ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন হয়রানি একটি উদ্বেগজনক সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশেও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ব্যবহারকারী ছয় কোটির বেশি, যা নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, নারীরা অনলাইনে অপমানজনক মন্তব্য, অবাঞ্ছিত বার্তা, ভুয়া পরিচয় তৈরি বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার মতো হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। তরুণ প্রজন্ম ও অভিভাবকদের মধ্যে বোঝাপড়া ও সহযোগিতা জোরদার করতে পিএসটিসি ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ঢাকার আফতাবনগরের পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি) ভবনে বিশ্বব্যাপী জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাবিরোধী ১৬ দিনের ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ২৭ নভেম্বর, ২০২৫ ‘যুব-প্রাপ্তবয়স্ক সংলাপ: সেতুবন্ধ ও যৌথ ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজন করা হয়। ওই সংলাপে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, যুব নেটওয়ার্কের সদস্য ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ এনডিসি। পিএসটিসির নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদের সঞ্চালনা ও সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্কের (নয়ন) ভাইস চেয়ারপারসন ফাইজা রহমান আনিলা

ডা. আশরাফী আহমদ, এনডিসি
মহাপরিচালক
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়াদের কথা বলতে চাইলে সবার আগে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা অপ্রত্যাশিত। রাতভর অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আবরার তো ভুল কিছু বলেনি! তবুও তাকে বাঁচতে দেয়া হয়নি।
অনলাইন হ্যারাসমেন্টের আরেকটি ঘটনা ঘটে জুলাই অভ্যুত্থানকালে। সবাই যখন প্রোফাইল লাল করে তখন ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। আমার ছেলে মেয়েরাও প্রোফাইল লাল করেছিল। যেকোনো সময় ওদের মধ্যে গ্রেফতার হওয়ার ভয় দেখতে পেয়েছিলাম। এটাও এক ধরনের সাইবার বুলিং বলা যেতে পারে আমার মতে।
আমাদের ছেলে মেয়ে উভয়ই ভুলের কারণে কোনো না কোনোভাবে ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে। বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব থাকায় সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার পর সন্তানরা আস্থা ও নির্ভরশীল কাউকে সমস্যার কথা বলার সুযোগ পায় না। এতে করে সন্তানরা বিপদগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। এ দূরত্ব গুছিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে পারলেই সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমরা অনেকে শুরুতেই বাচ্চাদের স্মার্টফোন দিই। উঠতি বয়সে বাচ্চাদের জন্য এ ফোনটি ক্ষতির কারণ হয়। এর মাধ্যমে তারা সহজেই ভুলে জড়িয়ে পড়ে। সুতরাং সন্তানকে প্রথমে সেলুলার ফোন দিতে হবে। সামগ্রিকভাবে সবাইকে সচেতন হতে হবে। একে অন্যের প্রতি আন্তরিক হতে হবে।

ড. নূর মোহাম্মদ
নির্বাহী পরিচালক
পিএসটিসি
আমাদের অনেকেই একই সামাজিক মাধ্যমের একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করি, যা শুধু নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ায় না, অনলাইন সহিংসতার সুযোগও তৈরি করে। দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ গড়ে তুলতে প্রতিটি অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করা অত্যন্ত প্রয়োজন; এতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকে এবং আইডি হ্যাকের আশঙ্কা কমে যায়। পাশাপাশি সন্তানরা অনলাইনে কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এসব বিষয়ে সচেতন নজর রাখা দরকার। তবে শুধু নজরদারি নয়, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ছোটবেলা থেকেই মূল্যবোধ, সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দেয়া বেশি কার্যকর।
রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিককে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব পালন করে, কিন্তু নিরাপত্তার সবটুকু দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। অনলাইন বা অফলাইনে কেউ হয়রানির অভিজ্ঞতা হলে বিষয়টি গোপন না করে যথাসময়ে আইনি সাহায্য নেওয়া জরুরি। সম্মান নষ্ট হবে এমন ভুল ধারণা পরিহার করে যেকোনো সমস্যায় পরিবারকে জানানোর পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। অভিভাবকদেরও সন্তানদের অভিজ্ঞতা বোঝা, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার মানসিকতা থাকা দরকার।
সমাজে সহিংসতার ধরন সময়ের সঙ্গে বদলেছে, কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব এখনো মানসিক সুস্থতাকে ব্যাহত করে। তাই নীরব দর্শক হয়ে থাকা নয়—নারীসহ যে কারো প্রতি সহিংসতা দেখলেই প্রতিবাদ করতে হবে। ছেলে মেয়ে নয়, সবার প্রতি ‘মানুষ’ হিসেবে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। প্রজন্মভেদে ব্যবধান নয়, ভিন্ন চিন্তাভাবনাকে সম্মান করে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় আত্মসম্মানবোধ গড়ে তোলা এবং অন্যায় দেখলে সাহস নিয়ে দাঁড়াতে শেখা।
নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়তে ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সমর্থন, সামাজিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো—এই সবকিছুর সমন্বয়ই আমাদের এগিয়ে নেবে।

মো. তসলিম উদ্দিন খান
পরিচালক
আইইএম ইউনিট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
ভায়োলেন্সের বিপক্ষে আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। নিজেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা দিন দিন প্রাযুক্তিক উন্নয়ন করছি। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু প্রযুক্তি বা ডিজিটাল মাধ্যমে কতটুকু ব্যক্তিগত তথ্য দেব সেটি জানতে হবে। আবেগের বশে এমন কিছু করা যাবে না, যা ভবিষ্যতে ক্ষতি ডেকে আনে। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় কতটুকু ব্যক্তিগত কথা বলব সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। মেয়েরা যখন দেখবে তোমার বন্ধু তোমার সঙ্গে খারাপ কথা বলার চেষ্টা করছে, তখনই সেটিকে স্টপ করাতে হবে। বলতে হবে যথেষ্ট, এর বেশি নয় কিংবা তুমি এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলবে না। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা শিখতে হবে।

ড. তৌহিদা তাসনিমা
চেয়ারপারসন, সামাজিক সম্পর্ক বিভাগ
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা আগে অফলাইনে ছিল। এখন এটি অফলাইন-অনলাইন উভয়ভাবে হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণের কথা যতই বলি না কেন, এখানে আমাদের আরো কাজ করার আছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার জানতে হবে। এর নিরাপত্তার বিষয়গুলো জানতে হবে। এ নিয়ে কথাও বলতে হবে। এখন অনেক নারী সামাজিক মাধ্যমে ছবি দিতে দ্বিধান্বিত বোধ করে। কারণ ছবি শেয়ার করলেও সেখানে নানারকম নেতিবাচক মন্তব্য আসে। যেগুলোও একধরনের হ্যারাসমেন্ট।

প্রিয়তা মণ্ডল
চেয়ারপারসন
ন্যাশনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক (নয়ন)
আমরা যারা ‘মেয়ে মানুষ’ তারা সব জায়গায় কথা বলার সুযোগ পাই না। অনেক কিছু দেখি এবং অনুভব করি কিন্তু সব জায়গায় বলার মতো পরিবেশ আমরা পাই না। সুযোগ পেলেও সমস্যার কথা তুলে ধরতে লজ্জা, ভয় ও সংকোচবোধ করি। বলতে না পারা মেয়েদের পক্ষ থেকে বলতে চাই—আমরা আজ ডিজিটাল সিকিউরিটি নিয়ে কথা বলছি। এখান থেকে শুরু হয়, যা শেষ হয় শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে।
ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের শিকার হওয়া সত্ত্বেও মুখ খুলতে পারি না। নিরাপত্তার বিষয়ে মেয়েদের বাড়তি সচেতন হতে হবে। নিজেদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু আমরা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করি, সেহেতু আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমার সব অনলাইন নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো টু স্টেপ ভেরিফায়েড কিনা, তা খেয়াল রাখতে হবে। যদিও ছেলে মেয়ে উভয়েরই অনলাইন জগতে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে; তবুও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে নারীরা একটু বেশিই নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন।
রাস্তায় অনেক সময়ই মোরাল পুলিশিংয়ের শিকার হতে হয়। সমাজে নারীদের প্রতি নেতিবাচক কথা বলার মানুষের অভাব নেই। অনেকবার এর শিকার হয়ে আমাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে হয়েছে। আমি চাই আমার মতো আর কোনো মেয়েকে যেন নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে না হয়। প্রত্যেকটা নারী যেন একটি নিরাপদ পরিবেশ পায়। শান্তিমতো চলতে-ফিরতে পারে। এজন্য সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সবাইকে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

ড. মারজিয়া জামান সুলতানা
সিনিয়র লেকচারার, সামাজিক সম্পর্ক বিভাগ
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
ছেলে কিংবা মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের প্রভাবটি বুঝতে হবে। এর মাধ্যমে শারীরিকভাবে হয়তো আঘাতপ্রাপ্ত হয় না কেউ। কিন্তু মানসিক প্রভাবটা পড়ে মারাত্মক। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্বিগ্নতা, হতাশাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটা পড়ালেখাকে ব্যাহত করে এবং ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমাদের সমাজের একটা প্রবণতা হলো ভিকটিম ব্লেমিং। ফলে ভুক্তভোগী আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়ে একজন ব্যক্তি প্রথমে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এতে তার মানসিক ক্ষতি হয়। পরবর্তী সময়ে তিিন আত্মহত্যাসহ বিভিন্নভাবে নিজের ক্ষতি করেন। এতে করে ব্যক্তিটি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের শিকার ভিকটিম শারীরিকভাবে আহত, আত্মহত্যা, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াসহ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। সামগ্রিকভাবে বলা যায় জিজিটাল হ্যারাসমেন্টের মানসিক ও শারীরিক উভয় প্রভাবই রয়েছে।

ফাইজা রহমান অানিলা
ভাইস চেয়ারপারসন
ন্যাশনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক (নয়ন)
দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছে, যেখানে ৭৮ শতাংশ নারী প্রযুক্তি উদ্ভাবিত সহিংসতার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক ও নাগরিকভাবে সক্রিয় নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানির ক্ষেত্রে, প্রতিবেদনে দেখা যায় যে অনলাইন নির্যাতন প্রায়ই অফলাইন শারীরিক বা যৌন সহিংসতার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ৮০ শতাংশ নারী সাইবার বুলিংয়ের শিকার; যাদের ৩৫ শতাংশ জানিয়েছেন অনলাইন হ্যারাসমেন্টের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে। এর ফলে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ নারী আত্মহত্যা করেছেন এবং প্রায় ২ শতাংশ নারী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এ সংখ্যা ক্ষুদ্র হলেও এর প্রভাব ব্যাপক। কেননা এ নারীগুলোর আত্মহত্যার ফলে তাদের পরিবারের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
এদিকে, অনলাইন হ্যারাসমেন্টের ফলে প্রায় ৪৯ শতাংশ ব্যক্তির ঘুমের সমস্যা হয়। আবার হ্যারাসমেন্টের ভয়ে প্রায় অর্ধেক নারী অনলাইন কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকার কথা জানিয়েছেন। এতে নারীর সামাজিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং সামগ্রিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
সাইবার বুলিং মোকাবেলায় পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ইলেকট্রনিক লেনদেন আইন, দণ্ডবিধি, গোপনীয়তা আইনের মতো বিদ্যমান আইন ব্যবহার করেছে। গার্হস্থ্য সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি সম্পর্কিত আইন অনলাইন ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছে। পুলিশ বা সাইবার ইউনিটে অভিযোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বৃদ্ধি করেছে। এসবের পাশাপাশি বাংলাদেশে নতুন একক সাইবার হয়রানি আইন প্রণয়ন এবং ইউনেস্কোর দ্বারা প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি সহায়তা উৎসাহিত করতে হবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস সেজুঁতি
শিক্ষার্থী
ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
অনলাইনের নারীদের পাশাপাশি ছেলেরা বুলিংয়ের শিকার হয়। কিন্তু সেটি নারীদের তুলনায় কম। ছেলেরা সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করলে কালো, ভুঁড়ি মোটা এমন নানারকম বডিশেমিংয়ের শিকার হতে হয়। আবার পোশাকের ভিত্তিতে নারীকে শাহবাগী ট্যাগ দেয়া হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছবি শেয়ার করলে আজেবাজে মন্তব্য করা হয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে।

ইসরাত জামান
উপপরিচালক (প্রোগ্রাম মনিটরিং) আইইএম ইউনিট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
ডিজিটাল হ্যারাসমেন্ট যারা করে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে মানসিকভাবে ভুক্তভোগীকে কষ্ট দেয়া। তাই কেউ কখনো হ্যারাসমেন্ট হলে ভেঙে পড়লে চলবে না। নিজের ক্ষতি না করে বিষয়টি ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা ও মোকাবেলা করতে হবে। এভাবে সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব।
বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে ছোটবেলা থেকে সুশিক্ষা দেয়া। পুরুষদের মনে রাখতে হবে রাস্তার নারীটি কারো না কারো মা কিংবা বোন; তারা আপনার পরিবারের নারী সদস্যের মতোই আরেকজন নারী। তাকে নিজ পরিবারের নারী সদস্য মনে করে সম্মান জানাতে হবে।
আরেকটি কষ্টের বিষয় হলো আমাদের সমাজে ধর্ষিতাকে প্রমাণ করতে হবে সে ধর্ষিত হয়েছে। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কিন্তু নারীদের সম্মান জানানোর যে সংস্কৃতি সেই ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি।

মো. আরাফাত হোসেইন
শিক্ষার্থী
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
আমরা ‘কনসেন্ট’ শব্দটি অনেকেই জানি কিন্তু এর ব্যবহার সম্পর্কে জানি না। উদাহরণস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু মহলে আড্ডার সময় বিভিন্ন জমায়েতে অনেকে হঠাৎ করেই ছবি তোলে। পরে অনুমতি ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে শেয়ার করে। ছবিতে যারা আছেন তাদের যে একটা প্রাইভেসি আছে সে বিষয়ে চিন্তাই করে না। একজন ব্যক্তির যে প্রাইভেসি আছে সে বিষয়ে খেয়ালই রাখা হয় না। ফলে এ ছবিটি পরবর্তীকালে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আবার আমার যে ছবিটি ছাড়া হলো সেটা কে কীভাবে ব্যবহার করবে তা জানি না। কেননা, অনেক সময় সেই ছবি সংগ্রহ করে এআইয়ের সাহায্যে বিকৃত ছবি তৈরি করে।
সাইবার বুলিংয়ের জন্য চালু করা হটলাইন ১০৯ নম্বরে ফোন করে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা সময়মতো পাওয়া যায় না। দ্রুত সেবা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক ভূমিকা প্রত্যাশা করি।
পরিবার থেকে সন্তানকে জেন্ডার রেসপেক্ট শেখাতে হবে। ছেলে মেয়ে উভয় উভয়কে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

আবু সাদাদ মোহাম্মদ সায়েম
প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (মিল অ্যান্ড এইচআর)
পিএসটিসি
১০০ জনের মধ্যে ৮০ জন ফেসবুকে অবমাননাকর মন্তব্য করে থাকে। এর মধ্যে ১২ জনই আপনাদের অনুমতি ছাড়া ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে দিচ্ছে। আমরা বাবা-মায়েরা বলছি, আমরা নতুন জেনারেশনের বাবা-মা। কিন্তু আমরা বাবা-মায়েরা ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়ে খুব একটা অবগত নই। ফলে সন্তানদের প্রতি আমরা যথেষ্ট বন্ধুসুলভ হওয়া সত্ত্বেও ছেলে মেয়েদের সাথে ভালোভাবে মিশতে পারছি না। আমদের সন্তানরা ফেসবুক ব্যবহার করছে, ফেসবুকে বাজে মন্তব্যও পাচ্ছে কিন্তু বাবা-মাকে বলতে পারছে না। আমি মনে করি তরুণদের সব কথাই বাবা অথবা মা অথবা উভয়ের সঙ্গে শেয়ার করার পরিবেশ থাকতে হবে। বেছে বেছে বাবা-মায়ের সাথে কথা শেয়ার না করে সবকিছুই শেয়ার করতে হবে। আমার মেয়ে ও বোন আপনার মেয়ে ও বোেনর — এ ধারণা থেকে বের হয়ে বিষয়টি সার্বজনীনভাবে ভাবতে হবে।

সাবিক রহমান
ভাইস চেয়ারপারসন, সাউথ এশিয়া রিজিওনাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক (সারিন)
আমি সরাসরি ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের শিকার না হলেও অনেককে দেখেছি এমন পরিস্থিতির শিকার হতে। সেই পরিস্থিতিতেই ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে আমরা যেন বিষয়টিকে এড়িয়ে না গিয়ে হ্যারাসমেন্টের প্রতিবাদ করি এবং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াই। এক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হই।

অনিতা শরীফ চৌধুরী
টিম লিডার
পিএসটিসি
সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শিশুদের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। বাচ্চারাও এখন স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। তারা বিভিন্ন গেমস ও ভিডিও দেখছে। এখানে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব তৈরি হচ্ছে, এটি ভীতিকর। এটিকে কীভাবে সিস্টেমেটিকভাবে ব্যবহার করা যায় সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। বাচ্চাদের জন্য ডিজিটাল মাধ্যমকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

ফাতেমা তুজ জোহরা
শিক্ষার্থী
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
স্বভাবগতভাবেই মেয়েরা লজ্জাশীল, সমস্যার কথা বলতে চায় না। ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের কথা বলার আগে অধিকাংশ সময় আমরা বুঝতেই পারি না যে এটা ডিজিটাল হ্যারাসমেন্ট কিনা। ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের ফলে সৃষ্ট মানসিক সমস্যা আমাদের জন্য একটি প্রধানতম সংকট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এতটাই সহজ যে কেউ এখানে অ্যাকসেস পায় এবং নৈতিকভাবে দুর্বলরা এর অপব্যবহার করে। এখানে মেয়েদের নানাভাবে হ্যারাস করা হয়। কিন্তু নারীর প্রতি এ ডিজিটাল হ্যারাসমেন্টের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখছি না।
অফলাইন কিংবা অনলাইন কোথাও নারীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। হিজাবি কিংবা নন-হিজাবি কোনো নারীই হ্যারাসমেন্ট থেকে রেহাই পাচ্ছে না। কিন্তু মেয়েরা এসব বলতেও পারে না। নিজের মধ্যে সমস্যা জিইয়ে রেখে মানসিক সমস্যায় পড়েন অনেকে।
আমাদের বয়সী মেয়েরা ছেলেবন্ধুর প্রতি একটু বেশিই দুর্বল থাকে। তারা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে বিভিন্ন প্লাটফর্মের পাসওয়ার্ড দেয়, যা তাদের জন্য একটা পর্যায়ে মরণফাঁদে পরিণত হয়। এসব রোধে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সচেতন ভূমিকা ও কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানাই।

মো. নূর মোহাম্মদ সিয়াম
মেম্বার (ইয়ুথ) চাইল্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপ গাজীপুর
মেয়েরা আগে বাইরে গেলে ইভ টিজিংয়ের শিকার হতো। এখন অনলাইনে ঢুকলেই তারা হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে। বান্ধবীরাও বন্ধুদের টার্গেট হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নানাভাবে তার ছবি বা ভিডিও নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা ঘটছে। এসব প্রতিরোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

সাব্বির হোসেইন রামীম
শিক্ষার্থী
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে খুব দ্রুতই ভিডিও বানানো যায়। ছোট ছোট সেসব ভিডিও খুব দ্রুতই ডিজিটাল মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে অনেক ফেক ভিডিও ছড়াচ্ছে। কারো একটি ফেক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর যে ক্ষতি হয়, পরে সেটিকে মিথ্যা প্রমাণ হলেও ক্ষতি কাটানো সম্ভব হয় না। এখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ থাকতে হবে। এখন অফলাইনেও নারীদের বিভিন্নভাবে (মব) হেনস্তা করা হচ্ছে। এখানে সরকারের আইন প্রয়োগের দুর্বলতা রয়েছে। এসব নিয়েও সবার প্রতিবাদ করতে হবে।

মোহাম্মদ আজিম উদ্দিন
প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর
পিএসটিসি
প্রথমত, নিজেকে জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের স্মার্টফোনকে জানতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক মাধ্যম এবং চতুর্থত, আমি কার সঙ্গে এসব মাধ্যমে যোগাযোগ করছি তা জানতে হবে। আমরা সামাজিক মাধ্যম থেকে একেবারে আড়ালে থাকতে পারব না। কিন্তু যার সঙ্গে এসব মাধ্যমে যোগাযোগ করছি তাকে ভালোভাবে জানতে হবে। কেননা ডিজিটাল মাধ্যমে যাকে কাছের ভাবছি তাদের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও ফাঁস হয়। সেজন্য খুব সচেতনভাবে অন্যদের সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে।

ডা. মো. মাহবুবুল আলম
হেড অব প্রোগ্রামস
পিএসটিসি
নারী নির্যাতন অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। আমরা এসব নিয়ে প্রায় সারা বছরই কাজ করে থাকি। ডিজিটাল সহিংসতার শিকার নিয়ে বেশি বেশি কথা বলতে হবে। ডিজিটাল বিভিন্ন মাধ্যমের সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী আমাদের তরুণরাই। সে কারণে এবারের ১৬ দিনের ক্যাম্পেইনে আমরা তরুণদের বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছি। আমরা তাদের কথা শুনব। পাশাপাশি দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদেরও কথা শুনব। সেজন্য এ ক্যাম্পেইন হবে তরুণ ও স্টেকহোল্ডারদের একটি কানেকশন। এখানে তরুণদের ভাবনা জানতে পারব। তাদের ভাবনা নিয়েই আমরা কাজ করতে চাই।




