সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে আমার সেক্টরের সেনাদের পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশ আসে কে-ফোর্স গঠনের, আমি আগে থেকেই মনঃস্থ করেছিলাম, পাকিস্তানি সেনাদের ওপর পুনরাক্রমণের আগে আমার অধীন সেনাদের পুনর্গঠন দরকার। আমাদের সেনারা চার-পাঁচ মাস ধরে অবিরাম যুদ্ধ এবং জীবনধারণের নিম্নতম প্রয়োজন আহার-নিদ্রা থেকে বঞ্চিত ও যুদ্ধসামগ্রীর অপর্যাপ্ততা ইত্যাদি প্রবল প্রতিকূলতার দরুন স্বাভাবিক কারণেই অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। সুতরাং পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে শত্রুপক্ষকে আক্রমণের আগে আমাদের সেনাদের কিছু বিশ্রাম ও পুনর্গঠন প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এছাড়া নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদের নিয়ে এবং চতুর্থ বেঙ্গলের পুরনো ও অভিজ্ঞ সেনাদের নিয়ে আরো কয়েকটি ব্যাটালিয়ন গঠন করার ইচ্ছা ছিল। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি আমার সাবসেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে আমার হেডকোয়ার্টারস মেঘালয়ে একটি কনফারেন্স করি। সে কনফারেন্সে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হয়:
ক. চতুর্থ বেঙ্গল থেকে পুরনো ও অভিজ্ঞ সেনা নিয়ে আরো দুটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে।
খ. চতুর্থ বেঙ্গলের ‘চার্লি’ কোম্পানি এবং হেডকোয়ার্টারসের কিছু সেনা চতুর্থ বেঙ্গলেই থাকবে এবং তাদের নিয়ে চতুর্থ বেঙ্গলকে পুনর্গঠন করা হবে। এ ব্যাটালিয়ন পরিচালনার জন্য ক্যাপ্টেন গাফফারকে নিযুক্ত করা হয়। ব্যাটালিয়নটি পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসের জন্য কোনাবন বেইসে একত্র করা হবে।
গ. চতুর্থ বেঙ্গলের ‘ডেলটা’ ও ‘ব্রাভো’ কোম্পানির কিছু সেনা নিয়ে নতুন করে নবম বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হবে। ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিনকে এ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। এ ব্যাটালিয়নকে কসবা বেইসে পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করা হবে।
ঘ. চতুর্থ বেঙ্গলের ‘আলফা’ ও ‘ব্রাভো’ কোম্পানির অবশিষ্ট সেনাদের নিয়ে দশম বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হবে। মেজর সালেককে এ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। মেজর সালেক এবং চতুর্থ বেঙ্গলের ‘আলফা’ কোম্পানি সালদা নদীতে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় তাকে তার সেনাসহ বেলুনিয়াতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। দশম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে বেলুনিয়া-রাজনগর বেইসে পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করা হবে।
ঙ. ২ নম্বর সেক্টরের অধীন সব যোদ্ধাকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হবে। নবগঠিত চতুর্থ, নবম ও দশম রেজিমেন্টকে নিয়ে ‘কে-ফোর্স’ নামে ব্রিগেড গঠন করা হবে।
চ. নবগঠিত ‘কে’ ব্রিগেডের আলাদা হেডকোয়ার্টারস স্থাপন করে সেখানে স্টাফ অফিসার হিসেবে ক্যাপ্টেন মতিন ও লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আলমকে নিযুক্ত করা হয়।
ছ. গেরিলা হেডকোয়ার্টারস মেলাঘরেই রাখা হবে। মেজর হায়দার আমার অধীনে গেরিলা স্টাফ অফিসার নিযুক্ত হয়।
জ. ১৮টি সেক্টর কোম্পানি কোম্পানি হিসেবেই থাকবে এবং তারা ‘কে-ফোর্স’ হেডকোয়ার্টারসের নির্দেশ মেনে চলবে। তাদের সাধারণত কমান্ডো হিসেবে শত্রুপক্ষের পশ্চাদভাগে (গভীর অভ্যন্তরে) ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালানোর কাজে নিয়োগ করা হবে।
ঝ. গেরিলারা তাদের নিজ নিজ এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের নির্মূল করে নিজ নিজ এলাকা শত্রুমুক্ত করবে। পাকিস্তানি সেনাদের ছোট ছোট দলে বিচ্ছিন্ন করে তাদের ঘাঁটিগুলোকে অনুরোধ করে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করবে।
ঞ. ‘কে-ফোর্স’ ব্রিগেডকে পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো দখল করার কাজে নিয়োগ করা হবে এবং উদ্ধারকৃত মুক্ত এলাকার প্রতিরক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকবে।
ট. অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখের মধ্যেই ‘কে-ফোর্স’ পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা হবে।
ঠ. ‘কে-ফোর্স’ পুনর্গঠনকালে পাকিস্তানি সেনারা যাতে তাদের হৃত মনোবল পুনরুদ্ধার না করতে পারে এবং প্রাধান্য বিস্তারে সক্ষম না হয়, সেজন্য সেক্টর কোম্পানিগুলো এবং কমান্ডো প্লাটুনগুলো গেরিলাদের সহায়তায় চতুর্থ বেঙ্গলের অপারেশন এলাকায় নিয়োজিত থেকে শূন্যতা পূরণ করবে এবং তাদের তৎপরতা অব্যাহত রাখবে।
ড. অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম যা কিছু আছে তা পুনরায় বিভিন্ন দলের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা হবে।
ঢ. গোলন্দাজ বাহিনীর প্রথম ফিল্ড রেজিমেন্ট ‘কে-ফোর্স’-এর অধীনে নিযুক্ত করা হয়।
ণ. ‘কে-ফোর্স’ এবং ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কত্ব যৌথভাবে আমার অধীনে থাকবে। আমার অবর্তমানে এ দুটি বাহিনী বিভক্ত হবে। কে-ফোর্সের অধিনায়কত্ব করবেন মেজর সালেক এবং ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করবেন মেজর হায়দার।
কনফারেন্সের বর্ণিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ নম্বর সেক্টরের পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা হয়। নিয়মিত বাহিনীর ‘কে-ফোর্স’ ব্রিগেড গঠন করার কাজে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। যেহেতু যুদ্ধসামগ্রীর যথেষ্ট অভাব ছিল; বিশেষ করে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও পোশাকের; তবুও সংগঠনের কাজ মোটামুটি এগিয়ে চলে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে নবম বেঙ্গল রেজিমেন্ট কসবাতে, চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট সালদা নদীতে এবং দশম বেঙ্গল রেজিমেন্ট বেলুনিয়াতে সংগঠিত হয়ে পুনরায় যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে যায়। যুদ্ধে পুনর্নিয়োগের আগে এসব ইউনিটকে তিন সপ্তাহের জন্য ব্যাপকভাবে সমন্বিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝিতে নবম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পরীক্ষামূলকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিই। এ সময়ে আমাদের সেক্টর ট্রুপস কসবা, মন্দভাগ প্রভৃতি এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনে চলছিল। আমি এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তাদের সম্পূর্ণভাবে এ এলাকা থেকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত নিই। কসবার পূর্বাংশ ইতিমধ্যেই আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। পাকিস্তানি সেনারা সেখান থেকে পিছু হটে পূর্বেই পশ্চিমাংশে পুরান বাজারের কাছে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। নবম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পাকিস্তানি সেনাদের এই ঘাঁটি আক্রমণের নির্দেশ দিই। নির্দেশ অনুযায়ী ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন তার ব্যাটালিয়নকে লাতুমুড়ার পেছনে সমবেত করে এবং ২০ অক্টোবর পর্যন্ত শত্রু অবস্থানের সব সংবাদ সংগ্রহ করে। শত্রু অবস্থানের তথ্য জানার পর বোঝা যায়, পাকিস্তানি সেনারা তাদের অবস্থানটি পূর্ব ও দক্ষিণমুখী করে বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে। আমি মেজর আইন উদ্দিনকে নবম বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানি দিয়ে উত্তর দিক থেকে পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিই।
২২ অক্টোবর ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নবম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রায় ১০ মিনিট তীব্র কামানের গোলার আক্রমণের পর উত্তর দিক থেকে দুটি কোম্পানি লেফটেন্যান্ট আজিজ (শহীদ লেফটেন্যান্ট খন্দকার আজিজুল ইসলাম বীর বিক্রম) ও সুবেদার শামসুল হকের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ অতর্কিত আক্রমণের জন্য পাকিস্তানি সেনারা প্রস্তুত ছিল না। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তাদের অবস্থানগুলো ভেঙে পড়ে। তারা দিশেহারা হয়ে পেছনের দিকে পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাদের একটি ছোট দল পেছনে হটে গিয়ে ছোট একটি নালার পশ্চিম তীরে পুনরায় দ্রুত অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করে। পরদিন ভোররাত চারটার দিকে সুবেদার শামসুল হকের কোম্পানি পাকিস্তানি সেনাদের এ অবস্থানের ওপর আবার আক্রমণ চালায়। প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে প্রায় ২০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ২২ জন আহত হয়। বিপর্যন্ত হয়ে পাকিস্তানি সেনারা সম্পূর্ণরূপে পেছনে হটে যায়। এ আক্রমণের ফলে সম্পূর্ণ কসবা আমাদের দখলে আসে। পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে গিয়ে মইনপুর, কায়েমপুর (কাইমপুর), কামালপুর প্রভৃতি জায়গায় তাদের নতুন অবস্থান তৈরি করে। কসবা শত্রুমুক্ত করার পর নবম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কৃশানপুর, বগাবাড়ী ইয়াকুবপুর এলাকাজুড়ে তাদের নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করে। এ অবস্থানগুলো থেকে টহল দল ও শক্তিশালী রেইডিং দল পাকিস্তানি অবস্থানগুলোর ওপর ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে।
চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কোনাবনে তাদের বেইসে পুনর্গঠিত হওয়ার পর অক্টোবরে আবার যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে যায়। আমি এই ব্যাটালিয়নকে সালদা নদী থেকে পাকিস্তানি সেনাদের বিতাড়িত করার নির্দেশ দিই। সালদা এলাকাটি ট্যাকটিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে খারাপ বলে তাদের ওপর আমাদের পুরো ব্যাটালিয়ন নিয়ে আক্রমণ করার নির্দেশ দিই। কোম্পানি ও প্লাটুনে ভাগ হয়ে প্রথম তৎপরতা চালিয়ে এলাকার ওপর পুরো আধিপত্য অর্জন করার নির্দেশ দিই। এ নির্দেশের পর ক্যাপ্টেন গাফফার তার মন্দভাগ-অবস্থান থেকে সালদা নদীর পশ্চিমে ও উত্তরে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎপরতা বাড়ায়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি প্লাটুন কায়েমপুরের [কাইমপুর] কাছে অ্যামবুশ পাতে। পাকিস্তানিদের প্রায় ৪০ জন সেনা এ অ্যামবুশে আক্রান্ত হয়। ফলে ১৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং অনেক আহত হয়। এর তিন-চারদিন পর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের আরেকটি রেইডিং দল পাকিস্তানি সেনাদের চত্তরা [ছতুরা] অবস্থানের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে রকেট লঞ্চার দিয়ে একটি বাংকার উড়িয়ে দেয় এবং ১৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হতাহত করে। এর কিছুদিন পর নায়েব সুবেদার সিকদার আফজাল হোসেনের [শেখ আফজাল হোসেন বীর বিক্রম, পরে অনারারি ক্যাপ্টেন) নেতৃত্বে চতুর্থ বেঙ্গলের একটি কোম্পানি পাকিস্তানি সেনাদের পেছনে অনুপ্রবেশ করে চাপিতলায় অ্যামবুশ পাতে। পরদিন ভোররাত চারটার সময় পাকিস্তানি সেনাদের দুটি কোম্পানি তাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলো শক্তিশালী করার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। পাকিস্তানি সেনাদের এ দল ভোর পাঁচটায় আমাদের অ্যামবুশে এসে যায়। প্রায় চার ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে প্রায় ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।
সালদা নদী এলাকায় শত্রুদের ঘাঁটিটি খুবই শক্তিশালী ছিল। এ ঘাঁটির উত্তর দিয়ে সালদা নদী প্রবাহিত হওয়ায় শত্রুদের উত্তর দিক সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ ছিল। ঘাঁটি পর্যবেক্ষণের পর আমরা আরো জানতে পারি যে সালদা নদীর তীর বরাবর আমাদের ঠিক সামনে তারা চারটি বড় পরিখা খনন করেছে। সালদা নদীর গুদামঘরের পাশ দিয়েও তারা একই রকম পরিখা খনন করেছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘাঁটিটি তিন দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন গাফফার ও নায়েব সুবেদার সিরাজের নেতৃত্বে একটি প্লাটুন সালদা নদী রেলস্টেশনের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নেয়। সুবেদার মঙ্গল মিয়ার নেতৃত্বে আরেকটি প্লাটুন সালদা নদী ও গুদামঘরের পশ্চিমে নদী অতিক্রম করে অবস্থান নেয়। সুবেদার বেলায়েতের [শহীদ বেলায়েত হোসেন বীর উত্তম] নেতৃত্বে আরেকটি প্লাটুন সালদা নদীতে শত্রুঘাঁটির বিপরীত দিকে অবস্থান নেয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এসব রেইডিং দল ১৫ নভেম্বর রাতে পাকিস্তানি সেনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য শত্রুঘাঁটির ওপর হালকা আক্রমণ চালায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা গোলা বর্ষণ করে। এ গোলাবর্ষণ সারা রাত চলে এবং ভোরের দিকে বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের আক্রমণ শেষ হয়ে গেছে ভেবে পাকিস্তানি সেনারা পরদিন সকালে কিছুটা অসতর্ক হয়ে পড়ে এবং বিশ্রামের সুযোগ নেয়। আমরা তাদের এই অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে সকাল আটটার দিকে তাদের ওপর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রচণ্ড আক্রমণ চালাই।
সুবেদার মঙ্গল মিয়ার দলটি পশ্চিম দিক থেকে সালদা নদী গুদামঘরের পরিখায় অবস্থানরত শত্রুদের ওপর এবং নায়েব সুবেদার সিরাজ পূর্ব দিকের পাহাড়ি এলাকার অবস্থান থেকে সালদা নদী রেলস্টেশনের পরিখায় অবস্থানরত শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালায়। সঙ্গে সঙ্গে নায়েব সুবেদার মুহম্মদ হোসেন সুবেদার বেলায়েতের অবস্থান থেকে আরআর-এর সাহায্যে নদীর অপর তীরে শত্রুদের চারটি পরিখা ধ্বংস করে দেয়। এতে আমাদের যথেষ্ট সুবিধা হয় এবং পাকিস্তানি সেনারা সম্মুখবর্তী পরিখা ছেড়ে পিছু হটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সুবেদার বেলায়েত তার সেনাদের নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সাঁতরে অপর তীরে শত্রুদের সম্মুখবর্তী পরিত্যক্ত পরিখাগুলো দখল করে নেয় এবং কিছু সেনাকে সেসব পরিখায় রেখে সামনের দিকে আরো অগ্রসর হয়। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সুবেদার বেলায়েত বীর বিক্রমে সম্মুখভাগের শত্রুপরিখার ওপর গ্রেনেড চার্জ করে আরো কয়েকটি শত্রু-বাংকার ধ্বংস করে। ফলে কয়েকজন শত্রুসেনা নিহত হয়। সুবেদার বেলায়েত ও তার দলের প্রচণ্ড আক্রমণে সালদা নদীর তীরবর্তী এলাকা সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়ে যায়। ফলে সালদা নদী রেলস্টেশনে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সালদা নদী গুদামঘরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ সময় পাকিস্তানি সেনাদের একটি ওয়্যারলেস মেসেজ আমাদের কাছে ধরা পড়ে। এতে তারা কর্তৃপক্ষকে জানায়, মুক্তিবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন তাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালাচ্ছে। তাদের পক্ষে এই ঘাঁটিতে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এ মেসেজ পাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাদের দুর্বলতা সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারি। তাদের মনোবল যে একেবারেই ভেঙে পড়েছে তা বেশ বোঝা যায়। সঙ্গে সঙ্গে সুবেদার মঙ্গল মিয়াকে তার আক্রমণ আরো জোরদার করার নির্দেশ দিই। এ প্রচণ্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে গুদামঘরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা নয়নপুর রেলস্টেশনের দিকে পালাতে থাকে। সুবেদার মঙ্গল মিয়ার দলটি গুদামঘর এলাকা দখল করে নেয়।
সালদা নদী এলাকা দখল করা একটি দুঃসাহসী পরিকল্পনা ছিল। এ পরিকল্পনা অত্যন্ত অপ্রচলিত কৌশলের একটি বিরাট সাফল্য। এর ফলে কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। সালদা নদী কমপ্লেক্স আমাদের হস্তগত হওয়ার পর পাকিস্তানি সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এই এলাকা পুনর্দখলের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। পাকিস্তানি সেনারা চান্দলার কাছে অন্যান্য এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক সেনা এনে সমাবেশ ঘটায়। ১৬ নভেম্বর রাত ২টা ১৫ মিনিটে পাকিস্তানি সেনারা প্রায় দুই ব্যাটালিয়ন সেনাশক্তি নিয়ে আমাদের সালদা নদী, মন্দভাগ, কামালপুর প্রভৃতি অবস্থানের ওপর গোলন্দাজ বাহিনী ও মর্টারের সহায়তায় প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণ তিন-চার ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে। সকাল পর্যন্ত যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের বিপুলসংখ্যক সেনা হতাহত হয়। উপায়ান্তর না দেখে তারা আক্রমণ বন্ধ করে পিছু হটে যায়।
এর কয়েকদিন পর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে সালদা নদী থেকে ফেনীর দিকে আক্রমণ চালানোর জন্য ‘কে’ ফোর্সের অধীনে বেলুনিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কামালের [কামাল উদ্দিন আহমেদ] অধীনে কয়েকটি সেক্টর কোম্পানি সালদা নদীতে রেখে ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল বেলুনিয়াতে ‘কে’ ফোর্সে যোগদান করে। দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট রাজনগরে তাদের পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসের পর তাদের দুই সপ্তাহের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ব্যাপক প্রশিক্ষণের পর বেলুনিয়ায় আবার তাদের পুরনো প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোতে পাঠানো হয় এবং এই সেক্টরে তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এ সময় দশম ইস্ট বেঙ্গলকে মেজর জাফর ইমাম নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পুনরায় রণক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর দশম ইস্ট বেঙ্গল তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করে। ১৫ অক্টোবর দশম ইস্ট বেঙ্গল অনন্তপুর প্রতিরক্ষাব্যূহের সামনে পরশুরাম, চিথলিয়া প্রভৃতি জায়গায় পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটিগুলোর ওপর ছোট ছোট আক্রমণ চালায়। এসব আক্রমণে ২৪ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়। পাকিস্তানি সেনাদের তিনটি বাংকারও তারা ধ্বংস করে। ১৮ অক্টোবর সকাল ছয়টার সময় পাকিস্তানি সেনাদের একটি প্লাটুন আমাদের ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে বেলুনিয়া নদীর পূর্ব তীরে আমাদের সেনাদের অ্যামবুশে পড়ে। ফলে ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়। ফুলগাজীর কাছে দশম বেঙ্গলের পাইওনিয়ার প্লাটুন ওই দিনই রাস্তায় মাইন পুঁতে সকাল ১০টার সময় পাকিস্তানি সেনাদের একটি ট্রাক ধ্বংস করে দেয়। সাতজন পাকিস্তানি সেনা এতে নিহত এবং তিনজন আহত হয়। ২০ অক্টোবর আমাদের মর্টার ডিটাচমেন্ট সন্ধ্যা ছয়টায় পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে অনুপ্রবেশ করে চিথলিয়া ঘাঁটিটিতে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এতে ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও সাতজন আহত হয়। ২৫ অক্টোবর আমাদের গোলন্দাজ বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের চিথলিয়া ঘাঁটির ওপর আবার আক্রমণ চালায়। ফলে দুটি গাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় এবং সাতজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ২৬ অক্টোবর ভোর পাঁচটার সময় ফুলগাজীর কাছে আমাদের একটি প্লাটুন পাকিস্তানি সেনাদের টহল দলকে অ্যামবুশ করে। এতে নয় পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ছয়জন আহত হয়।
দশম ইস্ট বেঙ্গলের তৎপরতার কারণে এ এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের বিপুল সংখ্যায় সমাবেশ ঘটানো হয়। তারা দশম ইস্ট বেঙ্গলকে ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। ২৭ অক্টোবর চিথলিয়ার কাছে এক ব্যাটালিয়নের বেশি শক্তির সমাবেশ ঘটায়। সন্ধ্যা ছয়টার সময় গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাদের দুটি কোম্পানি অগ্রসর হয়ে আমাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি নিলক্ষ্মীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। আমাদের সেনারা সাহসের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে বাধা দেয়। কিন্তু প্রচণ্ড আক্রমণের সামনে টিকতে না পেরে মূল ঘাঁটিতে ফিরে আসে। পাকিস্তানি সেনারা নিলক্ষ্মী অগ্রবর্তী ঘাঁটিটি দখল করে নেয়। পরদিন সকালে দশম ইস্ট বেঙ্গলের তিন কোম্পানি আমাদের গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় নিলক্ষ্মীর ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। সকাল ১০টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে। প্রচণ্ড চাপে পাকিস্তানি সেনারা টিকতে না পেরে নিলক্ষ্মী ঘাঁটি ত্যাগ করে পিছু হটে যায়। আমাদের সেনারা নিলক্ষ্মী পুনর্দখলের পর প্রতিরক্ষাব্যূহ মালিবিল ও গাবতলী পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে। পরদিন সন্ধ্যা ছয়টায় আমাদের একটি প্লাটুন দুবলা চাঙ্গের কাছে একটি অ্যামবুশ পেতে বসে থাকে। পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল বেলুনিয়া যাওয়ার পথে সেই অ্যামবুশে পড়ে। আমাদের প্লাটুনটি পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করে এবং দুজন পাকিস্তানি সেনাকে জীবিত বন্দি করে। এছাড়া অনেক অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেয়।
৬ নভেম্বর দশম বেঙ্গলের একটি কোম্পানি গোলন্দাজ বাহিনী ও মর্টারের সহায়তায় চিথলিয়ার উত্তরাংশে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরক্ষাব্যূহের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। প্রায় চার ঘণ্টা যুদ্ধের পর দশম বেঙ্গলের কোম্পানিটি চিথলিয়ার উত্তরাংশ দখল করে নিয়ে সালিয়া এবং ধানীকুণ্ডার মাঝখানে রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে পরশুরাম ও ফেনীর মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে সমর্থ হয়। ফলে বেলুনিয়ার উত্তরাংশের পাকিস্তানি সেনারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একজন অফিসারসহ ১২ জন পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধে নিহত এবং পাঁচজন বন্দি হয়।
এ সময় ‘কে’ ফোর্স হেডকোয়ার্টারস থেকে পুনরাক্রমণের নির্দেশ আসে। এ নির্দেশ অনুযায়ী ‘কে’ ফোর্স হেডকোয়ার্টারস কোনাবন অবস্থান থেকে দক্ষিণ বেলুনিয়াতে স্থানান্তরিত হয় এবং বেলুনিয়া সেক্টরে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকেও এ যুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী ‘কে’ ফোর্সকে অতিসত্বর ফেনী মুক্ত করার আদেশ দেয়া হয়। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল ফেনীর দিকে অগ্রসর হয়। চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল উত্তর দিক থেকে ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে ফেনীর দিকে অগ্রসর হয়। দশম বেঙ্গল লক্ষ্মীপুর হয়ে ছাগলনাইয়ার দিকে অগ্রসর হয়। ‘কে’ ফোর্সের এই দুই ব্যাটালিয়নের প্রচণ্ড চাপে পাকিস্তানি সেনারা টিকতে না পেরে তাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি পাঠাননগর ও দক্ষিণ মুন্সিরহাট ছেড়ে পেছন দিকে পালিয়ে যায়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে ‘কে’ ফোর্স ছাগলনাইয়া ও ফেনীর উপকণ্ঠে পাকিস্তানি সেনাদের উত্তর-পশ্চিম দিকে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে ফেলে এবং পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানগুলোর ওপর গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এ চাপে পাকিস্তানি সেনারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। আমাদের আক্রমণের চাপ আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়। উপায়ান্তর না দেখে ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেলে শুভপুর সেতু উড়িয়ে দেয়। যার ফলে পাকিস্তানি সেনাদের পিছু ধাওয়া করা ‘কে’ ফোর্সের পক্ষে অসুবিধা হয়ে পড়ে এবং তাদের অগ্রাভিযান বাধাপ্রাপ্ত হয়। শুভপুর সেতু মেরামতের জন্য দুই দিন সময় লেগে যায়। মিত্র বাহিনীর প্রকৌশলীরা একটি সেতু পুনর্নির্মাণ করে এবং এরপর সেতু ও নৌকার সাহায্যে চট্টগ্রামের দিকে ‘কে’ ফোর্সের অগ্রাভিযান আবার শুরু হয়। এ সময় আমি আহত হওয়ায় ‘কে’ ফোর্সের নেতৃত্ব মেজর সালেকের ওপর ন্যস্ত ছিল।
‘কে’ ফোর্স ফেনী থেকে করেরহাট পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের ছোটখাটো রক্ষাব্যূহ দখল করে তাদের অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখে এবং করেরহাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত করে। করেরহাট থেকে চট্টগ্রামে অগ্রসর হওয়ার জন্য নতুন এক পরিকল্পনা নেয়া হয়। এ পরিকল্পনা অনুসারে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল ও মুজিব ব্যাটারিকে নিয়ে হিয়াক-ফটিকছড়ি-নাজিরহাট হয়ে চট্টগ্রামের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শত্রুবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাবে এবং দশম ইস্ট বেঙ্গল ফেনী-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কে সীতাকুণ্ড হয়ে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হবে। এ দ্বিমুখী অগ্রাভিযান চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে পৌঁছে চট্টগ্রাম শহরের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালাবে। পরিকল্পনামতো চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল মুজিব ব্যাটারিসহ হিয়াকুর দিকে ৭ ডিসেম্বর রাত ১২টায় অগ্রসর হয়। পরদিন সকাল ছয়টায় হিয়াকু বাজারের কাছে পৌঁছার পর পাকিস্তানি সেনাদের একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পাকিস্তানি সেনাদের এই ঘাঁটিতে ৪০-৫০ জন সেনা ছিল। তারা আমাদের বাধা দেয়। কিন্তু আমাদের সেনা ও গোলন্দাজ বাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা ফটিকছড়ির দিকে পালিয়ে যায়। ফলে হিয়াকু বাজার আমরা অতি সহজেই শত্রুমুক্ত করে নিজেদের দখলে আনি। হিয়াকু থেকে চট্টগ্রামের দিকে একটি কাঁচা রাস্তা গেছে। রাস্তাটি খুবই খারাপ। সেই রাস্তায় হেঁটে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রসর হতে হয়। অগ্রসরের পথে নারায়ণহাটের কাছে পাকিস্তানি সেনাদের আরেকটি অবস্থানের সঙ্গে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের সংঘর্ষ হয়। পাকিস্তানি সেনাদের এ অবস্থানও আমাদের আক্রমণের চাপে টিকতে না পেরে ফটিকছড়ির দিকে পিছু হটে যায়। যাওয়ার সময় একটি কাঠের সেতু ধ্বংস করে দেয়। চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল ওই দিন রাতে নারায়ণহাটে বিশ্রাম নেয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতুটি মেরামত করার পর আমাদের অগ্রযাত্রা আবার শুরু হয়। পথে কাজীরহাটে পাকিস্তানি সেনারা আমাদের অগ্রাভিযানে বাধা দেয়ার জন্য পথে অনেক মাইন পুঁতে রাখে। এ মাইনগুলো সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রসর হতে হয়।
১০ ডিসেম্বর ফটিকছড়ির উপকণ্ঠে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের অগ্রাভিযানকে পাকিস্তানের ২৪তম ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্ট বাধা দেয়। ফটিকছড়িতে পাকিস্তানিদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। সে জন্য চতুর্থ বেঙ্গলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গাফফার পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর চতুর্থ বেঙ্গল দুই ভাগে বিভক্ত হয়। একটি দল ফটিকছড়ির সন্নিকটে পাহাড়ের দিকে রাস্তায় এবং প্রধান দলটি কাজীরহাট-ফটিকছড়ি রাস্তার দিকে অগ্রসর হয়। ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের সম্পর্কে আরো তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং তার পরই পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর গোলাবর্ষণ করা হয়। কিন্তু শত্রুদের অবস্থান এত শক্তিশালী ছিল যে চার ঘণ্টা যুদ্ধ চালানোর পরও পাকিস্তানি সেনারা আমাদের আক্রমণকে প্রতিহত করে। সুতরাং এভাবে আক্রমণ চালিয়ে কোনো লাভ নেই মনে করে অন্য পন্থা অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং এ কারণে আমাদের সেনাদের কিছুটা পিছিয়ে নেয়া হয়।
চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল ১৪ ডিসেম্বর রাতে পশ্চিম দিকে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়ে চা-বাগানের ভেতর দিয়ে ভোর পাঁচটায় নাজিরহাটে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে তারা এত হতভম্ব হয়ে পড়েছিল যে আমাদের আক্রমণে বাধা পর্যন্ত দিতে পারেনি এবং শত্রুরা ঘুম থেকে উঠেই দেখতে পায়, আমরা তাদের পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালিয়েছি। উপায়ান্তর না দেখে সবকিছু ফেলে তারা চট্টগ্রামের দিকে পালাতে থাকে। পালানোর পথে আমাদের মর্টারের এবং মেশিনগানের গুলিতে অনেক পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। প্রায় ৪০ জন হতাহত পাকিস্তানি সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাওয়া যায়। আটজন পাকিস্তানি সেনা বন্দি হয়, ৪৯ জন ইপিসিএএফ অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। বিপুল গোলাবারুদ ও অন্যান্য জিনিসপত্র আমাদের হস্তগত হয়। রেশন বোঝাই কয়েকটি ট্রাকও আমাদের দখলে আসে। পালানোর সময় পূর্ব থেকে লেফটেন্যান্ট শওকতের গণবাহিনীর কোম্পানিও পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং অনেককে হতাহত করে। পাকিস্তানি সেনারা রাস্তা ছেড়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। ১৪ ডিসেম্বর নাজিরহাট সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। আমাদের একজন শহীদ ও একজন সেনা আহত হয়।
পাকিস্তানি সেনারা নাজিরহাট সড়ক সেতু আগে থেকেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। সেজন্য নাজিরহাট থেকে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রযাত্রা এক দিন দেরি হয়ে যায়। নাজিরহাটের স্থানীয় জনগণের সাহায্যে সেই সেতুটির আংশিক পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয় এবং ১৫ ডিসেম্বর নাজিরহাট থেকে চট্টগ্রামের দিকে আমাদের অগ্রাভিযান পুনরায় শুরু হয়। সকালে হাটহাজারী পৌঁছার পর দশম ইস্ট বেঙ্গলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। দশম ইস্ট বেঙ্গল মেজর জাফর ইমামের নেতৃত্বে সীতাকুণ্ড হয়ে চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে আসছিল। হাটহাজারীতে যোগাযোগের পর ‘কে’ ফোর্সের দশম ইস্ট বেঙ্গল ও চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শত্রুমুক্ত করে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে এই সম্মিলিত বাহিনী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অগ্রসর হয়ে চট্টগ্রাম শহর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এ সময় বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টারস আক্রমণ স্থগিত রাখার নির্দেশ পাঠায়। আরো খবর আসে যে পাকিস্তানি সেনারা ওই দিন আত্মসমর্পণ করবে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে চারটায় পাকিস্তানি সেনাদের এক ডিভিশন সেনা ‘কে’ ফোর্সের কাছে অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। পাকিস্তানি সেনাদের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম সেনানিবাস, নৌঘাঁটি ট্রানজিট ক্যাম্প প্রভৃতি জায়গায় বন্দি করে রাখা হয়। সমস্ত চট্টগ্রাম ‘কে’ ফোর্সের নিয়ন্ত্রণে আসে। স্বতঃস্ফূর্ত জনগণ বিজয়মাল্যে ভূষিত করে আমাদের বিজয়ী বীর সেনাদের। বিজয় উল্লাসে শহর প্রদক্ষিণ করে তারা।
[কে-ফোর্সের প্রধান খালেদ মোশাররফের সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি ১৯৮০ সালের ২০ জুলাই গৃহীত। সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: দশম খণ্ড; সম্পাদক: হাসান হাফিজুর রহমান]










