প্রতি ২৩ সেকেন্ডে তৈরি হয় একটি টয়োটা করোলা! আর ৩৬ সেকেন্ডে দুনিয়ার কোথাও না কোথাও কেউ একটি করোলা কিনছেন। উৎপাদিত হয় ১৬টি দেশে, আর ১৫০টি দেশের রাস্তায় এটি দেখা যায়। টয়োটা করোলার যাত্রা হয়েছিল জাপানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো নির্মাণের এক বিশেষ পর্যায়ে। ১৯৫০-এর দশকের শেষদিকে জাপানের অর্থনীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে শুরু করে। নির্মাতারা সাধারণ পরিবারগুলোর হাতে একটি ফ্যামিলি কারের চাবি পৌঁছে দিতে চাইছিলেন। ১৯৬৪ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক ছিল জাপানের অবকাঠামো খাতের বিপুল নির্মাণযজ্ঞের একটি মাইলফলক। এ সময় মহাসড়ক বিস্তৃত হয়, পাকা রাস্তার সংখ্যা বাড়ে। ফলে মোটরযানের ব্যবহার বৃদ্ধির বাস্তব ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এ বছরই মোটরগাড়ি দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে। এই নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এগিয়ে যায় টয়োটা। তাদের লক্ষ্য ছিল একটা ফ্যামিলি কার তৈরি করা। আর এ পরিকল্পনা থেকেই ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু ‘টয়োটা করোলা’র।
১৯৬৬ সালের ২০ অক্টোবর টয়োটা একটি প্রেস রিলিজ পাঠায়, ‘টয়োটা করোলা জাপানের পাঁচ সিটের একটি মোটরগাড়ি। এটা বাজারের সবচেয়ে সহজলভ্য গাড়ি। করোলা তৈরিতে টয়োটার প্রকৌশলীরা নিজেদের কোম্পানির প্রযুক্তিগত সামর্থ্যের সেরাটা বের করে এনেছেন জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে।’ সেদিন কে জানত যে এই করোলাই একদিন দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি বিক্রীত গাড়িতে পরিণত হবে! একই বছরের ৫ নভেম্বর করোলার বাজারজাত শুরু হয়। অর্থাত্ সপ্তাহ দুয়েক আগে করোলা তাদের ৫০ বছর পার করল।
১৯৬১ সালে টয়োটা বাজারে এনেছিল পাবলিকা। পাবলিকা বাজারে আনা হয়েছিল ‘জাতীয় গাড়ি’র ধারণাকে সামনে রেখে। এই ধারণার পেছনে ছিল জাপানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রণালয়। প্রযুক্তির বিচারে পাবলিকা দারুণ হলেও আকর্ষণীয় ছিল না। তাই ক্রেতারা সেভাবে সাড়া দেননি। এর পর টয়োটা নতুন গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেয়। টয়োটার প্রকৌশলীরা ১ হাজার সিসির ইঞ্জিন নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে করোলা বাজারে ছাড়ার ছয় মাস আগে ইঞ্জিন হয়ে গেল ১১০০ সিসির। প্রকৌশলীরা বিপদে পড়লেন। আবার নতুন করে ডিজাইন করতে হলো। সে সময় কম্পিউটারের আধুনিক ডিজাইন সফটওয়্যার ছিল না, প্রকৌশলীরা হাতের ড্রয়িং দিয়ে কাজ করতেন। ইঞ্জিন বদলের সিদ্ধান্তের ৭৫ দিনের মধ্যে তারা নতুন ডিজাইন তৈরি করেন।
করোলা তৈরির পেছনে ছিলেন তাতসুয়ো হাসেগাওয়া। বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বিমানের নকশা করতেন। নতুন গাড়িতে তিনি বিমানের এয়ারোডাইনামিকসের কিছু বৈশিষ্ট্য যুক্ত করলেন। করোলা নিয়ে তার পরিকল্পনা ছিল একশতে আশি নম্বর তোলা, অর্থাত্ বাজারের অন্যান্য গাড়ির চেয়ে ক্রেতাকে একটু ভালো কিছু উপহার দেয়া।
শুরুতে করোলার সর্বোচ্চ গতি নিয়ে একটি মজার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময় ১ হাজার সিসি ইঞ্জিনের গাড়ির সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার। আর ১ হাজার ১০০ সিসির গাড়ি ঘণ্টায় দেড়শ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে পারত। কিন্তু করোলা গাড়ির ক্যাটালগে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার বলেই লেখা হয়। ফলে বিক্রি শুরু হওয়ার পর ক্রেতারা বলতে শুরু করেন, ‘এই গাড়ির কিছু অতিরিক্ত গতি আছে।’ করোলা নিয়ে টয়োটার স্বপ্ন শিগগিরই বাস্তব রূপ পায়। বাজারে আসার তিন বছরের মধ্যে করোলার ফার্স্ট জেনারেশন গাড়িটি জাপানের সর্বাধিক বিক্রি হওয়া যানে পরিণত হয়। এই সাফল্য শিগগিরই দুনিয়ার অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে যায়। করোলাই প্রথম গাড়িতে হোয়াইট রিভার্সিং বা ব্যাক-আপ লাইটের প্রবর্তন করে।
আশির দশকের শুরুর দিকে ১১৬টি দেশের রাস্তায় টয়োটা করোলা সগর্বে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। এখন বাংলাদেশসহ দুনিয়ার অধিকাংশ দেশেই রাস্তায় বেরোলে করোলা চোখে পড়বেই। এ বছর টয়োটা করোলা তার যাত্রা শুরু করার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। একটা গাড়ির জন্য বয়সটা নেহাত কম নয়, তাও আবার জনপ্রিয়তা ধরে রেখে। অবশ্য জনপ্রিয় বলাটা যথেষ্ট নয়, করোলা দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় গাড়ি। যাত্রা শুরুর পর থেকে করোলার ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি গাড়ি বিক্রি হয়েছে। করোলার জনপ্রিয়তা আঁচ করা যাবে একটি তথ্যের দিকে নজর দিলে। টয়োটার ৭৯ বছরের ইতিহাসে কোম্পানিটির বিক্রি করা প্রতি পাঁচটি গাড়ির একটি হচ্ছে করোলা।
করোলার জনপ্রিয়তার পেছনে এর পারিবারিক গাড়ি হয়ে ওঠার বৈশিষ্ট্যগুলো কাজ করেছে। এর সিটগুলো ঘরের সোফার মতো। কমপ্যাক্ট কার হওয়া সত্ত্বেও এর ছাদ বেশ উঁচু, ফলে গাড়ির ভেতরে ঘরের মতো একটা পরিবেশ তৈরি হয়। এছাড়া করোলা যখন বাজারে আসে, তখন জাপানের ক্রেতারা তিনটি ‘সি’ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন— কালার টেলিভিশন, কার ও কুলার। শুরুতেই করোলা ক্রেতাদের আগ্রহকে পূরণ করতে পেরেছিল।
এখন চলছে করোলার ১১তম জেনারেশন। ৫০ বছর পার করেও করোলা তার গুণগত মান, স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রেখেছে। প্রতিটি নতুন সংস্করণ বাজারে আনার আগে টয়োটা আগের সংস্করণ নিয়ে ক্রেতাদের মতামতকে আমলে নিয়েছে। তাই এখনো করোলা ক্রেতাদের মনমতো গাড়ি সরবরাহ করে যাচ্ছে।
করোলা উৎপাদনের জন্য টয়োটা তাকায়োকাতে বিশেষ ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। বাজারে আসার দুই বছরের মাথায় ১৯৬৮ সালে করোলার বার্ষিক উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে ১১ লাখে পৌঁছে যায়। একই বছর করোলার উত্তর আমেরিকায় রফতানি শুরু হয়। উৎপাদন শুরু হওয়ার ১৬ বছর চার মাসের মাথায় করোলা তার এক কোটি গাড়ি বিক্রির মাইলফলক স্পর্শ করে। ১৯৯৪ সালে করোলা উৎপাদনের সংখ্যায় ভক্সওয়াগন বিটলকে পেছনে ফেলে। ১৯৯৭ সাল নাগাদ এটি দুনিয়ার বেস্ট সেলিং মডেলে পরিণত হয়।
কোনো ছেলেই হয়তো কখনো বাবাকে টয়োটা করোলা কিনে দেয়ার জন্য আবদার করেনি। কেউ তার শোয়ার ঘরের দেয়ালে টয়োটা করোলার পোস্টারও লাগায়নি। কিন্তু এই করোলাই ৫০ বছর ধরে দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য পরিবারের সদস্যের মতোই হয়ে আছে। যাত্রা শুরুর সে সময়কার আরো অনেক উত্তেজনাকর যন্ত্রের তুলনায় সেই টয়োটা করোলা কিছুটা পানসেই ছিল। মিনি বা সিটরো ডিএস কিংবা ইতালির যেকোনো কিছুর তুলনায় টয়োটা ছিল একেবারেই অনাকর্ষণীয়। টয়োটা করোলার ডিজাইন গতানুগতিক, বিশেষত্বহীন এবং একেবারেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল না। সেই থেকে এখনো টয়োটা করোলা তেমনই আছে।
বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এটা ঠিক যে করোলার কোনো ‘ব্যক্তিত্ব’ নেই আর কখনো ছিলও না। এটা কখনো শিল্পকে অনুপ্রেরণা দেয়নি কিংবা জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। দ্য ইতালিয়ান জবে যদি তিনটি করোলা নিয়ে স্বর্ণের স্তূপ চুরি করতে যেত, তাহলে কী সেটা এত মজার হতো?
এমনকি গাড়িপাগলরাও বহু বছর ধরে করোলার বদলে যাওয়া চেহারাগুলোর বড়জোর একটি-দুটি স্মরণ করতে পারবেন। করোলার ভেতরে বসে থাকাটাও এমন কোনো স্মরণীয় অনুভূতি নয়। মিনি বা ফিয়াট সিনকুয়েসেন্টো বা বিটলের মতো ‘কিউট বেবি’ চেহারাও নেই এর। প্রেমে পড়ার জন্য এর চেহারাটা একটু বেশি শক্ত।
করোলা চালানো যে খুব আনন্দের, তা নয়। মিনি, এসকর্ট বা গলফ যে আনন্দময় ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা দেয়, করোলা তা দেয় না। তবে এটাও ঠিক যে সিটরো টুসিভি বা রেনল্ট ফোরের মতো করোলা চালানোটা কঠিন নয়।
এত সব একঘেয়েমি বৈশিষ্ট্যের পরও করোলা সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত গাড়ি। অনেকে অবশ্য বলেন দুনিয়ার বেস্ট সেলিং গাড়ি হচ্ছে ভিডব্লিউ বিটল। ৬০ বছরের জীবনে ২ কোটি ১৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৬৪টি ভিডব্লিউ বিটল বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ৫০ বছরে করোলা বিক্রি চার কোটির বেশি। এটা বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না যে করোলাই টয়োটা মোটর করপোরেশন এবং জাপানি ইন্ডাস্ট্রির সুনামকে আজকের শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
করোলা উদ্ভিদবিজ্ঞান-সম্পর্কিত একটি টার্ম, যার অর্থ ফুলের মুকুট। আর এই করোলা গাড়ি টয়োটার আধিপত্যের মুকুট হিসেবে কাজ করেছে। টয়োটাই একমাত্র বৃহত্ কোম্পানি, যারা বাজারের সাধারণ ক্রেতাদের জন্য গাড়ি তৈরি করেছে এবং বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। টয়োটা পৃথিবীর গাড়ি উৎপাদনে ফোর্ড এবং জেনারেল মোটরকেও ছাড়িয়ে গেছে। এবং তারা এটা করেছে তেমন কোনো সমবায়ের সহায়তা ব্যতীত। শুরুতে নতুন গাড়ির নাম ঠিক করতে গিয়ে টয়োটার প্রডাক্ট প্লানিং বিভাগে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। সবাই এমন একটি নাম চাচ্ছিলেন, যা দুনিয়া জয় করা গাড়ির জন্য মানানসই হবে। প্রডাক্ট প্লানিং বিভাগে সদস্যরা ইংরেজি, ইতালীয় এবং ফরাসি অভিধান ঘাঁটলেন, খুঁজলেন জাপানের প্রচীনতম কাব্যসংগ্রহ ‘টেন থাউজেন্ড লিভস’-এর পাতায়। শেষমেশ অনেক স্বপ্ন নিয়ে লাতিন শব্দ ‘করোলা’ই নির্ধারিত হলো।
অনেকে বলেন, করোলা নামটি পছন্দ করা হয়েছে কারণ টয়োটা ইংরেজি ‘সি’ বর্ণটি পছন্দ করে। টয়োটার বেশকিছু গাড়ির নামের অদ্যাক্ষর ‘সি’। যেমন— সেলিকা (১৯৭০), ক্যারিনা (১৯৭০), করসা (১৯৭৮), ক্যামরি (১৯৮০) ও করোনা। তাই ‘সি’ অক্ষরটির প্রতি টয়োটার নীতিনির্ধারকদের বিশেষ প্রীতির অনুমানটা হয়তো অমূলক নয়!
তাকায়োকাতে করোলা উৎপাদনের জন্য বিশেষ ফ্যাক্টরি স্থাপনের পর টয়োটার স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল, ‘নতুন প্লান্ট চালু হওয়ার পর কোনো ব্যর্থতা সহ্য করা হবে না।’ এটিই ছিল ফার্স্ট জেনারেশন করোলা উৎপাদনক্ষেত্র এবং পরবর্তীকালেও এই প্লান্টটি করোলা উৎপাদনের মূল প্লান্ট হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। বর্তমানে তাকায়োকা প্লান্টটি ১১ লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। প্রতি বছর এই প্লান্ট থেকে ৬ লাখ ১ হাজার করোলা তৈরি হয়।
ফার্স্ট জেনারেশন করোলা বাজারে এসেছিল ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে। এর ছয় মাস আগে বাজারে নেমেছিল নিশানের সানি (বর্তমানে যা সেন্ট্রা নামে পরিচিত)। সে সময় জাপানে টয়োটার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নিশান। ১ হাজার ৭৭ সিসির করোলা ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী নিশানের গাড়ির চেয়ে দশমিক ১ লিটার বড়। এই সামান্য ব্যবধানই করোলাকে সাফল্য এনে দেয়। এটি বাজারে আসার এক মাসের মধ্যে তা বিক্রিতে নিশানকে পেছনে ফেলে দেয়।
বাজারে আসার পর থেকেই করোলা ইতিবাচক সাড়া পায়, এক কথায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বিক্রি শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্য ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে ১৫টি করোলা অস্ট্রেলিয়ায় রফতানি হয়। এটা ছিল করোলা রফতানির সূচনা। ১৯৬৭ অর্থবছরে এর রফতানিতে উল্লম্ফন দেখা দেয়, এ বছর ১৫ হাজার ৪২৫টি করোলা রফতানি হয়। ১৯৬৯ সালে এর রফতানি এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। ১৯৭০ সালে এটি টয়োটার প্রধান রফতানি মডেলে পরিণত হয়।
ওয়ার্ল্ড র্যালি চ্যাম্পিয়নশিপে করোলার বহু প্রতীক্ষিত অভিষেক ঘটে ১৯৯৭ সালে। বিভিন্ন ধরনের রাস্তা, যেমন- তুষারঢাকা পথ, পাথুরে রাস্তা কিংবা বরফের পথে একই রকম গতি বজায় রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালে করোলা ম্যানুফ্যাচারার’স টাইটেল জিতে নেয়। এর পর করোলা ওয়ার্ল্ড র্যালি চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়ে ফর্মুলা ওয়ানে অংশগ্রহণ শুরু করে। ১৯৮৫-৮৬ সালে করোলা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের খাতায় নাম উঠিয়েছিল, এই সময় গাড়িটি অস্ট্রেলিয়ান ট্যুরিং কার চ্যাম্পিয়নশিপে ধারাবাহিকভাবে ২৪টি ক্লাস জিতেছিল।
গাড়ি নির্মাণ শিল্প এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে জাপানের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে হোন্ডা সিভিকস, নিশান সানি, মিত্সুবিশি শোগান এবং সুজুকি সুইফটও নিজেদের অবদান রেখেছে। তবে করোলাই জাপানের সবচেয়ে বড় অটোমোটিভ সাফল্যের গল্প। ২০০৫ সালে বার্নাস্টোন, ডার্বিশায়ার ও ভিয়েতনামে ১৬টি প্লান্ট থেকে ১৩ লাখ ৬০ হাজার করোলা উৎপাদিত হয়। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে করোলা চার কোটি গাড়ি উৎপাদনের মাইলস্টোন অতিক্রম করে। এর মাধ্যমে এটি সর্বকালের বেস্টসেলিং গাড়িতে পরিণত হয়। ২০১৫ সালেও করোলা ছিল দুনিয়ায় সর্বাধিক বিক্রি হওয়া গাড়ির নেমপ্লেট।
করোলার বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনের গল্পকে একটি শব্দেই প্রকাশ করা যায়— নির্ভরযোগ্যতা। অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু দুটি জিনিসের কথা বলা যায়— এক. করোলার সরলতা, দুই. নির্মাণ প্রকৌশলের প্রতি নির্মাতাদের অখণ্ড মনোযোগ করোলাকে একটি অসাধারণ নির্ভরযোগ্য বাহনে পরিণত করেছে। করোলা মোটরগাড়ির ধারণাকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। এটি বাজারে আসার আগে মানুষের ধারণা ছিল যে মোটরগাড়ি মানে স্বপ্ন, আবেগময়-গ্ল্যামারাস কিছু, গাড়ি মানেই রোমাঞ্চকর কোনো ভ্রমণ! করোলা মোটরগাড়িকে অন্য ১০টি হোম অ্যাপ্লায়েন্সের মতো একটি সামগ্রীতে পরিণত করেছে। গাড়ি মানে একেবারেই ব্যবহারিক সামগ্রী, এতে কোনো আবেগ নেই, গাড়ি নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। তার পরও ব্যবহারকারীরা করোলার শক্তসামর্থ্য গঠনের প্রশংসা করেন, অনেকে এর মধ্যে যথেষ্ট সৌন্দর্যও দেখতে পান। বেশির ভাগ করোলা চালানো খুব সহজ, এর স্টিয়ারিং এবং ক্লাচের গঠন দুনিয়াজুড়ে চালকদের গাড়ি চালানো অনেক সহজ করে দিয়েছে। এই গাড়ি দরকারি সামগ্রীসমৃদ্ধ।
করোলা নিজেই তার সাফল্যের ভুক্তভোগী হয়েছে। পুরো দুনিয়া এর নির্ভরযোগ্যতার ওপর নির্ভর করতে চায়। অন্যদিকে টয়োটা বেশকিছু স্টাইলিশ ডিজাইনের গাড়ি বাজারে এনেছে, কিন্তু সেগুলোয় আর করোলা নেমপ্লেট লাগানো যায়নি। সবাই যেন সাদাসিধে কিন্তু নির্ভরযোগ্য করোলাকেই দেখতে চান। তাই ২০০৬ সালে প্যারিস মোটর শোতে উদ্বোধন করা স্টাইলিশ একটি সিরিজের নাম দেয়া হয় ‘অরিস’। তবে জাপানে ৩৩ বছর রাজত্ব করে ২০০২ সালে বেস্ট সেলিং কারের মুকুট হারাতে হয়েছে করোলাকে। হোন্ডা মোটরসের ফিট একে পেছনে ফেলেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি হিসেবে জাপানের অনেক ক্রেতা এখন টয়োটা অ্যাকুয়ার দিকে ঝুঁকছেন।





