দুনিয়া যখন উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় ছুটছে, তখন একটি দেশ টানা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ‘গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স’-এর শীর্ষে, নিঃশব্দে কিন্তু নিশ্চিতভাবে। যার নাম সুইজারল্যান্ড, আলপাইন শৃঙ্গের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট দেশ। শুধু উদ্ভাবনের সূচকেই নয়, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়কালে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যায়ও বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে তারা। মাত্র ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষের একটি ছোট্ট দেশ, ২৬টি ক্যান্টনে বিভক্ত, যাদের প্রত্যেকটির রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। চারটি সরকারি ভাষা, পর্বতময় ভূখণ্ড যার ৭০ শতাংশ পাহাড়ে ঘেরা—এ বৈচিত্র্যময় কাঠামো নিয়েও কীভাবে সুইজারল্যান্ড এমন বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে যাচ্ছে বারবার? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় দর্শনে—যেখানে উদ্ভাবন কেবল অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং জাতীয় আত্মপরিচয়ের অংশ।

বিজ্ঞান ও গবেষণাকে সুইজারল্যান্ড শুধুই উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখে না—এটি দেশটির রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দের দিক থেকে দেশটি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের শীর্ষ সারির কাতারে। ২০২১ সালে সুইজারল্যান্ড জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় করেছে এ খাতে—অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) বেশির ভাগ দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এ পরিমাণ ব্যয়ে তারা ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ষষ্ঠ অবস্থানে।

শুধু অধিক ব্যয় নয়—বিশ্বমানের গবেষণাকে সুইজারল্যান্ডে গভীরভাবে প্রোথিত করার পেছনে রয়েছে আরো কিছু শক্ত ভিত। আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে সুইজারল্যান্ডের দুর্দান্ত সংযুক্তি, উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশ, উন্নত অবকাঠামো এবং সামাজিকভাবে জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব—এ উপাদানগুলো একত্রে গড়ে তুলেছে এক অনুকরণীয় গবেষণা পরিবেশ।

তবে সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানচর্চা শুধু একাডেমিক পরিসরে আবদ্ধ নয়। দেশটির গবেষণা ও উন্নয়নে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশ অর্থায়ন এবং ৫৩ শতাংশ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। অর্থাৎ করপোরেট গবেষণাগারগুলোই গবেষণার বড় অংশের হাল ধরেছে। প্রযুক্তি, শিল্প, স্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিচ্ছে করপোরেট গবেষণাগার, যাদের লক্ষ্য শুধু আবিষ্কার নয়, উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ।

এখানেই শেষ নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ। দেশটি অংশ নিচ্ছে অসংখ্য বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা ও কর্মসূচিতে। নির্দিষ্ট কিছু অংশীদার দেশের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে দ্বিপক্ষীয় গবেষণা সহযোগিতা। তথ্য, প্রযুক্তি, মেধা ও মতবিনিময়ের জন্য তারা গড়ে তুলেছে এক উন্মুক্ত ও সজীব পরিবেশ, যা উদ্ভাবনের পথকে করে তুলেছে আরো মসৃণ।

বিশ্বজুড়ে একাডেমিক সংযোগ ও গবেষণা নেটওয়ার্কিংয়ে সুইজারল্যান্ডের যে দক্ষতা, তা তাদের গবেষণাভিত্তিক অবস্থানকে করে তুলেছে আরো শক্তপোক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি। এ কারণেই ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের (সার্ন) মতো ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পের আতিথ্য দেয় সুইজারল্যান্ড, যেখানে কণার গতি থেকে মহাবিশ্বের রহস্য পর্যন্ত খুঁজে দেখা হয়।

সুইস অভিজ্ঞতা তাই শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত, যেখানে উন্নয়ন আর উদ্ভাবন চলে হাত ধরাধরি করে, যার ভিত্তি নির্মিত হয় জ্ঞান ও দূরদর্শিতার ওপর।