১৯৭১ সালের অক্টোবর। প্রথম সপ্তাহেই সমগ্র জেড ফোর্সকে নিয়ে যাওয়া হলো সিলেটে। প্রথম ব্যাটেলিয়ন গেলো শ্রীমঙ্গলের জঙ্গল এলাকায়। তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন গেলো ছাতক অঞ্চলে আর অষ্টম ব্যাটেলিয়ন গেলো কুলাউড়ায়। উদ্দেশ্য ছিলো সিলেটকে উত্তপ্ত করে তোলা। যত বেশী সম্ভব শত্রু সৈন্য হতাহত করা আর রৌমারীর মত সত্যিকারভাবে মুক্ত এলাকা বলে উল্লেখ করা যেতে পারে এমনি একটি এলাকা দখল করা ও তা অধিকারে রাখা। এর আগে প্রয়োজন হলো সিলেটের চা বাগানগুলো পুরোপুরিভাবে দখল করে সেগুলোর ক্ষতি সাধন করা।
১৯৭১ সালের ১২ই অক্টোবর তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী ও শহরটি অবরোধ করলো। কিছু সংখ্যক স্থানীয় গেরিলাও এ কাজে করলো তাদের সহায়তা। এই অবরোধ স্থায়ী হয়েছিল ৬ দিন। এই সময়ে তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের সাথে পাক-বাহিনীর একটি এ্যাডহক ব্রিগেডের ঘটলো কয়েক দফা প্রচণ্ড সংঘর্ষ। পাকিস্তানী ব্রিগেডের কর্তৃত্ব করছিল ব্রিগেডিয়ার রানা।
তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন ছাতক সিমেন্ট কারখানা দখল করে নিল। বিধ্বস্ত করে দিল বিদ্যুৎ উৎপাদক জেনারেটরটির প্রধান অংশ। ফলে সমগ্র এলাকায় নেমে এল ঘন অন্ধকার।
উভয় পক্ষেই চলল আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণ। পরিণামে দুই পক্ষের যুদ্ধ গ্রাম এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়লো। তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের জন্য এটা ছিল বিরাট যুদ্ধ, যুদ্ধে পাকিস্তানের দিকে নিহত হলো তিনশ সৈন্য, আহত হলো আরো অনেক বেশী। ছাতকের এই অভিযানের কাহিনী ছড়িয়ে পড়লো সারা বিশ্বে। এই অভিযানকালে তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের ২০ জন সৈনিক শহীদ হলেন। আহত হলেন ৫০ জন।
পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ছাতকে নিযুক্ত পাকিস্তানী ব্রিগেড কম্যান্ডার বিশ্বাসই করতে চায়নি যে শুধুমাত্র তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন আর কিছুসংখ্যক গেরিলা মিলে ছাতকে তাদের এমনি করে নাস্তানাবুদ করেছে। তার মতে ছাতকে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে কোন ভারতীয় নিয়মিত বাহিনী। শুধু তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের পক্ষে নাকি এটা সম্ভবই নয় ।
তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের জওয়ানদের জন্য নিঃসন্দেহে এটাও একটা প্রশংসনীয় ব্যাপার। তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন ছাতকের একই এলাকায় আরো কতকগুলো ছোট ছোট অভিযানও চালায়। এতেও পাক-বাহিনীর ধনবল আর জনবল বহুলাংশে বিনষ্ট হয়। ২রা নভেম্বর তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের দখলে আসে গোয়াইন এলাকা। সেখানে ওরা হস্তগত করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ। গোয়াইনের যুদ্ধে পাকিস্তানীদের হতাহত হয়েছিল প্রায় দেড় শতাধিক সৈন্য। অপরদিকে তৃতীয় ব্যাটেলিয়নে হতাহত হয়েছিল মাত্র ৩০ জন।
পরবর্তী সময়ে দুর্বার অভিযান চালিয়ে তৃতীয় ব্যাটেলিয়ন ৬ই নভেম্বর দখল করে ভিট্রিখেল ও লুনি, ১০ই নভেম্বর দখল করে দাউরিখেল, ১২ই নভেম্বর দখল করে গোয়া ও শিমুলতলা, আর ২৮শে নভেম্বর দখল করে ছোটখেল। ছোটখেলে মারাত্মক রকমের এক হাতাহাতি যুদ্ধ হয়। হারানো ছোটখেল পুনরুদ্ধারের জন্য পাকিস্তানী হায়েনারা তিন দফা ব্যাপক আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের সমস্ত আক্রমণই প্রতিহত করা হয়। শুধু তাই নয়, প্রতিটি সংঘর্ষে হতাহত হয় তাদের বিপুলসংখ্যক সৈন্য।
তৃতীয় ব্যাটেলিয়নের পক্ষে ছোটখেল রক্ষায় নিয়োজিত ছিল একটিমাত্র কোম্পানী, এর অধিনায়ক ছিলেন ক্যাপ্টেন এস আই এম নূরন্নবী চৌধুরী। ২রা ডিসেম্বর পাকিস্তানীরা রাধানগরের সমগ্র এলাকা থেকে পুরোপুরিভাবে পিছু হটে যায়। রাধানগর এলাকার ছোট ছোট সংঘর্ষগুলোতে পাকিস্তানীদের আড়াইশ থেকে তিনশ সৈন্য নিহত হয়। আহত হয় আরো অনেক বেশী।
এবার সিলেটের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মরত প্রথম ও অষ্টম ব্যাটেলিয়নের বীরত্বগাথায় আসা যাক। ১৬ই অক্টোবর দুটি আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে অষ্টম ব্যাটেলিয়ন দখল করে নেয় সাগরনাল ও ফুলতলা চা বাগান। এই দুটি চা বাগানের প্রতিরক্ষা কাজেই নিয়োজিত ছিল একটি করে পাকিস্তানী কোম্পানী। সাগরনাল ও ফুলতলা অভিযান পরিচালনা করেন যথাক্রমে মেজর আমীন ও ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। অষ্টম ব্যাটেলিয়নও দুটি চা বাগানেই এক কোম্পানী করে সৈন্য নিয়োগ করেছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে, ১৯৭১
অল্প সময়ের মধ্যেই পাক-বাহিনীর ২২ নং বালুচ রেজিমেন্ট সাগরনাল চা বাগানে পাল্টা আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাদের এই আক্রমণ প্রতিহত করা হয়। সংঘর্ষে হতাহত হয় বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানী সৈন্য। দখল করার সাথে সাথেই চা বাগানের কারখানাগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। ১৬ই অক্টোবরের সংঘর্ষে নিহত হয় একশ’রও বেশী পাকিস্তানী সৈন্য। তাদের আহতের সংখ্যা ছিল আরও বেশী। অষ্টম ব্যাটেলিয়নের একজন শাহাদাত বরণ করে আর প্রায় ৬ জন আহত হয়।
একই দিনে প্রথম ব্যাটেলিয়নের জওয়ানরা দখল করে নেয় খেজুরিচরা চা বাগান। ধ্বংস করে দেয় বাগানের চা কারখানা। মেজর জিয়া উদ্দীন পরিচালনা করছিলেন এই প্রথম ব্যাটেলিয়ন। এখানেও পাকিস্তানীদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সৈন্য হতাহত হয়। ১৯শে অক্টোবর অপর আক্রমণ চালিয়ে প্রথম ব্যাটেলিয়ন চাম্পারায় চা বাগান দখল করে। সেখানেও তারা কারখানাটি অকেজো করে দেয়। এর পর পরই তারা এক আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে ধলাই চা বাগানের ফ্যাক্টরী ধ্বংস করে দেয় এবং সেখানে বহু পাকিস্তানী সৈন্য হত্যা করে।
২৮শে অক্টোবর প্রথম ব্যাটেলিয়ন একই সঙ্গে পেট্টোখোলা ও ধলাই চা বাগানে আক্রমণ চালায়। পেট্টোখোলা দখল করে রেখেছিল এক প্ল্যাটুন পাকিস্তানী সৈন্য। আর ধলাই চা বাগানে ছিল এক কোম্পানী পাক সৈনিক। কয়েক ঘন্টার যুদ্ধেই পেট্টোখোলার পতন ঘটে। কিন্তু অল্প পরেই পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি কোম্পানী সেখানে পাল্টা আক্রমণ চালায়। আমাদের ব্যাটেলিয়নের সাথে ওদের হাতাহাতি সংঘর্ষ হয়। এবং শেষ পর্যন্ত তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এই যুদ্ধে প্রথম ব্যাটেলিয়নের ৭ জন সৈন্য শহীদ ও অপর কয়েকজন আহত হয়। পাকিস্তানীদের দিকে একজন ক্যাপ্টেনসহ প্রায় ৫০ জন সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়। ধলাই চা বাগানটিতে পরে আরো বহু পাকিস্তানী সৈন্য পাঠানো হয়। এই দুটি চা বাগানের সংঘর্ষ পরে মারাত্মক আকার ধারণ করে। কয়েকদিনের প্রচন্ড যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ধলাই চা বাগানের পতন ঘটে। এই যুদ্ধে পাক-বাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্টের প্রায় দুশ সৈন্য নিহত হয়। এর মধ্যে ৭ই নভেম্বর অষ্টম ব্যাটেলিয়নের লেফটেন্যান্ট ইমদাদ তার কোম্পানী নিয়ে ধলাই চা বাগান আক্রমণ করেন। প্রচন্ড হাতাহাতি যুদ্ধের পর বাগানটি হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। কিন্তু অপর কয়েকজনের সাথে ইমদাদ শহীদ হন। ইমদাদ পাকিস্তানী সামরিক একাডেমীতে ক্যাডেট অফিসার ছিলেন। ১৯৭১-এর জুনে তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। ধামাই চা বাগানে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
এর মধ্যে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের মেজর আমীন দক্ষিণগুল চা বাগানে এক আক্রমণ চালিয়ে ২২ বালুচ রেজিমেন্টের ৫০ জন সৈনিককে হত্যা করেন। একই সময়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান অষ্টম ব্যাটেলিয়নের অপর একটি কোম্পানী নিয়ে আঘাত হানেন লাতুতে। সেখানে কয়েক দিনব্যাপী যুদ্ধে একশরও বেশী পাক-সৈন্য নিহত হয়। অপর দিকে অষ্টম ব্যাটেলিয়নের শহীদ হন মাত্র ১২ জন। এই আক্রমণে কুলাউড়া থেকে লাতু পর্যন্ত রেল লাইন সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়া হয়। এই সময়ে এই এলাকায় অগণিত ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলাকে কর্মতৎপর করে তোলা হয়। তাদের সুবিন্যস্ত আক্রমণ ধারায়ও পাকিস্তানীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
৮ থেকে ১২ই নভেম্বরের মধ্যে প্রথম ব্যাটেলিয়ন ফুসকুরি ক্লাব, নূরজাহান, বড়ুয়া, হুসনাবাদ ও রাজঘাট চা বাগান দখল করে নেয়। সব জায়গায়ই তারা বাগানের ফ্যাক্টরীগুলো অকেজো করে দেয়। শ্রীমঙ্গলের আশেপাশের পাক-বাহিনীকেও ব্যতিব্যস্ত করে তোলা হয় এবং তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়া হয়। এসব সংঘর্ষে উভয় পক্ষেই বেশ কিছু সৈন্য হতাহত হয়। এর মধ্যে অষ্টম ব্যাটেলিয়ন দখিনগুল, সোনারূপা, ধামাই ও দিলখুশ চা বাগানে আক্রমণ চালিয়ে এগুলো দখল করে নেয়। এসব সংঘর্ষেও বহু হানাদার সৈন্য হতাহত হয়।
১৫ই নভেম্বর মেজর আমীনের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের কোম্পানী দক্ষিণগুলের উত্তরে পাক-বাহিনীর ওপর এক প্রচন্ড আক্রমণ চালায়। এতে ১২১ জন পাকিস্তানী সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়। দ্বিতীয় (মুজিব) ব্যাটারীও এতে অংশগ্রহণ করে। এখানে আমাদের বীর জওয়ানরা বহু অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদও আটক করে। পরে দ্বিতীয় (মুজিব) ব্যাটারী বড়লেখার পাকিস্তানী অবস্থানের ওপর জওয়ানরা বহু রাস্তা-ঘাট উড়িয়ে দেয়। এতেও বহু পাকিস্তানী সৈন্য নিহত আর ওদের বহু গাড়ী আক্রমণ চালিয়ে বহু পাক-সৈন্য হতাহত করে। একই এলাকায় প্রথম ও অষ্টম ব্যাটেলিয়নের ধ্বংস হয়। এর পরেই আসে চূড়ান্ত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২০শে নভেম্বর। সেদিন ছিল ঈদ-উল-ফিতর। জেড ফোর্সের সৈনিকরা এই অনুষ্ঠান পালন করতে অস্বীকার করে। বরং হানাদার বর্বর বাহিনীর ওপর চরম আঘাত হানার জন্যেই তারা এই দিনটিকে বেছে নেয়।
সেদিন মেজর জিয়া উদ্দীনের অধীনে প্রথম ব্যাটেলিয়ন বাল্লা ও আটগ্রাম এলাকা দখল করে নেয়। ৩১ নং পাঞ্জাব ও স্থল স্কাউটের সৈনিকদের প্রায় সবাই নিহত হয় এবং অবশিষ্টরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচে। প্রথম ব্যাটেলিয়ন বহু গোলাবারুদ হস্তগত করে, বহু রাজাকারও সে সময় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করে। পরদিন জকিগঞ্জ পর্যন্ত সমগ্র এলাকাটি পাক-বাহিনীর কবলমুক্ত করা হয়। ২৪শে নভেম্বর রাতে প্রথম ব্যাটেলিয়ন কানাইঘাটের পূর্বদিকে সুর্মা নদী পর্যন্ত এগিয়ে যায় এবং প্রচণ্ড যুদ্ধের পর শাকিপুর ও গৌরীপুর এলাকা দখল করে।
২৫শে ও ২৬শে নভেম্বরের মাঝের রাতে জিয়া উদ্দীনের পরিচালনাধীন প্রথম ব্যাটেলিয়ানে ৩১ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি কোম্পানী ও কয়েকশত রাজাকার মিলে এক প্রচন্ড হামলা চালায়। এরা চালায় সাড়াসী আক্রমণ। এদের সাথে গোলন্দাজ বাহিনীও কাজ করে। দীর্ঘ দশ ঘন্টা কালব্যাপী এই সংঘর্ষ চলে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এতে অসংখ্য পাক সৈন্য হতাহত হয়। আর ব্যাটেলিয়নের পক্ষে দিনাজপুরের ক্যাপ্টেন মেহবুবুর রহমানসহ আরো কয়েকজন শহীদ হন। প্রায় অপর ১৫ জন আহতও হয়। ঘটনার পর আশেপাশের গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জানা যায় যে, তারা ঘটনাস্থলেই প্রায় সাড়ে তিনশ পাকিস্তানী সৈন্য ও রাজাকারের লাশ দেখতে পায়। এই যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও মূল্যবান দলিলপত্র আমাদের জওয়ানদের হাতে আসে।
এই দিনগুলোতে অষ্টম ব্যাটেলিয়ান জুরি, করমতানগর, সাগরনাল, দিলকুশ ও বড়লেখায় আক্রমণ চালিয়ে অগণিত পাকিস্তানী সৈন্য হতাহত করে ও বহু অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করে। তারা বহু স্থানীয় দালালকেও খতম করে। অষ্টম ব্যাটেলিয়ান ১লা ডিসেম্বর কমলগঞ্জ পর্যন্ত এলাকা শত্রু মুক্ত করে এবং পরদিন কমলগঞ্জও অধিকার করে। এসব সংঘর্ষে পাকিস্তানীদের দুই শতাধিক সৈন্য হতাহত হয়। ফলে পাকিস্তানীরা এই এলাকা ছেড়ে মৌলবীবাজারের দিকে পালিয়ে যায় ৷
৮ ও ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে প্রথম ব্যাটেলিয়ান ও দুটি অতিরিক্ত রাইফেল কোম্পানী সিলেটের দিকে যাত্রা করে। ১৪ই ডিসেম্বর ভোরে তারা সিলেট শহরের পশু খামারের কাছে যেয়ে উপনীত হয়। এই ব্যাটেলিয়ানের সাথেই যায় জেড ফোর্সের সদর দফতর। পথে পাক-বাহিনীর সাথে কয়েক দফা সংঘর্ষ ঘটে এবং সব সংঘর্ষেই পাকিস্তানী বাহিনীর অবস্থান ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়। শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছেই তারা ফ্রন্ট্রিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের সাথে এক সংঘর্ষের সম্মুখীন হয়। দুই ঘন্টা স্থায়ী এই যুদ্ধে একশরও বেশী পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়। এতে বহু পাক সৈন্য আটক হয়। প্রথম ব্যাটেলিয়ানেরও ৩৮ জন হতাহত হয়। সংঘর্ষের পরপরই পাক বাহিনী এই এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে প্রথম ব্যাটেলিয়ান ঝড়ের গতিতে সমগ্র সিলেট শহরে ঢুকে পড়ে। ১৬ই ডিসেম্বর পাক-বাহিনী আত্মসমর্পণের আবেদন জানিয়ে সাদা পতাকা উড়িয়ে দেয় ৷
এর মধ্যে তৃতীয় ব্যাটেলিয়ান ছাতকের দিক থেকে সিলেট অভিমুখে অগ্রসর হয়। ৪ঠা ডিসেম্বরের মধ্যে তারা কয়েক দফা আক্রমণ চালিয়ে গোরা, শিমুলতলা, পিরিজপুর, কারুই ও আলিরগ্রাম দখল করে নেয়। ৫ই ডিসেম্বর তারা গোয়াইন পুনর্দখল ও দোহালি বাজার দখল করে। ৬ই ডিসেম্বর দখল করে ছাতক শহর ও সিলেট কারখানা। ৯ই ডিসেম্বর তারা চিলিতাবাড়ী দখল করে ও তার পরদিন সালুটিকর বিমান ঘাঁটির প্রান্তে যেয়ে উপনীত হয়। ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ ও লামাগাজী আমাদের ব্যাটেলিয়ানের দখলে আসে। এর মধ্যেই তারা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে সিলেট শহর ঘিরে ফেলে।
অপর দিকে অষ্টম ব্যাটেলিয়ান একের পর এক করে কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও মৌলবীবাজার শহর দখল করে নেয়। মৌলবীবাজারে পাকিস্তানীদের একটি এডহক ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ছিল। বহু পাকিস্তানী সৈন্য ছিল এই অঞ্চলগুলোতে। কিন্তু কমান্ডিং অফিসার মেজর আমীন একের পর এক এই গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করে পাকিস্তানীদের মারাত্মকভাবে আতঙ্কিত করে তোলে।
ঐতিহাসিক নগরী সিলেটে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটেলিয়ান পাকিস্তানী আর্মি কমান্ডারদের মাঝেও ত্রাসের সৃষ্টি করে। মৌলবীবাজারের পর তারা দখল করে নেয় ফেঞ্চুগঞ্জ শহর এবং ১০ই ডিসেম্বর দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে সিলেট শহর। এই পর্যায়ে পাকিস্তানী পশুদের সাথে তাদের কয়েক দফাই সংঘর্ষ ঘটে। তারা যে শুধু পাক-বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায় আর তাদের আক্রমণ প্রতিহত করে তাই নয়, ১৪ই ডিসেম্বর দিবাগত রাতে তারা সিলেট শহরে ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়। এভাবে প্রথম ব্যাটেলিয়ান উত্তর-পূর্ব দিক থেকে, তৃতীয় ব্যাটেলিয়ান উত্তর ও উত্তর- পশ্চিম দিক থেকে আর অষ্টম ব্যাটেলিয়ান দক্ষিণ দিক থেকে সিলেট শহরের ভেতর ঢুকে পড়ে। ফলে সিলেট শহরে অবস্থানকারী বর্বর হানাদার বাহিনীর সৈনিকদের ভাগ্যও চারদিক থেকে রুদ্ধ হয়ে যায়। তারা বাধ্য হয় সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণ করে। সিলেটে ১২৫ জন অফিসারসহ প্রায় ৭ হাজার সৈন্যকে বন্দি করা হয়।
সূচনা থেকে ‘জেড’ ফোর্সের সর্বমোট দুইশ জন শহীদ ও তিনশ জন আহত হয়। এই অত্যল্প সংখ্যা থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা অর্জনে জেড ফোর্সের অপরিসীম বীরত্ব ও নিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ফোর্সের শহীদ, আহত আর গাজীরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যেও হয়ে থাকবে এক প্রেরণার উৎসস্বরূপ। এরাই প্রমাণ করেছে যে, বাঙালীরা যুদ্ধ করতে পারে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদান দিতে পারে এবং এই স্বাধীনতা রক্ষা করতেও পারে।
[লেখাটি জেড ফোর্স কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের কথার ভিত্তিতে তৈরি। ছাপা হওয়ার আগে তিনি লেখাটি পড়ে ছাপার অনুমোদন দিয়েছিলেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩ জুলাই ১৯৭২ সাপ্তাহিক বিচিত্রার ১ম বর্ষ ৯ সংখ্যায়। এখানে মূল লেখার সংক্ষেপিত রূপ সংকলিত হয়েছে। সংগ্রহ: মাহফুজ উল্লাহর ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া রাজনৈতিক জীবনী’ শীর্ষক গ্রন্থ]





