আজ সুইজারল্যান্ডের জাতীয় দিবস। এ বিশেষ দিনে বাংলাদেশে বসবাসরত সব সুইস নাগরিক ও বাংলাদেশী বন্ধুদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

জাতীয় দিবস আমাদের ফিরিয়ে নেয় সাত শতাব্দী পেছনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে। জনপ্রিয় লোকগাথা অনুযায়ী, ১২৯১ সালের আগস্টে তিন আলপাইন ক্যান্টনের প্রতিনিধিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে শপথ নিয়েছিলেন, সেটিই সুইস কনফেডারেশনের ভিত্তি স্থাপন করে। ঐতিহাসিক সে মুহূর্ত থেকে শুরু করে ১৮৪৮ সালে সুইস ফেডারেল সংবিধান গৃহীত হওয়া এবং বর্তমান আধুনিক সুইজারল্যান্ড পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক যাত্রাপথ পরিচালিত হয়েছে সংলাপ, বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে। ফলে আমাদের জাতীয় দিবস উদযাপন কেবল অতীতকে স্মরণ করার নয়। বরং এটি সুইজারল্যান্ডকে গড়ে তোলা মূল মূল্যবোধগুলোর প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের একটি উপলক্ষও বটে।

তুষারে আবৃত পর্বতশৃঙ্গ আর ছবির মতো উপত্যকার গণ্ডি পেরিয়ে আজকের সুইজারল্যান্ড গড়ে তুলেছে উন্নত ও রফতানিমুখী অর্থনীতি। যার পেছনে রয়েছে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির অপরিহার্য সংযোগ। সুইজারল্যান্ডের বেসরকারি খাত ও উৎপাদন খাত বিশ্বজুড়ে নির্ভরযোগ্যতা, নিখুঁত ও গুণগত মানের প্রতীক। এ ক্রোড়পত্রে সুইজারল্যান্ডের বেসরকারি খাতের শক্তির দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে—যেখানে উঠে এসেছে কীভাবে আমরা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার মানদণ্ড স্থাপন করে চলেছি।

সুইজারল্যান্ড একটি গতিশীল, বহু সাংস্কৃতিক ও বহু ভাষার রাষ্ট্র। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার পদ্ধতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র ও ফেডারেল কাঠামো সুইজারল্যান্ডের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এ কাঠামো নাগরিকদের স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত অধিকাংশ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করে।

মানবাধিকার ও মানবিক সহমর্মিতার ঐতিহ্য আমাদের মৌলিক আদর্শ, যা সুইজারল্যান্ডকে বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দায়িত্বশীল ও বিশ্বস্ত বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমরা আমাদের ‘আন্তর্জাতিক জেনেভা’ নিয়ে গর্বিত। যেখানে অসংখ্য আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংস্থা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। আজ যখন বহুপক্ষীয়তা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, সুইজারল্যান্ডের এ ভূমিকার গুরুত্ব আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় ও বহুমাত্রিক। আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিপুল সম্ভাবনাময় এবং বর্তমানে এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আবির্ভূত। আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক ১০০ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য প্রবাহের মাধ্যমে চার বছর ধরে ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।

প্রায় সব প্রধান সুইস বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তারা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, বরং বাংলাদেশের জনগণের জন্য উচ্চমানের পণ্য, সেবা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিও নিয়ে আসছে। আমরা আশাবাদী, ব্যবসা পরিচালনার আরো সহজতর পরিবেশ এবং একটি উন্নত নীতিগত কাঠামো আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করবে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের একটি প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে সুইজারল্যান্ড। সুইজারল্যান্ড ২০২৮ সালের মধ্যে তার দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগিতা কার্যক্রম ধাপে ধাপে দায়িত্বশীল ও টেকসইভাবে গুটিয়ে আনলেও বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুক্ত থাকবে। মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে বিশেষত চলমান রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিবাসন ইস্যুতে সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশের পাশে থাকবে।

গত বছর বাংলাদেশ কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করেছে। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের দ্বৈত রূপান্তরের পথে রয়েছে দেশটি। এ রূপান্তরের সময়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের পাশে রয়েছে—এমন একটি সমাজ যেখানে সবার অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি দৃঢ় হয়। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক রূপরেখায় পরিবর্তন এনে উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদের ওপর ভিত্তি করে একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছে। এ যাত্রায় সুইস বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অংশীদারদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।

শেষ করার আগে আমি আবারো উল্লেখ করতে চাই যে, সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক গভীরভাবে মূল্যায়ন করে এবং আমরা দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পর্যায়ে সংযোগ আরো দৃঢ় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রেতো রেঙ্গলি

বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত