতেন না। তাঁহার ইট ছিল ৫/৬ ইঞ্চি লম্বা ও ২ ইঞ্চির চেয়ে কম পুরু। রাস্তার লম্বালম্বিভাবে সমদূরে পাঁচ সারি আস্ত ইট পাতা হইত। প্রত্যেক সারিতে দুইখানা ইট থাকিত। দুই-একটি সারির মধ্যে ৪/৫ খানা ইট আড়াআড়িভাবে বসান হইত। কোনো ইটই চিত করিয়া লাগানো হইত না, কাত করিয়া পাশাপাশি বসানো হইত। দুইটি লম্বা সারির মধ্যে প্রায় ২ ফুট ব্যবধান রাখা হইত। রাস্তার পাশ হইত প্রায় ১০ ফুট চওড়া। চাটগাঁয়ের রাস্তার একাংশও এভাবে পাকা করা হয়। ৫০০ বত্সরের মধ্যে এসব আর মেরামত করা হয় নাই। তথাপি বেশ ভালোই আছে। লোকে কিছু কিছু সরাইয়া নেওয়ার বহুস্থানে রাস্তা উঁচু, নিচু হইয়া গিয়াছে সত্য, কিন্তু তথাপি তাহা মফস্বলের কোনো রাজপথের চেয়ে ক্লিষ্ট নহে। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারেরা তাঁহার নিকট হইতে রাস্তা নির্মাণের কৌশল শিখিতে পারেন।
ষাটগম্বুজের এক মাইল পূর্বে বাগেরহাটের তিন মাইল পশ্চিম হইতে একটি সুদীর্ঘ রাস্তা দক্ষিণ দিকে গিয়াছে, অপর দিকে ইহা শুর নদীর তীরবর্তী কুড়লতলা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উচ্চ রাস্তাটি অদ্যান্ত ৪০ ফুটের অধিক প্রশস্ত। ইহা দিয়া আধ মাইল গেলে বিখ্যাত ঠাকুর দীঘি পাওয়া যায়; এই বিশাল দীঘি ১ হাজার ৬০০ বর্গফুট। সম্ভবত তিনি কোনো পুরাতন দীঘির খাতে ইহা খনন করেন। শিববাড়ীতে যে প্রতিমার পূজা হইতেছে, তাহা এই দীঘিতেই পাওয়া যায়। দীঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে জিন্দা পীরের মসজিদ। উত্তর পাড়ে একটি প্রকাণ্ড শান-বাঁধানো ঘাট। ঘাটের বাহিরে সর্বত্র অরণ্য নিবিড় বন। দীঘিটি দামে ভরিয়া গিয়াছে। তথাপি পানি এত নির্মল যে, তলের বালুকাগুলি পর্যন্ত দেখা যায়। ঘোড়দীঘি ও বালুদীঘি এখন কুম্ভীরে ভর্তি। খান জাহানের নামে লোকে খই, চিড়া, পিঠা, মোরগ প্রভৃতি যে শিরনি দেন, তাহা এগুলির খাদ্য। আবার কোনো কোনো দরগায়ও এরূপ দেখা যায়, যেমন বায়জিদ বোস্তামির চিল্লায় আছে কচ্ছপ, শাহজালালের দরগায় গজাল মাছ। তবে এগুলি খাদিমদের পোষ্য, এই যা পার্থক্য। প্রতি বত্সর চৈত্র মাসে ঠাকুর দীঘির পাড়ে প্রকাণ্ড মেলা বসে। দূর-দূরান্ত হইতে বহু লোক এখানে আসে। খান জাহানের সমাধি সমচতুষ্কোণ। কিন্তু ভিতরের দেওয়াল অষ্টকোণ; বহির্ভাগ ৪৬ বর্গফুট। চারকোণে চারটি স্তম্ভ, প্রাচীরের নিচের ৩ ফুট পাথর দিয়া গাঁথা। প্রস্তরগুলির পরিমাণ ২^১^৪ ভাগের ৩ ফুট। অষ্টকোণে দেওয়ালের উচ্চতা ২৫ ফুট। মেঝে পূর্বে মীনাদার ইষ্টকে মণ্ডিত ছিল, এগুলি অপহূত হইয়াছে। গম্বুজের উপরের বিবিধ কারুকার্য অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছে। গম্বুজের উপরের আস্তর এত শক্ত ও সুন্দর যে, এক প্রকার বিনা মেরামতে এখনো সুন্দরভাবে আছে। উত্তর ভিন্ন তিন দিকে ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি তিনটা দরজা, মধ্যভাগে কবর। প্রথমে ছয় খানা বড় বড় কৃষ্ণ প্রস্তরের একটি তাক, তাহার উপর চার খানা কৃষ্ণ প্রস্তরের আরেকটি তাক, তদুপরি ৬ ফুট দীর্ঘ অর্ধ গোলাকার একটি সুন্দর কৃষ্ণ প্রস্তর। বর্স নিম্নের তাকটি মীনাদার টালিতে আবৃত ছিল, তাহা আর নাই। শীর্ষ প্রস্তরের পৃষ্ঠ, পার্শ্বদেশ ও নিম্নভাগ সযত্নে উত্কীর্ণ সুন্দর আরবি-ফারসি লিপিতে পূর্ণ। নিচের লেখা অনেকটা অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। অথচ এখনো এগুলির পাঠোদ্ধার হয় নাই। করিবে কে? এত তত্ত্ব বিভিন্ন মন্দির ও বিহার আবিষ্কারেই ব্যস্ত।
খান জাহানের কবরগাহের পশ্চিম পার্শ্বেই তাঁহার উজির মুহম্মদ তাহিরের সমাধি। ইহা শূন্যগর্ভ স্মৃতিসৌধ মাত্র। ইহার বাহিরে খান জাহানের মেজবানদের বাবুর্চিখানা। ইহা এক গম্বুজের একটি প্রকাণ্ড ইষ্টক পরিমাণ ৪০ বর্গফুট। ইহা অদ্যাপি অটুট রহিয়াছে। এত দিন এই অমর রাজর্ষির আরো শত শত কীর্তি খলিফাতাবাদ শহর ও খুলনার যেখানে সেখানে পড়িয়া আছে। সেগুলির অদ্যাপি কোনো অনুসন্ধান হয় নাই। জনহিতৈষীর সহিত এমন জয়যাত্রার কাহিনী কে কবে শুনিয়াছেন। দিগ্বিজয়ের ইতিহাসে খান জাহান অনন্ত গৌরবে বিরাজমান। এই ব্যাপারে কাহারও সহিত তাঁহার তুলনা চলে না।
[বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য এই প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে।]




