এক.
বিংশ শতাব্দীর আটচল্লিশ সাল। মাত্র মাস কয়েক আগে ইয়া বড় একটা দেশকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান নামের দুটি নতুন দেশ করা হলো। একদম গরম গরম দুটি দেশ। আলাদা পরিচয়ে নিজেদের ভাগে যত মানুষ পড়েছে, সেগুলো নিয়েই নিজেদের মতো সীমানা আর সংসার পাতায় ব্যস্ত নতুন ভূখণ্ড দুটি। খুব যে মানুষের মন মতো হয়েছে বলা যাবে না। সরাসরি শিকড়ে হাত পড়ায় অনেকে সহ্য করতে পারছেন না। বাপ-দাদার দেয়া বহু পুরনো সেটআপ ভেঙে নতুন সেটআপে যেতে অনেকেরই অনীহা। মূলত ধর্মের ভিত্তিতেই এই উলটপালট। হিন্দু-মুসলিম দ্বৈরথের ফলই ছিল এই পুনর্গঠন।
এ রকম ওলটপালট সময়ে ঢাকার সূত্রাপুরের একটা হিন্দু পরিবারের কথা এখানে বলা হচ্ছে। দুই ভাই হরিপদ ঘোষ আর দয়াল ঘোষ। দেশ ভাগটাগ হয়ে একাকার কিন্তু এই দুই ভাই তখনো ভাগ হননি। বাবার ইচ্ছা ছিল তারা ইসলামপুরে থান কাপড়ের পাইকারি দোকান দেবেন কিন্তু কাপড়চোপড়ের ব্যবসায় তাদের এত আগ্রহ ছিল না। তাদের মাথায় ঘুরছিল অদ্ভুত কিন্তু সময়োপযোগী এক ব্যবসার চিন্তা। বাহারি বাতির ব্যবসা। লাইট হাউজ। বিয়ে-খতনা-জন্মদিন আরো কত উপলক্ষ সারা বছর তো লেগেই থাকে। মানুষের মনের খুশি বিষয়টা খুব উদযাপনকেন্দ্রিক। অতি অল্পতেই তারা উত্সবে গা ভাসিয়ে দিতে চায়। তুচ্ছ বিষয়েও অনুষ্ঠানের ডাক দেয় তারা। ভাবে কয়দিন আর বাঁচবে? দিন থাকতে জাঁকজমক-ফুর্তি যত দূর করা যায়। হরিপদ ভাবেন। বেশ মুনাফা আসবে। পুরান ঢাকার এদিকটায় ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুব একটা খারাপ না। বুড়িগঙ্গার ওই পার থেকে, ঢাকার আশপাশের সব জায়গা থেকেই দিনভর এদিকটায় খদ্দেরদের আনাগোনা থাকেই। ফলে ব্যবসায়ীরা ঢাকার এই পুরনো অংশে বেশ সচ্ছল ছিল। সঙ্গে আরেকটি জিনিস ওদের থাকতই, সেটা হলো— সখ। তাদের শখের তোলা আশি টাকারও বেশি ছিল বোধ হয়।
হরিপদ তাই ভাই দয়ালের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। বৃদ্ধ পিতার অনুমতি নেন। কয়েক মাইল মরিচবাতি, পাঁচ-ছয়টি হ্যাজাগ, কটা রেভলবিং লাইট, আর কয়েকজন কর্মচারী। ব্যস আর কি। ঠিকানা লক্ষ্মীবাজার মনুর গলি। দোকানের নাম ‘হরি-দয়াল লাইটহাউস’। অগ্রজ হরিপদবাবুর এক ছেলে, এক মেয়ে। তাদের পড়ালেখার কথা মাথায় রেখে ছোট ভাই দয়ালের সঙ্গে এক রকম চূড়ান্তই করে ফেলেছেন বিষয়টি। দয়াল দোকানে বসেন। এদিকে হরিপদ মেকানিকের কাজে বেশ পারদর্শী। ছোট একটা দোকান চালান লোক দিয়ে। তাই দিনভর শাঁখারিপট্টি- চাংখারপুলে দৌড়াদৌড়ি করেই দিনের অধিকাংশ সময় চলে যায় তার।
এদিকে নতুন ব্যবসার গতি ভালোই। সবাইকে প্রসাদ খাইয়ে দোকান খোলা হলো। প্রথম দিনেই শ্যামলকান্তি বড়ালের বাড়ি থেকে ১ হাজার ৩০০ গজের মরিচবাতির অর্ডার আসে। শ্যামল বাবুর ছোট মেয়ের বিয়ে। হরিপদ ৩ টাকা অগ্রিম নিয়ে অর্ডারটা বুকিং নেন। দয়াল খুশি খুশি মেজাজে বলে—
‘এমতে ব্যবসাডা ত ভালোই মনে হয় দাদা। খাটনি জব্বর কম। জিনিস ভাড়া খাটাইয়া বি ভালো টেকা কামান যাইব।’
হরিপদ মাথা নাড়েন।
এদিকে দেশের অবস্থা অতটা ভালো নয়। দুদিন আগে যেদিন হরি-দয়াল লাইটহাউস চালু হলো, ঠিক সেদিনই পূর্ব পাকিস্তান স্টুডেন্টস লিগের জন্ম। কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজের মুজিব নামের এক তুখোড় ছাত্রনেতা সেটার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন।
খাজা নাজিমুদ্দিনের কাণ্ডকারখানা তখন অনেকের ভালো লাগছিল না। দেশটা তো ভাগ হলোই তাই বলে আপন ভাষায় কেউ মন ভরে কথা বলতে পারবে না, তাই কি হয়? জিন্নাহ যাওয়ার আগে ইঙ্গিতটা ভালো দিয়ে গেলেন না। দোকানে বসে বসে দুই ভাই সাচ্চু ব্যাপারীর লগে আলাপে মজেন।
‘কও ত মিয়া, মুসলমান হইচি বইলা কি নিজের ভাছা অ বি কুরবান দিবার লাগব নি হি? কেমুন কতা এইডা?’— সাচ্চু ব্যাপারী উষ্মা প্রকাশ করেন।
‘হ, দেহনা কেমুন খেতের মাইঝখানে আইল দেওনের মত দেশ টারে ভাগ কইরা ফালাইচে’— দয়ালও রাগ উগড়ে দেন।
এ রকম ভালো-মন্দে দিন কিছু যায়। হরিপদ বুঝতে পারেন এই লাইটের ব্যবসায় অনেকেই ঢুকে যাচ্ছেন। আলী ইদ্রিসের ‘ইদ্রিস ডেকোরেটর’, হিরণবাবুর ‘লতামোহিনী লাইটিং’ ইত্যাদি আরো অনেক দোকান তাদের দেখাদেখি দাঁড়িয়ে গেল। এখন তাই ব্যবসায় মন্দা। এভাবে তো আর সংসার চলবে না। নতুন ব্যবসা ধরতে হবে। এবার পুঁজি বেশ মোটা রকমের খাটাতে হবে। যা কামিয়েছেন দুই ভাই, তা মিলিয়ে আর কিছু যোগ করে নতুন একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে হবেই। কিন্তু ব্যবসাটা কী হবে? যাতে সহজে কেউ আশপাশের দশ মহল্লায়ও সেই ব্যবসা নকল করতে না পারে। উঠেপড়ে লাগেন দুই ভাই।
হঠাৎ করেই ব্যবসার একটা চমত্কার উপায় বের হয়ে আসে। তখন আন্দোলন প্রায় দশদিকে। সাধারণ মানুষ ভাষার একটু আরামের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের চাপ দিচ্ছে। এমন সময় বুদ্ধিটা একদম মোক্ষম ফায়দা হিসেবে আসে।
এইবার তবে মাইকের ব্যবসা। আগেরটার মতোই। তবে এইবার মূলধন বেশ বড় আকারের। এই বুদ্ধিটা এসেছে তখনকার রাজনৈতিক হালচাল থেকে। সুরিটুলা স্কুলে মালেক মেম্বার তার মিটিংয়ে মাইকে কথা বলতে গিয়ে একদিন খুবই বিব্রত হন। মালেক মেম্বার নাকি মাইকঅলাকে ডেকে অনেক বকেছেন। ব্যাটা মালেকের কোনো ভয় নেই! এত বড় একজন নেতার সমাবেশে তারই বক্তব্যের সময় মাইক ঘেরঘের করবে, টানা টুং আওয়াজ করবে, এটা হয় নাকি। এ ধরনের সিস্টেমে ব্যবসা তারা করবেন না। তারা করবেন মজবুত, নিখুঁত ব্যবসা— বড় ব্যবসা। হরিপদের আশা এই মাইকে ভাসানী সাহেবও একদিন ভাষণ দেবেন। হরিপদের চোখ চকচক করে। এবার খুবই সতর্কভাবে আগাবেন। কোনো ভুলের জায়গা নেই। নিজে মেকানিক হওয়ায় ব্যাপারটা আরো আগ্রহ পায়।
তখন পল্টন ময়দানে নিয়মিত সভা-সমাবেশ হতো। এবং সেগুলো খুব প্রয়োজনেও গণসংলগ্ন ছিল। সেখানে অনেক মাইক ব্যবহার করা হতো। হরিপদ তাই ভালো বোধ করেন। যখন তারা বিক্রমপুর থেকে এই পুরান ঢাকায় আসেন, তখন তো কেউ ছিল না। সেই গ্রাম-মঠবাড়িয়াও তখন খাঁ খাঁ করত। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে করে অনেকটা জীবিকার ঝুঁকি নিয়েই বিনয় ঘোষ এই লক্ষ্মীবাজারে আসেন।
হরি আর দয়াল মিলে এই কয়েক দিন বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। হরি বলেন, হ্যান্ডমাইকও লাগবে কয়েকটা। দয়াল একটা গ্রামোফোন কেনার কথা বলেন কারণ মহল্লায় বিয়েশাদিতে উঁচু দরে সেটা ভাড়া দেয়া যায়।
পরের মাসেই নয়টি মাইক, একটি গ্রামোফোন কিনে ব্যবসা শুরু করেন দয়াল ও হরি। নাম কী দেবেন কোম্পানির? সেলিম চাচার কাছে যান দুই ভাই। সেলিম চাচা মুরুব্বি, ইংরেজ আমলের বিএ পাস। সবার সমীহের পাত্র। উদ্দেশ্য শুনে মুরুব্বি খুশি হন। অলয়েজ রেডি অ্যাট ইওর সার্ভিস অন কল— টাইপের উদ্দেশ্য। তাই ইংরেজি বাক্যটিকে সংক্ষিপ্ত করে তিনি নাম রাখেন আরজা ইলেকট্রনিকস। আরো সোজা করে রাখেন আরজু ইলেকট্রনিকস। দুই ভাই খুশি হন। শুরু করেন ব্যবসা।
বেশ কয়েক দিন পর বড় বড় জায়গা থেকে ডাক আসা শুরু করে। সারা ঢাকা এফোঁড়ওফোঁড় করে ফরমায়েশ আসতে থাকে। এদিকে ছাত্রসমাজ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মনোভাবে খুবই তিতিবিরক্ত। সুযোগ পেলেই সভা করছে।
তাই অহরহ ডাক আসে আরজু মাইকের। তাদের কোম্পানির নাম হতে থাকে। হরিপদ ভাবেন কোম্পানির নামটা বদলাতে হবে। জগন্নাথ কলেজের এক ছাত্রের বুদ্ধিতে নতুন নাম রাখেন ‘কল-রেডী’। যে কেউ যেকোনো সময় ডাকলে যাতে প্রস্তুত থাকতে পারে, এমন মাইক কোম্পানিই বানাতে চান হরি আর দয়াল ঘোষ। বলা তো যায় না বাংলার মুখ্যমন্ত্রীরা যদি ঢাকায় এসে সমাবেশ করতে চান! তখনো যাতে কল-রেডী হাতের নাগালে থাকে, যেন তখন তাদের জাদুকরী কণ্ঠের সামনে এই মাইক ধরা যায়।
’৫২ সাল। মিটিং হবে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমনেসিয়াম মাঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাথা আগুন গরম। মায়ের ভাষায় হাত দিয়েছে কুকুরের দল। সাহস কত বড়! তমুদ্দিন মজলিশ হয়ে ভাষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের আজকের নেতারা রাগে ফুঁসছেন। এই আগুন ছাত্রদের ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষ, কৃষক, মজুর, শিক্ষক, ডাক্তার সবার মাঝে ছড়িয়ে গেছে। গ্রামে গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় এই আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়েছে। এ রকম একটি উত্তপ্ত সমাবেশে মাইক সার্ভিস দেবে ভেবেই কল-রেডীর কর্ণধার দুই ভাই রোমাঞ্চিত। এই মাইকের আওয়াজ যদি লিয়াকত আলী খানের কানে যায়, খাজা হারামির কানে যায়। হরি ভাবেন, যাবেই ত, ছাত্ররা ধরেছে যখন আওয়াজ একসময় যাবেই। কিছু হইত ক্ষতি হবে, তবু আওয়াজ যাবেই। দরকারে কিসের বায়না, কিসের ফি এমনিতেই কাজ করে দেবে কল-রেডী। দেশের স্বার্থ বলে কথা। ঘরের ভাষা বলে কথা। রাতে হরি দয়ালকে বলেন, ‘কলিকাতা থেইকা মাইকের ইউনিট কিইনা আনবার লাগব। মাইক বারান লাগব। দেশের অবস্থা ভালো না রে দয়াল। মিটিং মিছিলের সংখ্যা বাড়বার লাগতাচে। আমার কারিগরেরা বডি বানাইবার পারে।’
সেদিনের মিটিংয়ে হ্যান্ডমাইকেও কথা বলেন নেতারা। এর কয়েক দিন পর জিল্লুর রহমান আমতলায় ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা করেন।
দিন যায়। অনেক দিন চলে যায়। তত দিনে বাংলাদেশে অনেক ভিনদেশী শকুনের আনাগোনা বাড়ে। ফাঁকে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ গিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ দল গঠন করা হয়। তারও অনেক পরে ৬ দফা, ’৬৯-এর অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে কল- রেডী মাইক সরবরাহ করে। হরি আর দয়াল তত দিনে রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছেন, এমন অবস্থা। লাভের কথা না ভেবেই দয়াল আর হরিপদ ঘোষ বাংলার মুক্তিতে অবদান রাখতে থাকেন।
৭ মার্চ। বিংশ শতাব্দীর ’৭১ সাল। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সেই ছেলেটি আজ রেসকোর্সের মাঠে ভাষণ দেবেন। ডাক পড়েছে কল-রেডীর। কিছু অতিরিক্ত মাইক, জরুরি হ্যান্ডমাইকসহ ইলেকট্রিক তার, বাঁশ গাড়া সব কাজই করে কল-রেডী মাইক কোম্পানির লোকেরা। গত কয়েক বছর হরিপদ আর দয়াল ঘোষ জাপান, চীন, তাইওয়ান থেকেও উন্নত মানের মাইক আমদানি করেছেন। অন্য কিছু মাইক সার্ভিস যে শহরে হইনি, তা নয়। তবে তারা ডাক পায়নি। তাহের মাইক, হাবিব মাইকসহ আরো কিছু মাইক এই শহরে অবশ্য আছে। যেমনটা সেই শুরুর দিকে হয়েছিল। হরি-দয়াল লাইটহাউসের সঙ্গে গণ্ডা বেঁধে ব্যবসা শুরু করেছিল ইদ্রিস ডেকোরেটর, লতামোহিনী লাইটিং। সেই লক্ষ্মীবাজারের মনুর গলিতে।
দুই.
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সাল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শুভমিতা আর দ্বৈপায়ন বসে আছে লেকের পাড়ে। মাস তিনেক হলো তারা একই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ ভালো বন্ধু হয়ে গেছে তারা। একসঙ্গে সেমিনার করে। লাইব্রেরি ওয়ার্ক করে। ক্যান্টিনেও যায় একসঙ্গে। ডিপার্টমেন্টের বড় ভাইয়েরা বেশ কয়েকবার র্যাগও দিয়ে ফেলেছে ওদের।
‘এই তোরা কি প্রেম করিস? একসাথে এত কিসের ঘুরাঘুরি তোদের? যখনি তগরে দেখি গলায় গলায় দেখি কেন?
ওরা উত্তরে কিছুই বলে না। র্যাগ-ট্যাগ যা খাওয়ার খেয়ে চলে যায়। ডিবেট ক্লাবে ওরা এক টিমে। ভালো বোঝাপড়া আছে বিধায় নাম করছে। ‘দ্বৈপায়ন’ নামটি শুভমিতারই দেয়া। ভালো টেবিল টেনিস খেলে সে। শুভমিতা নামটিও মেয়েটির ডাকনাম। মানে দ্বৈপায়নের দেয়া নাম।
ওই দিন অতিথি পাখিরা খুব একটা আসেনি লেকে। দ্বৈপায়ন গান গাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু হচ্ছে না।
‘আমরা মলয় বাতাসে ভেসে যাব...’
গানটা গাইতে গিয়েও পারছে না দ্বৈপায়ন। গলায় আটকে যাচ্ছে। অনুপ ঘোষালের গলায় ডিএল রায়ের এই গানটি বেশ ভালো লাগে শুভমিতার। তার চেয়েও বেশি ভালো লাগে দ্বৈপায়নের গলায়। কিন্তু আজ এমন কী হলো? দ্বৈপায়নের শরীর ভালো আছে তো, নাকি? কাল তো টার্ম কুইজ।
দ্বৈপায়ন মুখ খোলে। একটা ঢিল ঠিক ঢিল না- একটা ম্যারা গাছের শুকনা ডাল ছুড়ে মারতে গিয়েও মারে না। শুভমিতার দিকে মুখ তুলে তাকায়। বলে—
‘আচ্ছা, শুভমিতা বল তো আমাদের এই দেশটা কি কখনো স্বাধীন হবে না?’
শুভমিতা অবাক হয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে দ্বৈপায়ন এর আগে অনেকবার এই দেশের স্বাধীনতা নিয়ে সংশয়-অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ওর কাছে কিন্তু আজকে একটু বেশি পরিমাণে ওর মন খারাপ। শুভমিতা উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ। এক অর্থে হয়েছে বলা যায়। কাগজে-কলমে, দলিল-দস্তাবেজে হয়েছে ঠিকই। একদম স্বার্থকথার প্রশ্নে কিন্তু হয়নি। মানবিক মুক্তি, মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গায়, গণতন্ত্রের প্রয়োগের বেলায় কিছুই তো হয়নি। সবই তো গোল্লায় গেল।’
‘হয়নি শুভ। তোর উত্তর হয়নি। স্বাধীনতার স্বাদ তো সেটাই- যেই কারণে যাদের কারণে, যেই সময়ের কারণে সেই স্বাধীনতাটা অর্জিত হয়েছে সেই কারণকে, সেই মুক্তির কাণ্ডারি মানুষগুলোকে, সেই সময় মানে ইতিহাসটাকে ঠিক ঠিকভাবে জানা, মেনে নেয়া, সবাইকে সেই সত্যিটাই বলে বেড়ানো, তাই না? তাহলেই তো কেবল মানুষ উজ্জীবিত হবে, দ্বিধাবিভক্ত হবে না। তখনই তো কেবল তাদের ইচ্ছাবিন্দু আর উদ্দেশ্যবিন্দু এক হবে, তাই না?
‘হ্যাঁ, একজ্যাক্টলি। দিস ইজ হাইলি কট এন্ড এক্সপ্লেইনড।’
আরো অনেক কথা চলতে থাকে ওদের মধ্যে। অনেকগুলো সারস আর ফ্লেমিঙ্গ পাখি দাপাদাপি করতে থাকে দূরে ওই লেকে। পরিযায়ী পাখিদের দেশ থাকে? কি আশ্চর্য! তারা তাদের জীবনের পুরোটা সময় যাওয়া-আসার মধ্যে থাকে। দেশ থেকে মহাদেশ। হাজার মাইল। বিষুবরেখার এইধার থেকে ওইধার। চলতেই থাকে। ক্লান্তি ভর করে না। কারণ এদের স্বাধীনতা আছে। স্বাধীনতা থাকলে পরিশ্রমে ক্লান্তি আসে না। দিন শেষে মনে হয় আমার ওপর তো কেউ আর খবরদারি করবে না, অযথা শোষণ করবে না, বিনা অন্যায়ে কেউ গালমন্দ করবে না। ফলে দিনের তীব্র ক্লান্তি তার উবে যায় মুক্তির ছোঁয়ায়।
সেদিন ওরা যার যার হলে ফিরে যায়। কুড়ি বছর বয়স্ক এই দুটি মানুষের মধ্যে এখনই সেই প্রশ্ন, সেই জিজ্ঞাসাগুলো তৈরি হচ্ছে। যেটা সেই দিনগুলোয় সংগ্রামী ওই যোদ্ধাদের মধ্যেও তৈরি হতো।
শুভমিতা গ্রামের বাড়ি যাবে। রাজবাড়ির নিশিকান্দা। সঙ্গে যাবে তার বাবা আবু তাহের। বাবার অনেক কাজ তার পরও মেয়েকে কদিনের জন্য দিয়ে আসবেন। ঘোরাঘুরি করুক কদিন। ভার্সিটি ভেকেশন চলছে।
দ্বৈপায়নকে সে অনেক মিস করবে। ওর সুন্দর সুন্দর কথা। নানান গুণের কথা। আচ্ছা, ওকে নিয়ে গেলেও তো পারত সে। ওহ না, সে তা পারবে না। তার দেশ এখনো এতটা উদার হয়নি। দ্বৈপায়নই তো একদিন বলেই ছিল যে একটা দেশ তত উন্নত, যে দেশে রাস্তায় হাঁটলে কেউ বুঝবেই না যে পুরুষ হাঁটছে, না মেয়ে হাঁটছে। কি অদ্ভুত গভীর কথা। শুভমিতা বাসে শুয়ে শুয়ে ভাবে।
আজ দ্বৈপায়নের ঠাকুরদাদার প্রয়াণ দিবস। তেইশতম প্রয়াণ দিবস। শুভমিতাকে সে ফোনে বলেছে যে সে আজকে ক্যাম্পাসে আসতে পারবে না। শুভমিতার তাই মন খারাপ। মন খারাপ থাকলে শুভমিতা হয় বই পড়ে কিংবা বাবার সঙ্গে আলাপ করে। ওর বাবার বয়স হয়েছে। আগে অনেক ছোটাছুটি করত। এখন আর পারেন না। রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক মানুষ তার বাবাকে চেনে। এই তো কয়েক দিন আগেও পল্টনে সাবেক বিরোধী দলের বিশাল মিটিংয়ে ওর বাবার কোম্পানি মাইক সার্ভিস দিয়েছে। ওই দলের জন্য তার বাবার মাইক সার্ভিস সদা হাজির। দেশব্যাপী তাই তার বাবা আবু তাহেরের অনেক নাম। যেখানে এই দলটি, সেখানেই ‘তাহের’ মাইক। শুভমিতার এ ব্যাপারটা ভালো লাগে না। কেন তার বাবা কেবল একটা দলের জন্য দিনের পর দিন মাইক সার্ভিস দিয়ে যাবে? শুভমিতা ভেবে পায় না।
কোনো কিছু ভেবে না পেয়ে শুভমিতা দ্বৈপায়নের কথা ভাবে। ওর কথা ভাবলে বেশ আরাম লাগে ওর। ‘আচ্ছা, আমার বাবা মাইকের বিজনেস করে, অন্য অনেকের বাবাও কি মাইকের বিজনেস করে? করে তো, করে না! তবে সবারটা তো এ রকম একপেশে রাজনৈতিক না, তাই না?’ আচ্ছা দ্বৈপায়নকে ও সব কিছুই বলেছে কেবল এই কথাটি ছাড়া। বাবার পেশাটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? শুভমিতা ভাবে। আচ্ছা দ্বৈপায়নের বাবা কী করে, সেটা তো দ্বৈপায়ন ওকে বলেনি। তাহলে কি দ্বৈপায়ন সব বুঝতে পারে, তার কথা? আমি বলিনি বলে কি সে-ও লুকিয়েছে? এলোমেলো ভাবতে থাকে শুভমিতা। ছেলেটা কি জাদুকর?
ভাবতে ভাবতেই শুভমিতা (ভালো নাম শিপু তাহের) দ্বৈপায়নকে ফোন দেয়।
‘এই দ্বৈপায়ন, আজ একটু বলবে, তোমার বাবা কী করে?
এপারে দ্বৈপায়ন শুধুই অবাক হয়। পাগলি হঠাত্ কি বলে। মুহূর্ত পর এবার দ্বৈপায়ন মোবাইল হাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
তোমার কী দরকার হঠাৎ?
- না, এমনি।
তুমি যদি বলো তাহলে আমিও বলব।
- কী বলব?
দ্বৈপায়ন (ভালো নাম বীরেন ঘোষ) হালকা ঘামতে থাকে। সম্ভবত ঘরের বিদ্যুত্ চলে গেছে। দ্বৈপায়ন ভাবে। এই কথাটা বলা আর না বলা তো একই। ফোনটা যথাসম্ভব মুখের কাছে নিয়ে দ্বৈপায়ন বলে—
‘আমার দুই দাদা ঠাকুরের নাম ছিল হরিপদ ঘোষ আর দয়াল ঘোষ। আমি দয়াল ঘোষের নাতি। তারা মাইকের ব্যবসা করতেন।
অনেক নামকরা সেই মাইক কোম্পানি। আমি বীরেন ঘোষ তোমার দ্বৈপায়ন।’
শুভমিতা মানে শিপু তাহের মোবাইল কানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এও কি সম্ভব! সে ভাবতে থাকে— বিরোধিতা তো কমছে না, দূরত্ব তো বেড়েই যাচ্ছে। বিভাজন কি আদিমতম আদেশ কারো, নাকি ধর্মে, জাতে, ভাষায়, নীতি বা রাজনীতি— সবখানেই কী কাঁটাতার থাকতে হবে, ভয়-দুশ্চিন্তা কি জগজ্জননীর চিরন্তন বিধান। পুরো জীবনটাই কি কাকতাল?
ওইদিকে বীরেন ঘোষ ওরফে দ্বৈপায়ন ফোনে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলতেই থাকে।






