আমরা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বোম্বে বিমানবন্দরে পৌঁছাই এবং মেজর ও কমিশনার আমাদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় স্বাগত জানান। পরদিন আমরা নয়াদিল্লিতে পৌঁছাই এবং ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তর ও গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ভারতীয় নৌবাহিনীর স্টাফ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শর্মা আমাদের গ্রহণ করেন।
ক্যাপ্টেন রায় চৌধুরী এবং যৌথ বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার কর্নেল রÅvংকধারী এক সদস্য আমাদের ভারতে আসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। আমি তাদের প্রস্তাব দিই যে আমরা নৌ-কমান্ডো হতে চাই এবং কমান্ডো প্রশিক্ষণ নিতে চাই। প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করে।
অ্যাডমিরাল নন্দা ও গোয়েন্দা বিভাগের ক্যাপ্টেন রায় চৌধুরী বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোর জন্য সব ধরনের সহায়তা ব্যবস্থা করতে অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং মুর্শিদাবাদের পলাশীতে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল প্রয়াত লেফটেন্যান্ট সুমীর দাস ও নন-কমিশন্ড নৌ-কর্মকর্তা (পেটি অফিসার) গুপ্তাকে যমুনা নদীতে (নয়াদিল্লি) আমাদের নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণ দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়।
প্রশিক্ষণ চলাকালে আমরা নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। আমরা তাদের সঙ্গে আমাদের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেন যে পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কলকাতায় ফেরার পর নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণ এবং ছাত্রদের নিয়োগের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আমরা ১৯৭১ সালের ১০ মে আকাশপথে কলকাতা পৌঁছাই। আমি কর্নেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে ১৯৭১ সালের ২১ মে তাকিপুর ও ভোমরা ইয়ুথ ক্যাম্পস পরিদর্শন করি এবং নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের ১২০ জন যুবককে নিয়োগ করি। ক্যাম্পগুলো মেজর এমএ জালিল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ওসমানের অধীনে ছিল। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য পশিমবঙ্গের পলাশী ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
প্রশিক্ষণকালীন জীবন ছিল বেশ দুর্বিষহ। নৌ-কমান্ডোদের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ ১৯৭১ সালের ১০ জুলাই সম্পন্ন হয় এবং দ্বিতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষ হয় ১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই।
বাংলাদেশের যেসব বন্দরে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, চাঁদপুর অভ্যন্তরীণ বন্দর, নারায়ণগঞ্জ অভ্যন্তরীণ বন্দর, দাউদকান্দি অভ্যন্তরীণ বন্দর।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৭৮ জন প্রশিক্ষিত কমান্ডোকে চারটি দলে ভাগ করা হয়। ৬১ জন কমান্ডো নিয়ে গঠিত প্রথম দল ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট এডব্লিউ চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। ২৮ জন কমান্ডো নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় দল ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট এমবি আলমের নেতৃত্বে চাঁদপুরে পাঠানো হয়। ২৮ জন কমান্ডো নিয়ে গঠিত তৃতীয় দল ১৯৭১ সালের ২ আগস্ট এমএ রহমানের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে পাঠানো হয়। আর ৬১ জন কমান্ডো নিয়ে গঠিত চতুর্থ দল ১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট এমএ উল্লাহর নেতৃত্বে মোংলায় পাঠানো হয়। তাদের ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট রাত ১২টায় (০০০০ ঘণ্টা) আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশনা ও পরামর্শ দেয়া হয়।
মোংলা দলটি ভারত থেকে দেশীয় নৌকায় গন্তব্যে পৌঁছায়। যাত্রাপথে বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাদের সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল পার হতে হয়। চারটি দলই ১৯৭১ সালের ৬ আগস্ট রাতে আক্রমণ চালায় এবং বাংলাদেশের মানুষ লন্ডনে বিবিসি থেকে পরিচালিত রেডিও অব বাংলাদেশে মূল্যবান যে সংবাদটি শুনতে পায় তা হলো ‘বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোরা চট্টগ্রাম বন্দরে ছয়টি জাহাজ ও বার্জ, মোংলা বন্দরে পাঁচটি জাহাজ ও বার্জ, নারায়ণগঞ্জে তিনটি কোস্টার ও বার্জ এবং চাঁদপুরে একটি জাহাজ ও একটি পন্টুন ধ্বংস করেছে। দাউদকান্দির সেতু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তানি গানবোটগুলোর নদীপথ ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার একমাত্র পথ বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোরা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।’
আগরতলা ইয়ুথ ক্যাম্পস থেকে আরো ৬০ জন যুবক কমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ক্যাম্পে যোগ দেন। আবার পশ্চিমবঙ্গের ইয়ুথ ক্যাম্পগুলো থেকেও ১২০ জন যুবক প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের ক্যাম্পে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২৬ আগস্ট অথবা এর পর থেকে প্রতিটি দলে ৪ থেকে ২০ জন কমান্ডো নিয়ে গঠিত ছোট ছোট দলকে নাশকতা ও ধ্বংস অভিযানের জন্য যেসব স্থানে পাঠানো হয় সেগুলো হলো চট্টগ্রাম বন্দর, বরিশাল, মোংলা, সিলেট, আরিচা, নগরবাড়ী, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, মাগুরা, দাউদকান্দি, ফুলছড়িঘাট, খুলনা, রাজশাহী, ভোলা, নরসিংদী, নবীনগর, রাজবাড়ী, অষ্টগ্রাম ও বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর।
কমান্ডোরা নির্ধারিত দায়িত্ব সম্পন্ন করে পলাশী ক্যাম্পে ফিরে আসতেন। পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজে নাশকতার চেষ্টা করা হয়। একটি অভিযানে চারজন কমান্ডো রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে এবং তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। অমানবিক নির্যাতনের মধ্যেও সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমান্ডোরা তাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি। দীর্ঘ সময় পর শেষ পর্যন্ত তাদের মুক্তি দেয়া হয়।
বাংলাদেশ বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সালেক পরামর্শ দেন যেন ১১ জন যুবককে সঙ্গে নিয়ে আমাকে খুলনায় অভিযানের জন্য পাঠানো হয়। আমি ১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পলাশী ক্যাম্প ত্যাগ করে টাকিতে ৯ নম্বর সেক্টর সদর দপ্তরের উদ্দেশে যাত্রা করি। খুলনায় পৌঁছে আমি বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করি এবং খুলনা ও সুন্দরবন এলাকায় তিনটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ মোট ১৯টি ক্যাম্প স্থাপন করতে সক্ষম হই। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোয় আট হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
উল্লেখ্য, খুলনা ও মোংলায় নদীগুলো হাঙরে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু অভিযানের সময় হাঙরের আক্রমণে একজনেরও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। প্রচণ্ড শীতেও কমান্ডোদের দিনের পর দিন পানিতে থাকতে হয়েছে। এমনকি সুন্দরবন এলাকায় বাঘও ছিল।
১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকাল পৌনে ৭টায় আমি খুলনা শহর দখল করি এবং সার্কিট হাউজ ভবনের ওপর বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। শহরের মানুষ জয় বাংলা ধ্বনিতে আমাদের স্বাগত জানায়।
[মো. রহমত উল্লাহর সাক্ষাৎকারটি (১৯৭৪) হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ১০ খণ্ড’ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত রূপে সংকলিত]










