সাংগাত বাংলাদেশ ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে গত ৬ নভেম্বর ‘সম্পত্তিতে নারীর অবস্থান (উত্তরাধিকার ও নারী)’ শীর্ষক একটি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে এ ক্রোড়পত্র
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক, বণিক বার্তা
বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। এ ৫০ বছরে বাংলাদেশের পরিবর্তনে নারীরা বড় ধরনের শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। পরবর্তী ধাপের উন্নয়নে নারীদের ক্ষমতায়িত করা প্রয়োজন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেকোনো উদ্যোগ নিতে গেলেই প্রাথমিক পুঁজির জোগান আসে সম্পত্তি থেকে। এখানে সম্পত্তি উন্নয়নের একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশের বেশির ভাগ নারীর অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স খুবই সীমিত। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে বেশির ভাগ নারী কোনো মর্টগেজ রাখতে পারেন না। আর ব্যাংকগুলো কোনো রকম মর্টগেজ ছাড়া ঋণ দিতে উৎসাহী নয়। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাদের উদ্যোগ বড় করতে পারেন না। আমরা এবারো দেখেছি কভিডের পরে ব্যাংকগুলো নারীদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহী নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করেও প্রণোদনার অর্থ বিতরণে সাফল্য আনতে পারেনি। ফলে সরকারের দিক থেকে নারীদের জন্য যেসব সমর্থনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। আমাদের সংবিধানে সবাইকে সমান অধিকার দেয়ার কথা আছে। নারীকে নির্যাতন থেকে রক্ষা এবং নারীর মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে অনেক আইন হয়েছে। সেসব ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য রয়েছে, যা সমঅধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের ভেতরে আন্দোলন ও লড়াই চলছে। আশা করি এ আলোচনা সেখানে কিছু অবদান রাখবে।
খুশী কবির
উপদেষ্টা, সাংগাত
সমন্বয়ক, নিজেরা করি
উত্তরাধিকারে নারীর অবস্থানটা কী? সংবিধানেরও ৪৯ বছর পার হলো। সংবিধানে সব নাগরিককে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে কিন্তু আমাদের পারিবারিক আইনটা ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে কিছু জায়গা আমাদের মূল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, আমরা চাইছি কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? আমরা জানতে চাইছি, আইনে যেটা আছে, সেটা আমরা পাই কিনা। বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকে ভালো করেছে, সেখানে নারীদের অবদান অনেক বেশি। কিন্তু সামাজিকভাবে নারীর অবস্থান খুবই দুর্বল। নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের ঘটনা খুব বেশি ঘটছে। আমরা চিন্তাচেতনার অনগ্রসরতার জন্য নারীকে সমান মর্যাদার মানুষ হিসেবে দেখতে এখনো শিখিনি। শুধু সূচকে ভালো করার চেষ্টা না, নারী-পুরুষ যে সমান, সেটা দৃষ্টিভঙ্গিতেও স্পষ্ট হতে হবে। আবার সম্পত্তি থাকলেও নারীকে সমানভাবে দেখা হয় কিনা, সেটা নিয়ে আমরা তৃতীয় পর্বে আলোচনা করব।
ভূমিতে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে উত্তরাধিকার। যে দেশের জনগণের বড় অংশ একটি ধর্ম চর্চা করে সেখানে তাদের ধর্মের প্রাধান্য থাকে। আমাদের সিভিল আইন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফৌজদারি আইন প্রভৃতি ধর্ম দ্বারা পরিচালিত নয়। কিন্তু পারিবারিক আইন ধর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আমাদের অভিন্ন পারিবারিক আইন থাকা দরকার। এ আন্দোলনটি আমরা আশির দশকে প্রথম শুরু করেছিলাম। আমরা অনেক ছাড় দিই কিন্তু কণ্ঠস্বরটা ঐক্যের জায়গা থেকে সরে গেছে। এ বিষয়ে আমরা নারীরা যেমন সোচ্চার, তেমন যেন পুরুষরাও হয়। বিষয়টিকে গবেষণার মূলধারায় আনতে হবে। সবকিছুর সঙ্গে মিলিয়ে এ সম্পর্কিত গবেষণা করতে পারলে তার মধ্যে নানা যুক্তি চলে আসবে। অনেকে জমি পায় কিন্তু বলা হয় তারা জমি পাবে যদি সে বলে যে সে অন্য কোনো ধর্মের কাউকে বিয়ে করবে না। এটা বলা হয়, কারণ সে তার সম্পদটা কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। যখন আমাদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হবে, তখন নাগরিক হিসেবে সেই ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দিলেই জমি বিক্রির সময় কাউকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকতে হবে না, পারিবারিক আইনের ব্যাপারে কথা বলা যাবে না—সেই ধারা ভাঙতে হবে। শুধু আইনগত নয়, সার্বিক জীবন, অর্থনীতি ও মানবাধিকারের সঙ্গে মিলিয়ে আইন করতে হবে। আমাদের সবাইকে সর্বপরিসরে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীদের মধ্যে শক্তি আনতে হবে, পুরুষদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ড. ফস্টিনা পেরেরা
অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
সিনিয়র ফেলো, সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস
আমরা যে বিষয় নিয়ে কথা বলছি, সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে শত বছর ধরে। ব্রিটিশ আমলেও এ আলোচনা জারি ছিল। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, আগে হয়তো ইকোনমিক আর্গুমেন্টের দিক থেকে এতটা সোচ্চার ছিল না। মূলত বঞ্চনা ও বৈষম্যের জায়গা থেকে এ আন্দোলন বিভিন্ন পর্যায়ে আসতে আসতে আমরা আজ এ পর্যায়ে এসেছি। আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে সাম্যের সঙ্গে সমতার কথা বলা হয়েছে। সেটা বিশেষ করে সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে পাই। এত স্পষ্ট করে বলার পরও সংবিধান-পূর্ববর্তী যে ইতিহাস, সেটার রেশ এখনো রয়ে গেছে। ব্রিটিশরা যখন তথাকথিত রিলিজিয়াস পার্সোনাল আইন তৈরি করেছেন তখন ধর্মের কথা মাথায় রেখে তারা এ আইন করেননি। অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, গভর্মেন্ট ও ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি মাথায় রেখে তারা আইন ব্যবস্থার পুরোটাই সেকুলার আইনের অধীনে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু একটা অংশ, বলা যায় সেটা মাত্র ৫ শতাংশ তারা আলাদা রেখেছেন। বলেছেন যে এটা ধর্মভিত্তিক হবে। কিন্তু সেই ৫ শতাংশের মধ্যেই আমার পরিচয় কী হবে, পারিবারিক অধিকার কী হবে, আমি কাকে বিয়ে করতে পারব, কাকে পারব না, সম্পত্তিতে আমার অধিকার কী হবে—সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ধর্মের আইনের আবহে আলাদা করে রাখা হয়েছে।
১৯৮৫ সালের ফ্যামিলি কোর্ট কিন্তু পারিবারিক অনেক বিষয়ে সুরাহা দেয়। ওই আদালত বিয়ে, বিয়ে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, খোরপোশ, ভরণপোষণ, মোহরানা, সন্তানের অভিভাবকত্বসহ সব বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়। শুধু একটি বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি, সেটা হলো উত্তরাধিকার। উত্তরাধিকারের বিষয়গুলো সুরাহা করা যায় কিন্তু তা করা হয় না সেই সংবিধান-পূর্ববর্তী ইতিহাসের কারণেই।
ধর্মভিত্তিক যে অধিকার দেয়া হয়েছে, সেটারও প্রতিফলন দেখছি না। সেটা অর্থনৈতিক তো বটেই, ক্ষমতারও বিষয়। সেসবেরই প্রতিফলন দেখতে পাই প্রতিবন্ধকতার জায়গায়। কোরআন অনুসারে সম্পত্তি ভাগাভাগি পুরোপুরি পরিষ্কার। হিন্দু নারীরা দুভাবে সম্পত্তি পান। একটা হচ্ছে স্ত্রীধন, আরেকটা হচ্ছে ১৯৩৭ সালের ‘হিন্দু উইমেন প্রপার্টি রাইট কন্ডিশন’-এর ওপরে। কিন্তু দুটিরই একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটা তিনি তার জীবদ্দশায় ভোগ করতে পারবেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তিনি সেটা কাউকে দান করতে পারবেন না। ফলে উত্তরাধিকারের যে মূল বিষয়, সেটা তিনি ভোগ করতে পারেন না। বৌদ্ধরাও হিন্দু আইন অনুসারে সম্পত্তির ভাগ করেন। খ্রিস্টানরা ১৯২৫ সালের ‘সাকসেশন অ্যাক্ট’ অনুসরণ করেন। খ্রিস্টানদের জন্য তাদের সম্পত্তির বণ্টন বা উত্তরাধিকারের আইনটি সমান। এখানে শুধু যে পুরুষ-নারীতে বৈষম্য নেই তা নয়, পূর্ণ রক্ত ও অর্ধরক্তের মধ্যেও কোনো বৈষম্য নেই। সব খ্রিস্টানের জন্য একই রকম উত্তরাধিকার আইন করা হয়েছে; কিন্তু অর্থনৈতিক পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার বিষয়ের কাছে গিয়ে সেটা বদলে যায়। এত সুন্দর আইন থাকলেও প্রয়োগের জায়গায় আমরা বাধা দেখতে পাচ্ছি। খ্রিস্টান নারীকেও বলা হচ্ছে, ‘জানেনই তো মুসলিমপ্রধান দেশ। অপেক্ষা করেন। আপনি কেন সম্পত্তি নেবেন? ভাইকে দিয়ে দিন। আপনি তো বিয়ে করে চলেই যাবেন, বেড়াতে যাবেন, আপনাকে তো দেখে রাখবেই।’ আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে নজর দিলে মনে হয় না এ আন্দোলনের সঙ্গে খুব একটা জাস্টিস করা হবে। পূর্ণাঙ্গ ও সার্বিক একটা অ্যাপ্রোচ আমাদের নিতে হবে। কয়েক মাস আগে যতীন্দ্রনাথ মণ্ডল বনাম গৌরী দাসের মামলা পেয়েছি। সেখানে মাননীয় হাইকোর্ট বলেছেন, হিন্দু নারীরা তাদের স্বামীর কৃষি ও অকৃষি জমি পাবেন। তবে সেটি এখন সেটলড ল নয়। এখনো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। এখন যদি যতীন্দ্রনাথ মণ্ডল আপিল না করেন, তাহলে এটা আইন হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রের গত্বাঁধা কথা এটা মাইনরিটির বিষয়, আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমরা রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে বলছি না কিন্তু রাষ্ট্রের তো একটা সংবিধান আছে, মানবাধিকারের সনদে স্বাক্ষর করেছে, একটা বিবেক আছে, সব নাগরিকের প্রতি দায়িত্ব আছে। সেটার প্রয়োগ করতে বলছি। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য এসব আটকে যাচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্রের কোনো প্রোঅ্যাকটিভ আচরণ দেখছি না। ধর্মের নামে অসাম্য ও বঞ্চনার সম্পর্কগুলো জিইয়ে রাখা হচ্ছে।
ভারত ও নেপালে উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে নারীর প্রবেশগম্যতা ও অধিকার ভোগ অনেক এগিয়েছে। অনেকে বলতে পারেন, হিন্দু রাষ্ট্র তো তাই সেটা হয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান তো তাহলে মুসলিমপ্রধান দেশ। বাধাটা তাহলে ধর্ম নয়, বরং অন্য জায়গায় ছিল। কমিউনিটিকে অবশ্যই একটি আলোচনায় অংশ নিতে হবে। নীরব দর্শকের ভূমিকায় রাষ্ট্র থাকতে পারে না। সেখানে রাষ্ট্রের একটা প্রোঅ্যাকটিভ ও অগ্রগামী ভূমিকা দেখতে চাই। ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালায় সম্পদ ও উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অভিগম্যতা বা প্রবেশগম্যতা দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী নিজেও তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। ২০১৯ সালের আইনগত সহায়তা দিবসেও তিনি বলেছেন, ধর্মীয় অনুশাসন বা আইন পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে না। যেটার ভিত্তিতে রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে সেটার প্রতিনিয়ত বরখেলাপ হচ্ছে। সেই দায় কেন রাষ্ট্র নেবে? কেন সেখানে রাষ্ট্র প্রোঅ্যাকটিভ ভূমিকা নেবে না।
আইন এ প্রতিবন্ধকতার একটা অংশ মাত্র। আইন তো স্পষ্ট। খ্রিস্টানদের জন্য প্রণীত আইন কিন্তু যুগান্তকারী সমতার একটা পদক্ষেপ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন ওই পুরুষতন্ত্র ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে। আমাদের একটা বৃহত্তর ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাপ্রোচ নিতে হবে। আমাদের কাজগুলো আরো চালিয়ে যেতে হবে। সেই সঙ্গে ডিমান্ড তৈরি করতে হবে। সম্পত্তিতে সমান অধিকার চাইছি, সেটা পাওয়ার জন্য আমাদের ডিমান্ড কী হবে সে বিষয়ে অ্যাডভোকেসি থাকতে হবে। তিন ভাগের এক ভাগ হলেও তো উইলের মাধ্যমে সম্পদ দিতে পারছি, ট্রাস্ট করে বা উপহার হিসেবে দিতে পারছি। নারী অধিকার যেহেতু সাম্যের কথা বলছে। ট্রান্সজেন্ডারসহ সবার কথা মাথায় রেখেই আইন সংস্কার করতে হবে। আইন কমিশন ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তাকে সহযোগিতা করাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সোস্যাল জাস্টিস পার্লামেন্টারি ককাসকে এখানে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। আমরা উন্নয়নের মহাসোপানে হাঁটছি, কিন্তু মানুষের মনে যদি বৈষম্য ও বঞ্চনা থাকে তাহলে আগামী ৫০ বছরেও আমরা ততটা এগোতে পারব না, যতটা এগোতে চাই।
সোনিয়া খাতুন
রংপুরের ভুক্তভোগী
আমরা তিন ভাই ও তিন বোন। মা আছে, বাবা মৃত। বাবার কেনা কিছু সম্পত্তি আছে। বিয়ের পর পরই বড় ভাই আলাদা হয়ে যায়। যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মেজ ভাইয়ের কাছে থাকে মা। সে চাকরি করে। সেই টাকা দিয়ে সংসার চলে না। আমি চাকরি করি, আমরা বোনেরা মাকে দেখাশোনা করি। মাকে একা না রাখার জন্য আমরা তিন বোন সম্পদ বুঝে নিতে চাই। মেজ ভাই বলে, ‘বিয়ে করে তো তোরা চলেই যাবি’। পাঁচ বছর সাংসারিক অশান্তি শেষে আমরা তিন বোন মামলা করার সিদ্ধান্ত নিই। পরে ওরা আলোচনায় বসে। আমরা তিন বোন একসঙ্গে জমি নিতে চাই যেন আমরা একটা বাড়ি করে ভাড়া দিতে পারি। তাতে মায়ের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হয়। তাছাড়া আমরা বিয়ে না করলেও ওখানে থাকতে পারি বা আমাদের মা যেন কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে পড়েন পরবর্তী সময়ে। পাঁচ বছর আগে আমরা দাবি তুলেছিলাম বলে আমাদের অধিকার বুঝে পেয়েছি। দাবি তুললেই সেটা একসময় না একসময় আদায় হয়। এখন চাকরি থেকে ছুটিতে গেলেও ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু বাবার এ সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি বলে আমার দুই বোনসহ আমি ও মা নিশ্চিন্ত আছি।
সবিতা তালুকদার
বরিশালের ভুক্তভোগী
আমি সনাতন ধর্মাবলম্বী। সামাজিক বিধি মেনেই আমার বিয়ে হয়। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নারীর সম্পত্তি থাকা কতটা প্রয়োজন, সেটা বুঝতে পারি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাবার পরিবারে প্রশ্ন তুলি। ভাইকে বলি, আমরা তো সম্পত্তি পাইনি। আপনার মেয়ে আছে। আপনি দিয়ে গেলে মেয়ে একটা সম্পদের মালিক হবে। আমার দাদা কিন্তু এ বিষয়ে কোনো আলাপ করেন না। এসব কথা যখন আমার ভাইপো শোনে, সে বলে, ‘মেয়েদের সম্পত্তির দরকার কী! বোনকে বিয়ের সময় তো দিবই। তোমরা যেমন বেড়াতে আসো সেভাবেই সে বেড়াতে আসবে।’ সে বয়সে ছোট হলেও এখনই তার মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তৈরি হয়েছে। আমার জীবন থেকে বুঝেছি যে নারীর সম্পত্তির প্রয়োজন। আমি যেখানে বাস করি, সেখানে আরো সনাতন ধর্মাবলম্বী বাস করেন। তাদের কারো ভাই বা বাবার কাছ থেকে শুনিনি যে বলেছেন, ‘তোরা তো আমাদের বোন বা মেয়ে, তোদেরও একটু সম্পত্তি দিই।’ এভাবেই কিন্তু চলে আসছে। মেয়েরা করুণার পাত্র হয়ে যাচ্ছে। সম্পত্তি থাকলে আজ আমার একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যেত। প্রশ্ন তোলার কারণে ভাইপোর সঙ্গে আমার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পরিবারের অন্যরাও বিষয়টা ভালোভাবে নিচ্ছে না।
রোকশানা আক্তার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভুক্তভোগী
আমরা তিন ভাই ও দুই বোন। বাবা-মা মারা গেছেন। ভাইয়েরা সবাই থাকে সৌদি আরব। ভাই-বোনদের দায়িত্ব আমি পালন করেছি। মায়ের ঘরটা বসতবাড়ির মতো ব্যবহার করতাম আমরা। ৯ অক্টোবর আমার বোন আমার কাছে বেড়াতে এসেছিল, ফিরে গিয়ে আর বাড়িতে ঢুকতে পারেনি। ভাইয়ের কথায় বেড়া দিয়ে আমার বোনকে আর ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরে মামলা করি।
নিরূপা দেওয়ান
সাবেক সদস্য
মানবাধিকার কমিশন
আমি উত্তরাধিকারে আমাদের আদিবাসী নারীদের অধিকার নিয়ে বলব। প্রকৃতপক্ষে আমাদের নিজস্ব প্রথাগত যে আইনকানুন আছে, সেখানে নারীর সম্পত্তির কথা লেখা নেই। তবে লিখিত না থাকার একটা সুবিধা আছে বলে মনে করি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অধিকার নেই। উত্তরাধিকারের জন্য আবেদন করি, তখন অবিবাহিত বোন থাকলে ভাইয়েরা তাকে কিছুটা সম্পত্তিও দিতে চেষ্টা করেন। তবে অনেকেই নারীর অধিকার নেই বলে বঞ্চিত করতে চান। যদিও পুরুষে পুরুষে সেটা ভিন্ন হয়। আমার বাবা দুই ভাই-বোনের মধ্যে তার সম্পদ ভাগ করে দেন। আবার দেখা গেছে, একজন বোন অবিবাহিত থাকা অবস্থায়ও চার ভাই মিলে জায়গাজমি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা বলি, তার ভরণপোষণ দিতে হবে। সম্পত্তির অধিকার তার থাকতে হবেই। ভাইয়েরা পরে বাধ্য হয় বোনকে সম্পদের ভাগ দিয়েছে। এভাবেই আমরা চেষ্টা করছি। আমাদের যেসব প্রধান রীতিনীতি আছে, সেখানে তিন সার্কেলের চিফরা এসব পরিচালনা করেন। সার্কেলের প্রধানকে বলা হয় সার্কেল চিফ আর তার অধীনে কাজ করেন হেডম্যান ও কারবারিরা। কয়েকটা গ্রাম মিলে হেডম্যান আর কারবারিরা একটি গ্রামের প্রধান। আমাদের সামাজিক বিচার-আচার তাদের কাছেই হয়। সম্পত্তির ব্যাপারেও সেটা হয়। লিখিত থাকলেও অনেক সময় দেখি ভাইয়েরা বোনদের সম্পত্তি দিতে চায় না। এখানে লিখিত নেই বলে বেশি অসুবিধায় পড়তে হয়। এসব নিয়ে অনেক দিন ধরে রাজাদের সঙ্গে আমরা বসছি। কারবারি নেটওয়ার্ক, নারী কারবারি নেটওয়ার্কও আছে। এখন তারা শক্ত হয়েছে। চাকমা সার্কেল চিফ যিনি আছেন, তিনি অত্যন্ত নারীবান্ধব। আমরা এখন বিয়েতে রেজিস্ট্রেশন ও সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে কাজ করতে চাইছি। তবে সেই বিষয়ে কোনো মামলা এলে চাকমা সার্কেলে আলোচনা করা হবে। রাজা বাবুর সঙ্গে মিটিংয়ে বলা হয়েছে, কারবারিদের আরো সচেতন করতে হবে। সাংবিধানিক আইনের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আরো বেশি সংবেদনশীল হওয়ার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভাই-বোনদের মধ্যে সম্পত্তি বিষয়ে বিভেদ সৃষ্টি হলে ভাইয়েরা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে বিধবা মাকে যেমন সম্পত্তি দেয়া হচ্ছে তেমন বোনকেও দেবে, তবে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কত অংশ তারা দেবে। লিখিত নেই বলে নারীকে সম্পত্তি দেয়ার ব্যাপারে অনেকে বাধা দিত, এখন সেটা বদলাচ্ছে। নারী হেডম্যান নিয়োগের ব্যাপারেও পুরুষরা আগে বাধা দিত। এখন চাকমা সার্কেলে তিন শতাধিক নারী কারবারি হয়ে গেছেন। জায়গা ভাগাভাগির সময়ে আমরা দেখেছি ভাইয়ের বউ বাধা দিচ্ছে। পরে রাজার কাছে আপত্তি জানালে, রাজা দেখলেন তারই একজন হেডম্যানের বড় ভাই অর্থ দিচ্ছে না। রাজাকে বলার পরে তিনি ব্যবস্থা করে দিলেন। নারীই নারীর জন্য প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় বলেছিলাম, জায়গা ভাগাভাগির সময়ে ভাইয়ের বউ বা বোনের স্বামী থাকবে না। কারণ তারা বাইরে থেকে এসেছে। তার আগেও তো ভাই-বোনের সম্পর্ক ছিল। তাই তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেবে। যেহেতু আমাদের সব নিয়ম লিখিত আকারে নেই, শুধু মারমাদের লিখিত আছে, তাই নানান পথ বের করতে হবে।
বোন যদি অবিবাহিত হয় তাহলে তাকে সম্পদ দেয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়, লিখিত দিতে হবে যে তুমি অন্য কোনো ধর্মের কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। কারণ তাহলে আমার সম্পদ অন্য কারো কাছে চলে যাবে। এসব মন-মানসিকতা আমাদের বদলাতে হবে। আমাদের আরো সোচ্চার হতে হবে।
প্রমীলা বিশ্বাস
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
হিন্দু আইনে সম্পত্তিতে নারীর যে অবস্থান, সেটা কীভাবে মোকাবেলা করতে হয়, সে বিষয়ে আমি বলব। হিন্দু আইনে নারী দুই ধরনের পথে সম্পত্তি পান—স্ত্রীধন ও দায়ভাগ। নারী পিতার কাছ থেকে বা স্বামীর কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পান। সেই সম্পত্তি শুধু জীবদ্দশায় ভোগ করতে পারেন। তার নামে যেসব সম্পত্তি ক্রয় করেন, উপহার পান বা দান পান সেগুলোই তার স্ত্রীধন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ নারী ট্রান্সফার বা বিলি বণ্টন করতে পারেন না। লিগাল নেসেসিটির কারণে অল্প কিছু সম্পত্তি ট্রান্সফার করতে পারেন, সম্পূর্ণ নয়। তিনি ভোগ করতে পারবেন কিন্তু তার ভাবী ওয়ারিশ সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। অনেক বাবা আমাদের কাছে আসেন যে আমার একটিই মেয়ে, তাকে পুরো সম্পদ কীভাবে দেব। মেয়ের যদি ভবিষ্যতে কোনো পুত্রসন্তান না হয় তাহলে বাবার ভাইয়ের ছেলেরা থাকলে তারা সে সম্পত্তি পেয়ে যান। উত্তরাধিকার সূত্রে মেয়েকে দিতে পারেন না। মেয়েকে মৃত ধরে ক্রমান্বয়ে ওয়ারিশরা সম্পত্তি পাবেন। অনেক ভাই পরে এই বোনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে আসেন যে আমার যে সম্পদ ও সম্পত্তি পাওয়ার কথা, সেটা আমি না পেয়ে আমার চাচা আমার বোনকে দিয়ে দিয়েছেন। এমন অনেক মামলা আমাদের কাছে আসে। লিগাল নেসেসিটির মাধ্যমে কেউ যে সম্পদ বিক্রি করবেন তাও পারবেন না। এমনকি পুরো সম্পদও বিক্রি করতে পারবেন না। আচার-অনুষ্ঠানের জন্য বিক্রি করতে পারবেন বা নাবালক সন্তান থাকলে তাদের পড়াশোনার জন্য সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন। ফলে সেটা মেয়েটির নিজস্ব প্রয়োজনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে না। ব্যবহার হচ্ছে অন্যের প্রয়োজনের জন্য। বৃদ্ধ বয়সে নারীরা এসবের সম্মুখীন বেশি হন। স্বামী মারা যাওয়ার পর মা সন্তানের কাছে থাকেন। কিন্তু তারও যে সম্পদ ভোগদখলের অধিকার আছে, সেটা তিনি জানেন না। অবিবাহিত মেয়ে, যে ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন বা মা-বাবার সঙ্গে থাকেন, তার ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার আছে। সেটা মেয়েরা জানেন না। মেয়েদের আগে সম্পদ পেতে হবে। তার পরে চাইলে সে ছেড়ে দেবেন। তার যে অধিকার আছে, সেটাই অনেকে জানেন না। হিন্দু আইনে নারীর কোনো অধিকারই নেই। উত্তরাধিকার হিসেবে তাকে যেটা দেয়া হচ্ছে, সেটা আসলে দেয়া হচ্ছেই না। ভরণপোষণের জন্য, জীবন চালানোর জন্য যতটা দরকার, সেটা দেয়া হচ্ছে কেবল। আমরা যদি দায়ভাগ আইনটাই অনুসরণ করি তাহলে আমাদের দেশে বাধা কী, তা আমি জানি না। মেয়েরা যদি নিজেদের জায়গা থেকে সোচ্চার না হয় তাহলে বাইরে থেকে কেউ এসে এটি ঠিক করবে না। একটা বাবা ছেলের থেকে মেয়েকে কম করে মানুষ করেন না। সেই বাবাই যখন মেয়ে ঠিকঠাক সম্পদ পাবে কিনা, সেই বিষয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন, তখন তাদের এগিয়ে আসতে হবে। বাবা-মা ছেলেকে যেভাবে জন্ম দেন, একইভাবে মেয়েকেও জন্ম দেন। তাহলে কেন তারা পিছিয়ে থাকবে। সমতা যেন আসে, সেই চেষ্টা সব বাবারা করবেন।
ফওজিয়া খোন্দকার ইভা
কোর গ্রুপ সদস্য, সাংগাত
নির্বাহী পরিচালক, প্রাগ্রসর
আমরা সবাই কম-বেশি ভুক্তভোগী। নারী হিসেবে আমাদের সবারই কিছু না কিছু বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস আছে। ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের স্লোগান ছিল—নারীর চোখে বিশ্ব দেখুন। কেন বলা হয়েছিল? আমরা যে সমতার কথা বলছি, সবাই যখন ভাবছি নারী তার সব অধিকার পেয়ে গেছেন, আসলে তা হয়নি। নারী যে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেটা একজন নারীই বুঝতে পারেন। সম্পত্তি তো অনেক বড় জায়গা। আমি আইনের লোক নই। আমি সমতা আনার ক্ষেত্রে কাজ করি। এর সূত্রপাত পিতৃতন্ত্র থেকে। অনেক সময় আমাদের শুনতে হয়, নারীরা এখন বেশি পাচ্ছেন। সেখানে কেন আমরা নারীর কথা বলি। কিন্তু যে লড়াইয়ে আমাকে প্রতিনিয়ত যোদ্ধা হিসেবে এগোতে হয়, সেখানে আমার অধিকারের কথা আমি ছাড়া আর কে বলবে। যখন একটি ১২-১৩ বছরের মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয় পরিবার থেকে, তখন সে নিজের শরীরই চেনে না, তখন তাকে অন্য একটি পুরুষের সম্পত্তি হয়ে যেতে হয়। শিক্ষিত মেয়েও তার পরিবারের কথা মেনে পড়াশোনা বা কাজ ছেড়ে দেয়। এসবই পিতৃতন্ত্রের কারণে। সুতরাং সম্পত্তি যে আমরা পাব না, এটা একটা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা কাঠামো। কাঠামো হয়তো ভাঙা যায়। আমরা জানি পিতৃতন্ত্র একটি কাঠামো। বাই ডেফিনেশন পিতৃতন্ত্র এমনটা করে। সম্পত্তির সঙ্গে নারীর শ্রমবিভাজন জড়িত, নারী নির্যাতন জড়িত এবং নারীর পরনির্ভরশীলতা জড়িত। পিতৃতন্ত্র চায় নারীকে পরনির্ভরশীল করতে। তাহলে নারী আওয়াজ তুলবেন না কেন? আওয়াজ তোলা নারী আমরা পছন্দ করি না। আমাদের সব প্রতিষ্ঠান পিতৃতন্ত্রকে বহন করছে। ধর্ম আমাদের পিতৃতন্ত্রেরই একটি স্বরূপ। সেজন্য ধর্মে অন্যান্য বিষয় নিয়ে যত না কথা বলা হয়, নারীকে নিয়ে কথা বলা হয় বেশি। অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে দেখতে হয়, একজন বাবা, ভাই বা সহকর্মী নারীর ওপর হাত তোলেন শুধু সম্পদের জন্য। পরিসংখ্যান বলে, সারা পৃথিবীতে নারী কাজ করছেন ৬৫-৭০ শতাংশ, আয় করছেন ১০ শতাংশ আর সম্পদে অভিগম্যতা মাত্র ১ শতাংশের। জেন্ডার গ্যাপ নিয়ে আলোচনা করা দরকার। জেন্ডার শ্রমবিভাজনের কারণে নারী ঘরের কাজে আবদ্ধ থাকছেন। সেজন্য নারীর মর্যাদা, পরিচিতি নেই, সম্পদে অভিগম্যতা নেই। বাবা, ভাই, স্বামীর সম্পদ না পেলেও নিজেরা যে সম্পদ করবেন, সেটাও করতে পারেন না নারী। নারীর সমতা আনার জন্য যে অধিকার মর্যাদা বা পরিচয় প্রয়োজন, যতদিন সেটা নিশ্চিত করতে না পারব ততদিন যে আইন বা প্রতিষ্ঠান আছে, সেটা তাকে তা দিতে পারবে না।
অনেকেই বলেন, নারীবাদীরা পরিবারের বিরুদ্ধে, তারা পুরুষবিদ্বেষী। কথাটি সঠিক নয়। নারীকেই নারীর কথা বলতে হবে। আমার কথা যেহেতু কেউ বলে না, তাই আমাদেরই সোচ্চার হতে হবে। সম্পত্তির অধিকার আমাদের ন্যায্য অধিকার, করুণা নয়। যতদিন না পাব পথ হাঁটব। তাই স্লোগান দিয়ে বলি—কন্যা আমার পুত্র আমার বিভেদ কেন করো, সমান অংশ দিয়ে তুমি নিজকে বড় করো।
ড. বিনায়ক সেন
মহাপরিচালক, বিআইডিএস
সম্পত্তির অধিকার এলে নারীর এমপাওয়ারমেন্ট বাড়বে। বীণা আগারওয়াল ১৯৯১ সালে তার এ ল্যান্ড অব হার ওউন বইতে পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন, যেসব নারীর সম্পত্তির অধিকার আছে তাদের ইকোনমিক মবিলিটি এমপাওয়ারমেন্ট অনেক বেশি। দীপা নারায়ণের সঙ্গে ২০০৫-০৭ সালে মুভিং আউট অব পভার্টি ইন ইন্ডিয়া বই নিয়ে কাজ করেছিলাম। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, উত্তর প্রদেশ ও অন্ধ্র প্রদেশের ওই জরিপ করার সময় দেখেছি, যারা কোনো না কোনোভাবে সম্পত্তির অধিকার পেয়েছে, তাদের দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ত্বরান্বিত হয়েছে, দারিদ্র্যের হারও অনেক কমেছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যারা খাসজমি পেল এবং যারা পেল না, তাদের মধ্যে তুলনা করে দেখানোর ইচ্ছে ছিল যে তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের হারটা কেমন ছিল। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে ফিমেল লেবার ফোর্সে তার অংশগ্রহণ বাড়বে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের পরিসংখ্যানে ভারতে এই হারটা ৩০-এর উপরে ছিল। সেটা কমে ২০-এর নিচে নেমে এসেছে। এই একই সময়ে বাংলাদেশে এ হার ২০ থেকে ৩৬ শতাংশে গেছে। আমাদের দেশে ভারতের তুলনায় সম্পত্তিতে নারীর অধিকার বেশি, সেজন্য ভারতের তুলনায় এ হারটা বাড়ছে। ফিমেল লেবার ফোর্সের মধ্যে কর্মজীবী ও বেতনবিহীন গৃহস্থ নারীও পড়েন। সম্পত্তি ও সম্পদের অধিকার এলে, সে বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত হয়ে দক্ষ ও উন্নত মানের সম্পদে পরিণত হতে পারে। ‘উইমেন’স রাইটস টু প্রপার্টি অ্যান্ড ইনহেরিটেন্স’-এ নারীর বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান। এই বৈষম্য সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমি বলব, সংবিধানের ১৯-এর ১ ও ২-এর সঙ্গে এটা কোনোভাবেই যায় না। ১৯-এর ১-এ আছে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট কিনা, আর ১৯-এর ২-এ বলা হয়েছে, ‘মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য, প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের জন্য, সুষম সুযোগ-সুবিধা দান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ বিদ্যমান আইন সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। হিন্দু আইনে আমি যদি মেয়ের বাবা হই, তাহলে যেন মেয়েকে খানিকটা সম্পত্তি দিতে পারি, সেসব বিষয়ে তো আমরা কিছুই জানি না। না জানলে তো আমরা কিছুই করতে পারব না।
বিদ্যমান আইনের সংস্কার কীভাবে হবে? লিগ্যাল আর্গুমেন্টে অনেকে আর্গুমেন্ট রেফারেন্স টেনে আনেন। এখানে তাহলে কেন এমন না? ‘১৯৫৬ সালের হিন্দু ইনহেরিটেন্স অ্যাক্ট’ ২০০৫ সালে হিন্দু সাকসেশন অ্যাক্টে র্যাডিক্যালি বদলায়। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মেয়ে তার পুরুষ কাউন্টারপার্টের সমপরিমাণ সম্পদ পাবে। আমরা সেই রেফারেন্স টানতে পারি কিনা। এখানে প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের। কারণ এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রও অনেক সময় নড়েচড়ে বসতে চায় না। এক্ষেত্রে নারী আন্দোলনের একটা বড় ভূমিকা আছে। ১৯-এর ১ এবং ২, ২৭ ও ২৮ এবং ১৩ ও ১৪ ধারাকে আরো বেশি প্রয়োগ করা দরকার। ষাটের দশকে আন্দোলন না হলে নারীরা এতদূর এগোতে পারতেন না। এখন নতুন করে আন্দোলন করার সময়। তাছাড়া আমাদের জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম দরকার।
সিগমা হুদা
অ্যাডভোকেট ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সব জায়গায় সবাই বলছে নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। আমি মনে করি, পুরুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আর্টিকেল ২৮ নিয়ে আমি রিট করেছি। কিন্তু আর্টিকেল ৪১-কে কেউ চ্যালেঞ্জ করছে না। সেখানে বলা হচ্ছে, যে যার ধর্ম পালন করতে, প্রকাশ্যে ব্যক্ত করতে ও প্রচার করতে পারবে। কিন্তু সেটাই আমাদের আটকে রাখছে। কলোনিয়াল মোডালিটি আইনের পরিবর্তন করা হয়নি।
সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক শরিয়া ল। সব লকে ওভাররাইট করা যাবে কিন্তু এ আইনকে যাবে না। ওই ওভাররাইটিং কন্ডিশনের জন্য। ওটার বেসিসেই আমরা আমাদের ইনহেরিট্যান্স আইনকে কাভার করছি। সেই সুপিরিয়র ল-তে বলা হচ্ছে, আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করবে মুসলিম পার্সোনাল শরিয়া ল। ভারতে হিন্দু বেশি। সেখানে তারা পরিবর্তন আনতে পেরেছে। মুসলিমরা তো পারেনি। মুসলিম পার্সোনাল ল বিলের বিরোধিতা করা হয়েছে বারবার। ধর্ম দিয়ে নারীদের সঙ্গে পুরুষদেরও বৈষম্য দূর করতে হবে। নারী আর নারীর মধ্যেও বৈষম্য দূর করতে হবে। আমি একজন মুসলিম নারী, আমার বন্ধু হবে হিন্দু নারী। আমরা সবখানে সিভিল ল-তে এক রকম পাচ্ছি কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে ভিন্ন কিছু পাচ্ছি। খ্রিস্টানরা একটু ভালো আছে। কথায় বলে, কন্যা তোমার ঠিকানা কী? আসলে তার ঠিকানা কী? নারীরা ২৩তম অবস্থানে সাকসেশন। তার পরও সেই অধিকার থাকবে যদি তাদের ছেলেসন্তান হয়। আমি অনেক মুসলিম পরিবারেও দেখেছি এ মনোভাব। আমি খাগড়াছড়ির রাজত্ব নিয়ে একটা মামলা করেছি। রাজকুমার এলেন। বললেন, মায়ের রানী হওয়ার কথা ছিল কিন্তু পারছেন না। কারণ তিনি অ্যাডপ্টেড চাইল্ড ছিলেন। ক্লায়েন্টকে বললাম, মিয়ানমারের বইটা নিয়ে আসো, দেখো সেখানে কীভাবে চলে। ক্রিমিনাল ল-তে আমরা ইসলামিক ল পালন করছি না। সিভিল ল, ট্রেড ল বা অন্য কোনো ল-তে সেই ইসলামিক আইন পালন করা হচ্ছে না। আমরা অনুসরণ করছি ইউনিফর্মড ল। শুধু ফ্যামিলি ল-তে ইসলামিক আইন পালন করা হচ্ছে। সচেতনতাই একমাত্র বিষয়, যেটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী আছেন, যারা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। তারা হয়তো জানেনই না প্রতিষ্ঠানে কী হচ্ছে। তাদের স্বামীরা সব সামলায়। সমান উত্তরাধিকার চাইলে একটা ইউনিফর্ম ল আনতে হবে। তা না হলে অনেকেই ক্ষেপে যাবেন। আপনি ধর্ম পালন করেন কিন্তু সব আইন হতে হবে সিভিল ল। সেটা শুধু নারী না, সবার জন্য সমান হবে। তাহলে আমরা এগিয়ে যাব। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না এক সন্তানকে বাদ দিয়ে আরেক সন্তানকে সব সম্পদ ও সম্পত্তি দিতে। সবার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শ্রুতলিখন: শর্মিলা সিনড্রেলা




