জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুব দিবস এমন একটি বিশেষ দিন, যা বিশ্বের তরুণদের সম্ভাবনা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও সামাজিক পরিবর্তনে তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য পালিত হয়। বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী তরুণরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালের যুব দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে: ‘প্রযুক্তিনির্ভর যুবশক্তি বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্বে অগ্রগতি’। এ দিবসকে কেন্দ্র করে বণিক বার্তা এবং পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) যৌথ উদ্যোগে ১০ আগস্ট ২০২৫ বণিক বার্তার প্রধান কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। পিএসটিসির নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদের সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল বৈঠকে দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়ন কর্মী, উদ্যোক্তা ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন; যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএসটিসির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (মিল অ্যান্ড এইচআর) আবু সাদাদ মোহাম্মদ সায়েম

ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান
মহাপরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
প্রযুক্তিনির্ভর যুবশক্তি মানে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়; বরং প্রযুক্তিবান্ধব এমন যুবসমাজ, যারা প্রযুক্তিকে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহে কাজে লাগাবে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো তরুণদের দক্ষ করে তুলতে নানা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিন্তু অনেকেই এসব প্রশিক্ষণকে দক্ষতা বৃদ্ধির বদলে ভাতা পাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এখন এ বিষয়ে নজরদারি জোরদার করেছে। তবে আয় বৃদ্ধি বা ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোই কি জীবনের একমাত্র লক্ষ্য? আজ বহু তরুণ মাদকাসক্তির ফাঁদে বিপন্ন। তাদের দক্ষতা ও কর্মমুখী জীবনে ফিরিয়ে আনতে নানা কর্মসূচি চলছে। দেশের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর জনশক্তি যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন যুবশক্তি। কারণ মানবিকতা ছাড়া কোনো সাফল্যই দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। আমরা কত টাকা আয় করি তা দিয়ে সাফল্য মাপলেও, আসল প্রশ্ন—আমরা কতটা মানবিক? প্রযুক্তি ও মানবিকতা মিলিয়েই গড়ে উঠতে পারে উন্নত ও টেকসই বাংলাদেশ।

ড. নূর মোহাম্মদ
নির্বাহী পরিচালক
পিএসটিসি
আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় ১৫-২৪ বছর বয়সীরা যুব, আর বাংলাদেশে এই সীমা ১৮-৩৫ বছর। যে সংজ্ঞাই ধরা হোক, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা তরুণ। তাই তাদের নিয়ে ভাবা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি জ্ঞানের বিকল্প নেই। শিশু-কিশোরদের প্রাথমিক প্রযুক্তি জ্ঞান পরিবার থেকেই দিতে হবে। কোন সাইটে সঠিক তথ্য আর কোথায় অপতথ্য—এ বিষয়গুলো বোঝাতে হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা দিতে হবে, তবে অবশ্যই সঠিকভাবে গাইড করে। সরকারেরও অভিভাবকের মতো দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের দেশে ইন্টারনেট খরচ অত্যধিক। ফ্রি করা সম্ভব না হলেও সাশ্রয়ী করা জরুরি। তা না হলে প্রযুক্তিভিত্তিক সম্ভাবনার সব আলোচনা কেবল কাগুজে স্বপ্ন হয়ে থাকবে। নীতির ক্ষেত্রে বটম-আপ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি, যেখানে যুবকদের মতামত গুরুত্ব পাবে এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক
বণিক বার্তা
বণিক বার্তা শুরু হওয়ার সময় আমি তরুণ ছিলাম, আর তরুণরাই আমাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ছিল তরুণদের এক বিশাল গণজাগরণ, যা বিশ্বব্যাপী নজর কাড়ে। বাংলাদেশের তরুণরা কঠোর পরিশ্রমী কিন্তু তারা যদি আরেকটু শিক্ষিত হতো কিংবা প্রশিক্ষণ পেত তাহলে আরো অনেক বেশি আয় করতে পারত। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে তরুণদের কাজের সুযোগ সীমিত—১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে যারা পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ বা কাজে নেই, তাদের হার বিশ্ব গড় ২২ শতাংশের বিপরীতে বাংলাদেশে ৪০ শতাংশের বেশি; নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৬১ শতাংশ। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নয়—শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিদেশে আমাদের তরুণরা কঠোর পরিশ্রম করছে, কিন্তু শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ালে তারা আরো বড় অবদান রাখতে পারত। এলডিসি উত্তরণে এই বৃহৎ যুবশক্তিকে কাজে লাগানো জরুরি। আশা করা যায়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুব দিবসে সরকার তরুণদের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবে।

ডা. মো. মনজুর হোসাইন
প্রোগ্রাম ম্যানেজার (এ এন্ড আরএইচ), এমসিএইচ- সার্ভিসেস ইউনিট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
দেশে প্রায় ৩ কোটি ২৮ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে ও সহিংসতা প্রতিরোধে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
‘দশ থেকে উনিশে, আমরা তোমার পাশে’—এ প্রতিপাদ্যে আমরা কাজ করছি, তবে এ কাজ একা সম্ভব নয়; যুবদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার। বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্ট সোসাইটি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইডসহ বহু যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠনের সঙ্গে আমরা কাজ করছি।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার প্রাণ বাঁচাতে পারে, আবার অপব্যবহার ক্ষতি ডেকে আনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অযাচিত ব্যবহার নিয়ে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে। শহরের তুলনায় গ্রামে নারীরা ডিজিটাল অ্যাকসেসে অনেক পিছিয়ে আছে, ইন্টারনেট প্রবেশযোগ্যতাও কম। তাই নারীদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও গ্রামীণ এলাকায় প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

রেজিনা আরজু লাভলী
উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ)
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় ২৬টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। গত ৫ বছরে প্রশিক্ষিত নারীদের ২২% কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হয়েছেন। যা জিডিপিতে নারীর ২৩% শতাংশ অবদানে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। আমাদের শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ গার্মেন্টস সেক্টরে রয়েছে। গার্মেন্টস সেক্টরে ইন্টার্নশিপের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। কিন্তু তারা এতে রাজি নয় বরং রেডিমেড কর্মী চায়। তবে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা দুই দিন গার্মেন্টস পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে। মাঠ পর্যায়েও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর অংশীদারত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে কাজ করছে। এক্ষেত্রে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছুর জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকা ঠিক না। তাই এনজিও কর্মী থেকে শুরু করে সবাই মিলে নিজেদের দায়িত্বটা পালন করতে হবে। প্রযুক্তিকে শুধু তথ্যনির্ভর করে তোলা উচিত না বরং এটির প্রয়োগের যে ভালো সম্ভাবনাগুলো রয়েছে, তার সবগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

মো. আমান উল্লাহ দরজী
সহকারী পরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর গাজীপুর
যুবদের দক্ষতার উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কাজ করছে অধিদপ্তর। যুবশক্তির ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন তার আর্থিক সক্ষমতা। যখনই যুবরা আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে তখনই আমরা যুবশক্তির ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারব। কীভাবে গ্রাম থেকে শহর পর্যায়ে যুবশক্তির সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে অধিদপ্তর কাজ করছে। আমরা ৭৫ লাখের বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। দেশের ১৮-৩৫ বছর বয়সীরা বেকার না, তারা কর্মপ্রত্যাশী। গতানুগতিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আমরা প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ইলেকট্রনিক বিষয়গুলোর বিভিন্ন দিক সম্পর্কেও তরুণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে আমরা ফ্রিল্যান্সিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কেননা এ দেশের যুবসমাজ শুধু বাংলাদেশেরই সম্পদ নয়, প্রযুক্তির কল্যাণে তারা এখন গোটা পৃথিবীরই অংশ।

আবু সাদাদ মোহাম্মদ সায়েম
প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (মিল অ্যান্ড এইচআর)
পিএসটিসি
বাংলাদেশের প্রায় ৫২ মিলিয়ন তরুণ প্রতিদিন শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং সৃজনশীল কাজে প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, যা তাদের জ্ঞান বিনিময়, বিনোদন ও উদ্যোক্তা উদ্যোগের সুযোগকে প্রসারিত করছে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও গরিবের মধ্যে এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে গভীর ডিজিটাল বিভাজন এখনো বিদ্যমান, যা সবার সমান সুযোগ সৃষ্টিতে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কি নোটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের তরুণদের মধ্যে প্লাটফর্মভিত্তিক ব্যবহারের ধরনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা। টিকটক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বাধিক—মোট সক্রিয় ব্যবহারকারীর ৪৮ শতাংশ। এর পরে রয়েছে ইউটিউব (৪৩ শতাংশ), ফেসবুক (৩৫ শতাংশ) ও ইনস্টাগ্রাম (১৫ শতাংশ)। এছাড়া ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ৭২ দশমিক ৩১ শতাংশ মানুষের কাছেই মোবাইল ফোন রয়েছে, যা ডিজিটাল যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রযুক্তি তরুণদের জন্য অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

নন্দিনী লোপা
কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি (জিএফএফ), দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের আগামী ১০ বা ২০ বছরে কোথায় দেখতে কিংবা নিতে চায় তার পরিষ্কার ঘোষণা থাকা জরুরি। তরুণদের আমরা কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা জানে তারা দেশের কাছে কী চায়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত সেটি তরুণরা জানে। কিন্তু রাষ্ট্র কি তাদের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারছে? অর্থাৎ তার আকাঙ্ক্ষা কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে সেটি আসল বিষয়। মেধাবী যুবরা বলেন, তারা দেশে থাকবেন না, সুযোগ পেলে বাইরে চলে যাবেন এবং যাচ্ছেনও। তাই তরুণদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার মানসিকতার পেছনের যে বিষয়গুলো কাজ করে, তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে এ দেশের তরুণ সমাজ। সবাই জুলাই অভ্যুত্থানের আহত ও নিহতদের নিয়ে কথা বলি কিন্তু এই আন্দোলনের যে আকাঙ্ক্ষাগুলো ছিল, সে বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়গুলোর দিকে আমরা মনোযোগ দেই না। বিশেষ করে যারা অভ্যুত্থান ঘটালেন তারা পরবর্তী সময়ে ক্লাসে ফিরে গেল কি না, তাদের প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্র কাজ করছে কি না, সে অভিপ্রায়গুলো সেভাবে সামনে আসছে না। যুবদের জন্য আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কর্মসংস্থান প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষাগত দক্ষতা এবং জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ থাকবে। দেখা যাচ্ছে ইতিহাস পড়ে কেউ ব্যাংকে, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে প্রশাসনে, আবার ডাক্তার হয়ে অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে একজন তরুণ তার শিক্ষাগত দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন না— যা তাকে দিতে হবে। শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর, কর্মমুখী ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধু সভা-সেমিনারে আলোচনা করলেই হবে না, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা শ্রেণীকক্ষে প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও গ্রামীণ এলাকায় প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

সাবিক রহমান
ভাইস চেয়ারপারসন, সাউথ এশিয়া রিজিওনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক (সারিন)
প্রযুক্তি আমাদের অসাধারণ ক্ষমতা এনে দিয়েছে। এর বহুমুখী ব্যবহার সীমান্তের দেয়াল ভেঙে দিয়েছে, তরুণদের বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু দেশে এখনো গভীর প্রযুক্তিগত বিভাজন রয়ে গেছে।
দেশে বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠী ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও এখনো অনেক তরুণ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। ইন্টারনেটে সবার প্রবেশাধিকার একটি মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। এ সুযোগ থেকে কেউ বঞ্চিত হলে ভবিষ্যৎ হবে অসম্পূর্ণ এবং বৈষম্য বাড়বে। অবশ্যই আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, সবকিছু আমরা একসঙ্গে পাব না।

ড. ফিজার আহমেদ
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, সিএসই বিভাগ
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
আমাদের একটি বিষয় কখনো দায় আবার কখনো সম্পদ, সেটা হলো যুব সম্পদ। একদিকে যুবকরাই দেশটাকে গড়ছে, অন্যদিকে যুবকদের বেকারত্বের ভারে দেশ নুয়ে পড়ছে। বিশ্ব বলছে দক্ষ মানবসম্পদ দরকার, কিন্তু আমরা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছি কি? যুব উন্নয়ন কিংবা মহিলা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণগুলো আমি দেখেছি, তাদের ফেসবুক, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শেখানো হচ্ছে। যারা শিখছেন, তারা এই প্রশিক্ষণের উপযোগী কিনা তা আগে যাচাই করা দরকার। গার্মেন্টস সেক্টরে অটোমেটেড মেশিন চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ দরকার, আমরা চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেখানে দক্ষ মানবসম্পদ পাচ্ছি না। আমাদের কোন সেক্টরে কী ধরনের দক্ষ জনশক্তি দরকার তার একটা হিসাব থাকা জরুরি, শুধু প্রশিক্ষণ দিলে তো হবে না, বাজারে সেটার চাহিদা আছে কিনা সেটা আগে যাচাই করে দেখতে হবে। এটি করতে সরকারি-বেসরকারি মিলে একটি চলমান কর্মসূচি দরকার।

প্রিয়তা মণ্ডল
চেয়ারপারসন
ন্যাশনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক (নয়ন)
আমরা শুধু ভবিষ্যতের নেতা নই, আমরা আজকেরও নেতা। বৈষম্য, দ্রুত পরিবর্তন ও প্রযুক্তিনির্ভর এ যুগে সীমান্ত পেরিয়ে একসঙ্গে কাজ করাটা কোনো বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজন। প্রযুক্তি হলো সেই সেতু, যেটা ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ গড়া যায়—আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই।
যদি প্রযুক্তি হয় সেতু, তবে যুবরাই এর স্থপতি। আমাদের হাতে সঠিক টুলস দিতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে আসন দিতে হবে, আর বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমরা অনেক কিছুই পারি।
পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নীতিনির্ধারণ ও এজেন্ডা সেটিংয়ে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।

সুপা বড়ুয়া
কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর
টেরে ডেস হোমস, নেদারল্যান্ডস
প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এর সঠিক ব্যবহার হলে আমরা অফিস, গবেষণা থেকে শুরু করে জীবনের নানা ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পারি। প্রযুক্তির যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও রয়েছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির ঘটনা ঘটলেও প্রতিটি প্লাটফর্মের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে, যা জানা ও মেনে চলা প্রত্যেক ব্যবহারকারীর নিজ নিজ দায়িত্ব।
অংশীদারত্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সবকিছু কর্তৃপক্ষের ওপরে চাপালে ভালো কিছু পাওয়া কঠিন।
যুবসমাজের প্রতিনিধি ও তাদের নেতৃত্বাধীন কমিউনিটিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারে চ্যালেঞ্জ থাকলেও সচেতনতা, সঠিক গাইডলাইন ও দায়িত্বশীলতা থাকলে এর সুফল সর্বোচ্চ মাত্রায় পাওয়া সম্ভব।

সাঈদা বাণী
প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর, ফেমিনিস্ট অপরচুনিটি নাউ (এফওএন)
নীতি প্রণয়নের সময় যাদের জন্য কাজ করা হচ্ছে— বিশেষ করে প্রান্তিক নারী, যুব, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও ট্রান্সজেন্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বপ্ন হারানো চোখে স্বপ্ন ফেরাতে তাদের কথা শোনা জরুরি। প্রযুক্তি ভাবনা শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বা ফ্রিল্যান্সিংয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে আগামী ৫-১০ বছরে দেশ ও বিশ্বে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে যুবদের জন্য করণীয় নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ। যুবের সংজ্ঞা, নীতিনির্ধারণের বাস্তবতা ও উপকারভোগীর প্রকৃত প্রয়োজন নতুনভাবে ভাবতে হবে—যাতে প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা পৌঁছায়। বিশেষ করে গ্রামের প্রান্তিক নারী ও পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট অ্যাকসেস নিশ্চিত করা জরুরি।

মাহির ফয়সাল
সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব পপুলেশন সায়েন্সেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান সময়ে আমরা তৃতীয় শিল্প বিপ্লব পেরিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রধান ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষার্থীরা মাত্র ১০ মিনিটে অনলাইনে অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে পারছে। প্রযুক্তিনির্ভরতা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানা নয়, এটা কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারে সেটাও শেখানো প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ডেমোগ্রাফিক অপরচুনিটি (জনসংখ্যাগত সুবিধা) সম্পূর্ণরূপে বুঝে নিতে হবে। ডেমোগ্রাফিক অপরচুনিটি হলো এমন একটি সময় যখন যুব জনসংখ্যার পরিমাণ বেশি থাকে এবং এটি দেশটির সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। আমরা কেন এতদিন এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি, এটা একটা প্রশ্ন।

সামিরা আফরিন
মেম্বার (ইয়ুথ)
চাইল্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপ, গাজীপুর
আমরা শিশুদের নিয়েই কাজ করি। কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি। আমরা যখন স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন নিয়ে কিছু বলি তারা সেগুলোয় গুরুত্ব দেয় না। পিএসটিসি থেকে এ সম্পর্কে আমি জানতে পেরেছি। কিন্তু হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী আছে যারা এটি সম্পর্কে সঠিক গাইডলাইন পায় না। আমি চাই, প্রতিটি স্কুল বা ইউনিয়নে একজন করে গাইড বা শিক্ষক থাকুন, যিনি কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন সম্পর্কে নানা পরামর্শ দেবেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটিকে উপক্ষো করার সুযোগ নেই।

মো. নুরুল কবির
প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর পিএমই ও ফান্ডরেইজিং টেরে ডেস হোমস, নেদারল্যান্ডস
প্রযুক্তি বা তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমি এটি কখন পাচ্ছি, আর কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর যুবশক্তির জন্য প্রথমে প্রয়োজন নিরাপদ ও চাহিদাসম্পন্ন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ। এটি তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি উভয় ক্ষেত্রেই দরকার। এ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ না থাকলে তরুণদের আমরা শিক্ষার আওতায় আনতে পারি। তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে পারি। কীভাবে তারা নিরাপদে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করবে তার নির্দেশনা দিতে হবে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার হয় চাহিদার ভিত্তিতে। আজ কিংবা পাঁচ বছর পর কী দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে তার বাস্তবিক শিক্ষা দিতে হবে। আগামী ৫০ বছর পরে কী হবে প্রযুক্তি আমাদের চিন্তাধারায় সেটি নিয়ে এসেছে।

মো. নূর মোহাম্মদ সিয়াম
মেম্বার (ইয়ুথ) চাইল্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপ গাজীপুর
দেশের তরুণদের সবাই ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এটিকে কেউ ভালো কাজে, আবার কেউ খারাপ কাজে ব্যবহার করে। ইন্টারনেট ব্যবহার এখন অনেক বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যেগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে মানুষ হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা। তারা না বুঝে সামাজিক মাধ্যমে পাবলিক করে নিজের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করছে। পরে দেখা যায়, অসাধু লোকজন এই ছবি-ভিডিও অপরাধকাজে ব্যবহার করছে। বর্তমান যুগ এআইয়ের। এ সময়ে একটি ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইলসহ অনেক কিছুই করা যায়। তরুণদের মধ্যে ফেসবুক-ইন্টারনেট আসক্তি আছে। তারা এখন আর মাঠে গিয়ে খেলে না। তারা মোবাইলে গেম খেলতে পছন্দ করে।

কানিজ গোফরানী কোরায়শী
প্রজেক্ট ম্যানেজার পিএসটিসি
কৃষি খাতে প্রযুক্তির সংযুক্তি ঘটাতে হবে। অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য যুবসমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যুবকদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা তাদের উদ্যোগগুলো প্রযুক্তির সঙ্গে সন্নিবেশ করতে পারে। কেবল প্রযুক্তি ব্যবহার নয়; এটিকে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও অন্যান্য খাতে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ এবং আমরা কৃষি থেকে সরে যেতে চাই না। তবে আধুনিক কৃষিবান্ধব প্রযুক্তি সংযুক্ত করার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি সম্ভব। এজন্য যুবসমাজকে কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো জরুরি। তরুণদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে প্রাইভেট বা বেসরকারি সংস্থাকেও (পিপিপি) সম্পৃক্ত করা হলে তরুণ সমাজের বড় অংশকে প্রশিক্ষণ বা সেবা প্রদান করা যাবে।
সুপারিশ
যুবক ও যুব মহিলাদের প্রশিক্ষণ প্রদানে নিয়োজিত সব সরকারি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন।
জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের মাধ্যমে তরুণদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা, যাতে প্রশিক্ষণের সুযোগ সর্বাধিক এবং কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়।
আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং, কোডিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।
বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্প খাতের কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ।
সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে জাতীয় যুব উন্নয়ন নেটওয়ার্ক গঠন।
তরুণদের জন্য সাশ্রয়ী বা বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
নারীদের জন্য নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি প্রবর্তন।
দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের প্রতিটি খাতে দক্ষ যুবশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
নীতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ও সুশীল সমাজের সঙ্গে যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।




