রোম থেকে আল্পসের পথে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যখন ফ্রান্সের উদ্দেশে যাত্রা করেন, তখন তার বয়স ৬৪। চলেছেন ঘোড়ায় টানা গাড়িতে। যাত্রার আগে ঠিক করলেন, মোনালিসাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। চিত্রকর্মটি ঘোড়ার জিনের পেছন দিকে ঝোলানো ভারী থলিতে রাখা হলো। লিওনার্দো চলেছেন ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের অনুরোধে। বড় অংকের পেনশন আর লোয়ারে বিশাল অট্টালিকাসম বাড়ির প্রস্তাব দিয়ে লিওনার্দোকে রাজি করিয়েছেন তিনি।
শিল্পী লিওনার্দোর জন্য এসব প্রাপ্তি ছিল স্বাভাবিক। জীবনের বেশির ভাগ সময়ে তিনি ধনী ও ক্ষমতাধরদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। উপভোগ করেছেন ফ্লোরেন্সের প্রভাবশালী বণিক পরিবার, মিলানের ডিউক আর রোমের পোপের পৃষ্ঠপোষকতা। তবে প্রথম ফ্রান্সিসের ওই প্রস্তাবটি ছিল লিওনার্দো গৃহীত কারো শেষ অনুরোধ। কেননা ১৫১৯ সালের ২ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ধরে নেয়া হয়, তার মৃত্যুর সময় রাজা ফ্রান্সিস উপস্থিত ছিলেন বা লিওনার্দো রাজার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। যদিও এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। রাজা ফ্রান্সিস লিওনার্দোর মৃত্যুর একদিন পর সেখানে পৌঁছেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক দাবি করেন। আর এত শতক পেরিয়ে সে ঘটনার সত্যতা আজ খুঁজে বের করা নেহাত কঠিন।
লিওনার্দোর প্রয়াণের ৫০০ বছর স্মরণে ইউরোপজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে তার কাজের প্রদর্শনী। ভিঞ্চিপ্রেমী মানুষ ছুটছেন মিলান, প্যারিস, ফ্লোরেন্স কিংবা ভেনিসের জাদুঘরে এ মায়েস্ত্রোর মাস্টারপিস—মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার, ভার্জিন অব দ্য রকস কিংবা সেন্ট জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট এক ঝলক দেখতে। বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম সেরা শিল্পী স্মরণে। শিল্পীসত্তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিজ্ঞানী, ভাস্কর, স্থপতি, উদ্ভাবক, সংগীতজ্ঞ, সাহিত্যিক, আবিষ্কারক লিওনার্দোর প্রগাঢ় প্রতিভা আজো জট পাকানো ধাঁধা হিসেবে রহস্য ছড়ায়। মৃত্যুর পর তার ডায়েরি, তার সম্পর্কে লেখা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে ভিন্ন এক সত্তার সন্ধান মেলে, যে সত্তা প্রতিভা ও পাগলামিতাড়িত।
লিওনার্দোর জীবনীকার জর্জিও ভাসারি তার বইয়ে লিখেছেন, ‘মৃত্যুর
সময় বিলাপরত লিওনার্দো বলেছেন, ‘যেভাবে
উচিত ছিল সেভাবে কাজ না করে তিনি তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে স্রষ্টা ও মানবজাতির প্রতি অন্যায় করেছেন।’ মনোবীক্ষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড এ শিল্পী সম্পর্কে বলেছেন, ‘ভিঞ্চির
কাহিনী যেন একটা প্যারাডক্স—তার প্রবল প্রতিভা শারীরবিদ্যা, দর্শন আর শিল্পের বিস্ময়কে ঘিরে রেখেছে। অন্যদিকে অনেক কাজ বা প্রকল্প আছে, যা তিনি শেষ করতে পারেননি।’ ফ্রয়েড দাবি করেছেন, ‘পরিকল্পনা
করতে গিয়ে ভিঞ্চি অতিরিক্ত সময় নিয়েছেন আর তার অধ্যবসায় ও মনঃসংযোগের অভাবগুলো লক্ষণীয়। স্বভাবগতভাবেই তিনি ছিলেন অস্থিরমতি, তাই অনেক কিছু আরম্ভ করেও শেষ পর্যন্ত সমাপ্তির রেখায় পৌঁছতে সমর্থ হননি। মাঝখানে ছেড়ে দিয়েছেন।’
মনঃসংযোগ স্থির না করতে পারার বিষয়টি লিওনার্দোর মধ্যে ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠতে থাকে, বিশেষ করে ভিঞ্চি নামের ছোট গ্রাম থেকে ফ্লোরেন্সে আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিওর কাছে প্রশিক্ষণের দিনগুলোয়। ভেরোচ্চিও ছিলেন সত্যিকারের রেনেসাঁর মানুষ। যিনি লিওনার্দোর বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ ইচ্ছা আর সারগ্রাহী প্রতিভাকে উপভোগ করেছেন। তবে গুরু ভেরোচ্চিওর কাছ থেকে দ্রুত কার্য সম্পাদন আর সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের গুণগুলো লিওনার্দো আয়ত্ত করতে পারেননি। তার প্রথম কমিশনপ্রাপ্ত কাজ, যা কিনা লিওনার্দো তার পিতার মাধ্যমে পেয়েছিলেন, তা বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না করায় বাতিল করা হয়। এছাড়া কর্মসূচি অনুযায়ী অন্য কাজটিও কখনো তার শুরু করা হয়নি। এদিকে স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত




