মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালি ছিল শতকরা নয় ভাগ। পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা বাঙালিদের সবসময় ছোট চোখে দেখত, হেয়প্রতিপন্ন করত এবং তাদের কখনই দায়িত্বশীল পদে রাখা হতো না। এমনকি কাউকে পদোন্নতি দিয়ে ওপরের দিকেও নেয়া হয়নি।
২৫ মার্চের আগে পাকিস্তান সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এর ধারাবাহিকতায় তারা বাঙালির ওপর গণহত্যা চালানোর পরিকল্পনা করে। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা করে সেনাবাহিনীতে থাকা বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে। সে কারণে বাঙালি সেনাসদস্যদেরও নিধন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে চট্টগ্রামে ইবিআরসি—ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অবস্থানরত বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
মেজর জিয়াউর রহমান তখন ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চট্টগ্রামের সিডিএ মার্কেট এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ হত্যাযজ্ঞের খবর পেয়ে তিনি তার বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
এরই মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ইপিআর সদর দপ্তর পিলখানায় হামলা চালিয়ে বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে। একইভাবে যশোর, কুমিল্লা ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সেনাসদস্যদের হত্যা শুরু হয়। এ অবস্থায় যারা বেঁচে যান, তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। এভাবেই ২৬ মার্চ থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
সে সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আটটি ব্যাটালিয়নের মধ্যে পাঁচটি বাংলাদেশে এবং তিনটি ব্যাটালিয়ন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশে থাকা পাঁচটি ব্যাটালিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর জিয়াউর রহমানসহ অন্যরা। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধ শুরু করেন। শুধু বেঙ্গল রেজিমেন্ট নয়—আর্টিলারি, ইঞ্জিনিয়ার, আর্মার্ডসহ বিভিন্ন কোরে কর্মরত বাঙালিরাও ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত অনেক বাঙালি সেনাসদস্যও সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ইপিআরের (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ রাইফেলস) সদস্যরাও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে তাদের শক্তি বাড়িয়ে দেন। পাশাপাশি পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যরাও বিচ্ছিন্নভাবে পালিয়ে এসে মুক্তিবাহিনীতে যুক্ত হন। এভাবে প্রায় এক লাখ মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছিল। এ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন কর্নেল এমএজি ওসমানী। তিনি মুক্তিবাহিনীকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করেন এবং ‘নৌ কমান্ডো’ নামে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করেন।
তাদের প্রচেষ্টায় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দেশের অধিকাংশ এলাকা মুক্ত হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় এবং সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান।
রণাঙ্গনের স্মৃতি
আমি তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারিতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ইউনিটটি ছিল কুমিল্লায়। সেখানে আমরা মাত্র চারজন ছিলাম বাঙালি, বাকিরা সবাই পশ্চিম পাকিস্তানি।
২৫ মার্চ রাতে অধিনায়ক আমাদের ডেকে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখে। আর পাকিস্তানি সৈন্যদের পাঠানো হয় গণহত্যা চালাতে। চার-পাঁচদিন এভাবে আটকে রাখার পর ৩০ মার্চ আমাদের সবাইকে গুলি করা হয়। বাকি তিনজন শহীদ হন। আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ভান করে পড়ে ছিলাম, তারা বুঝতে পারেনি যে আমি জীবিত। রাত গভীর হলে লাশের ঘর থেকে জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে পালাই। পালানোর সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, কিন্তু অন্ধকারের কারণে কোনো গুলি গায়ে লাগেনি। আমি এক দৌড়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে গোমতী নদী পার হয়ে একটি গ্রামে আশ্রয় নিই।
গ্রামবাসীরা আমাকে চিকিৎসা, খাবার ও ওষুধ দেয়। চারদিন সেখানে থাকার পর আমি ভারতীয় বিএসএফ ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করি। সেখানে মুক্তিবাহিনীর মেজর খালেদ মোশাররফ আমাকে স্বাগত জানান এবং মুক্তিবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরে আগরতলার জিবি হাসপাতালে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসা শেষে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই।
মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার পর কুমিল্লা অঞ্চলে সর্বাধিক যুদ্ধ করি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটি হয় বেলোনিয়ায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বারবার বেলোনিয়া দখলের চেষ্টা করে, কিন্তু আমরা মুক্তিবাহিনী সেখানে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলি। তারা প্রায় ২১ বার আক্রমণ চালালেও আমাদের পরাজিত করতে পারেনি।
পরে ২১ জুন পাকিস্তান সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আমাদের পেছনে সেনা নামিয়ে দেয়। সামনে থেকে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র দিয়ে এবং পেছন থেকে সেনা দিয়ে দ্বিমুখী আক্রমণ চালানো হয়। এ আক্রমণ সামলাতে না পেরে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই এবং ভারতে আশ্রয় নিই। বেলোনিয়া তখন পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়।
অক্টোবরে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় আমরা আবার বেলোনিয়া আক্রমণ করি। দুদিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিচ্ছিন্ন করে দিই। এরপর ৮ নভেম্বর চূড়ান্ত আক্রমণ চালিয়ে প্রায় ১০০ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করি। প্রথমবার পরাজিত হলেও দ্বিতীয়বারে আমরা বিজয় অর্জন করি।
বেলোনিয়া পুনর্দখলের পর আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম সীমান্ত সড়কের কাছে অবস্থান নিই। ডিসেম্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশ নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে ফেনী দখল করি, এরপর নোয়াখালী দখল করি। ৬ ডিসেম্বর নোয়াখালীতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
পরে আমাদের চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ৭ ডিসেম্বর আমরা চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা শুরু করি এবং ১৬ ডিসেম্বর সেখানে পৌঁছাই। আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে একটি পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছিলাম। ১৭ ডিসেম্বর আমি সেখান থেকে নেমে চট্টগ্রাম শহরে যাই এবং চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিই। এভাবেই আমরা যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করি।
[সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত]










