আনুষ্ঠানিক যাত্রা ১৮৬৯ সালে হলেও সুয়েজ খাল মিসরের দীর্ঘ ইতিহাসের অচ্ছেদ্য অংশ এবং সময়পরিক্রমায় এটি পরিণত হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইনে। খালটি ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগর এবং এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সংযোগকারী সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কৃত্রিম জলপথ বা শিপিং রুট। স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শুরু থেকে আজ অবধি এটিই হলো প্রধান বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবহন ও শিপিং গন্তব্য।
ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-সাবুদ অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব উনিশ শতকের দিকে লোহিত সাগর ও নীল নদের একাংশের মধ্যে একটি খালের অস্তিত্ব ছিল, যা দিয়ে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হতো। ফারাও তৃতীয় সেসস্ট্রিসের শাসনামলে খননকৃত খালটি শুষ্ক মৌসুমে নৌচালনার জন্য খুলে দেয়া হতো এবং নিয়মিত ড্রেজিং করা হতো। অবশেষে এটি পরিত্যক্ত হয়েছিল খ্রিস্টীয় আট শতকের দিকে। তবে নতুন করে জলপথটির রূপকার বলতে গেলে আধিপত্যবাদী ইউরোপীয় শক্তিগুলো, যারা এটিকে দেখেছিল ভারত ও এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের নাতিদীর্ঘ বাণিজ্যপথ হিসেবে। কেননা উল্লিখিত অঞ্চলে আগে তাদের যেতে হতো আফ্রিকা হয়ে ঘুরপথে। এ সংক্ষিপ্ত পথটি তাদের মূল্যবান সময় ও বাণিজ্যবহর অভিযানের লক্ষণীয় ব্যয় কমিয়েছিল।
সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী মিসরীয় শহর পোর্ট সাইদ ও লোহিত সাগর তীরবর্তী সুয়েজ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। নির্মাণের সময় এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৬৪ কিলোমিটার ও গভীরতা ছিল আট মিটার। একাধিকবার সংস্কারের পর এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১৯৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার ও গভীরতা ২৪ মিটার।
নবরূপে খালটি নির্মাণের ধারণা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। যতদূর জানা যায়, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মাথা থেকে সুয়েজ খাল নির্মাণের ধারণা প্রথম আসে, ১৭৮৯ সালে তিনি যখন মিসরে অভিযান চালিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এ খাল তত্কালীন প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রেট ব্রিটেনের বিপরীতে তার নিজের দেশ ফ্রান্সকে বাণিজ্য ও শিপিং ইন্ডাস্ট্রির দিক থেকে কৌশলগত সুবিধা দেবে। কিন্তু তার জরিপকারীদের ভুলের কারণে ধারণাটি বাস্তবে রূপদান করা সম্ভব হয়নি নেপোলিয়নের। জরিপকারীরা ভেবেছিল, দুই সাগর বেশ সুউচ্চ এবং প্রকল্পটি মিসরের নীল নদ তীরবর্তী অঞ্চলকে প্লাবিত করবে।
অবশ্য পরবর্তীকালে ধারণাটির মৃত্যু ঘটেনি। ইউরোপ ও এশিয়ায় দ্রুত চলাচলের উপায় হিসেবে খ্রিস্টীয় ষোলো শতক থেকে ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে নানা পরিকল্পনা নেয়া অব্যাহত থাকে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসে ১৮৫৪ সালে ফরাসি কূটনীতিক ফের্দিনঁ দু লেসেপসের হাতে। তখন তিনি মিসরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় ফ্রান্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট কনসল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি মিসরের শাসক মোহাম্মদ সাইদ পাশাকে সুয়েজ খাল খনন এবং এজন্য একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব দেন। সাইদ পাশা তাতে সম্মত হন। প্রস্তাবিত জলপথ নির্মাণ এবং ৯৯ বছরের জন্য সেটি পরিচালনার উদ্দেশ্যে মিসর ও ফ্রান্সের যৌথ মালিকানায় চার বছর পর ইউনিভার্সাল কোম্পানি অব দ্য মেরিটাইম সুয়েজ ক্যানেল গঠন করা হয়। এ কোম্পানির অধীনে ১৮৫৯ সালের ২৫ এপ্রিল খননকাজ শুরু হয়।




