১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড হচ্ছে জেড ফোর্স। মেজর পরে লে. কর্নেল (যুদ্ধকালীন) জিয়াউর রহমানের নামানুসারে এই ব্রিগেডের নামকরণ হয়। মেজর জিয়া যুদ্ধের প্রথম দিকে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে চট্টগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাথমিক প্রতিরোধ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেনানিবাসের বাইরে থাকায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্বচ্ছ চিত্র এই ইউনিটের সামনে ছিল। ১ মার্চে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের নগরীতে পরিণত হয়। জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে অবস্থিত বাঙালি সৈন্য ও অফিসাররা নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করতে শুরু করেন। ফেব্রুয়ারির প্রথম থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে সৈন্য আনতে শুরু করে। বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সংগত কারণেই সন্দেহের উদ্রেক হয়। রাষ্ট্রদ্রোহের ভয়ে কেউ তার মনের কথা অন্যকে বলতে সাহস পেত না। ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়া এবং কোয়ার্টার মাস্টার ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ছিলেন তাদের অন্যতম। ক্যাপ্টেন অলি ইবিআরসিতে কর্মরত কর্নেল এমআর চৌধুরী এবং ক্যাপ্টেন আমিন আহাম্মেদ চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম পরোক্ষভাবে এ সম্পর্কে কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। মেজর জিয়া সিনিয়র বলে ক্যাপ্টেন অলি তার ওপর ভরসা করতে লাগলেন। ২৫ মার্চ রাতে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পাকিস্তান থেকে আগত অস্ত্র ও গোলাবারুদবাহী জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাসের নির্দেশ দেয়া হয়।
মেজর জিয়াউর রহমান নিজ সৈন্যসহ চট্টগ্রাম পোর্ট এলাকায় যাওয়ার পথে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরীর কাছে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সংবাদ পান। মেজর জিয়া তাৎক্ষণিক ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ফিরে আসেন এবং সব অফিসার ও সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ওই রাতেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই ইউনিটের সব সৈন্য ও অফিসার স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহের পক্ষে যোগদান করেন। এ অবস্থায় ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সৈন্যদের ওপর সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত হামলার আশঙ্কায় নিজ অবস্থান ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২৬ মার্চ ভোরে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সব পদবির সৈনিক পটিয়ায় একত্রিত হন। ২৭ মার্চ ’৭১ সন্ধ্যা ৭:৩০টায় মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে (কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র) আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
ইপিআর ক্যাপ্টেন রফিক যখন চট্টগ্রাম শহরে তার অধীন বাঙালি ইপিআর সৈনিকদের নিয়ে মরণপণ লড়াইয়ে নিয়োজিত তখন মেজর জিয়া তার সৈনিকদের নিয়ে কালুরঘাটে অবস্থান করছিলেন। এর ফলে কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, রামগড়, বরকল ইত্যাদি সীমান্ত এলাকা থেকে আগত ইপিআর সৈনিকদের কালুরঘাটে থামিয়ে দিয়ে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আনা হয়। দেশের চলমান যুদ্ধে গতিশীলতা আনয়ন এবং সীমান্ত এলাকায় ‘মুক্তাঞ্চল’ গঠনের লক্ষ্যে এপ্রিল থেকেই প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলোর সমন্বয় সাধন করে নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার পরিকল্পনা মোতাবেক বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারের নির্দেশক্রমে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানকে তার রেজিমেন্টসহ মেঘালয় রাজ্যের তুরা পাহাড়ের তেলঢালায় আনা হয়। একইভাবে ১ ও ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে তেলঢালায় সমবেত করা হয়।
এর আগে ব্যাটালিয়ন তিনটি বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় বহু সৈন্য নিহত ও আহত হয়। ফলে ফোর্স গঠনের ঘাটতি পূরণ করতে সেক্টর বাহিনী, ইপিআর, আনসার এবং গেরিলা যোদ্ধা নিয়োগ করে ব্যাটালিয়ন তিনটি গড়ে তোলা হয়। এভাবে সেনাবাহিনীর ১, ৩ ও ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে ৭ জুলাই গঠন হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং নামকরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে এই ব্রিগেডটির নাম দেয়া হয় ১ আর্টিলারি ব্রিগেড। ব্রিগেড গঠনের পর জুলাইয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোর নাম হয়—১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট, ২ আর্টিলারি এবং ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি। ব্রিগেডে নতুন সদস্য নিয়োগের পর এদের প্রথাগত যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত এবং ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে এরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। একই সঙ্গে ব্যাটালিয়ন তিনটিকে সমন্বিত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রথাগত যুদ্ধের শিক্ষা দেয়া হয়।
নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের পর মেজর জিয়া একাধারে ব্রিগেড কমান্ডার ও ১১ নং সেক্টর কমান্ডারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরই মধ্যে তিনি লে. কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, ডেপুটি অ্যাডজুট্যান্ট ও কোয়ার্টার মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন, ব্রিগেড সিগন্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম, ব্রিগেড মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান ডা. হুমায়ূন হাই। ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী ও পরে মেজর জিয়া উদ্দিন; ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার হন মেজর শাফায়াত জামিল এবং ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান মেজর আবু জাফর মোহাম্মদ আমিনুল হক। এছাড়া ক্যাপ্টেন বজলুল গনি পাটোয়ারি, ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান, ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, লেফনেট্যান্ট আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মহসীন উদ্দিন আহমেদ, লেফটেন্যান্ট আশরাফুল আলম, ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন, ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন, ক্যাপ্টেন মহসিন উদ্দিন, লেফটেন্যান্ট এসআইএম নূরুন্নবী খান, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী, ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন, লেফটেন্যান্ট মোদাচ্ছের হোসেন খান, লেফটেন্যান্ট মাহবুব-উল-আলম প্রমুখ অফিসার এই ফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ পদে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
উল্লেখ্য, ১০ সেপ্টেম্বর প্রধান সেনাপতি এক চিঠিতে এই ব্রিগেডের নামকরণ করেন ‘জেড ফোর্স’। অক্টোবরে জেড ফোর্সে যুক্ত হয় ২ ফিল্ড ব্যাটারি আর্টিলারি (রওশন আরা ব্যাটারি) এবং একটি সিগন্যাল কোম্পানি। ক্যাপ্টেন খন্দকার আব্দুর রশীদ আর্টিলারি রেজিমেন্টের দায়িত্ব পান এবং সিগন্যাল কোম্পানির কমান্ডার হন ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম (লে. কর্নেল এসআইএম নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম, রৌমারী রণাঙ্গন, কলম্বিয়া প্রকাশনী, ঢাকা, জানুয়ারি, ২০০৪, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৪)
৭ জুলাই ’৭১ নিয়মিত ব্রিগেড গঠন হলে এই ফোর্সের দায়িত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে নির্ধারিত হয় বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল এলাকা। ব্রিগেড গঠনের পর ব্রিগেড কমান্ডার জিয়া তার তিনটি ব্যাটালিয়নের অ্যাসিড টেস্ট হিসেবে তিনটি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করেন। তার মধ্যে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে কামালপুর বিওপি আক্রমণ, ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নকশি বিওপি আক্রমণ এবং ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সীমান্ত হতে ২০-২৫ মাইল দেশের ভেতরে বাহাদুরাবাদ ঘাট আক্রমণের নির্দেশ দেন। এছাড়া জুলাই-সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত জেড ফোর্স তার যুদ্ধ এলাকায় কয়েকটি দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেয়। এর মধ্যে দেওয়ানগঞ্জ যুদ্ধ, উলিপুর-কুড়িগ্রাম অভিযান (৩১ আগস্ট), বকশীগঞ্জে আক্রমণ (২১ সেপ্টেম্বর), হাতীবান্ধা অপারেশন, (২৭ সেপ্টেম্বর-৫ অক্টোবর), কোদালকাটি সীজ অপারেশন (৬ আগস্ট-২ অক্টোবর), সর্বোপরি রৌমারী মুক্তকরণ ও সিভিল প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জেড ফোর্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১)।
জেড ফোর্সের সাংগঠনিক কাঠামো
ব্রিগেড সদর দপ্তর: তেলঢালা (মেঘালয়, ভারত)
কমান্ডার: লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান (জুলাই-ডিসেম্বর ’৭১)
ব্রিগেড মেজর: ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ
ডিএ এ কিউএমজি: ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন
ব্রিগেড সিগন্যাল অফিসার: ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম
ব্রিগেড মেডিকেল অফিসার: ডা. হুমায়ূন হাই
১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ ব্যতীত অন্য কোনো অফিসার না থাকায় ১৩ জুলাই ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীকে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। যদিও তিনি ছিলেন ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আদি অফিসার। ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন আদি ও সিনিয়র মেজর জিয়াউদ্দীন আহমেদ আগস্টে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে তাকে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক করে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীকে তার আদি ইউনিট ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। ফলে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কাঠামো দাঁড়ায়—
অধিনায়ক: মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী (জুলাই-আগস্ট ’৭১), মেজর জিয়াউদ্দীন আহমেদ (আগস্ট-ডিসেম্বর)
উপ-অধিনায়ক: ক্যাপ্টেন বজলুল গণি পাটোয়ারী
অ্যাডজুট্যান্ট ও কোয়ার্টার মাস্টার: ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট লিয়াকত আলী খান
১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চারটি কোম্পানি ছিল—
‘এ’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান
‘বি’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমেদ
‘সি’ কোম্পানি কমান্ডার: লেফটেন্যান্ট আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী
‘ডি’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন বজলুল গণি পাটোয়ারী
এছাড়া কোম্পানি কমান্ডার, কোম্পানি অফিসার এবং প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনিসুর রহমান এবং ওয়াকার হাসান বিভিন্ন যুদ্ধে প্রভূত অবদান রাখেন (হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, দশম খণ্ড, পৃ. ৬৮১; লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এসআর প্রিন্টিং প্রেস, ঢাকা, মার্চ ১৯৯১, পৃ. ২২৫)।
৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
অধিনায়ক: মেজর শাফায়াত জামিল
উপ-অধিনায়ক: ক্যাপ্টেন মহসীন উদ্দিন আহমেদ
অ্যাডজুটেন্ট: ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আশরাফুল আলম
মেডিকেল অফিসার: ডা. ওয়াছি উদ্দিন
৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চারটি কোম্পানি ছিল—
‘এ’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন
‘বি’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন
‘সি’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন মহসিন উদ্দিন আহমেদ
‘ডি’ কোম্পানি কমান্ডার: লেফটেন্যান্ট এসআইএম নূরুন্নবী খান
এছাড়া কোম্পানি কমান্ডার, কোম্পানি অফিসার এবং প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ফজলে হোসেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আশরাফুল আলম ও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মনজুর আহমদ বিভিন্ন যুদ্ধে দায়িত্বশীল অবদান রাখেন (এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, পৃ. ২২৫)।
৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
অধিনায়ক: মেজর আবু জাফর মোহাম্মদ আমিনুল হক
উপ-অধিনায়ক: ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী
রেজিমেন্টাল মেডিকেল অফিসার ডা. বেলায়েত হোসেন
৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চারটি কোম্পানি ছিল—
‘এ’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী
‘বি’ কোম্পানি কমান্ডার: ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন
‘সি’ কোম্পানি কমান্ডার: লেফটেন্যান্ট মোদাসসের হোসেন
‘ডি’ কোম্পানি কমান্ডার: লেফটেন্যান্ট মাহবুবুর রহমান
এছাড়া কোম্পানি কমান্ডার, কোম্পানি অফিসার এবং প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট এমদাদুল হক, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মুনিবুর রহমান, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আবু বকর বিভিন্ন যুদ্ধে প্রশংসনীয় অবদান রাখেন (এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, পৃ. ২২৫-২২৬; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, দশম খণ্ড, পৃ. ৬৮২)।
২ ফিল্ড ব্যাটারি আর্টিলারি (রওশন আরা ব্যাটারি)
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ছয়টি ১০৫ এমএম গান (হাউইটজার) আসামের মাসিমপুরে অবস্থিত ভারতীয় ‘ইকো’ সেক্টর থেকে পাওয়া যায়। এ ছয়টি গান নিয়ে সিলেটের বিপরীত দিকে ভারতের কৈলাশ শহরে ২ ফিল্ড ব্যাটারি গঠন করা হয়। মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদ এই ব্যাটারির অধিনায়ক নিযুক্ত হন। ক্যাপ্টেন এএম রাশেদ চৌধুরী ও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট কাজী সাজ্জাদ আলী জহির এই ব্যাটারির অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ব্যাটারিকে ‘রওশন আরা ব্যাটারি’ নামে ডাকা হতো। অক্টোবরের পর থেকে এ ব্যাটারি ‘জেড ফোর্স’ ব্রিগেডকে সিলেট অঞ্চলে বিভিন্ন যুদ্ধে ফায়ারিং সাপোর্ট দ্বারা সহায়তা করে। যুদ্ধক্ষেত্রে সমরাস্ত্রগুলো চা বাগানের ট্রাক্টরে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মুভ করা হতো (Bangladesh Fights for Independence, Page 249)
সিগন্যাল কোম্পানি
যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতা-ব্যর্থতা অনেকাংশে সঠিক সংকেতের ওপর নির্ভর করে। এটা বিবেচনা করে নিয়মিত ফোর্স গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এই ফোর্সে একটি সিগন্যাল কোম্পানি গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। মুক্তিযুদ্ধে এটাই ছিল প্রথম সিগন্যাল কোম্পানি। প্রথমে সিগন্যাল কোম্পানি গঠন করতে সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ তখন কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির খুব অভাব ছিল। তাছাড়া প্রয়োজনীয় লোকবলেরও অভাব ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে এক রণক্ষেত্র থেকে অন্যপ্রান্তে সংবাদ পৌঁছাতে গাড়ির অভাব ছিল। বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিগন্যাল কোম্পানি গঠন করা হয়। ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম এই কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অক্টোবর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার ও ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সিগন্যাল কোম্পানি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। অক্টোবরের শেষদিকে এই সিগন্যাল কোম্পানি জেড ফোর্সের ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে প্রত্যেকটি রণাঙ্গনে সংকেত পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে। তার মধ্যে সিলেট জেলার বড়লেখা, ফুলতলা, আদমটিলা, বিয়ানীবাজার যুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (প্রাগুক্ত)।
যুদ্ধ এলাকা
লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘জেড ফোর্স’ গঠনের পরপরই এ বাহিনীর ওপর বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার অপারেশনাল দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রথম অবস্থায় (জুলাই-সেপ্টেম্বর ’৭১) জেড ফোর্স ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও রৌমারী এলাকায় যুদ্ধরত থাকে। অক্টোবরের প্রথম থেকে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত জেড ফোর্স ৪ ও ৫ নং সেক্টর (সিলেট-সুনামগঞ্জ-মৌলভীবাজার) এলাকায় বিভিন্ন যুদ্ধে পরম পারদর্শিতা প্রদর্শন করে এবং চূড়ান্ত যুদ্ধে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীকে পদানত করে সিলেট মুক্ত করার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। ১১, ৪ ও ৫ নং সেক্টর এলাকায় জেড ফোর্সের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধগুলো নিম্নরূপ—কামালপুর যুদ্ধ, বাহাদুরাবাদ ঘাট অপারেশন, দেওয়ানগঞ্জ থানা আক্রমণ, চিলমারীর যুদ্ধ, হাজীপাড়ার যুদ্ধ, ছোটখাল, গোয়াইনঘাট, টেংরাটিলা, গোবিন্দগঞ্জ, লামাকাজি, সালুটিকর বিমানবন্দর, ধলই বিওপি, ধলই চা বাগান, ধামাই চা বাগান, জকিগঞ্জ, আলি ময়দান, এমসি কলেজ, ভানুগাছা, কানাইঘাট, ফুলতলা চা বাগান, বড়লেখা, লাতু, সাগরনাল চা বাগান, ছাতক ও রাধানগর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, দশম খণ্ড, পৃ. ৬৮২)।
[লেখাটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ব্রিগেডভিত্তিক ইতিহাস, ২০০৬ গ্রন্থ থেকে সংকলিত]










