প্রথম বাজারে আসে ১৯৬৬ সালে। অর্থাৎ এর মাঝে অর্ধশত বছর পার করে ফেলেছে জাপানি টয়োটা কোম্পানির জনসাধারণের জন্য নির্মিত গাড়িগুলো, যার নাম টয়োটা করোলা। প্রথম প্রজন্মের সেই সাদাটে ছোট্ট সেডান গাড়ি থেকে আজ ১১তম প্রজন্ম পর্যন্ত পথ চলতে গিয়ে পুরনো সাব-কমপ্যাক্ট গাড়িগুলো পরিণত হয়েছে কমপ্যাক্ট গাড়িতে। এর মানে হলো, ছোট আকৃতি থেকে মাঝারি আকারে এসে পৌঁছেছে এ সময়ের করোলা। সঙ্গে জাপানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে বিশ্বের ১৫০টি দেশে বিক্রি হচ্ছে এখন গাড়িগুলো। পঞ্চাশ বছরের নানা স্মৃতিকথা আর মাইলফলকগুলোকে উদযাপন করতে তাই কোম্পানিটি করোলার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে নানা আয়োজনে আর স্মৃতিকথায়। আর তাদের সঙ্গে এ পঞ্চাশ বছরের গল্পগাথা বলতে যোগ দিয়েছেন হলিউড অভিনেত্রী জিনা রড্রিগুয়েজ ও হান্না সিমোনও। কারণ জিনা যেমন হলিউড পর্যন্ত তার স্বপ্নকে ছুঁতে এসেছিলেন নিজের করোলা গাড়িটির ওপর চেপে, হান্নাও প্রথম গাড়ি চালানোই শেখেন তার বাবার অনেক যত্নে রাখা ঝকঝকে নতুন করোলা গাড়িটি দিয়েই।
বিশ্বের সব সময়ের সেরা ‘বেস্ট সেলিং’ গাড়ির তালিকায় রয়েছে টয়োটার করোলা মডেলের গাড়িগুলো। প্রথম দুটি স্থান আমেরিকান ফোর্ড কোম্পানির ‘ফোর্ড মডেল টি’ ও জার্মান ভক্সওয়াগনের ‘ভক্সওয়াগন বিটল’ নিয়ে নিলেও কোম্পানিগুলো সে মডেল প্রস্তুত করা ছেড়েছে অনেক আগেই। টয়োটা করোলা কিন্তু সেই ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত নানা রঙে আর নানা ঢঙে একটির পর একটি নতুন গাড়ি এর ভোক্তাদের উপহার দিয়েই যাচ্ছে। এরই মাঝে পাঁচ দশকজুড়ে ৪ মিলিয়নের বেশি গাড়ি বিক্রি হয়েছে এ এক মডেলেরই। যদিও একেবারে এক মডেল বলে ফেললেও ভুল হবে, অল্প অল্প করে আধুনিকায়ন সবসময়ই ঘটেছে পুরনো করোলাটির চেহারায়। যেমন আগের গাড়িগুলোর নকশার রিয়ার-হুইল ড্রাইভের ব্যবস্থা থাকলেও ধীরে ধীরে সেটা চলে এসেছে ফ্রন্ট-হুইল ড্রাইভে। এর মাঝে ফোর-হুইল ড্রাইভের অস্তিত্বও দেখা গেছে কখনো-সখনো।
‘করোলা’ একটি লাতিন শব্দ, যার অর্থ ‘ছোট মুকুট’। টয়োটার একটি অন্যতম ঐতিহ্য হলো, এরা এদের সেডান গাড়িগুলোর নাম রাখে এর মাঝারি আকারের গাড়ির লাইন টয়োটা ক্রাউনের সঙ্গে মিল রেখে। তারই ধারাবাহিকতায় এ নাম। আজ পর্যন্ত টয়োটা করোলার চলার পথ যে সাফল্যগাথায় পূর্ণ, সেটির সঙ্গে এই অর্থটি বেশ মানিয়েছেই বলতে হয়। জন্মের শুরু থেকেই জাপানে টয়োটা করোলা স্টোরগুলোতে এ গাড়িগুলো যেন ছিল বিশেষ আকর্ষণ। যখন এর নির্মাণ শুরু হয়, তখন এর সঙ্গে ‘টয়োটা স্প্রিন্টার’ নামে এর একটি যমজ বোনও তৈরি করা শুরু হয়েছিল বটে, তবে সেটি চলেছিল ২০০০ সাল পর্যন্ত।
করোলার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে টয়োটার নানান উদযাপন ও সেগুলোর প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে এ বছরের শুরুর দিক থেকেই। আর এসব উদযাপনের মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমক যেটিকে মনে হচ্ছে, সেটি হলো এ প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে বাজারে একটি সম্পূর্ণ নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গাড়ি ছাড়ার কথা ঘোষণা দিয়েছে। একদম নতুন কিছু বাড়তি নিরাপত্তা ও প্রকৌশলগত সুবিধা রাখা হয়েছে বিশেষ সংকলনের এ গাড়িটিতে। ব্ল্যাক চেরি রঙের এই সংস্করণটির সবকিছুই যেন একটু অন্যরকম। ১৭ ইঞ্চির নিখুঁত অ্যালুমিনিয়ামের চাকার সঙ্গে গাঢ় ধূসর রঙের ইনসার্ট-সম্পন্ন এ নকশাটি যে সহজেই ভোক্তাদের মন কেড়ে নেবে, তার আভাস পাওয়া গেছে এরই মধ্যে। এর বসার সিট, স্টিয়ারিং হুইল, কেন্দ্রীয় আর্মরেস্ট থেকে শুরু করে শিফটার বুট পর্যন্ত সবকিছুতেই যেন টাটকা ব্ল্যাক চেরির আভা। তেমনই টুকটুকে রঙের সঙ্গে অভিজাত কালো রঙের মিশ্রণে ক্রেতাদের সামনে আসছে করোলার এ সংস্করণটি। আর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটার এনটিউন অডিও প্লাস, সঙ্গে ৪.২ ইঞ্চির রঙিন ইনফো ডিসপ্লে। জানা গেছে, নিরাপত্তার জন্য বাড়তি কিছু সুবিধাও যুক্ত করছে গাড়িটিতে করোলা।
এ তো গেল গাড়ির সাধারণ বৈশিষ্ট্যগত গুণাগুণ। সেই সঙ্গে অর্ধশত বার্ষিকী উপলক্ষে আরেকটা বাড়তি কিছু একটা থাকা তো চাই। তাই এর সঙ্গে টয়োটা একটি বিশেষ ব্যাজও যুক্ত করে দেবে গাড়িতে— যা করোলার ৫০তম বছরে পা দেয়ার বার্তাটিই যেন মহাসমারোহে জানিয়ে দেবে সবাইকে। সঙ্গে গাড়ির মেঝের ম্যাটটিতেও দেখা মিলবে পঞ্চাশতম বার্ষিকীর বিশেষ লোগোটি।
আসছে বছর এ বিশেষ করোলা গাড়িগুলোকে দেখা যাবে বাজারে। বলা হচ্ছে, সীমিত পরিমাণে বাজারে ছাড়া হবে গাড়িটিকে; মাত্র ৮ হাজার গাড়ি বাজারে দেয়ার কথা ভাবছে টয়োটা। এটা শুনে যদি কারো মনে প্রশ্ন জাগে যে, ৮ হাজার আবার কীভাবে সীমিত পরিমাণের হয়, তাহলে তাকে চিন্তা করতে হবে আরেকটু বৃহত্ পরিসরে এসে। যেমন ধরুন, ২০১৫ সালে এক যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়েছে তিন লাখের বেশি করোলা, প্রতিদিন যা দাঁড়ায় ১ হাজারের কাছাকাছি। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে কিন্তু ৮ হাজার গাড়িকে ভোক্তা চাহিদার কাছে নস্যিই বলা চলে, তাই নয় কি?






