একদিন বাদশাহ আকবর তার নিজস্ব বাগানবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বাদশাহর সঙ্গে ছিলেন বীরবল আর ছিলেন নবরত্নের দু-চারজন সভাসদ। তারা বলাবলি করছিলেন, দুনিয়ায় অর্থই হলো যত অনর্থের মূল।

বীরবল কিন্তু তাদের সঙ্গে একমত নন। তিনি বললেন, তা কেন হবে? অর্থ সবসময় অনর্থের মূল হলে অর্থ কেউ চাইত না। অথচ আমরা দেখছি অর্থ লাভের জন্য মানুষ অকাতরে সব রকম কষ্ট স্বীকার করতে রাজি হচ্ছে।

তখন ছিল শীতকাল। দিল্লিতে খুব শীত পড়েছে। বাদশাহ সরোবরের পানিতে একবার হাত ডুবিয়েই সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে নিলেন। হাত মুছতে মুছতে তিনি বললেন, বীরবলের সঙ্গে আমিও একমত নই। টাকা পেলেই লোকে সবকিছু করতে রাজি হবে না। আমি বলতে পারি, টাকা-পয়সার লোভে কেউ এ সরোবরের পানিতে রাত কাটাতে রাজি হবে না। সে চেষ্টা কেউ করলে বেচারা ঠাণ্ডায় মরে যাবে।

বীরবল বললেন, সে রকম লোকেরও অভাব নেই জাঁহাপনা। টাকা পাওয়ার আনন্দটা তাকে শীতের ভেতরেও গরম করে রাখবে।

অন্য সভাসদরা বীরবলের কথায় হেসে উঠলেন। একজন বললেন, মুখে যা বলা সম্ভব, তার বেশির ভাগই কাজের বেলা করা সম্ভব নয়। বীরবল যা বলছেন, তা হয়তো শুধু তার পক্ষেই সম্ভব।

বীরবল সেদিকে কর্ণপাত করলেন না। তিনি বললেন, বাদশাহ যদি ইচ্ছে করেন, তবে আমি তেমন লোকও হাজির করতে পারি।

বাদশাহ রাজি হলেন। সে রকম সাহসী লোককে তিনি অনেক টাকা পুরস্কার দেবেন বলেও জানালেন।

বীরবল দিল্লিতে ফিরে লোক খুঁজতে লাগলেন। টাকায় কি না হয়?

অবশেষে তিনি সত্যিই একজন লোক বের করলেন। টাকা পাওয়ার লোভে গরিব লোকটি সারা রাত সরোবরে ডুবে থাকতে রাজি হলো।

বাদশাহ বললেন, তুমি সারাটা রাত কাটাবে সরোবরের পানিতে গলা অবধি ডুবে থেকে। কোনো আগুন বা আলোর কাছে কিন্তু আসতে পারবে না—রাজি?

লোকটি তাতেই রাজি হলো। সে এত গরিব যে, টাকার কাছে তার জীবনও তুচ্ছ ছিল। সে বলল, তাই হবে জাঁহাপনা। সারা রাত আমি সরোবরের পানিতেই দাঁড়িয়ে থাকব। কোনো আলো বা আগুনের কাছে আসব না।

লোকটি যাতে তার কথা ঠিক রাখে, সেজন্য জনাকয়েক পাহারাদার রাখা হলো সরোবরের চারপাশে।

গরিব লোকটি সারা রাত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল পানির মধ্যে শরীর ডুবিয়ে। তারপর ভোরে উঠে পাহারাদারদের সঙ্গে নিয়ে হাজির হলো বাদশাহর দরবারে।

বাদশাহ তো তাকে দেখেই অবাক! তিনি মনে করেছিলেন, লোকটা নিশ্চয়ই শীতে মরে যাবে, নয়তো একটু পরেই উঠে পালাবে। তাই তিনি বললেন, কী করে তুমি পারলে সরোবরে রাত কাটাতে?

গরিব বেচারা হাত জোর করে বলল, আমি একবারও পানির ভেতর থেকে উঠে আসিনি জাঁহাপনা। আপনার পাহারাদার তা দেখেছে।

পাহারাদাররা লোকটির কথায় সায় দিয়ে চুপ করে রইল। বাদশাহ বললেন, তাহলে কেমন করে...?

লোকটি তখন বলল, হুজুর! দূরে একটা আলো জ্বলছিল। সারা রাত আমি একদৃষ্টে সেদিকে চেয়েছিলাম। তাতে শীতের কথা আমার মনেই পড়েনি।

এ কথা শুনে একজন সভাসদ হঠাৎ বলে উঠলেন, জাঁহাপনা! এ লোকটা তার প্রতিজ্ঞা ঠিক রাখেনি। ওই আলোর উত্তাপেই তার শরীর গরম হয়েছে।

ঠিক বলেছ।

এই বলে বাদশাহ সেই গরিব লোকটির দিকে চেয়ে বললেন, তুমি তোমার কথার খেলাপ করেছে। কাজেই তোমাকে টাকা দেয়া হবে না।

গরিব বেচারা আর কী করবে? পুরস্কারের টাকা না পেয়ে দুঃখিত মনে সে বাড়ি ফিরে গেল।

বাড়ি যাওয়ার পথে লোকটি যখন কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছিল, তখন তার সঙ্গে দেখা হলো বীরবলের। বীরবল বললেন,