প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামার পর এটি স্কুল-কলেজসহ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি আন্দোলনের নতুন গতিপথ তৈরি করে। ১৪ জুলাই যখন শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারীদের রাজাকার বললেন। তার প্রতিক্রিয়াতেই পরদিন আমরা ক্যাম্পাসে এসে ৮ নম্বর গেটে দাঁড়ালাম। তখন ৬০-৭০ জনের মতো ছিলাম। কর্মসূচি শেষে আমরা ঢাবি ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখি রণক্ষেত্র—ভিসি চত্বরে হামলা চলছে। আমরা আহতদের চিকিৎসা সহযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি তখন। ১৬ জুলাই সারা দেশে ছয়জন শহীদের খবরে আন্দোলন আরো তীব্র হয়। ১৭ জুলাই টিএসসিতে গায়েবানা জানাজায় যোগ দিতে গিয়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশের বাধার মুখে মল চত্বরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
পরদিন নর্থ সাউথের সামনে পুলিশ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আগে বাড়লে গুলি চালানো হবে। আমি সহযোদ্ধাদের বলি, আমরা ভয় পাই না, গুলি চালালে প্রথম গুলিটা আমি খাব। মিছিল নিয়ে নতুনবাজার অতিক্রম করে বাঁশতলায় পৌঁছতেই শুরু হয় মুহুর্মুহু ফায়ারিং। মাথায় ইট লেগে কপাল ফেটে যায়, চারদিকে রক্ত আর মরদেহের বিভীষিকা। আহত অবস্থায় আইইউবিতে শত শত শিক্ষার্থীর রক্তভেজা চেহারা দেখে নিজের দায়বদ্ধতা আরো বেড়ে যায়। সিদ্ধান্ত নিই পিছু হটার আর কোনো সুযোগ নেই, লক্ষ্য এখন শুধুই এক দফা।
১৯ জুলাই ভয়াবহ কারফিউর মধ্যেও হেলিকপ্টার থেকে গুলি আর কাঁদানে গ্যাসের শেলের ভয় উপেক্ষা করে আমরা রাজপথে নামি, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলি। ২৭ জুলাই বাসা ছেড়ে, আত্মগোপনে থেকে, নানা জায়গায় রাতে আশ্রয় নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাই। ২৮ জুলাই আমাদের শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে সংহতি জানান। বেশ কয়েকজনকে তুলেও নিয়ে যাওয়া হয়। ১ আগস্ট আমরা নর্থ সাউথের ১ নম্বর গেটে বিক্ষোভ কর্মসূচি দিই। সেদিন পুলিশ খুব একটা বাধা দেয় না। আমরা ১ ঘণ্টার মতো কর্মসূচি পালন করে শেষ করি। ২ আগস্ট আমরা যমুনা গেটের সামনে একত্র হই। তখন একটা বক্তব্য দিই সাড়ে ৩ মিনিটের। সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানাই। হাসিনা সরকারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি জনতার মঞ্চের পক্ষ থেকে। ৩ আগস্ট আমরা শহীদ মিনারে যাই। ওখানে এক দফার ঘোষণা আসে। ওইদিন এ পর্যন্তই। পরদিন আমরা অসহযোগ কর্মসূচির সমর্থনে নর্থ সাউথের ১ নম্বর গেটে অবস্থান নিই। ওইদিন অসংখ্য মানুষ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। কেউ খাবার কিনে এনে দেয়, কেউ পানি, কেউ খাওয়ার জন্য পিঠা বানিয়েছেন, সেগুলো না খেয়ে আমাদের জন্য নিয়ে আসে। ৪ আগস্ট রাতে তো কোনো ঘুম হলো না। ৫ আগস্ট সকালে আমরা নর্থ সাউথের ১ নম্বর গেটে জড়ো হতে শুরু করি। সেখানে ৭০ জনের মতো ছিলাম। সে সময় নাফসিন আজরিন এগিয়ে যেতে শুরু করলে পুলিশ হামলা চালায়। একই সময় খবর পাই ছাত্রলীগ-যুবলীগ আর আওয়ামী লীগের লোকজন কয়েকটা লেয়ারে জড়ো হচ্ছে আমাদের ওপর হামলা করবে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম সত্যি। তারা বেশ সজ্জিত হয়ে আছে। তারা হামলা চালাবেই। এর মধ্যেই খবর পাই উত্তরা থেকে একটা বিশাল মিছিল আসছে। আমরা প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি ও আশপাশের সব ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে ছিলাম। সেদিনও ব্যাপক হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে খবর আসে সেনাপ্রধান ভাষণ দেবেন। এ ঘোষণা জানার পরই পুলিশ চলে যায়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে আমরা গণভবনে যাই।









