কামালপুর বিওপির অবস্থান
জামালপুর মহকুমার বক্শীগঞ্জ থানার ধানুয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম কামালপুর। কামালপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী অন্য গ্রামগুলোর মধ্যে ধামুয়া, উঠানীপাড়া, খাসিরগাঁও, পশ্চিম কামালপুর, পালবাড়ী, ব্রাহ্মণপাড়া, মাঝিরচর ও বালুরগ্রাম প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কামালপুর গ্রামের মাঝামাঝি এলাকায় ইপিআর সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) অবস্থিত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত রেখা থেকে দেড় কিলোমিটার অভ্যন্তরে সীমান্ত পিলার ১০৮৪ এবং ১০৮৫ এর মাঝামাঝি স্থানে এবং বক্শীগঞ্জ থানা সদর থেকে চার কিমি দূরত্বে কামালপুর বিওপির অবস্থান। অন্যদিকে জামালপুর মহকুমা সদর থেকে কামালপুর ৪০ কিমি উত্তরে অবস্থিত। কামালপুর সীমান্তের অপরপ্রান্তে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। কামালপুরের কাছাকাছি সীমানা চিহ্নিতকরণ এলাকার সীমান্ত রেখাটি আঁকাবাঁকা এবং অসমতল। সীমান্তের ওপারের অঞ্চলটি বাংলাদেশের সমতল ভূমি থেকে উঁচু। এই রাজ্যের সীমান্তবর্তী শহর মহেন্দ্রগঞ্জ এলাকায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের ১১ নং সেক্টরের সদর দপ্তর।
সীমান্ত এলাকা থেকে আগত শেরপুর ময়মনসিংহ সড়কটি বিওপির পূর্ব পাশ দিয়েই চলে গেছে। এই রাস্তাটি বক্শীগঞ্জ গোষাইপুর হয়ে শেরপুরের সঙ্গে গোটা অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে। এ এলাকার সঙ্গে সড়ক পথে এটিই একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। ভূমিগত অবস্থানের দিক থেকে কামালপুর এবং এর চারপাশের এলাকা সমতল। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ছাড়া এ অঞ্চলে আর কোনো উল্লেখযোগ্য নদী নেই। তবে ব্রহ্মপুত্রের ছোট ছোট শাখা-প্রশাখা বিধৌত অববাহিকায় অবস্থিত বলে বর্ষাকালে পুরো অঞ্চলটি পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। বেশির ভাগ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। তাই বর্ষাকালে এ এলাকার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌকা। নদীপথে কামালপুর বিওপির সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে তাই এ পথ বা অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি।
রেকি ও তথ্য সংগ্রহ
ব্রিগেড কমান্ডার মেজর জিয়ার নির্দেশ অনুযায়ী ২৮ জুলাই বিকেলে বি-কোম্পানি কমান্ডার-ক্যাপ্টেন হাফিজ তার কোম্পানির প্লাটুন কমান্ডার সুবেদার আলী হোসেন, সুবেদার ফয়েজ এবং সুবেদার সিদ্দিককে সঙ্গে নিয়ে কৃষকের ছদ্মবেশে কামালপুর বিওপির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্ট করেন। তাদের পরনে লুঙ্গি, মাথায় গামছা এবং খালি গায়ে সবাই চাষীর বেশে বিওপির চারপাশে শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় ব্যক্তি নিরাপত্তার জন্য তাদের সবার কাছে শুধু একটি করে পিস্তল ছিল। তারা নিজেদের এমনভাবে তৈরি করেছিল যে, মাঠে কর্মরত কৃষকদের থেকে তাদের আলাদা করা পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ছিল কষ্টসাধ্য। নিকট থেকে বিওপির পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান পর্যবেক্ষণ তাদের গতিবিধি, টহল ও পজিশনসহ নিত্যদিনের কর্মকাণ্ড প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে সম্ভাব্য তথ্য ও খবরাখবর সংগ্রহ করে ক্যাপ্টেন হাফিজ তার রেকি দল নিয়ে নিরাপদে ফিরে আসেন।
একই দিন (২৮ জুলাই) রাতে ডি-কোম্পানির কমান্ডার ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ, সি-কোম্পানির কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আ. মান্নান, সুবেদার হাই, সুবেদার হাসেম ও নায়েক সফিকে সঙ্গে নিয়ে তারা রাত্রিকালীন বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য কামালপুর শত্রু এলাকায় রেকি করতে যায়। সাড়াশব্দহীন অন্ধকার রাত। রাতের অন্ধকারে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ পাকিস্তানি লিসনিং পোস্টের কাছাকাছি পৌঁছলে একজন পাকিস্তানি সৈনিক হল্ট বলে চিৎকার করে ওঠে। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ পাকিস্তানি সৈনিককে পরবর্তী কর্মকাণ্ডের কোনো সুযোগ না দিয়েই জড়িয়ে ধরে মাটিতে ধরাশায়ী করেন। এ সময় সুবেদার হাই কাছ থেকে সুযোগমতো পাকিস্তানি সৈন্যের ওপর গুলি চালায়। ফলে দায়িত্ব পালনরত দুজন পাকিস্তানি সৈন্য ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এ দুই সৈন্যের মাথার ক্যাপ এবং দুটি রাইফেল নিয়ে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন এবং তার দল নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসেন।
২৯ জুলাইয়ের মধ্যে রেকি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সব কমান্ডার নিজ নিজ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে সমর্থ হন এবং ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর কাছে চূড়ান্ত নির্দেশের জন্য সংগৃহীত সব তথ্য উপস্থাপন করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ জুলাই রাতের খাবার সূর্যাস্তের পূর্বেই মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিতরণ করা হয় এবং সূর্যাস্তের পর পরই সামরিক যানে চড়ে মুক্তিযোদ্ধারা মহেন্দ্রগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। খোলা ট্রাকে মুক্তিযোদ্ধারা ভিজে যায়। মহেন্দ্রগঞ্জে পৌঁছে সবাই গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে সীমান্তের কাছাকাছি ভারতীয় এলাকায় একটি পরিত্যক্ত বাংলোয় গিয়ে ওঠেন। সেখানে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেয়া হয়। দেশমাতৃকার জন্য প্রথম সম্মুখ সমরের যাত্রা তাই হয়তো বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে যাওয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল পুরো মাত্রায় চাঙ্গা ছিল।
চূড়ান্ত আক্রমণ
৩০ জুলাই বিকেলে বালির মডেলের ওপর সামরিক কায়দায় ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্তৃক যুদ্ধের চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় আক্রমণের দিক নিয়ে অনেকেরই মতভেদ ছিল। তাই সরাসরি বিওপির সম্মুখ দিক থেকে আক্রমণ করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিওপির কাছাকাছি পূর্বদিকে ডাকবাংলো এবং গুদাম ঘর থাকায় আক্রমণে মোমেন্টাম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বেশি বাঙ্কার থাকায় আক্রমণের জন্য উত্তর দিক বেছে দেয়া হয়। অধিনায়কের নির্দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো ছিল:
ক) টাগের্ট কামালপুর বিওপি
খ) চূড়ান্ত আক্রমণের সময় (H hour) ৩১ জুলাই ভোর ৩টা ৩০ মিনিট
গ) এসেম্বলি এরিয়া মহেন্দ্রগঞ্জ
ঘ) এফইউপি কামালপুর বিওপি ১০০০ গজ সামনে খোলা মাঠ। এফইউপি নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি প্রয়োজনীয় মার্কিং এবং গাইড প্রদান করবে
ঙ) আক্রমণকারী কোম্পানি বি এবং ডি কোম্পানি
চ) এফইউপি মার্কিং নিরাপত্তা এবং গাইড প্রদান সি-কোম্পানি
ছ) কাট অফ কোম্পানি এ কোম্পানি, কামালপুর বিওপি থেকে এক মাইল পেছনে কামালপুর শ্রীবর্দী রোড জংশন উঠানীপাড়া থেকে
জ) আর্টিলারি সাপোর্ট-ভারতীয় আর্টিলারি ব্যাটারি। টাইম প্রোগ্রাম (প্রি-এইচ আওয়ার সাপোর্ট) অনুযায়ী
ঝ) ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক চূড়ান্তকরণ
ঞ) গ্রুপ অধিনায়ক এবং অ্যাডজুটেন্টের এফইউপি এলাকায় অবস্থান। ব্রিগেড কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানও গ্রুপের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত হয়।
আক্রমণের জন্য কামালপুর শত্রু অবস্থানের ৬০০ গজ দূরে এফইউপি (Farming Up place) নির্ধারণ করা হয়। দুই প্লাটুন সৈন্যসহ লেফটেন্যান্ট মান্নানকে এফইউপির নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়। আক্রমণের সময় ছিল ৩০ জুলাই রাত ৩টা ৩০ মিনিট। সেদিন সন্ধ্যার পর অ্যাসেম্বলি এরিয়া হতে নির্দিষ্ট পথে কোম্পানির কমান্ডাররা নিজ নিজ সৈন্যসহ কামালপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ করে বৃষ্টি নামায় সৈন্যদের চলার গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। বৃষ্টি ও ঘোর অন্ধকার থাকায় গাইড এফইউপির পথ অনেকটা হারিয়ে ফেলে। ফলে আক্রমণকারী সৈন্যদের এফইউপিতে পৌঁছাতে বেশকিছু সময় দেরি হয়ে যায়। এ অতিরিক্ত সময় যুদ্ধ আদেশ পরিকল্পনার মধ্যে না থাকায় অ্যাসল্ট ফরমেশন তৈরির আগেই সৈন্যদল নিজেদের প্রি-এইচ আওয়ার বোমবার্ডমেন্টের শিকারে পরিণত হয়। নিজ গ্রুপের গোলার আঘাতের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর আর্টিলারির গোলাও তাদের ওপর এসে পড়তে থাকে।
ভারতীয় আর্টিলারির একটি গোলাও দুর্ভেদ্য শত্রু অবস্থানের ওপর পড়ছিল না। সতর্ক শত্রু সঙ্গে সঙ্গেই এফইউপিতে আক্রমণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর মর্টার ও আর্টিলারি গোলাবর্ষণ করতে থাকে। দূরপাল্লার ভারি মেশিনগানের গুলি আসতে থাকে অবিশ্রান্ত ধারায়। ফলে কোম্পানির কমান্ডারদের পক্ষে চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য ফর্মিং আপ করা অসাধ্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া এ সময় প্রাকৃতিক কারণে ওয়্যারলেস সিস্টেম জ্যাম হয়ে যাওয়ায় নিজ পক্ষের আর্টিলারি ফায়ার বন্ধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রক্ষা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শুধু চিৎকার এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে শেষ যোগাযোগ রক্ষার চেষ্টা চালানো হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও বি এবং ডি কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা ভিন্ন ভিন্ন দিক দিয়ে এফইউপিতে পৌঁছার চেষ্টা করে এবং ফর্ম আপ করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা অল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, অনভিজ্ঞতা, গাইডের সুষ্ঠু দিকনির্দেশনার অভাব ইত্যাদি কারণে তারা বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে। এ ভুলভ্রান্তির কারণে ফর্মিং আপ করার আগেই নিজেদের এবং শত্রুপক্ষের ক্রস ফায়ারে বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়। সাময়িকভাবে হলেও এ সময় আক্রমণ কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। এমনি একটি পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের পশ্চাদপসরণ ছিল স্বাভাবিক। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ এ অবস্থায় ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে হাতের কাছের সৈন্যদের মারতে থাকেন একের পর এক লাথি, কারো বা কলার চেপে ধরে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে থাকেন। আবার সৈন্যদের মন চাঙ্গা করার জন্য নিজের অবস্থান শত্রুদের কাছে জাহির হয়ে যাবে জেনেও বিওপির কাছাকাছি পৌঁছে। পাকিস্তানি বাহিনীকে লক্ষ্য করে মেগাফোনে উর্দুতে বলতে থাকেন—’আভিতক ওয়াকত হ্যায়, শালালোক সারান্ডার কারো নেহিত জিন্দা নেই ছোড়েঙ্গা।’ ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন হাফিজের প্রেরণায় মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায় এবং সবাই বিপুল বিক্রমে শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য অগ্রসর হয়। যুদ্ধের ময়দানে ফলাফল বিচার্য বিষয় হলেও ঘটনাটি কীভাবে ঘটে সেটাই সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। ২৮ জুলাই রাতে সালাহউদ্দিনের রেকির ঘটনা ও দুজন শত্রুসেনা হত্যার পর থেকেই পকিস্তানিরা আক্রমণ মোকাবেলায় বেশিমাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেছিল।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে শুধু মনের জোর ও অদম্য সাহসে উজ্জীবিত হয়ে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন হাফিজ সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নিজ নিজ কোম্পানি নিয়ে সমন্বিত আক্রমণ পরিচালনা করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পাকিস্তানি ডিফেন্সে ফাটল দেখা দেয়। পাকিস্তানি সেনারা প্রাথমিক অবস্থায় প্রথম সারিতে যে প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুলেছিল মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তারা তাদের প্রথম সারির অবস্থান ছেড়ে অন্তসীমা প্রতিরক্ষা অবস্থানে সরে যায় অর্থাৎ অভ্যন্তরে শেলপ্রুফ বাঙ্কারে ঢুকে সেখানে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর গুলিবর্ষণ করতে থাকে।
এরই মধ্যে মুক্তিবাহিনীর ২০-২৫ জন সাহসী যোদ্ধা শত্রুর বাঙ্কার অতিক্রম করে কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকে পড়ে এবং এক প্রকার হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু করে। আক্রমণের এমনি এক মুহূর্তে আর্টিলারির একটি গোলা ক্যাপ্টেন হাফিজের সামনে এসে পড়ে এবং তার হাতের স্টেনগান উড়ে যায়। এ গোলার আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। অত্যন্ত সাবধানতায় তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে তার কোম্পানি একপ্রকার নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে এবং বি কোম্পানির অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা এ হাতাহাতি যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করতে থাকে। অর্থাৎ এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ আসতে শুরু করে। ফলে মুক্তিবাহনীর আক্রমণের গতি আরো স্তিমিত হয়ে পড়ে।
এমন সময় মেজর জিয়া মেজর মঈনকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলতে থাকেন—’আই উইল একসেপ্ট নাইনটি ফাইফ পারসেন্টজ ক্যাজুয়েলটি। শট দেম আউট মঈন।’ (আমি শতকরা ৯৫ জন হতাহত গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু ওদের নিশ্চিহ্ন করে দাও, মঈন)। এখানে উল্লেখ্য, ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে মেজর জিয়ার ফ্রন্টে থাকার কথা নয়, কমান্ডার সাধারণত রেয়ার ডিফেন্স থেকেই কার্যকর যুদ্ধ পরিচালনা করে। এদিকে মাইন ফিল্ডে আটকে যাওয়া সুবেদার হাই-এর প্লাটুনের ডানে অবস্থানরত ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন বুঝতে পারলেন যে, শত্রুরা মাইন ফিল্ডের পেছনের বাঙ্কারগুলো দিয়ে আরো পেছনে সেকেন্ড লাইনে সরে গিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফলে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন ম্যাগাফোনে সুবেদার হাইকে প্লাটুন নিয়ে ডানে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আক্রমণের শুরুতে সুবেদার হাইয়ের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪০ আর যুদ্ধের এ পর্যায়ে পৌঁছা পর্যন্ত সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫-২০ জনে। এদিকে মাইনের আঘাতে নায়েক শফির হাত উড়ে যায় এমন সময় অগ্রসরমান সৈনিকরা ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনকে পজিশনে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করতে থাকে। এমন সময় একটি গোলা ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনের সামনে এসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে তিনি ধরাশায়ী হয়ে যান। আশপাশের জোয়ানরা ছুটে আসে। রক্তে ভিজে যায় মাটি, স্তিমিত হয়ে আসে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনের তেজোদীপ্ত নির্দেশের কণ্ঠস্বর।
অতঃপর মৃত্যুঞ্জয়ী সালাহউদ্দিন মরণকে আলিঙ্গন করে বেঁচে উঠল অমরত্বের পুনর্জন্মে। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনের মৃত্যুতে কেবল সহযোদ্ধদের মধ্যেই নয় গোটা ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহযোদ্ধা কর্তৃক সালাহউদ্দিনের মৃতদেহ আনতে এগিয়ে যায় এক বিহারী মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সেও ব্যর্থ হয়। মৃত্যু তাকে ছাড় দিলেও আটটি গুলিতে সে মারাত্মক আহত হয়। এদিকে ক্যাপ্টেন হাফিজ বেঁচে গেলেন অলৌকিকভাবে। হাতের স্টেন তোপে উড়ে গেলেও সামান্য আহত হয়ে বাংলার শ্রেষ্ঠ আরেক সন্তান বেঁচে যান। কিন্তু ৬০০ গজ পেছনে এফইউপির তত্ত্বাবধানে কর্মরত লেফটেন্যান্ট মান্নান উরুতে গুলি খেয়ে গুরুতরভাবে আহত হন। একই জায়গায় একইভাবে ফ্লাইং অফিসার লিয়াকতও শুয়েছিলেন কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। এ সময় আহত ক্যাপ্টেন হাফিজের ওয়্যারলেস সেট নিরাপদ স্থানে রেখে পুনরায় হাফিজকে উদ্ধার করে ল্যান্স নায়েক রবিউল ছুটতে থাকে শত্রুর অভিমুখে। কয়েক কদম যাওয়ার পর পরই তার দুহাতে গুলি এসে লাগে, তার পরও ক্যাপ্টেন হাফিজকে উদ্ধারের সংকল্প তাকে টলাতে পারেনি। যথাস্থানে পৌঁছে দেখতে পান হাফিজকে অন্য কেউ নিয়ে গেছেন। পড়ে থাকা ওয়্যারলেস ও রকেট লঞ্চার উঠানোর সময় নায়েক রবিউলের বুকে গুলি লাগে। রবিউল মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, মুখ থেকে রক্ত পড়তে থাকে। ওই অবস্থাতেই সে গ্রেনেড হাতে তুলে নিয়ে জীবনের আশা ত্যাগ না করে নিকটবর্তী আখখেতের দিকে দৌড় দেয়। বৃষ্টির মতো শত্রুর গুলি আসতে থাকে। রবিউল কোনোমতে আখখেতে গিয়ে পৌঁছেন। তারপর তিনি বুঝতে পারলেন যে, সহজে তিনি মারা যাচ্ছেন না। অন্যের সাহায্য ছাড়াই তিনি এগোতে পারবেন।
এদিকে বাঁ হাত থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। ডান হাতের হাড়টি বের হয়ে আছে নাকে মুখে রক্তের ছাপ। এ অবস্থায় পালিয়ে যেতে দেখে এক গ্রামীণ মহিলা তার দিকে এগিয়ে আসছিল। সে গৃহবধূদের হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করে। তার পরের ইতিহাস আজও তার কাছে ঝাপসা হয়ে আছে। এদিকে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনের শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে একদিকে শোকের ছায়া অন্যদিকে বিকল্প কমান্ডারের অভাবে সৈন্যদের মাঝে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেয়। নেতৃত্বহীন অবস্থায় সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ অবস্থায় ছোট ছোট গ্রুপে শত্রুর বাঙ্কারগুলোর ওপর আঘাতের পর আঘাত হানতে থাকে। এরই মধ্যে ভোরের আলো দেখা দেয়। ফলে বাঙ্কারের মধ্যে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা লক্ষ্যস্থির করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এ অবস্থায় বেলা প্রায় ৭টা বাজে। অথচ লোকক্ষয় না করে অবস্থান পরিবর্তন করা শ্রেয় জেনেও মেজর মঈন তার সৈন্যদলকে পশ্চাদপসরণ করাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহার করেন। যুদ্ধে উভয়পক্ষের জনবলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উভয়পক্ষের লাশে কমিউনিটি সেন্টার ভরে যায়।
এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনসহ ৩০ জন শাহাদাতবরণ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী তারা তিন ট্রাক বোঝাই করে শত্রুদের লাশ নিয়ে যেতে দেখেছেন। কয়েকটি হেলিকপ্টারে গুরুতর আহতদেরও নিয়ে যেতে দেখেছেন। প্রচলিত রণকৌশলের নিয়ম অনুযায়ী শত্রুর বিরুদ্ধে আঘাত হানতে হলে শত্রুপক্ষের শক্তির তুলনায় তিন গুণ বেশি শক্তি নিয়ে আঘাত হানতে হয়।
কিন্তু কামালপুর যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এক কোম্পানি সৈন্য সমন্বয়ে গঠিত দুর্ভেদ্য ঘাঁটির বিরুদ্ধে মাত্র দুই কোম্পানি সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করা হয়। তার পরও এ সৈন্যদের চার ভাগের তিন ভাগই ছিল কয়েক সপ্তাহের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অর্থাৎ গণযোদ্ধা, এদের বেশির ভাগই জীবনে কোনোদিন বন্দুক দেখেনি। অথচ অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত শক্তির বিরুদ্ধে কুণ্ঠাহীনভাবে আক্রমণ পরিচালনা করে। শত্রুর গোলা ও প্রতিরক্ষার দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে এরা শত্রুর বাঙ্কারে এক সময়ে ঢুকেও পড়ে। দুই পার্শ্বের সহযোদ্ধারা মাইন ও গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ছিল। তার পরও এরা থামেনি। দেশমাতৃকার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে এদের প্রতিরোধ স্পৃহা বরং বেড়েই চলছিল। এ ধরনের প্রতিকূল অবস্থায় পৃথিবীর কোনো পেশাদার সেনাবাহিনী আক্রমণ পরিচালনা করে সফল হতে পারে না। অথচ কামালপুর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা হেরে গিয়েও জিতেছিল।
মুক্তিবাহিনীর রোডব্লক
এদিকে কামালপুর যুদ্ধে ক্যাপ্টেন মাহবুবুরের নেতৃত্বে ‘এ’-কোম্পানি ৩১ জুলাই রাতে সীমান্ত অতিক্রম করে কামালপুর বক্শীগঞ্জ রাস্তায় কামালপুরের এক মাইল দক্ষিণে কামালপুর শ্রীবর্দী রোড জংশনে এবং উঠানীপাড়া এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ির বহর ধ্বংস করার লক্ষ্যে আধা পাকা রাস্তার ওপর অ্যান্টি মাইন স্থাপনের মাধ্যমে রোড ব্লক করে। এক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন মাহবুবুরের নেতৃত্বে মূল দল প্রধান ভূমিকা পালন করে। দলের সদস্য ছিল ৬০ জন। এ দলের সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব ছিল মাইনে পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ি বিধ্বস্ত হলে গুলি করে পাকিস্তানি সেনাদের হত্যা করা।
এ মূল দলের ৩০০ গজ দক্ষিণে একটি ছোট দল অবস্থান নেয়। তাদের দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে সম্ভাব্য সাহায্যকারী দলের আগমন সম্পর্কে সংকেত প্রদান করা এবং মূল দলের ফায়ার শুরু হলে পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের ধ্বংস করা। কাট অফ পার্টির আরো একটি দল মূল দলের ২০০ গজ উত্তরে অবস্থান গ্রহণ করে। এ দলের দায়িত্ব ছিল সাহায্যকারী পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের কামালপুর বিওপিতে পৌঁছতে বাধা দেয়া এবং পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের ধ্বংস করা। কামালপুর যুদ্ধের জন্য স্থাপিত রোডব্লক অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ ছিল বলে প্রমাণিত হয়।
কামালপুর বিওপিতে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের সংবাদে বকশীগঞ্জ কোম্পানি হেডকোয়ার্টার থেকে দুই-তিন ট্রাক পাকিস্তানি সেনা সাহায্যকারী হিসেবে কামালপুর বিওপির উদ্দেশে যাত্রা করে। রাত ৪টা ৩০ মিনিটে উঠানীপাড়া এলাকায় রাস্তায় স্থাপন করা মাইনের বিস্ফোরণে গাড়ি দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সঙ্গে কাট অফ পার্টির সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে।
পাকিস্তানি সেনারা ভূমিতে অবস্থান নিয়ে পাল্টা আক্রমণ সূচনা করে। প্রায় আধা ঘণ্টা গুলিবিনিময়ের পর পাকিস্তানি সেনারা এদিক সেদিক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মুক্তিবাহিনীর গুলিতে হতাহত হয়। এ সংঘর্ষে পাকিস্তানি বাহিনীর আট থেকে ১০ জন সৈন্য নিহত হয় এবং ১২-১৪ জন আহত হয়। তাদের দুটি গাড়িই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর একজন সদস্য শাহাদাতবরণ করেন।
কামালপুর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম—
১. ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ, ২. নায়েক গোলাম মোস্তফা, ৩. ল্যান্স নায়েক সিরাজুল ইসলাম, ৪. ল্যান্স নায়েক গোলাম মোস্তাফা, ৫. সিপাই মোহাম্মদ আলী, ৬. সিপাই মো. মাতিউর রহমান, ৭. সিপাই রহিম উল্লাহ, ৮. সিপাই মো. আমিনুল ইসলাম, ৯. সিপাই মো. আ. লতিফ, ১০. সিপাই রবিউল ইসলাম, ১১. সিপাই রফিকুল ইসলাম, ১২. সিপাই সাহেব আলী, ১৩. সিপাই মো. সদর উদ্দিন, ১৪. সিপাই মো. ফজলুল হক, ১৫. সিপাই আব্দুস সালাম, ১৬. সিপাই সৈয়দ ফুল মিয়া, ১৭. সিপাই মাতাবুদ্দিন, ১৮. সিপাই হায়াত আলী, ১৯. সিপাই আ. কুদ্দুস, ২০. সিপাই রবিউল আলম, ২১. সিপাই মনসুর আলী, ২২. সিপাই আনোয়ার হোসেন, ২৩. সিপাই আব্দুস সোবহান, ২৪. সিপাই সিরাজুল ইসলাম, ২৫. সিপাই ইউছুফ, ২৬. সিপাই গোলাম মুস্তফা, ২৭. নায়েক রবি উল্লাহ, ২৮. ল্যান্স নায়েক তাজুল ইসলাম
এছাড়া এ যুদ্ধে ক্যাপ্টেন হাফিজ, লেফটেন্যান্ট মান্নান, তিনজন জেসিও এবং আরো ৬৬ জন সৈনিক আহত হন। এ যুদ্ধে অসীম সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করায় বাংলাদেশ সরকার কয়েকজনকে বিভিন্ন পদকে ভূষিত করেন। তারা হলেন—
১. ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ, বীর উত্তম, ২. ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম, ৩. লেফটেন্যান্ট আব্দুল মান্নান, বীর বিক্রম, ৪. ল্যান্স নায়েক শহীদ সিরাজুল ইসলাম, বীর প্রতীক, ৫. ল্যান্স নায়েক শহীদ রবি উল্লাহ, বীর প্রতীক, ৬. ল্যান্স নায়েক শহীদ তাজুল ইসলাম, বীর প্রতীক, ৭. নায়েক সুবেদার আব্দুল হাই, বীর প্রতীক, ৮. নায়েক শফিকুর রহমান, বীর বিক্রম, ৯. সিপাই আব্দুল আজিজ, বীর বিক্রম, ১০. সিপাই গোলাম মুস্তফা, বীর বিক্রম, ১১. সিপাই তারিকুল ইসলাম, বীর প্রতীক, ১২. সিপাই শফিউদ্দিন, বীর প্রতীক, ১৩. সাইদুর রহমান, বীর প্রতীক।
(মহান মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, পৃ. ১৪১-১৫৭)
[লেখাটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ব্রিগেডভিত্তিক ইতিহাস, ২০০৬ গ্রন্থ থেকে সংকলিত]










