প্রতি বছর ৯ আগস্ট জাতীয় দিবসে দেশজুড়ে কুচকাওয়াজসহ বিভিন্ন উদযাপন অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা এ অঙ্গীকার পাঠ করেন। এটি একটি জাতি ও জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের প্রতিষ্ঠা ও লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সিঙ্গাপুরের স্কুলগুলোতে এ অঙ্গীকার শেখানো হয়। শিক্ষার্থীরা ও বাধ্যতামূলক জাতীয় সামরিক সেবায় নিয়োজিত সদস্যরাও এটি পাঠ করেন। সিঙ্গাপুরের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস রাজরত্নম রচিত এ অঙ্গীকারে সিঙ্গাপুরবাসীদের আহ্বান জানানো হয়েছে, ‘জাতি, ভাষা বা ধর্ম নির্বিশেষে একতাবদ্ধ জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের উৎসর্গ করতে, ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে, যাতে আমাদের জাতির জন্য সুখ, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি অর্জিত হয়।’

এ অঙ্গীকারে সিঙ্গাপুরের চারটি মৌলিক মূল্যবোধের ভিত্তি নিহিত রয়েছে। এর প্রথমটি হলো বহুসাংস্কৃতিকতা। এটি এমন একটি নীতি, যা প্রথম থেকেই জাতীয় অঙ্গীকারে প্রতিফলিত হয়েছে এবং বর্তমানে সিঙ্গাপুরবাসীর জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে। এর মূল বিশ্বাস হলো, কোনো একক জাতিগোষ্ঠী, ভাষা বা ধর্ম সিঙ্গাপুরের পরিচয় নির্ধারণ করে না; বরং প্রতিটি সিঙ্গাপুরবাসী সমাজের সমান অংশীদার।

আজকের আন্তঃসংযুক্ত ও বিশ্বায়িত পৃথিবীতেও বহুসাংস্কৃতিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকে থাকে না। এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রচেষ্টা, নিষ্ঠা ও অঙ্গীকার। সিঙ্গাপুরে আন্তঃধর্মীয় কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, যা যোগাযোগ ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। প্রতি বছর ২৫০টির বেশি আন্তঃধর্মীয় কার্যক্রম আয়োজন করা হয়।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বনির্ভর সহায়তা সংগঠনগুলো নিজ নিজ সম্প্রদায়ের এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তায় কাজ করছে। বিদ্যালয়ের দ্বিভাষিক নীতি এবং সরকারি আবাসন এলাকায় জাতিগত সমন্বয় নীতির মাধ্যমে বহুসাংস্কৃতিকতা সিঙ্গাপুরে শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বছরের পর বছর ধরে এ অভিন্ন পরিসর আরো বিস্তৃত হয়েছে, যার সুবিধাভোগী ও রক্ষক উভয়ই সিঙ্গাপুরবাসী।

সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় মৌলিক মূল্যবোধ হলো গণতন্ত্র। এর অর্থ হলো, ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরবাসীদের দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে মতামত ও অংশীদারত্বের সুযোগ দেয়া। সিঙ্গাপুরে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার নির্বাচনের জন্য এবং প্রতি ছয় বছর অন্তর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নিয়মিত, বিস্তৃত ও সক্রিয় অংশগ্রহণই গণতন্ত্রের সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রতিফলন। তৃতীয় মূল্যবোধ হলো ন্যায়বিচার যা সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পদমর্যাদা বা সম্পদ নির্বিশেষে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য হওয়ার ধারণা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করেছে। আইনের শাসন সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের আইনের শাসন সূচকে সিঙ্গাপুরের শক্ত অবস্থান এর প্রতিফলন।

চতুর্থ মূল্যবোধ হলো সমতা। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী যখন মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘এটি মালয় জাতির দেশ নয়; এটি চীনা জাতির দেশ নয়; এটি ভারতীয় জাতির দেশ নয়। এখানে প্রত্যেকেরই সমান স্থান থাকবে; ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের ক্ষেত্রে।’ বহুসাংস্কৃতিকতা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতা—এ চার মূল্যবোধই কঠিন সময়ে সিঙ্গাপুর ও এর জনগণকে একত্রে ধরে রেখেছে। কভিড-১৯ মহামারীর মতো সংকটের সময়েও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, জাতিগত, আদর্শিক ও ধর্মীয় বিভাজনের কারণে ক্রমবর্ধমান অস্থির বৈশ্বিক পরিবেশেও এ মূল্যবোধগুলো গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন হিসেবে কাজ করবে।

নিজেদের স্বাধীনতা উদযাপনের এ সময়ে আমাদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের কথা স্মরণ করতে হবে এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে, যারা আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার অংশীদার হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। ২০২৭ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তি উদযাপন করবে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ ছিল সিঙ্গাপুর। কয়েক দশকের পথচলায় দুই দেশের বন্ধুত্ব আরো গভীর ও শক্তিশালী হয়েছে।

২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সিঙ্গাপুরের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগকারী দেশগুলোর একটি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের কিছু বেশি ছিল।

সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান সেম্বকর্প, পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল, সারবানা জুরং এবং সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে আরো সম্প্রসারণে আগ্রহী। ডিজিটাল অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো প্রকল্প ও স্বাস্থ্যসেবা খাতেও সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের অংশীদার হতে পারে।

জনগণের পর্যায়েও দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং আমাদের স্বাধীনতার আগের সময় থেকে বিদ্যমান। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই অনেক বাংলাদেশী সিঙ্গাপুরে বসবাস ও কাজ করে আসছেন। তারা সিঙ্গাপুর গঠনে অবদান রেখেছেন এবং দেশটির বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সিঙ্গাপুর কো-অপারেশন প্রোগ্রামের (এসসিপি) আওতায় অর্থনীতি, জনপ্রশাসন, টেকসই উন্নয়ন ও বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশ নিতে প্রায় ২ হাজার ২০০ বাংলাদেশী কর্মকর্তা সিঙ্গাপুর সফর করেছেন। দুই দেশের জনগণের মধ্যে এ যোগাযোগের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করে এবং বোঝাপড়া থেকেই আসে সম্মান।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ঢাকায় সিঙ্গাপুর হাইকমিশন কনস্যুলেট থেকে হাইকমিশনে উন্নীত হয়। এটি দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতি ও বিকাশের প্রতিফলন। এরপর সরকার ও রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সংস্কৃতি ও শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত পারস্পরিক যোগাযোগ আরো বেড়েছে।

গত বছর সিঙ্গাপুরের ৬০তম স্বাধীনতা বর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে হাইকমিশন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগারে ৬০টি বই প্রদান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি সিঙ্গাপুরি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বাংলাদেশ জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সিঙ্গাপুরি খাবারের ওপর রান্না প্রশিক্ষণ এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের সঙ্গে শিশুদের জন্য একটি দাতব্য অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য।

এ বছর আমরা কনস্যুলার নেটওয়ার্কিং ও তথ্য বিনিময় অনুষ্ঠান, সিঙ্গাপুর কো-অপারেশন প্রোগ্রামের অংশগ্রহণকারীদের জন্য অ্যালামনাই সমাবেশ এবং আর্ট বাংলা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি।

বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের উষ্ণ বন্ধুত্বকে আমরা সবসময় মূল্য দিই। শুধু দ্বিপক্ষীয় পর্যায়েই নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে আমরা কাজ করে যাব।

উদযাপনের এ সময়েও আমাদের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে গভীর নজর রাখতে হবে। এমন সময়ে বহুসাংস্কৃতিকতা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতা থেকে পাওয়া ঐক্য সিঙ্গাপুরের জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এ চার মূল্যবোধ শুধু আমাদের একত্রে ধরে রাখে না, বরং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিও তৈরি করে। এস রাজরত্নমের রচিত জাতীয় অঙ্গীকার আজও সিঙ্গাপুরের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।