ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বছরজুড়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দেশব্যাপী নজরদারি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি টিকা উন্নয়ন ও সহজলভ্য করা জরুরি। এছাড়া তথ্যপ্রমাণভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ, কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন বলে মতামত দিয়েছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা। তাদের মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম কিংবা হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, গবেষক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকৃত বিস্তার জানতে দেশব্যাপী নজরদারি, গবেষণা ও নিয়মিত জরিপ পরিচালনা এবং রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা

ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম এমপি,
সভাপতি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু সরকার বা সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের পক্ষে এককভাবে এ রোগ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান ২০২৬’-এর উদ্বোধন করেছেন। এ অভিযান ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। তবে আমার মতে, এ কার্যক্রম সারা বছরই চালানো উচিত। কারণ ডেঙ্গুর প্রকোপ নির্দিষ্ট সময়ে বেশি থাকলেও সারা বছরই এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। ডেঙ্গু মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। প্রধানমন্ত্রীও এক্ষেত্রে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের আর্থিক অবস্থা ও সামর্থ্য বিবেচনায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোর দেয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এ দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না; দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু যে বিপজ্জনক রোগ, সে সম্পর্কে মানুষের ধারণা রয়েছে। তবে রোগটি নিয়ে অনেকের মধ্যে ভীতিও কাজ করে। এক্ষেত্রে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। মশা কোথায় ডিম পাড়ে, কোন জায়গায় পানি জমে থাকে এবং কীভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা যায়—এসব বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে। ডেঙ্গু সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। তারা বুঝতে পারছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। সাংবাদিকদের এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে মানুষ আরো সচেতন হবে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে পারবে। সরকারের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য এরই মধ্যে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। এছাড়া ডেঙ্গুর টিকা আনা বা প্রয়োগের বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। তবে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে দেশের সব মানুষকে সচেতন করা এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ড. ফাহমিদা খাতুন
সম্মাননীয় ফেলো
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)
ডেঙ্গু মোকাবেলায় সচেতনতা ও কার্যকর নীতিমালা জরুরি, ডেঙ্গু মোকাবেলা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। গত দুই দশকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ, তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বেড়েছে। বর্ষার আগে ও পরেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী দিনে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। ডেঙ্গুর সঙ্গে আমাদের আরো দীর্ঘ সময় বসবাস করতে হতে পারে, যদি না আমরা এ রোগ মোকাবেলায় আরো সক্রিয় ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করি। এ জন্য যেমন সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজন, তেমনি জনসচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি একটি বিষয় লক্ষ করেছি, পরিচিত অনেক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও তাদের অনেকে জানেন না, কী কারণে বা কোথা থেকে তারা সংক্রমিত হয়েছেন। অপরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি ও জলাবদ্ধতা এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করে। এসব বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। আবার আক্রান্ত হওয়ার পর রোগ শনাক্ত করতেও অনেক সময় লেগে যায়। এসব কারণেই জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। আমরা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করি। তবে এর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানানোও আমাদের উদ্দেশ্য, যাতে তারা স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যাগুলো মোকাবেলায় আরো সক্রিয় ও কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করেন। ডেঙ্গু মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আজকের আলোচনা থেকে যেসব বক্তব্য ও সুপারিশ উঠে আসবে, সেগুলো তিনি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যাতে ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবেলায় আরো জোরালো, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হবে। ফলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারব, অন্তত ঝুঁকি কমিয়ে আনতে সক্ষম হব।

ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন
সাবেক প্রধান
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
আইইডিসিআর
জনগণকে শুধু অবহিত করলেই হবে না, নিজেদের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। মানুষ যখন নিজের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় কাজ করার মতো জ্ঞান, উপকরণ ও সামর্থ্য পাবে, তখনই যোগাযোগ কার্যক্রম সফল হবে। জনগণকে সক্ষম করে তোলাই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এজন্য গণমাধ্যমের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়েও কাজ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (ইউএস সিডিসি) এবং স্বাস্থ্য খাতে সহায়তাকারী অন্যান্য সংস্থা কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। আমি দীর্ঘদিন আইইডিসিআরে কাজ করেছি। এখনো কমিউনিটিভিত্তিক নজরদারির কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি। কারণ রোগের সূত্রপাত হয় কমিউনিটিতে। রোগী যখন হাসপাতালে আসেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তাই আরো প্রাথমিক পর্যায়ে, কমিউনিটিতেই রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকেও (এনজিও) যুক্ত করা হচ্ছে। তবে কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করার পর সেখানে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকলে শুধু নজরদারি দিয়ে লাভ হবে না। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বড় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বাড়িয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট মোকাবেলা করা যাবে না। ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে আইসিইউ, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও প্লাটিলেট পৃথককরণ কেন্দ্রসহ হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে এসব উদ্যোগেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বড় হাসপাতালে কতগুলো আইসিইউ বাড়ানো সম্ভব? আইসিইউ স্থাপন করলেই প্রয়োজনীয় দক্ষ চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল তৈরি হয়ে যায় না। উপজেলা থেকে রোগীদের ঢাকায় পাঠিয়ে সাময়িকভাবে মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করা গেলেও এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বাড়ে। তাই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, পরীক্ষার সুবিধা এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

ডা. মো. আতিকুল ইসলাম
অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড কমিউনিটি, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট
ঢাকা শিশু হাসপাতালে এখনো হাম মোকাবেলায় আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ডেঙ্গু ও হাম—দুটি রোগের চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে আমরা নাজেহাল অবস্থায় আছি। ডেঙ্গু কখন ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন। ডেঙ্গু রোগের গতিপ্রকৃতিকে আমরা সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করি। প্রথম তিন-চারদিন থাকে জ্বরের পর্যায়। এরপর আসে সংকটকাল বা ক্রিটিক্যাল ফেজ। তারপর শুরু হয় সুস্থতার পর্যায় বা রিকভারি ফেজ। সংকটকালীন পর্যায়েই রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হতে পারে, শক তৈরি হতে পারে। এ সময় রোগীর মধ্যে বিভিন্ন বিপৎসংকেত দেখা দেয়। কিন্তু রোগী কমপেনসেটেড শকে থাকলেও তাকে বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটা বেশি দেখা যায়। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডেঙ্গুতে জ্বর চলে যাওয়ার পরবর্তী কয়েক দিন যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। এই সময় রোগীর অবস্থা ভালো থাকলে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা বজায় রাখা গেলে পরবর্তী সময়ে জটিলতার ঝুঁকি কমতে পারে। এই সংকটকালীন পর্যায়ে প্লাজমা লিকেজ হতে পারে, রক্তপাত হতে পারে, হেমাটোক্রিট বেড়ে যেতে পারে এবং ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই এই সময়ের বিপৎসংকেতগুলো সম্পর্কে রোগী ও অভিভাবকদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকরা এখন ভয় পাচ্ছেন, রোগী মারা গেলে তাদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠবে। এ কারণে বিশেষ করে নবীন চিকিৎসকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তারা অনেক সময় রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে দ্বিধা করছেন। আগে যেভাবে আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে চিকিৎসা করতেন, সেই আগ্রহও কিছুটা কমে যাচ্ছে। গণমাধ্যমের কাছে আমার অনুরোধ, চিকিৎসার জটিলতা ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরুন। চিকিৎসায় কোনো রোগীর মৃত্যু হলেই সেটিকে ভুল চিকিৎসা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। এতে চিকিৎসকরা নিরুৎসাহিত হন এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার
কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে হলে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক ও লক্ষ্যনির্দিষ্ট উপায়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিন বছর ধরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মশা নিয়ে গবেষণা ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে আমাদের গবেষক দল। পূর্বাভাস মডেলের মাধ্যমে পাঁচ মাস আগেই এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার সম্ভাবনা নেই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রম চললেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ এডিস মশার প্রকৃত প্রজননস্থলগুলোতে যথাযথ নজর দেয়া হচ্ছে না। এডিস মশার উল্লেখযোগ্য অংশ বাসাবাড়ি, পানির ড্রাম, ট্যাংক, পার্কিংয়ের স্থান এবং বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। অথচ এসব স্থানে সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পৌঁছানো কঠিন। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণকেও দায়িত্ব নিতে হবে। বাসাবাড়ি ও আঙিনায় পানি জমতে না দেয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। শুধু কীটনাশক প্রয়োগ করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে তা শনাক্ত করে সেসব স্থানে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কার্যকর ফল পেতে গবেষণা, নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততার সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ড. জিএম সাইফুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
আমাদের মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যেই মূল ত্রুটি লুকিয়ে আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। এ ধরনের ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ থাকবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন একজন মেডিকেল অ্যানটোমোলজিস্ট। তার সঙ্গে থাকবেন এপিডেমিওলজিস্ট এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ। ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্তকরণসহ মশা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন বিষয়ে তারা কাজ করবেন। কেন্দ্রীয় কমিটির পরিধি পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা থাকবে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এক ধরনের কার্যক্রম চললেও ঢাকা উত্তর বা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় একইভাবে কাজ হচ্ছে না। অথচ মশা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সীমানা মেনে চলে না। আমি ঢাকায় একটি বাড়িতে কীটনাশক প্রয়োগ করলাম, কিন্তু পাশের বাড়িতে করলাম না—তাহলে মশা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে চলে যেতে পারে। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মশার মধ্যে কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির ঝুঁকিও বাড়ে। কেন্দ্রীয় বিভাগ থেকে যদি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয় এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কীটনাশক সরবরাহ করা যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। এতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরো কার্যকর হবে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমাদের মেডিকেল অ্যানটোমোলজিস্টের অভাব রয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণের কাজটি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরিচালনা করা প্রয়োজন।

ডা. মাজহারুল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক (মেডিসিন)
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বর্তমানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ চলাকালে কারো জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা কিংবা রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে ডেঙ্গুর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য শরীরে র্যাশ থাকতেই হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। তবে ডেঙ্গু হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাও সম্ভব নয়। তাই কোন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং কাদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেয়া যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। ডেঙ্গু রোগী ও তাদের স্বজনদের রোগটির বিপৎসংকেত সম্পর্কে জানতে হবে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে আরো বেশি প্রচার প্রয়োজন। আমার চোখে এ নিয়ে নিয়মিত প্রচার খুব একটা পড়ে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন সহরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। তাই তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়কে ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ বা সংকটকাল বলা হয়। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং আগে থেকে বিভিন্ন ধরনের সহরোগ থাকা। তাই রোগীকে সময়মতো শনাক্ত করা, বিপৎসংকেত সম্পর্কে সচেতন করা এবং সংকটকালীন পর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনায় এসব বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ রোগটির লক্ষণ, বিপৎসংকেত, পরীক্ষা করানোর উপযুক্ত সময় এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে পারেন।

ড. মো. শফিউল আলম
সিনিয়র সায়েন্টিস্ট
আইসিডিডিআর,বি
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে মশা, বিশেষ করে রোগবাহক মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণে দেশব্যাপী সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা নেই। ডেঙ্গু মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এসব পরিকল্পনার আওতায় রোগ নজরদারি, মশা নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও টিকাদানের বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে ডেঙ্গুর টিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বে ডেঙ্গুর দুটি টিকা রয়েছে, যেগুলো নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে। বাংলাদেশেও ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। এনজেডি (এনজেডি) টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে। এছাড়া দেশের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ডেঙ্গুর টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পেয়েছে এবং প্রাণীর ওপর পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগও প্রয়োজন। দেশের মানুষের জন্য ডেঙ্গুর টিকা সহজলভ্য করতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। টিকা উৎপাদন, প্রাপ্যতা ও ব্যবহারের উপযুক্ত ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি নিয়েও কাজ করতে হবে। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান কার্যক্রমের সঙ্গে গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো জরুরি। রোগ নজরদারি থেকে শুরু করে মশা নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও চিকিৎসা—সব কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আহমদ দাউদ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
ল্যাবএইড হাসপাতাল
ডেঙ্গু মোকাবেলা শুধু সরকার, সিটি করপোরেশন কিংবা চিকিৎসকদের একার দায়িত্ব নয়; এটি সবার দায়িত্ব। রোগটির প্রকোপ কমাতে সারা বছর সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় প্রাথমিকভাবে তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন এবং শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীদের মশারির আওতায় রাখা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, রোগীদের কাউন্সেলিং এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কলকাতা, সিঙ্গাপুর, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, করপোরেট অফিসসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। যেসব স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গুকে শুধু মৌসুমি রোগ হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। সারা বছর প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করতে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়া যথাযথ করতে হবে। প্রতিটি রোগীকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গু মোকাবেলা আরো কার্যকর হবে।

ডা. এসএম ওয়াসিমুল ইসলাম
সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অঞ্চল-৫, ডিএনসিসি
ডিএনসিসি বছরের শুরুতেই মশা নিয়ন্ত্রণে একটি মাইক্রোপ্ল্যান তৈরি করে। এ পরিকল্পনায় বছরকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়—প্রাক্বর্ষা, বর্ষা, বর্ধিত বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুম। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় বর্ষার স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। ফলে বর্ষা শেষ হওয়ার পরও পোস্ট-মনসুন বা বর্ধিত বর্ষার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ধরনের পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। মশা দমনে কীটনাশক প্রয়োগের চেয়ে শুরুতেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালভিত্তিক নজরদারিতেও আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। হাসপাতালগুলোতে মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য মশার ফাঁদ বা ট্র্যাপ স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দৃষ্টিকোণ থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করি। তবে এ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হলে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার আরো কার্যকর করতে হবে। কোন এলাকায়, কাদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিলে মানুষ বেশি সচেতন হবে, তা বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। যেমন মাদরাসায় সচেতনতামূলক প্রচারের জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে হবে, যার কথা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। অর্থাৎ শুধু প্রচার চালালেই হবে না, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। অনেকেই জানেন না, কখন কোন পরীক্ষা করাতে হয় কিংবা অসুস্থতার কোন পর্যায়ে কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন।





