প্রিসিশন ঘড়ির মতোই সময়কে গুরুত্ব দিয়ে চলে যে দেশ, তার অর্থনীতিও যে সুচারুভাবে চলবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সুইজারল্যান্ড—বরফঢাকা পাহাড় আর নীলচে হ্রদের এ দেশটিকে অনেকেই কেবল ভ্রমণ কিংবা চকোলেটের জন্য চেনেন। কিন্তু এর আরেকটি পরিচয় রয়েছে, অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি কার্যকর। তা হলো এর বেসরকারি খাত। সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রমধর্মী। চারটি খাত—ওষুধ, আর্থিক সেবা, সূক্ষ্ম প্রকৌশল ও ঘড়ি শিল্প—মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেশটির জিডিপির বড় অংশ। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ‘সুইস কোয়ালিটি’ এক বিশেষ মর্যাদার নাম।

এসএমই: ছোট উদ্যোগ বিশাল অবদান

দেশটির ৯৯ শতাংশ কোম্পানি ছোট ও মাঝারি আকারের, অর্থাৎ এসএমই। এ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েই গড়ে উঠেছে সুইস অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই এমন বিশেষায়িত বাজারে কাজ করে, যেগুলোর চাহিদা কম হলেও মূল্য বেশি। তারা উদ্ভাবনকে সামনে রেখেই এগোয় এবং দ্রুত বাজারের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, যা বড় কোম্পানিগুলোর পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না। কর্মসংস্থানের বড় একটা অংশও এসএমই-নির্ভর। এত সব সাফল্যের পেছনে আছে কিছু দৃঢ় ভিত্তি। দক্ষ, প্রশিক্ষিত কর্মশক্তি, টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ তিনটি বিষয় মিলিয়ে সুইজারল্যান্ডে বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। যার ওপর দাঁড়িয়ে দেশটি তৈরি করেছে এক দৃঢ় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ। রাজনীতির পূর্বাভাসযোগ্যতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও এ পরিবেশকে করেছে আরো টেকসই।

শক্তি ও চ্যালেঞ্জ

সুইজারল্যান্ড বিশ্বের রফতানিনির্ভর অর্থনীতির এক চমৎকার উদাহরণ। দেশের উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশই রফতানি হয়ে যায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাজারে। সবচেয়ে বেশি যায় ওষুধ, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য ও ঘড়ি। ‘সুইস মেড’ লেখা মানেই তা উদ্ভাবনী ও গুণগত মানের প্রতীক। তবে এ সাফল্যের পথ পুরোটাই মসৃণ নয়। সুইজারল্যান্ডে শ্রম ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি এবং সুইস মুদ্রা ফ্রাঁর মানও শক্তিশালী—ফলে অনেক সময় রফতানি পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়, যা প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলে। তাছাড়া কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মনীতির কারণে নতুন পণ্যের বাজারে প্রবেশের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে সুইস বিনিয়োগ

বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুইজারল্যান্ড অন্যতম। দেশটির প্রধান বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোয় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা শুধু উন্নতমানের পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবা সরবরাহ করছে না, বরং কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে—বাংলাদেশী বাজারে আন্তর্জাতিক মান ও উদ্ভাবনের ছাপ রেখে যাচ্ছে।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী ও গতিশীল অংশীদারত্ব। যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও কেমিক্যাল পণ্য সুইস রফতানির মূল অংশ, আর বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য ও টেক্সটাইল। একদিকে যেমন পণ্যের আদান-প্রদান চলছে, অন্যদিকে সুইস কোম্পানিগুলো স্থানীয় বাজারে প্রযুক্তিনির্ভর সাপোর্ট দিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে সহায়তা করছে। এ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের গ্রাফ ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী।

রফতানি কার্যক্রমে সহায়তা

বিশ্ববাজারে সুইজারল্যান্ডের পণ্যের আস্থা ও নির্ভরতার পেছনে শুধু প্রযুক্তি আর গুণগত মানই নয়, কাজ করে আরো একটি শক্তি—সুইজারল্যান্ড গ্লোবাল এন্টারপ্রাইজ (এস-জিই)। এ সংস্থাটি সুইস কোম্পানিগুলোকে রফতানি কার্যক্রমে সহায়তা করে। যেন তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজ নিজ অবস্থান ধরে রাখতে পারে। নতুন বাজারে প্রবেশ মানেই শুধু পণ্য পাঠানো নয়—এর মানে নতুন নিয়ম, সংস্কৃতি, চাহিদা আর প্রতিযোগিতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া। আর এ জটিল পথ পাড়ি দিতে এস-জিই হয়ে ওঠে পথপ্রদর্শক। তারা পরামর্শ দেয়, বাজার বিশ্লেষণ করে, সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করে। ছোট উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান—সবার জন্যই এখানে রয়েছে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা। বিশ্বজুড়ে ব্যবসার পরিবেশ দিন দিন যেমন প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে, তেমনি হচ্ছে জটিল। এ বাস্তবতায় সুইজারল্যান্ডের কোম্পানিগুলো যাতে পিছিয়ে না পড়ে, বরং আরো দৃঢ়ভাবে সামনে এগোতে পারে, সেজন্যই এস-জিই কাজ করছে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে।